ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 72

লেখক: Mafiya Queen

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।

রয়্যাল হোল্ডিংসের পুরোনো আর্কাইভ রুমে বসে ছিল নীরা, আরিয়ান, রাফি ও জাহিদুল ইসলাম। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে পুরোনো কাগজপত্র, রেজিস্টার আর কয়েকটি হলদে হয়ে যাওয়া চিঠি।

নীরার চোখ আটকে আছে একটি নামের ওপর।

জাহিদুল ইসলাম।

— আপনি বলছেন, ২০০৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর C-14 ফাইলটি আপনার কাছে এসেছিল?

জাহিদুল মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। তবে আমি ফাইলটি খোলার অনুমতি পাইনি। আমাকে শুধু সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

আরিয়ান গম্ভীর স্বরে বলল,

— দায়িত্বটা কে দিয়েছিল?

— জহির উদ্দিন সাহেব। উনি বলেছিলেন, ফাইলটি কিছুদিন নিরাপদে রাখতে হবে। আর একটা বিষয় বিশেষভাবে বলেছিলেন—মূল কপি আর দ্বিতীয় কপি যেন একসঙ্গে না থাকে।

নীরা অবাক হয়ে তাকাল।

— কেন? একই ফাইলের দুটি কপি আলাদা রাখার প্রয়োজন কেন হয়েছিল?

জাহিদুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— সেটা আমি জানি না। তবে আমাকে বলা হয়েছিল, কোনো কাগজে পরিবর্তন করা যাবে না।

রাফি সামনে রাখা রেজিস্টারটি এগিয়ে দিল।

— স্যার, এই রেজিস্টারটা দেখুন। এখানে ফাইলটি ফেরত দেওয়ার তারিখ লেখা আছে।

আরিয়ান কাগজটি হাতে নিল।

তারিখ: ১২ অক্টোবর ২০০৮।

ফাইল গ্রহণকারীর জায়গায় একটি স্বাক্ষর।

কিন্তু স্বাক্ষরটি জহির উদ্দিনের নয়।

নীরা প্রশ্ন করল,

— তাহলে ফাইলটি কে নিয়েছিল?

রাফি নিচের ছোট্ট নোটটি দেখাল।

“Personal Secretary to Mahbub Alam.”

ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল।

আরিয়ান ধীরে বলল,

— মাহবুব আলমের ব্যক্তিগত সচিব!

নীরা রেজিস্টারের দিকে তাকিয়ে রইল।

— তাহলে মাহবুব সাহেব কি নিজেই ফাইলটি নিতে বলেছিলেন?

জাহিদুল মাথা নাড়লেন।

— আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। যিনি ফাইলটি নিতে এসেছিলেন, তিনি শুধু বলেছিলেন এটি মাহবুব সাহেবের অফিসে যাবে।

আরিয়ান বলল,

— ওই ব্যক্তির নাম মনে আছে?

— না। অনেক বছর আগের ঘটনা। তবে তাঁর হাতে একটা পরিচয়পত্র ছিল। তাতে মাহবুব সাহেবের অফিসের নাম লেখা ছিল।

নীরা চুপ করে গেল।

মাহবুব আলমের ডায়েরিতে লেখা ছিল, তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি আলাদা করে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু সেই নথির মধ্যে C-14 ফাইল ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আরিয়ান বলল,

— আমাদের আগে জানতে হবে, মাহবুব সাহেবের ব্যক্তিগত সচিব কে ছিলেন।

রাফি বলল,

— আমি পুরোনো কর্মচারীদের তালিকা খুঁজে দেখছি। হয়তো নাম পাওয়া যাবে।

পরদিন সকাল।

নীরা অফিসে পৌঁছাতেই আরিয়ান তাকে নিজের কক্ষে ডাকল।

টেবিলের ওপর কয়েকটি পুরোনো ছবি রাখা।

— এগুলো কোথায় পেয়েছেন?

নীরা ছবিগুলো হাতে নিল।

একটি ছবিতে মাহবুব আলম দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে।

আরেকটি ছবিতে তাঁর পাশে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ।

ছবির পেছনে লেখা—

“Office Staff — December 2008.”

আরিয়ান বলল,

— রাফি ছবিগুলো পুরোনো অফিসের এক কর্মচারীর কাছ থেকে পেয়েছে। লোকটি বলেছে, মাহবুব সাহেবের একজন ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। নাম সম্ভবত আনোয়ার হোসেন।

নীরা ছবির মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলল,

— সম্ভবত এই লোকটিই?

আরিয়ান ছবিটি হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল।

— নিশ্চিত হওয়ার আগে কিছু বলা যাবে না।

ঠিক তখনই রাফি কক্ষে ঢুকল।

— স্যার, একটা খবর আছে।

— বলো।

— আনোয়ার হোসেন নামের একজন ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছি। তিনি এখন অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তবে একটা সমস্যা আছে।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

— কী সমস্যা?

রাফি উত্তর দিল,

— তিনি মাহবুব আলমের অফিসে কাজ করার কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু C-14 ফাইলের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না।

আরিয়ান চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

— ঠিকানা পেয়েছ?

— জি, স্যার।

নীরা বলল,

— আমাদের তাঁর সঙ্গে দেখা করতে হবে।

আরিয়ান তার দিকে তাকাল।

— তুমি নিশ্চিত?

— এতদিন ধরে আমরা যে সত্যটা খুঁজছি, তার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়তো তাঁর কাছে আছে। এখন থেমে গেলে চলবে না।

আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

— ঠিক আছে। তবে এবার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিটি তথ্য যাচাই করব।

বিকেল চারটা।

পুরোনো ঢাকার একটি শান্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নীরা ও আরিয়ান।

দরজায় কড়া নাড়তেই একজন বৃদ্ধ দরজা খুললেন।

— কাকে চাই?

আরিয়ান ভদ্রভাবে বলল,

— আমরা আনোয়ার হোসেন সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

— আমি আনোয়ার।

নীরা বলল,

— আমরা মাহবুব আলম সাহেবের পুরোনো অফিসের কিছু নথি নিয়ে কথা বলতে চাই।

নামটি শুনতেই বৃদ্ধের মুখের ভাব বদলে গেল।

— এত বছর পর আবার এসব কেন?

আরিয়ান শান্ত স্বরে বলল,

— কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

আনোয়ার সাহেব দরজা খুলে তাদের ভেতরে আসতে দিলেন।

বসার ঘরে বসে নীরা সরাসরি প্রশ্ন করল,

— আপনি কি ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর C-14 নামে একটি ফাইল গ্রহণ করেছিলেন?

বৃদ্ধ চুপ করে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর বললেন,

— হ্যাঁ। ফাইলটি আমার হাতে এসেছিল।

নীরা ও আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকাল।

— কে দিয়েছিল?

— অফিসের একজন কর্মচারী।

— আপনি কি মাহবুব সাহেবের নির্দেশে ফাইলটি নিয়েছিলেন?

আনোয়ার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— আমি শুধু একটি নির্দেশ পেয়েছিলাম। ফাইলটি আলাদা করে রাখতে হবে। কেউ চাইলে সরাসরি দেওয়া যাবে না।

আরিয়ান প্রশ্ন করল,

— নির্দেশটি কে দিয়েছিল?

বৃদ্ধ এবার জানালার বাইরে তাকালেন।

— মাহবুব সাহেবের কাছ থেকে নয়।

নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,

— তাহলে কার কাছ থেকে?

আনোয়ার সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,

— একটি চিঠি এসেছিল। সেখানে লেখা ছিল, C-14 ফাইলটি কিছুদিন ব্যক্তিগত হেফাজতে রাখতে হবে। চিঠির শেষে শুধু একটি স্বাক্ষর ছিল।

— কার স্বাক্ষর?

