শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৬৩তম পর্ব: দ্বিতীয় সাক্ষীর অজানা পরিচয়
সকালে নীরা ঘুম থেকে উঠেই নওরীন আলমের পাঠানো ছবিটি আবার খুলল।
খামের ওপর লেখা কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল—
“এই নথির দ্বিতীয় সাক্ষীকে কখনো জানানো হয়নি যে তাঁর স্বাক্ষর কোন কাজে ব্যবহার করা হবে।”
কথাটি সত্যি হলে, এত দিনের অনুসন্ধানে নতুন একটি প্রশ্ন যুক্ত হবে।
আবদুল করিম কি সত্যিই জানতেন তাঁর স্বাক্ষর কোথায় ব্যবহার করা হয়েছিল?
নাকি তাঁর অজান্তেই অন্য কোনো নথিতে সেই স্বাক্ষর যুক্ত হয়েছিল?
নীরা আরিয়ানকে ফোন করল।
—আজ নওরীন আপুর কাছে যাব তো?
—হ্যাঁ। রাফিকেও সঙ্গে নিচ্ছি। খামটির প্রতিটি তথ্য যাচাই করতে হবে।
—আমার মনে হচ্ছে, এবার আবদুল করিম চাচার সঙ্গে আবার কথা বলা দরকার।
—আগে খামটা দেখি। তারপর সিদ্ধান্ত নেব।
১. মাহবুব আলমের ব্যক্তিগত প্রমাণ
দুপুরে তাঁরা নওরীন আলমের বাসায় পৌঁছালেন।
নওরীন তাঁদের একটি ছোট কাঠের আলমারির সামনে নিয়ে গেলেন।
—বাবার মৃত্যুর পর তাঁর ব্যক্তিগত কাগজপত্রগুলো আমি আলাদা করে রেখেছিলাম। এই খামটি তখন থেকেই এখানে আছে।
তিনি খামটি বের করে টেবিলে রাখলেন।
নীরা সাবধানে খাম খুলল।
ভেতরে ছিল তিনটি কাগজ।
প্রথমটি একটি গ্রহণ রসিদ।
দ্বিতীয়টি একটি ছোট বিবৃতি।
তৃতীয়টি ছিল কয়েকটি নামের তালিকা।
আরিয়ান প্রথম কাগজটি হাতে নিল।
—এখানে লেখা আছে, মূল নথি গ্রহণের সময় দুইজন সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন।
নীরা তালিকাটির দিকে তাকাল।
সেখানে নামগুলো ছিল—
১. আবদুল করিম
২. একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি
দ্বিতীয় নামের জায়গায় লেখা ছিল শুধু—
“A. S.”
নীরা বলল,
—A. S. মানে কে?
নওরীন উত্তর দিলেন,
—বাবার ডায়েরিতে এই আদ্যক্ষর দুবার পেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি কোথাও পুরো নাম লেখেননি।
২. আবদুল করিমের সঙ্গে আবার দেখা
সেদিন বিকেলেই তাঁরা আবদুল করিমের বাড়িতে গেলেন।
নীরা তাঁর সামনে রসিদটি রাখল।
—চাচা, এই কাগজে আপনার নাম আছে। আপনি কি এই গ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন?
আবদুল করিম চশমা ঠিক করে কাগজটি দেখলেন।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
—এই কাগজের কথা আমার মনে আছে। তবে আমি যে স্বাক্ষর করেছিলাম, সেটি ছিল নথি গ্রহণের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনাকে কি বলা হয়েছিল, নথিটি কী কাজে ব্যবহার করা হবে?
—না। আমাকে বলা হয়েছিল, পুরোনো কাগজপত্রের একটি তালিকা তৈরি হচ্ছে। আমি শুধু উপস্থিতির স্বাক্ষর দিয়েছিলাম।
নীরা বলল,
—তাহলে আপনার স্বাক্ষর পরে অন্য কোনো অনুমোদনের কাগজে ব্যবহার করা হয়ে থাকলে আপনি জানতেন না?
আবদুল করিম দৃঢ়ভাবে বললেন,
—না। আমার অনুমতি ছাড়া আমার স্বাক্ষর অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হলে সেটা সম্পূর্ণ অন্যায়।
৩. A. S. কে?
ইমরান এবার দ্বিতীয় সাক্ষীর নামটি দেখাল।
—আপনি কি এই A. S. নামের কাউকে চিনতেন?
আবদুল করিম কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—পুরোনো অফিসে আবদুস সালাম নামে একজন হিসাব সহকারী ছিলেন। তবে তাঁর সঙ্গে এই কাগজের সম্পর্ক আছে কি না, আমি নিশ্চিত নই।
নীরা বলল,
—তিনি কি এখনো জীবিত?
—আমার জানা নেই। বহু বছর আগে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।
আরিয়ান বলল,
—তাঁর কোনো কর্মী পরিচিতি বা ঠিকানা পাওয়া যেতে পারে?
আবদুল করিম বললেন,
—পুরোনো কর্মীদের রেজিস্টারে থাকার কথা। তবে একটা বিষয় মনে রেখো, শুধু নামের আদ্যক্ষর মিলে গেলেই কাউকে সাক্ষী ধরে নেওয়া যাবে না।
নীরা মাথা নাড়ল।
—আমরা সেটাই যাচাই করব।
৪. মাহবুবের ডায়েরির শেষ পাতা
নওরীন তাঁদের আরেকটি কাগজ দেখালেন।
—বাবার ডায়েরির শেষ দিকের একটি পাতায় এই কথাগুলো লেখা ছিল। আগে বুঝতে পারিনি।
নীরা পড়তে শুরু করল।
“দুই সাক্ষীর উপস্থিতি থাকলেই কোনো নথি সত্য হয়ে যায় না। একজন নথি দেখেছেন, আরেকজন শুধু গ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন—এই দুই দায়িত্ব এক নয়।
যে ব্যক্তি দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন, তাঁকে পুরো বিষয়টি জানানো হয়নি। তাই তাঁর স্বাক্ষরকে অনুমোদন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।”
নীরা কাগজটি নামিয়ে রাখল।
—মাহবুব আলম বিষয়টি বুঝেছিলেন!
আরিয়ান বলল,
—হ্যাঁ। তিনি অন্তত এটুকু বুঝেছিলেন যে সাক্ষীর স্বাক্ষর আর নথির অনুমোদন এক বিষয় নয়।
ইমরান বলল,
—তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কে সেই স্বাক্ষরকে অনুমোদন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিল?
নওরীন বললেন,
—বাবা এই প্রশ্নের উত্তর লিখে যাননি।
৫. পুরোনো কর্মী রেজিস্টার
পরদিন রাফি পুরোনো কর্মীদের তালিকা সংগ্রহ করল।
সেখানে আবদুস সালামের নাম পাওয়া গেল।
নাম: আবদুস সালাম
পদ: হিসাব সহকারী
কর্মকাল: ২০০৬–২০০৯
শেষ দায়িত্ব: নথি গ্রহণ ও হিসাব সংরক্ষণ
চাকরি ছাড়ার কারণ: ব্যক্তিগত আবেদন
নীরা বলল,
—২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কর্মরত ছিলেন।
আরিয়ান উত্তর দিল,
—তাই বলে তিনিই A. S. ছিলেন, সেটা এখনো প্রমাণ হয়নি।
রাফি আরও একটি তথ্য জানাল।
—স্যার, তাঁর চাকরি ছাড়ার আবেদনের সঙ্গে একটি আলাদা নোট যুক্ত আছে।
—কী লেখা?
—তিনি লিখেছিলেন, “আমার দায়িত্বে থাকা কিছু নথির মূল কপি ও সংযুক্ত কপির মধ্যে অমিল রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—তিনি নিজেই অমিলের কথা জানিয়েছিলেন?
ইমরান বলল,
—তাহলে তাঁকে খুঁজে বের করতেই হবে।
৬. একটি পুরোনো ঠিকানা
রেজিস্টারে আবদুস সালামের একটি পুরোনো ঠিকানা পাওয়া গেল।
রাফি জানাল, ঠিকানাটি যাচাই করে জানা গেছে, তিনি এখনো সেই এলাকার কাছাকাছি থাকেন।
আরিয়ান বলল,
—আগামীকাল তাঁর সঙ্গে দেখা করব।
নীরা একটু চিন্তিত হয়ে বলল,
—যদি তিনি কিছুই মনে করতে না পারেন?
আরিয়ান শান্তভাবে উত্তর দিল,
—তাহলে আমরা অন্য প্রমাণ খুঁজব। একজন মানুষের স্মৃতির ওপর পুরো সত্য নির্ভর করতে পারে না।
নীরা মৃদু মাথা নাড়ল।
তারপর বলল,
—তুমি সব সময় আমাকে একটা কথা মনে করিয়ে দাও।
—কোন কথা?
—কাউকে প্রমাণ ছাড়া দোষী ভাবা উচিত নয়।
আরিয়ান বলল,
—কারণ সত্য খুঁজতে গিয়ে যেন আমরা নিজেরাই অন্যায় না করি।
৭. রাতের শেষ বার্তা
রাতে নীরা নিজের ঘরে বসে পুরোনো কাগজগুলো গুছাচ্ছিল।
হঠাৎ তার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে বার্তা এল।
“আবদুস সালামের কাছে যাওয়ার আগে ১৮ সেপ্টেম্বরের গ্রহণ রসিদটি ভালো করে দেখুন। সেখানে একটি তথ্য বাদ পড়েছে।”
নীরা বার্তাটি কয়েকবার পড়ল।
তারপর দ্রুত আরিয়ানকে ফোন করল।
—আরিয়ান, একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে।
—কী লিখেছে?
নীরা বার্তাটি পড়ে শোনাল।
আরিয়ান বলল,
—রসিদটা আবার দেখো। হয়তো কোনো নম্বর বা সিল আমরা খেয়াল করিনি।
নীরা খাম থেকে রসিদটি বের করল।
সামনের অংশে গ্রহণের তারিখ, দুই সাক্ষীর নাম এবং নথির নম্বর লেখা ছিল।
কিন্তু পেছনের একেবারে নিচে ছোট একটি লাইন ছিল, যা আগে কেউ খেয়াল করেনি।
সেখানে লেখা—
“দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় যাচাইয়ের দায়িত্ব: ট্রাস্ট বোর্ডের সচিব।”
নীরা থমকে গেল।
—আরিয়ান, এখানে তো ট্রাস্ট বোর্ডের সচিবের কথা লেখা আছে!
আরিয়ান বলল,
—তাহলে আমাদের এবার জানতে হবে, ২০০৮ সালে ট্রাস্ট বোর্ডের সচিব কে ছিলেন।
নীরা রেজিস্টারের দিকে তাকাল।
সেখানে একটি নাম পাওয়া গেল—
মিজানুর রহমান।
কিন্তু মিজানুর তো আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি শুধু চুক্তি যাচাইয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন।
তাহলে কি তিনি দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় যাচাই করেছিলেন?
নাকি তাঁর নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ দায়িত্ব পালন করেছিল?
নীরা ধীরে বলল,
—আমাদের তৃষার বাবার সঙ্গে আবার কথা বলতে হবে।
আরিয়ান উত্তর দিল,
—হ্যাঁ। এবার তাঁকে রসিদটাও দেখাব।
নীরা ফোন রেখে কাগজটি বুকের কাছে ধরে রইল।
একটি পুরোনো স্বাক্ষর থেকে শুরু হওয়া অনুসন্ধান এবার পৌঁছে গেল মিজানুর রহমানের কাছে।
কিন্তু তিনি কি সত্যিই জানতেন, দ্বিতীয় সাক্ষী কে ছিলেন?
নাকি তাঁর নামও ব্যবহার করা হয়েছিল এমন এক ঘটনায়, যার পুরো সত্য তিনি নিজেও জানতেন না?
চলবে…