ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 91

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব ৯১: সিলের গোপন অধিকারী

লেখক: Mafiya Queen 👑

সকাল থেকেই নীরা অপেক্ষা করছিল।

গত রাতের মেসেজটা তার মাথা থেকে কিছুতেই সরছিল না।

“M-04-কে খুঁজবেন না। আগে খুঁজুন, কে A.R.-03 সিলটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।”

একটা সিল।

একটা পুরোনো নির্দেশনা।

আর একটা অজানা পরিচয়।

এতদিন তারা ভেবেছিল, C-14-এর রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু M-04। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, M-04-এর আগেও কেউ একজন পুরো প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব রেখেছিল।

সকাল দশটার দিকে আরিয়ান ফোন করল।

—তুমি প্রস্তুত?

—হ্যাঁ। সালেহ চাচার কাছে যাচ্ছি?

—হ্যাঁ। উনি পুরোনো তালিকাটা বের করেছেন।

—তালিকায় কী আছে?

—ফোনে কিছু বলেননি। বলেছেন, সামনে বসে দেখাবেন।

নীরা ব্যাগটা হাতে নিল।

আজকের দিনটা হয়তো তাদের তদন্তে নতুন মোড় নিয়ে আসবে।

১. সালেহ রহমানের পুরোনো তালিকা

সালেহ রহমানের বাড়িতে পৌঁছে নীরা দেখল, তিনি একটি কাঠের টেবিলের ওপর কয়েকটি পুরোনো কাগজ সাজিয়ে রেখেছেন।

আরিয়ান বলল,

—চাচা, আপনি বলেছিলেন A.R.-03 সিলের একটা তালিকা আছে।

সালেহ মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। এটা আজহার ভাই নিজে তৈরি করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আমি তালিকাটা নিজের কাছে রেখেছিলাম।

নীরা কাগজটা হাতে নিল।

শিরোনাম—

A.R.-03 — Personal Seal Control Record

নিচে কয়েকটি তারিখ এবং নাম লেখা।

প্রথম এন্ট্রি:

Seal issued to Azhar Rahman — Personal Authority.

দ্বিতীয় এন্ট্রি:

18 August 2008 — Seal retained by owner.

তৃতীয় এন্ট্রি:

After owner's death — Use suspended.

নীরা বলল,

—এখানে তো স্পষ্ট লেখা, আজহার সাহেবের মৃত্যুর পর সিলের ব্যবহার স্থগিত করা হয়েছিল।

সালেহ বললেন,

—ঠিক। আর সেই কারণেই ২৮ অক্টোবরের নির্দেশনায় সিলের ব্যবহার দেখে আমি অবাক হয়েছি।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—সিলটি তখন কার কাছে ছিল?

সালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি তালিকার পরের পাতাটি বের করলেন।

সেখানে লেখা—

Temporary Physical Custody — Assigned to: S. Rahman

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—S. Rahman?

আরিয়ান বলল,

—আপনি?

সালেহ মাথা নাড়লেন।

—না। আমি আগেই বলেছি, ১৮ অক্টোবরের একটি রসিদে যে S. Rahman লেখা আছে, সেটা আমার স্বাক্ষর নয়।

নীরা বলল,

—তাহলে অন্য কেউ?

সালেহ উত্তর দিলেন,

—সম্ভবত। কিন্তু পুরো নাম লেখা নেই।

২. সিলের শেষ হিসাব

আরিয়ান তালিকাটা মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল।

একটি পাতার নিচে ছোট করে লেখা—

Physical custody does not grant authorization to use.

নীরা বলল,

—মানে সিল কারও কাছে থাকলেও সে সেটা ব্যবহার করতে পারত না?

সালেহ বললেন,

—একদম। সিল সংরক্ষণ করা আর সিল ব্যবহারের অনুমতি থাকা এক নয়।

আরিয়ান বলল,

—তাহলে ২৮ অক্টোবর যিনি সিল ব্যবহার করেছিলেন, তিনি অনুমোদিত ছিলেন না।

—এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে তালিকা অনুযায়ী সিল ব্যবহারের ক্ষমতা স্থগিত ছিল। যদি পরে কোনো নতুন অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তার রেকর্ড থাকা দরকার।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—সেই নতুন অনুমোদনের কোনো রেকর্ড আছে?