বৃদ্ধ উঠে পাশের আলমারি খুললেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটি পুরোনো খাম বের করলেন।

খামটি টেবিলের ওপর রেখে বললেন,

— আমি চিঠিটা ফেলে দিইনি। কারণ তখনই বুঝেছিলাম, বিষয়টা সাধারণ কোনো অফিসের কাজ নয়।

নীরা খামটি হাতে নিল।

খামের ওপর লেখা—

“For Anwar Hossain — Confidential.”

আর নিচে একটি সংক্ষিপ্ত স্বাক্ষর।

J.

নীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

— জে...?

আরিয়ান খামটির দিকে তাকিয়ে বলল,

— জাহিদুল? জহির? নাকি অন্য কেউ?

আনোয়ার সাহেব মাথা নাড়লেন।

— আমি নাম জানি না। শুধু জানি, এই চিঠির নির্দেশে ফাইলটি আমার কাছে এসেছিল।

নীরা এবার জিজ্ঞেস করল,

— ফাইলটি এখন কোথায়?

বৃদ্ধের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

— আমার কাছে নেই।

— তাহলে কোথায়?

— কয়েক মাস পর একজন এসে ফাইলটি নিয়ে যায়। সে বলেছিল, মাহবুব সাহেবের নির্দেশ।

আরিয়ান দ্রুত প্রশ্ন করল,

— তার নাম?

আনোয়ার সাহেব কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

— নামটা পুরো মনে নেই। তবে তার পরিচয়পত্রে লেখা ছিল—

তিনি একটু থামলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

— “M. Rahman.”

নীরা স্তব্ধ হয়ে গেল।

আরিয়ানও কোনো কথা বলল না।

কারণ M. Rahman নামটি তাদের কাছে অপরিচিত ছিল না।

কিন্তু এই নামের সঙ্গে ঠিক কোন ব্যক্তির সম্পর্ক, তা এখনো অজানা।

নীরা খামের ভেতর থেকে চিঠিটি বের করল।

চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—

“ফাইলটি যার হাতে পৌঁছাবে, সে যেন মূল নথির সঙ্গে কোনোভাবেই দ্বিতীয় কপির তুলনা না করে।”

নীরা ধীরে মাথা তুলল।

— আরিয়ান, কেউ চায়নি আমরা দুই কপি মিলিয়ে দেখি।

আরিয়ান চিঠিটি হাতে নিয়ে বলল,

— তাহলে আমাদের প্রথম কাজ হবে মূল কপিটি খুঁজে বের করা।

ঠিক তখনই আনোয়ার সাহেব আরেকটি কথা বললেন।

— আপনারা যদি সত্যিই C-14-এর মূল কপি খুঁজতে চান, তাহলে একটা কথা মনে রাখবেন।

নীরা তাঁর দিকে তাকাল।

— কী কথা?

বৃদ্ধ নিচু স্বরে বললেন,

— মাহবুব সাহেব একবার আমাকে বলেছিলেন, “যে কাগজ সবাই খুঁজছে, আসল সত্যটা হয়তো সেই কাগজে নেই।”

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— তাহলে সত্যটা কোথায়?

আনোয়ার সাহেব উত্তর দিলেন না।

শুধু আলমারির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সেখানে রাখা একটি ছোট্ট কাঠের বাক্সের ওপর লেখা—

“C-14 — Original Copy Not Received.”

নীরার চোখ বড় হয়ে গেল।

কারণ এতদিন তারা ভেবেছিল, C-14 ফাইলের মূল কপি কোথাও না কোথাও সংরক্ষিত আছে।

কিন্তু বাক্সের লেখাটি অন্য কথাই বলছে।

মূল কপিটি হয়তো কোনোদিনই আনোয়ার সাহেবের কাছে পৌঁছায়নি।

আর যদি তা-ই হয়, তাহলে ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর তিনি ঠিক কোন ফাইলটি গ্রহণ করেছিলেন?

সেদিনের উত্তরটা এখনও অজানা।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 72 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন