ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 77

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

৭৭তম পর্ব: যে স্বাক্ষরটি মিথ্যা ছিল

লেখক: Mafiya Queen 👑

সকাল ১০টা।

মতিউর রহমানের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীরা, আরিয়ান ও রাফি।

পুরোনো বাড়িটির দেয়ালে বয়সের ছাপ স্পষ্ট। বারান্দার একপাশে কয়েকটি পুরোনো টব, জানালার কাঠে জমে থাকা ধুলো আর দরজার পাশে ঝুলে থাকা একটি পুরোনো ঘণ্টা।

নীরা বাড়িটির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছিল, কত মানুষের জীবনের কত গোপন কথা যে এই পুরোনো কাগজগুলোর মধ্যে আটকে আছে!

গত রাত থেকে তার মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—

১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালে বাবার নামে যে দায়িত্ব গ্রহণের কাগজ তৈরি হয়েছিল, সেখানে স্বাক্ষরটি করেছিল কে?

আর সবচেয়ে বড় কথা, বাবা যদি সেদিন অফিসেই না থাকেন, তাহলে তাঁর নামে দায়িত্ব গ্রহণের কথা লেখা হলো কীভাবে?

আরিয়ান নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,

— কী ভাবছ?

নীরা একটু থেমে উত্তর দিল,

— ভাবছি, একটা মিথ্যা স্বাক্ষর কতগুলো মানুষের জীবনকে এত বছর ধরে আটকে রাখতে পারে!

আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,

— একটা স্বাক্ষর পুরো সত্য নয়, নীরা। আমরা আজ জানতে পারব কাগজটা কীভাবে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব প্রমাণ মিলিয়ে দেখতে হবে।

নীরা মাথা নাড়ল।

ঠিক তখনই দরজা খুলে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মতিউর রহমান।

— তোমরা এসেছ? ভেতরে আসো।

পুরোনো কাগজের নতুন রহস্য

বসার ঘরে ঢুকে নীরা দেখল, টেবিলের ওপর একটি মোটা ফাইল রাখা।

মতিউর রহমান চশমাটা ঠিক করে বললেন,

— এই ফাইলের জন্যই তোমাদের ডেকেছি। গত রাতে অনেক ভেবেছি। এত বছর ধরে কাগজটা নিজের কাছে রেখে কোনো লাভ হয়নি। বরং সত্যটা প্রকাশ হওয়া উচিত।

আরিয়ান চেয়ারে বসে বলল,

— আপনি বলেছিলেন, এটা ১৮ অক্টোবরের হস্তান্তর রেজিস্টারের কার্বন কপি।

— হ্যাঁ। তবে শুধু কার্বন কপি নয়। এর সঙ্গে আরও দুটি কাগজ আছে। একটি উপস্থিতি তালিকা, অন্যটি আমার নিজের হাতে লেখা একটি নোট।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

— আপনার নিজের লেখা নোট?

মতিউর মাথা নিচু করলেন।

— হ্যাঁ। সেদিন যা ঘটেছিল, তার কিছু অংশ আমি লিখে রেখেছিলাম। তখন ভাবিনি, এত বছর পর এই নোটের প্রয়োজন হবে।

তিনি ফাইল খুললেন।

প্রথম কাগজটি ছিল একটি পুরোনো হস্তান্তরপত্র।

উপরে লেখা—

Trust Register Handover Record

তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০০৮।

প্রথম লাইনে লেখা—

Previous Responsible Person: Rashed Rahman.

দ্বিতীয় লাইনে—

Receiving Representative: M. Rahman.

নীরা কাগজটির দিকে ঝুঁকে পড়ল।

— এখানে তো বাবার নামের পাশে M. Rahman লেখা!

মতিউর বললেন,

— ঠিক। কিন্তু এই কাগজে একটি সমস্যা আছে।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

— কী সমস্যা?

মতিউর স্বাক্ষরের জায়গাটি দেখালেন।

— এখানে যে স্বাক্ষর রয়েছে, সেটি রাশেদ সাহেবের নয়। আর receiving representative-এর নামও পুরো লেখা হয়নি।

নীরা বিস্মিত হয়ে বলল,

— তাহলে কাগজটি অসম্পূর্ণ ছিল?

— শুধু অসম্পূর্ণ নয়। এর সঙ্গে থাকা অনুমতিপত্রটিও নেই।

আরিয়ান কাগজটি হাতে নিয়ে বলল,

— কোনো ব্যক্তি অন্য কারও পক্ষ থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তার লিখিত অনুমতি থাকার কথা। এখানে সেই অনুমতির কোনো উল্লেখ নেই।

মতিউর মাথা নাড়লেন।

— ঠিক বলেছ।

নীরা ধীরে বলল,

— তাহলে এই কাগজ দিয়ে বাবার নামে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল?

মতিউর একটু থেমে বললেন,

— এটাকে দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া বলা যায়। কিন্তু কে করেছে, সেটা আমি জানি না।

নীরার চোখে রাগ ও কষ্ট একসঙ্গে ফুটে উঠল।

— আপনি জানতেন কাগজটি ঠিক নেই। তবু এত বছর চুপ ছিলেন?

মতিউর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— জানতাম কাগজে অসংগতি আছে। কিন্তু তখন পুরো বিষয়টা বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম, হয়তো পরে অনুমতিপত্র জমা দেওয়া হবে।

— জমা হয়েছিল?

— না। আমি আর কোনো অনুমতিপত্র দেখিনি।

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— আমার বাবা কি জানতেন তাঁর নামে এমন কাগজ তৈরি হয়েছে?

মতিউর উত্তর দিলেন,

— কিছুদিন পর তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন। তবে তিনি কীভাবে জেনেছিলেন, সেটা আমি বলতে পারব না।

অনুপস্থিতির প্রমাণ

মতিউর দ্বিতীয় কাগজটি বের করলেন।

এটি ছিল ১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালের অফিস উপস্থিতি তালিকা।

আরিয়ান কাগজটি নিল।

তালিকায় একের পর এক নাম।

মাহমুদ রহমান।

জহির উদ্দিন।

মোস্তাফিজুর রহমান।

মতিউর রহমান।

আরও কয়েকজন কর্মচারী।

নীরার চোখ দ্রুত বাবার নাম খুঁজতে লাগল।

অবশেষে পাওয়া গেল—

Rashed Rahman — Absent.

নীরা কিছুক্ষণ নামটির দিকে তাকিয়ে রইল।

— বাবা সেদিন অফিসে ছিলেন না!

মতিউর বললেন,

— এই তালিকা অনুযায়ী তিনি অনুপস্থিত ছিলেন।

আরিয়ান প্রশ্ন করল,

— তালিকাটি কে তৈরি করেছিলেন?

— অফিসের প্রশাসনিক বিভাগ। আমি পরে এর একটি কপি পেয়েছিলাম।

— মূল তালিকাটি কোথায়?

— পুরোনো অফিসে থাকার কথা। তবে এখনো পাওয়া যায়নি।

রাফি বলল,

— স্যার, আমরা চাইলে অফিসের পুরোনো উপস্থিতি রেজিস্টার আবার খুঁজতে পারি।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

— খুঁজবে। তবে এই তালিকাটিও সংরক্ষণ করতে হবে।

নীরা আবার বাবার নামের দিকে তাকাল।

তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় বাবা কখনো পুরোনো ব্যবসার কথা বলতে চাইতেন না। কেউ মাহমুদ রহমানের নাম তুললে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যেতেন।

তখন নীরা ভাবত, হয়তো দুই পরিবারের মধ্যে সাধারণ কোনো মনোমালিন্য হয়েছিল।

কিন্তু আজ বুঝতে পারছে, সেই নীরবতার পেছনে অনেক বড় একটি ঘটনা লুকিয়ে ছিল।

নীরা ধীরে বলল,

— বাবা কি সেদিন ইচ্ছা করে অফিসে যাননি?

মতিউর উত্তর দিলেন,

— সেটা আমি জানি না। তবে তাঁর অনুপস্থিতির কারণ জানতে হলে চিকিৎসার নথি বা অন্য কোনো প্রমাণ খুঁজতে হবে।

আরিয়ান বলল,

— আমরা কোনো কিছু অনুমান করব না। আগে উপস্থিতির তথ্য নিশ্চিত করি।

সাক্ষীর নাম

মতিউর এবার কার্বন কপির নিচের অংশ দেখালেন।

সেখানে লেখা—

Witness: M.R.