সালেহ মাথা নাড়লেন।

—আমার কাছে নেই।

তিনি আরেকটি কাগজ বের করলেন।

এটি একটি ছোট হস্তান্তর নোট।

তারিখ—১৯ অক্টোবর ২০০৮।

লেখা—

Physical seal to remain secured until further instruction. No independent use permitted.

নীরা বলল,

—তাহলে ১৯ অক্টোবর থেকেই সিলটি নিরাপদে রাখার নির্দেশ ছিল।

আরিয়ান বলল,

—কিন্তু ২৮ অক্টোবর সেটি ব্যবহার করা হলো কীভাবে?

সালেহ ধীরে বললেন,

—হয়তো কেউ নির্দেশ অমান্য করেছিল। অথবা সিলটি অন্য কারও হাতে চলে গিয়েছিল।

৩. S. Rahman কে?

নীরা আবার প্রথম পাতার দিকে তাকাল।

—চাচা, S. Rahman নামটা কি আপনার কাছে পরিচিত?

সালেহ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—পুরোনো ব্যবসার সময় এই নামে কয়েকজনকে চিনতাম। কিন্তু ২০০৮ সালের এই রেকর্ডের ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে চিনি না।

আরিয়ান বলল,

—শাহেদ রহমানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ আছে?

নীরা মাথা নাড়ল।

—শাহেদ তো আগেই বলেছে, সে ১৮ অক্টোবর একটি খাম পেয়েছিল। কিন্তু সে সিলের দায়িত্বে ছিল কি না, সেটা আমরা জানি না।

সালেহ বললেন,

—কাউকে শুধু নামের মিল দেখে সন্দেহ করো না। রেকর্ডটা আগে যাচাই করো।

আরিয়ান সম্মতি জানাল।

—আমরা সেটাই করব।

সালেহ তালিকার একেবারে শেষ পৃষ্ঠা খুললেন।

সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নোট ছিল—

Seal custody was transferred to a temporary archive representative. Full identity recorded in separate register.

নীরা বলল,

—আলাদা রেজিস্টার!

আরিয়ান দ্রুত জিজ্ঞেস করল,

—সেই রেজিস্টার কোথায়?

সালেহ বললেন,

—সম্ভবত পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের নিচের আর্কাইভে।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—আবার সেই নিচের আর্কাইভ!

সালেহ মাথা নাড়লেন।

—আজহার ভাই গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলো আলাদা আলাদা জায়গায় রাখতেন। একটা নথি দিয়ে পুরো সত্য জানা যেত না।

৪. পুরোনো আর্কাইভের নতুন খাতা

বিকেলে নীরা, আরিয়ান ও রাফি আবার পুরোনো ট্রাস্ট অফিসে গেল।

নিচের আর্কাইভ কক্ষটি অনেক দিন পর পরিষ্কার করা হয়েছে।

রাফি একটি তাক থেকে কয়েকটি রেজিস্টার নামিয়ে টেবিলে রাখল।

আরিয়ান বলল,

—আমাদের Seal Custody Register খুঁজতে হবে।

নীরা একটি খাতা খুলল।

প্রথম কয়েকটি পৃষ্ঠা সাধারণ হিসাবের।

দ্বিতীয় খাতায় পুরোনো চুক্তির তালিকা।

তৃতীয় খাতার মলাটে লেখা—

Personal Seal & Key Custody Register — 2008

নীরা দ্রুত বলল,

—আরিয়ান, এটা পেয়েছি!

তিনজন মিলে খাতাটি খুলল।

আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কয়েকটি এন্ট্রি পাওয়া গেল।

১৮ অক্টোবরের পাতায় একটি লেখা—

Seal A.R.-03 received for temporary preservation.

নিচে নামের জায়গায় লেখা—

S. Rahman

তার পাশে একটি স্বাক্ষর।

আরেকটি ছোট নোট—

Not authorized for operational use.

নীরা বলল,

—এখানে আবার S. Rahman!

আরিয়ান স্বাক্ষরটা ভালোভাবে দেখল।

—এই স্বাক্ষরটা সালেহ চাচার স্বাক্ষরের সঙ্গে মেলে না।

রাফি বলল,

—তাহলে ব্যক্তিটি অন্য কেউ।

নীরা পরের পৃষ্ঠাটি উল্টাল।

কিন্তু সেখানে কিছু লেখা নেই।

শুধু একটি রেফারেন্স নম্বর—

SC-18/10/04

আর তার নিচে লেখা—

Identity verification pending.

৫. শাহেদের কাছে নতুন প্রশ্ন

রেজিস্টারের ছবি তুলে আরিয়ান শাহেদ রহমানকে পাঠাল।

কিছুক্ষণ পর শাহেদের ফোন এল।

—আরিয়ান, ছবিটা দেখলাম।

—আপনি কি স্বাক্ষরটা চিনতে পেরেছেন?

শাহেদ বললেন,

—না। এটা আমার স্বাক্ষর নয়।

নীরা ফোনের কাছে এসে বলল,

—আপনি কি কখনো A.R.-03 সিলটি হাতে নিয়েছিলেন?

শাহেদ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—একবার দেখেছিলাম। কিন্তু আমার কাছে কখনো সংরক্ষণের জন্য দেওয়া হয়নি।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—কোথায় দেখেছিলেন?

—পুরোনো ট্রাস্ট অফিসে। ২০০৮ সালের অক্টোবরের দিকে।

নীরা বলল,

—কার হাতে ছিল?

শাহেদ উত্তর দিলেন,

—একজন লোকের হাতে। তবে তাঁর নাম মনে নেই।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—তিনি কি নীল পাথরের আংটি পরেছিলেন?

শাহেদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—হ্যাঁ। মনে হচ্ছে, তাঁর হাতে এমন একটা আংটি ছিল।

নীরা আরিয়ানের দিকে তাকাল।

একই বৈশিষ্ট্য!

আব্দুস সালাম, ইমরান এবং এখন শাহেদ—তিনজনই নীল পাথরের আংটির কথা বলেছে।

আরিয়ান বলল,

—আপনি কি নিশ্চিত, একই মানুষ ছিলেন?

শাহেদ উত্তর দিলেন,

—চেহারা মনে নেই। তবে আংটিটা মনে আছে। কারণ পাথরটা বেশ বড় ছিল।

নীরা বলল,

—আপনি কি জানেন, তিনি সিলটি কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন?

—না। তবে তাঁকে নিচের আর্কাইভের দিকে যেতে দেখেছিলাম।

৬. সিলের সঙ্গে রাখা খাম

নীরা ও আরিয়ান রেজিস্টারটা আবার পরীক্ষা করতে শুরু করল।

রাফি বলল,

—স্যার, এখানে একটা কাগজ আটকে আছে।

সে পাতার ভাঁজ থেকে একটি ছোট কাগজ বের করল।

কাগজে লেখা—

SC-18/10/04 — Attached Envelope

নীরা বলল,

—এটা কি ওই রেফারেন্সের সঙ্গে সম্পর্কিত?

আরিয়ান কাগজটা উল্টে দেখল।

পেছনে হাতে লেখা—

Do not open until identity verification is complete.

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে একটা খামও ছিল!

রাফি বলল,

—কিন্তু খামটা কোথায়?

তারা টেবিলের ওপর থাকা রেজিস্টারগুলো আবার পরীক্ষা করল।

কোনো খাম পাওয়া গেল না।

তবে রেজিস্টারের শেষ পৃষ্ঠায় একটি নোট ছিল—

Envelope transferred to Lower Archive Cabinet 04.

আরিয়ান বলল,

—ক্যাবিনেট ০৪ কোথায়?

রাফি ঘরের এক কোণের দিকে দেখাল।

সেখানে একটি পুরোনো লোহার আলমারি।

নীরা বলল,

—ওটাই কি?

রাফি এগিয়ে গিয়ে নম্বর দেখল।

04

আলমারিটি তালাবদ্ধ।

সালেহের দেওয়া পুরোনো চাবির গোছা পরীক্ষা করে একটি চাবি পাওয়া গেল।

কয়েকবার চেষ্টা করার পর তালা খুলে গেল।

ভেতরে কয়েকটি পুরোনো ফাইল, খাম এবং রসিদ।

রাফি একটি বাদামি খাম বের করল।

খামের ওপর লেখা—

SC-18/10/04

নীরা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল।

আরিয়ান খামটি হাতে নিল।

সিল করা ছিল না। তবে মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।

ভেতরে ছিল একটি পাতলা কাগজ।

সেখানে লেখা—

The temporary seal holder is not the final custodian of C-14. Seal preservation and document custody must remain separate.

নীরা বলল,

—আবার একই কথা! সিলের দায়িত্ব আর C-14-এর দায়িত্ব আলাদা!

আরিয়ান কাগজের নিচের অংশ পড়ল।

সেখানে আরও লেখা—

The identity of the temporary seal holder shall be verified through the original signature record.

কিন্তু স্বাক্ষরের জায়গাটা ফাঁকা।

৭. শেষ সূত্র

নীরা হতাশ হয়ে বলল,

—এত কাগজ পেলাম, কিন্তু নাম পেলাম না।

আরিয়ান বলল,

—নাম পাওয়ার আগেই আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পেরেছি।

—কী?

—A.R.-03 সিলের অস্থায়ী রক্ষক এবং C-14-এর চূড়ান্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি একই মানুষ হওয়ার কথা নয়।

নীরা বলল,

—তাহলে নীল পাথরের আংটি পরা মানুষটি হয়তো শুধু সিলের রক্ষক ছিলেন।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

—হতে পারে। তবে তাঁর পরিচয় এখনো নিশ্চিত নয়।

ঠিক তখন রাফি বলল,

—স্যার, খামের ভেতরে আরেকটি ছোট কাগজ আছে।

সে কাগজটি বের করে টেবিলে রাখল।

সেখানে মাত্র একটি লাইন—

“Original signature specimen is held by the person who witnessed the 18 October transfer.”

নীরা বলল,

—১৮ অক্টোবরের হস্তান্তরের সাক্ষী?

আরিয়ান চিন্তিত হয়ে পড়ল।

—আমাদের কাছে কি সেই দিনের সাক্ষীর কোনো নাম আছে?

নীরা বলল,

—শাহেদের কাছে থাকা রসিদে তো অন্য একজনের পক্ষে গ্রহণ করার কথা ছিল।

রাফি বলল,

—আর ১৮ অক্টোবরের কিছু কাগজে একজন সাক্ষীর নাম আংশিক দেখা গিয়েছিল।

আরিয়ান দ্রুত বলল,

—কোন নাম?

রাফি পুরোনো নোট খুলে দেখল।

—এখানে লেখা আছে, “M. Rahman — Witness Copy.”

নীরা থমকে গেল।

—M. Rahman?

আরিয়ান বলল,

—এটা কি মিজানুর রহমান?

নীরা ধীরে বলল,

—হতে পারে। কিন্তু আমরা তো জানি, মিজানুর সাহেব সব কাগজ যাচাই না করেই সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন।

আরিয়ান বলল,

—তাহলে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে।

নীরা জানালার বাইরে তাকাল।

আবার একটি নাম।

আবার একটি অসম্পূর্ণ স্বাক্ষর।

কিন্তু এবার তাদের হাতে এমন একটি সূত্র এসেছে, যা হয়তো M-04-এর পরিচয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ ১৮ অক্টোবরের মূল স্বাক্ষরের নমুনা যার কাছে আছে, সে-ই হয়তো জানে—

সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 91 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন