শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি
লেখক: Mafiya Queen 👑
৬৪তম পর্ব: মিজানুরের অজানা দায়িত্ব
সকালে নীরা আরিয়ানকে ফোন করল।
—আজ কি মিজানুর আঙ্কেলের সঙ্গে দেখা করা যাবে?
—আমি তৃষার সঙ্গে কথা বলেছি। উনি আজ বিকেলে আমাদের সময় দিয়েছেন।
নীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আরিয়ান, একটা বিষয় আমার মাথায় ঘুরছে। মিজানুর আঙ্কেলের নাম বারবার বিভিন্ন নথিতে আসছে। কিন্তু তিনি প্রতিবারই বলছেন, তাঁর দায়িত্ব সীমিত ছিল।
আরিয়ান উত্তর দিল,
—তাই এবার তাঁকে কাগজগুলো দেখিয়ে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করব। অনুমান করে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।
১. পুরোনো রসিদ
বিকেলে মিজানুর রহমানের বাসায় পৌঁছাল নীরা ও আরিয়ান।
তৃষাও সেখানে উপস্থিত ছিল।
সবাই বসার পর নীরা ১৮ সেপ্টেম্বরের রসিদটি মিজানুরের সামনে রাখল।
—আঙ্কেল, এই রসিদে লেখা আছে, দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল ট্রাস্ট বোর্ডের সচিবের। আর ২০০৮ সালে সেই দায়িত্বে আপনার নাম পাওয়া গেছে।
মিজানুর কাগজটি হাতে নিলেন।
কিছুক্ষণ ভালো করে দেখার পর বললেন,
—হ্যাঁ, তখন আমি ট্রাস্ট বোর্ডের সচিবের দায়িত্বও সাময়িকভাবে পালন করেছিলাম।
নীরা অবাক হয়ে বলল,
—আপনি আগে এটা বলেননি কেন?
—কারণ আমি চুক্তি বিভাগের দায়িত্বের কথা বলেছিলাম। সচিবের দায়িত্বটা খুব অল্প সময়ের জন্য ছিল। তাছাড়া এই রসিদের কথা আমার মনে ছিল না।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় যাচাই করেছিলেন?
মিজানুর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
—আমার মনে আছে, একটি নাম যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আমি চূড়ান্ত অনুমোদন দিইনি।
২. অসম্পূর্ণ দায়িত্ব
নীরা দ্রুত প্রশ্ন করল,
—কেন অনুমোদন দেননি?
মিজানুর বললেন,
—কারণ যে কাগজটি আমার কাছে এসেছিল, তাতে সাক্ষীর পরিচয় নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট তথ্য ছিল না। শুধু নামের আদ্যক্ষর ছিল।
ইমরান জানতে চাইল,
—A. S.?
মিজানুর মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। আমি পূর্ণ নাম, কর্মী পরিচিতি এবং স্বাক্ষরের নমুনা চেয়েছিলাম। কিন্তু সেগুলো আর আমার কাছে আসেনি।
আরিয়ান বলল,
—তাহলে আপনার যাচাই অসম্পূর্ণই ছিল?
—ঠিক তাই। আমি কোনো ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করিনি।
নীরা বলল,
—কিন্তু পরবর্তী নথিতে আপনার দায়িত্বের উল্লেখ আছে।
মিজানুর শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,
—দায়িত্বের উল্লেখ থাকা আর অনুমোদন দেওয়া এক নয়। আমি চাইলে তখন লিখিতভাবে আপত্তি জানাতে পারতাম। সেটা না করাটা আমার ভুল ছিল।
৩. তৃষার প্রশ্ন
এতক্ষণ তৃষা চুপ করে সব শুনছিল।
এবার সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—বাবা, তুমি কি বুঝতে পারছ, তোমার এই চুপ থাকার কারণে এত বছর ধরে সবাই বিভ্রান্ত হয়েছে?
মিজানুর মেয়ের দিকে তাকালেন।
—বুঝতে পারছি। তখন আমি ভেবেছিলাম, অসম্পূর্ণ নথি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু পরে খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল।
তৃষা বলল,
—তাহলে তুমি কি জানো, সেই কাগজে শেষ পর্যন্ত কার স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছিল?
মিজানুর মাথা নাড়লেন।
—না। তবে একটা কথা মনে পড়েছে।
নীরা আগ্রহ নিয়ে সামনে ঝুঁকল।
—কী কথা, আঙ্কেল?
—সেই সময় ট্রাস্ট অফিসে একটি ছোট নীল রঙের রেজিস্টার ছিল। সেখানে প্রত্যেকটি অসম্পূর্ণ যাচাইয়ের নোট লেখা হতো। আমার আপত্তিটাও সেখানে লেখার কথা।
আরিয়ান বলল,
—রেজিস্টারটি কোথায়?
—আমি জানি না। দায়িত্ব ছাড়ার পর সেটি আর দেখিনি।
৪. পুরোনো নীল রেজিস্টার
মিজানুর কিছুক্ষণ ভেবে আবার বললেন,
—তবে রেজিস্টারটির একটি কপি হয়তো আমার কাছে আছে।
সবাই অবাক হয়ে গেল।
তিনি নিজের ঘরে গিয়ে একটি পুরোনো ফাইল নিয়ে এলেন।
ফাইলের মধ্যে কয়েকটি অফিস কপি ও চিঠি ছিল।
একটি পাতায় লেখা—
Verification Pending Register — September 2008
নীরা পাতাটি পড়তে শুরু করল।
সেখানে কয়েকটি নথির নম্বর দেওয়া ছিল।
R-21/17
C-14
TR-09
আর C-14-এর পাশে লেখা—
“দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় অসম্পূর্ণ। পূর্ণ পরিচয় না পাওয়া পর্যন্ত অনুমোদন স্থগিত।”
নীরা বলল,
—তাহলে আপনি সত্যিই অনুমোদন দেননি!
মিজানুর বললেন,
—হ্যাঁ। এই নোটটি আমার লেখা।
ইমরান বলল,
—এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
আরিয়ান কাগজটির ছবি তুলে নিল।
—আমরা এর সত্যতা যাচাই করব এবং মূল কপিটি নিরাপদে রাখব।
৫. যে কাগজটি পরে যুক্ত হয়েছিল
ফাইলের শেষ দিকে আরেকটি পাতা পাওয়া গেল।
সেখানে C-14-এর পাশে হাতে লেখা ছিল—
“পরিচয় যাচাইয়ের অপেক্ষা না করে নথির দ্বিতীয় কপি জহির উদ্দিনের কাছে পাঠানো হয়েছে।”
নীরা বিস্ময়ে বলল,
—কিন্তু আপনি তো অনুমোদন স্থগিত করেছিলেন!
মিজানুর মাথা নাড়লেন।
—আমি এই নির্দেশনা দিইনি।
আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,
—এই লেখাটি কার?
মিজানুর কাগজটি ভালো করে দেখলেন।
—লেখাটি আমার নয়। এমনকি আমার জানা মতে, এই পাতাটি মূল রেজিস্টারের অংশও ছিল না।
ইমরান বলল,
—তাহলে কেউ পরে এটি যুক্ত করেছে?
মিজানুর উত্তর দিলেন,
—সম্ভব। কিন্তু কাগজের বয়স, কালি এবং রেজিস্টারের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা না করে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
নীরা এবার বুঝতে পারল, এত দিন ধরে যে নথিগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর প্রতিটি অংশ একই সময়ে লেখা হয়নি।
৬. তৃষার বাবার শেষ স্মৃতি
আরিয়ান বলল,
—আঙ্কেল, আপনার কি মনে আছে, সেই সময় নথিগুলো কার কাছে সংরক্ষিত ছিল?
মিজানুর উত্তর দিলেন,
—প্রথমে নাসিমা বেগমের কাছে ছিল। পরে কিছু কাগজ জহিরের কাছে যায়। আর কিছু কাগজ বাইরের নিরীক্ষা বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
নীরা বলল,
—তাহলে কাগজগুলো এক জায়গায় ছিল না।
—না। আর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। কেউ একটি কাগজ দেখত, কেউ অন্যটি। ফলে পুরো বিষয়টি একসঙ্গে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তৃষা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তুমি কি এখন সব তথ্য দিতে প্রস্তুত?
মিজানুর মেয়ের হাতের ওপর হাত রাখলেন।
—হ্যাঁ। এবার আর কোনো তথ্য আমার কাছে লুকানো থাকবে না।
নীরা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল,
—ধন্যবাদ, আঙ্কেল। আমরা কাউকে অপমান করতে চাই না। শুধু চাই, যাঁর যা দায়িত্ব ছিল, সেটি পরিষ্কার হোক।
৭. নতুন নথির খোঁজ
বাড়ি ফেরার পথে আরিয়ান বলল,
—আজকের তথ্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মিজানুর সাহেবের আপত্তি প্রমাণ করছে, C-14-এর দ্বিতীয় সাক্ষীর পরিচয় তখনও নিশ্চিত হয়নি।
নীরা বলল,
—কিন্তু কেউ পরে সেই পরিচয় যাচাই না করেই দ্বিতীয় কপি জহির চাচার কাছে পাঠিয়েছিল।
—ঠিক। এখন জানতে হবে, সেই নির্দেশনাটি কে দিয়েছিল।
ঠিক তখন রাফির ফোন এল।
—স্যার, একটা নতুন তথ্য পেয়েছি।
আরিয়ান বলল,
—বলো।
—মিজানুর সাহেবের দেওয়া রেজিস্টারের সঙ্গে পুরোনো আর্কাইভের একটি তালিকা মিলিয়ে দেখেছি। সেখানে C-14-এর একটি অতিরিক্ত সংযুক্তি পাওয়া গেছে।
নীরা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
—কোথায়?
রাফি বলল,
—পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের নথি গ্রহণ বিভাগের তালিকায়। সংযুক্তিটির নাম—
“C-14 — Delivery Acknowledgement.”
আরিয়ান বলল,
—সেটা সংগ্রহ করতে পারবে?
—চেষ্টা করছি, স্যার। তবে একটা সমস্যা আছে।
—কী সমস্যা?
রাফি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,
—তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ওই সংযুক্তিটি গ্রহণ করেছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি তখন ট্রাস্টের কোনো কর্মী ছিলেন না।
নীরা জিজ্ঞেস করল,
—তাঁর নাম কী?
রাফি উত্তর দিল,
—নামটি পুরোপুরি পড়া যাচ্ছে না। তবে পদবির জায়গায় লেখা—
“পরিবারের অনুমোদিত প্রতিনিধি।”
নীরা আরিয়ানের দিকে তাকাল।
এবার রহস্যটা আরও জটিল হয়ে উঠল।
কেউ একজন পরিবারের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে C-14-এর সংযুক্তি গ্রহণ করেছিলেন। অথচ সেই ব্যক্তির নাম কোথাও স্পষ্টভাবে লেখা নেই।
আরিয়ান ধীরে বলল,
—আমাদের এবার জানতে হবে, সেই প্রতিনিধি কে ছিলেন।
নীরা জানালার বাইরে তাকাল।
তার মনে হলো, সত্যটা হয়তো খুব কাছেই আছে। কিন্তু প্রতিটি উত্তর নতুন একটি প্রশ্ন তৈরি করছে।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
পরিবারের অনুমোদিত প্রতিনিধি কি সত্যিই পরিবারের কেউ ছিলেন, নাকি পরিবারের বিশ্বাস অর্জন করা কোনো বাইরের মানুষ?
চলবে…