নীরা বলল,

— M.R. মানে মোস্তাফিজুর রহমান?

মতিউর মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। তবে তাঁর স্বাক্ষর এখানে থাকার কথা ছিল কি না, সেটা আমার জানা নেই।

আরিয়ান বলল,

— মোস্তাফিজুর সাহেব তো আমাদের আগেই বলেছিলেন, ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি আপত্তিপত্র জমা দিয়েছিলেন। সেখানে C-14-এর সাক্ষীর পরিচয় অসম্পূর্ণ থাকার কথাও লিখেছিলেন।

মতিউর অবাক হলেন।

— তাহলে তো বিষয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

— কেন?

— কারণ ১৮ অক্টোবরের এই কাগজে তাঁর নাম সাক্ষী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ তিনি যদি দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর অনুমতি ছাড়া নাম ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটা যাচাই করা দরকার।

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে মোস্তাফিজুর রহমানকে ফোন করল।

কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন রিসিভ হলো।

— হ্যালো, আরিয়ান?

— মোস্তাফিজুর সাহেব, আমরা ১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালের একটি হস্তান্তরপত্র পেয়েছি। সেখানে আপনার নাম M.R. হিসেবে সাক্ষীর জায়গায় রয়েছে।

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মোস্তাফিজুর বললেন,

— আমার নাম?

— জি। আপনি কি সেদিন ওই হস্তান্তরের সাক্ষী ছিলেন?

— না। আমি এমন কোনো হস্তান্তরের সাক্ষী ছিলাম না।

নীরা ফোনের কাছে এসে বলল,

— আপনি কি নিশ্চিত?

— একদম নিশ্চিত। আমার কাছে সেই সময়ের বাইরের অডিট অফিসের ভিজিট রেকর্ড আছে। আমি সেদিন অন্য জায়গায় কাজ করছিলাম।

আরিয়ান বলল,

— আপনার উপস্থিতির রেকর্ডের কপি কি দিতে পারবেন?

— পারব। আজই পাঠিয়ে দেব।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

— তাহলে আপনার নাম এখানে কীভাবে এলো?

মোস্তাফিজুর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— সেটা জানতে হলে স্বাক্ষরটি পরীক্ষা করতে হবে। শুধু আমার নাম লেখা থাকলেই প্রমাণ হয় না যে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম।

কল শেষ হওয়ার আগে তিনি আরও একটি কথা বললেন—

— আরিয়ান, একটা বিষয় মনে রেখো। ২০০৮ সালে আমি শুধু আর্থিক হিসাব নিয়ে কাজ করিনি। ট্রাস্টের কয়েকটি নথির ক্ষেত্রেও আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু তখন আমার আপত্তি গুরুত্ব পায়নি।

আরিয়ান বলল,

— আপনার আপত্তির কপি আমাদের কাছে আছে।

— ভালো। তাহলে সেগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে দেখো।

যে মানুষটি উপস্থিত ছিলেন না

দুপুরের দিকে রাফি মোস্তাফিজুর রহমানের পাঠানো নথি নিয়ে ফিরে এল।

এটি ছিল ১৮ অক্টোবর ২০০৮ সালের বাইরের অডিট অফিসের একটি ভিজিট রেকর্ড।

সেখানে মোস্তাফিজুর রহমানের নামের পাশে সময় উল্লেখ ছিল।

সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত তিনি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে অডিটের কাজে উপস্থিত ছিলেন।

নীরা কাগজটি হাতে নিয়ে বলল,

— তাহলে একই সময়ে তিনি দুই জায়গায় থাকতে পারেন না।

আরিয়ান বলল,

— ঠিক। তবে তাঁর নামের আদ্যক্ষর ব্যবহার করে অন্য কেউ স্বাক্ষর করেছে কি না, সেটাই এখন দেখতে হবে।

রাফি বলল,

— স্যার, আরেকটি তথ্য পেয়েছি।

— কী?

— ১৮ অক্টোবরের হস্তান্তরপত্রটি যে ফাইলে ছিল, সেই ফাইলটি ২২ অক্টোবর আর্কাইভে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু জমা দেওয়ার রেজিস্টারে গ্রহণকারীর নাম লেখা নেই।

নীরা বলল,

— আবার নাম নেই!

রাফি বলল,

— শুধু নাম নেই তা নয়। রেজিস্টারে লেখা আছে, ফাইলটি একজন “Temporary Representative” জমা দিয়েছেন।

আরিয়ান প্রশ্ন করল,

— তাঁর পরিচয়?

— সেটাও নেই।

নীরা মাথা নাড়ল।

— তাহলে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একই সমস্যা। কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে, কেউ কাগজ জমা দিচ্ছে, কিন্তু পরিচয় অসম্পূর্ণ রেখে যাচ্ছে।

আরিয়ান বলল,

— হয়তো প্রশাসনিক অবহেলা। আবার ইচ্ছাকৃতভাবে পরিচয় গোপনও করা হতে পারে। কিন্তু কোনটি সত্য, সেটা এখনই বলা যাবে না।

মতিউরের নীরবতার কারণ

সব কাগজ গুছিয়ে রাখার পর মতিউর রহমান ধীরে বললেন,

— নীরা, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।

নীরা তাঁর দিকে তাকাল।

— বলুন।

— তোমার বাবা যখন জানতে পেরেছিলেন তাঁর নামে দায়িত্ব গ্রহণের কাগজ তৈরি হয়েছে, তখন তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন।

নীরা চমকে উঠল।

— বাবা আপনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন?

— হ্যাঁ। তিনি আমাকে শুধু একটি প্রশ্ন করেছিলেন।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

— কী প্রশ্ন?

মতিউর চোখ নামিয়ে বললেন,

— তিনি জানতে চেয়েছিলেন, “যে মানুষটি আমার হয়ে স্বাক্ষর করেছে, সে কি জানে এই কাগজের মাধ্যমে কী দায়িত্ব আমার নামে চাপানো হচ্ছে?”

নীরা স্থির হয়ে গেল।

— আপনি কী উত্তর দিয়েছিলেন?

— আমি বলেছিলাম, জানি না।

— তারপর?

— তিনি বলেছিলেন, “যে মানুষ নিজের নামে কোনো দায়িত্ব নেয়নি, তাকে সেই দায়িত্বের জন্য দায়ী করা অন্যায়।”

নীরার চোখ ভিজে উঠল।

মতিউর আবার বললেন,

— সেদিন তিনি খুব রাগ করেননি। বরং অদ্ভুত শান্ত ছিলেন। যাওয়ার আগে শুধু বলেছিলেন, মূল কপির সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত যেন কেউ তাঁর নামে কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়।

আরিয়ান বলল,

— তাহলে আপনার কাছে তাঁর বক্তব্যের কোনো লিখিত প্রমাণ আছে?

মতিউর মাথা নাড়লেন।

— না। তবে সেদিনের পর আমি নিজের জন্য একটি নোট লিখেছিলাম।

তিনি ফাইলের ভেতর থেকে ছোট একটি কাগজ বের করলেন।

সেখানে লেখা—

“রাশেদ রহমান দায়িত্ব গ্রহণে সম্মতি দেননি। মূল C-14 নথি যাচাই না হওয়া পর্যন্ত হস্তান্তর সম্পন্ন বলে গণ্য করা উচিত নয়।”

নীরা কাগজটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

— আপনি এটা এতদিন নিজের কাছে রেখেছিলেন?

— হ্যাঁ। আমি জানতাম, একদিন হয়তো এই নোটের প্রয়োজন হবে।

শেষ কাগজের সূত্র

বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে মতিউর আরও একটি তথ্য দিলেন।

— তোমাদের একটা জায়গায় খোঁজ নেওয়া উচিত।

আরিয়ান বলল,

— কোথায়?

— পুরোনো প্রশাসনিক দপ্তরের নথি সংরক্ষণ বিভাগে। ১৮ অক্টোবরের হস্তান্তরপত্রের একটি কপি সেখানে পাঠানোর কথা ছিল।

নীরা বলল,

— কিন্তু সেটি কি এখনো থাকবে?

— জানি না। তবে মূল ফাইলের পাশাপাশি একটি প্রেরণ রেজিস্টারও তৈরি হয়েছিল। সেখানে কাগজটি কার কাছে পাঠানো হয়েছিল, তা লেখা থাকার কথা।

আরিয়ান বলল,

— তাহলে সেটাই আমাদের পরবর্তী কাজ।

মতিউর একটু থেমে বললেন,

— আরেকটা কথা। তোমরা যদি সত্যিই ওই রেজিস্টার খুঁজে পাও, তাহলে তার সঙ্গে থাকা গ্রহণপত্রটিও খুঁজবে। কারণ আমার মনে আছে, হস্তান্তরপত্রের সঙ্গে একটি আলাদা গ্রহণপত্র ছিল।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

— সেই গ্রহণপত্রে কী ছিল?

মতিউর উত্তর দিলেন,

— যতদূর মনে পড়ে, সেখানে রাশেদ সাহেবের নাম ছিল না। অন্য একজনের নাম ছিল।

আরিয়ান দ্রুত জিজ্ঞেস করল,

— নামটা মনে আছে?

মতিউর চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবলেন।

— পুরোটা মনে নেই। তবে নামের প্রথম অক্ষর ছিল—

তিনি একটু থামলেন।

তারপর বললেন,

— “S.”

নীরা ও আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকাল।

রাফি বলল,

— S. মানে সালেহ রহমান হতে পারে?

মতিউর মাথা নাড়লেন।

— হতে পারে। আবার অন্য কেউও হতে পারেন। অনুমান করে লাভ নেই।

রাতের নতুন প্রশ্ন

সন্ধ্যায় গাড়িতে বসে নীরা বাবার পুরোনো ডায়েরিটি খুলে দেখছিল।

আরিয়ান গাড়ি চালাচ্ছিল।

কিছুক্ষণ পর নীরা বলল,

— আরিয়ান, একটা কথা বলব?

— বলো।

— আমার মনে হচ্ছে, বাবা শুধু নিজের নাম বাঁচানোর জন্য এসব করেননি। তিনি হয়তো জানতেন, C-14-এর মধ্যে এমন কিছু আছে, যেটা ভুল মানুষের হাতে গেলে ট্রাস্টের সম্পত্তি বা দায়িত্ব নিয়ে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে।

আরিয়ান বলল,

— তোমার ধারণা যুক্তিসংগত। তবে সেটা প্রমাণ করতে হলে মূল Trust Deed দরকার।

নীরা জানালার বাইরে তাকাল।

— বাবা যদি সত্যিই এত কিছু জানতেন, তাহলে আমাকে কিছু বলেননি কেন?

আরিয়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

— হয়তো তিনি চেয়েছিলেন তুমি নিজের জীবনটা স্বাভাবিকভাবে কাটাও। পুরোনো বিরোধের বোঝা তোমার ওপর চাপাতে চাননি।

নীরা মৃদু স্বরে বলল,

— কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তাঁর অসমাপ্ত কাজটাই আমাকে শেষ করতে হবে।

আরিয়ান বলল,

— সত্য খোঁজা তোমার সিদ্ধান্ত। তবে নিজের জীবনটাও ভুলে যেও না, নীরা।

নীরা তার দিকে তাকাল।

— তুমি কি মনে করো, আমি খুব বেশি জড়িয়ে যাচ্ছি?

— আমি মনে করি, তুমি অনেক সাহস নিয়ে এগোচ্ছ। কিন্তু সাহস মানে সব দায়িত্ব একা কাঁধে নেওয়া নয়।

নীরা আর কিছু বলল না।

রাত ৯টা।

রয়্যাল হোল্ডিংসের অফিসে পৌঁছে রাফি আরিয়ানের হাতে একটি নতুন ফাইল দিল।

— স্যার, পুরোনো প্রশাসনিক দপ্তরের একজন কর্মচারীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। তিনি বলেছেন, ১৮ অক্টোবরের প্রেরণ রেজিস্টারের একটি অংশ এখনো সংরক্ষিত আছে।

আরিয়ান দ্রুত জিজ্ঞেস করল,

— কোথায়?

— পুরোনো রেকর্ড শাখায়। তবে সেটি দেখতে হলে আনুষ্ঠানিক অনুমতি লাগবে।

নীরা বলল,

— অনুমতির ব্যবস্থা করা যাবে?

রাফি উত্তর দিল,

— চেষ্টা করছি।

ঠিক তখনই আরিয়ানের ফোনে একটি মেসেজ এল।

প্রেরক: মাহমুদ রহমান।

মেসেজে লেখা—

“আরিয়ান, ১৮ অক্টোবরের কাগজপত্র নিয়ে আমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। আজই দেখা করতে হবে। কারণ আমি মনে করতে পেরেছি, সেদিন রাশেদের নামে যে দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল, সেটি নিয়ে আমি নিজেও আপত্তি তুলেছিলাম।”

আরিয়ান মেসেজটি নীরাকে দেখাল।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

— মাহমুদ সাহেবও আপত্তি করেছিলেন?

আরিয়ান উত্তর দিল,

— মনে হচ্ছে, তিনি আরও কিছু জানেন।

ঠিক তখনই আরেকটি মেসেজ এল।

এবার প্রেরক: সালেহ রহমান।

মেসেজে লেখা—

“১৮ অক্টোবরের গ্রহণপত্রে S অক্ষরটি আমার নয়। তোমরা যদি আমার নাম সন্দেহ করে থাকো, তাহলে আগে আসল রেজিস্টারটি দেখো। কারণ সেই দিন আমি যে কাগজে স্বাক্ষর করেছিলাম, সেটি C-14 হস্তান্তরের কাগজ ছিল না।”

নীরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

— তাহলে S কে?

আরিয়ান ধীরে ফোনটি নামিয়ে রাখল।

— এবার মনে হচ্ছে, আমরা আসল ঘটনার খুব কাছে চলে এসেছি।

কিন্তু ঠিক তখনই রাফি আরেকটি পুরোনো নথি নিয়ে ঘরে ঢুকল।

— স্যার, একটা সমস্যা হয়েছে।

— কী সমস্যা?

রাফি কাগজটি টেবিলে রাখল।

— ১৮ অক্টোবরের প্রেরণ রেজিস্টারের যে পৃষ্ঠাটি আমরা খুঁজছি, সেটি মূল রেজিস্টার থেকে ছেঁড়া। তবে পৃষ্ঠাটির কার্বন কপি পাওয়া গেছে।

নীরা দ্রুত কাগজটি হাতে নিল।

প্রাপক: S. Rahman.

তারিখ: ১৮ অক্টোবর ২০০৮।

বিষয়: C-14 Related Document — Personal Delivery.

কিন্তু প্রেরকের নামের জায়গাটি সম্পূর্ণ ফাঁকা।

নীরা ফিসফিস করে বলল,

— তাহলে S. Rahman-ই সেই ব্যক্তি, যাঁর কাছে কাগজটি পাঠানো হয়েছিল।

আরিয়ান কাগজটির নিচের অংশ দেখল।

সেখানে একটি ছোট্ট নোট—

“Original not included.”

আর তার পাশে হাতে লেখা আরেকটি বাক্য—

“The receiver knows where it is.”

নীরা ধীরে মাথা তুলল।

— যে মানুষটি কাগজটি গ্রহণ করেছিলেন, তিনিই জানেন মূল কপিটি কোথায়!

আরিয়ান বলল,

— এবার আমাদের শুধু সেই মানুষটিকে খুঁজে বের করতে হবে।

নীরা কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে একটাই প্রশ্ন—

S. Rahman কে?

সালেহ রহমান নন—এ কথা তিনি নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন।

তাহলে কি সেই ব্যক্তি রহমান পরিবারের অন্য কেউ?

নাকি পরিবারের সঙ্গে যুক্ত এমন কেউ, যার নাম এতদিন কোনো আলোচনাতেই আসেনি?

রহস্যের দরজা আবার খুলে গেল।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 77 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন