ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব 92

লেখক: Mafiya Queen

শেষ নিঃশ্বাসেও তুমি

পর্ব ৯২: মিজানুরের অজানা সাক্ষ্য

লেখক: Mafiya Queen 👑

সকাল দশটা।

নীরা অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু তার মন পড়ে আছে আগের দিনের পাওয়া সেই কাগজটির ওপর।

“Original signature specimen is held by the person who witnessed the 18 October transfer.”

১৮ অক্টোবরের সাক্ষী—M. Rahman।

মিজানুর রহমান।

কিন্তু মিজানুর কি সত্যিই জানেন, সেই দিন কী ঘটেছিল?

নীরা আরিয়ানকে ফোন করল।

—তুমি কি মিজানুর সাহেবের সঙ্গে কথা বলেছ?

—হ্যাঁ। উনি আজ বিকেলে দেখা করতে রাজি হয়েছেন।

—উনি কি জানেন আমরা কী নিয়ে কথা বলতে চাই?

—আমি শুধু বলেছি, ২০০৮ সালের একটা পুরোনো নথি সম্পর্কে জানতে চাই।

নীরা বলল,

—আমার মনে হচ্ছে, এবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু জানা যাবে।

আরিয়ান শান্ত গলায় বলল,

—আশা করি। তবে এবারও কোনো অনুমানকে সত্য ধরে নেব না।

১. পুরোনো সাক্ষীর সামনে

বিকেল চারটা।

মিজানুর রহমান নিজের বাড়ির বসার ঘরে বসে ছিলেন।

নীরা ও আরিয়ানকে দেখে তিনি বললেন,

—তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে, আবার কোনো পুরোনো রহস্য সামনে এসেছে।

আরিয়ান ফাইলটি টেবিলে রাখল।

—১৮ অক্টোবর ২০০৮-এর একটি নথি পেয়েছি। সেখানে আপনার নাম সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ আছে।

মিজানুর কাগজটা হাতে নিলেন।

কিছুক্ষণ দেখার পর তাঁর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

—এই রেকর্ডটা কোথায় পেয়েছ?

নীরা বলল,

—পুরোনো ট্রাস্ট অফিসের আর্কাইভে।

মিজানুর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আমি ভেবেছিলাম, এই বিষয়গুলো আর কখনো সামনে আসবে না।

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—আপনি কি সেদিন উপস্থিত ছিলেন?

—হ্যাঁ। তবে পুরো হস্তান্তর প্রক্রিয়ার সাক্ষী ছিলাম না।

নীরা বলল,

—তাহলে আপনার স্বাক্ষর কেন নেওয়া হয়েছিল?

মিজানুর উত্তর দিলেন,

—আমাকে বলা হয়েছিল, একটি সিল করা নথি সংরক্ষণের জন্য নেওয়া হচ্ছে। আমি শুধু কাগজ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলাম।

আরিয়ান বলল,

—আপনি কি প্রাপকের পরিচয় যাচাই করেছিলেন?

মিজানুর মাথা নাড়লেন।

—না। আমি কাউকে M-04 হিসেবে শনাক্ত করিনি।

নীরা বলল,

—কিন্তু আপনার স্বাক্ষর ব্যবহার করে যদি বলা হয় যে আপনি প্রাপকের পরিচয় নিশ্চিত করেছিলেন?

মিজানুর এবার সরাসরি নীরার দিকে তাকালেন।

—তাহলে সেটা মিথ্যা হবে।

২. স্বাক্ষরের নমুনা

মিজানুর নিজের ঘর থেকে একটি পুরোনো ফাইল নিয়ে এলেন।

—তোমরা যে স্বাক্ষরের নমুনা খুঁজছ, সম্ভবত এটা কাজে লাগবে।

ফাইলের ভেতরে ২০০৮ সালের কয়েকটি নথির কপি ছিল।

তিনি একটি কাগজ বের করলেন।

তারিখ—১৮ অক্টোবর ২০০৮।

নিচে তাঁর স্বাক্ষর।

আরিয়ান কাগজটি পরীক্ষা করল।

—এটা কি মূল নথির কপি?

—না। এটা আমার কাছে থাকা অফিস কপি।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—এখানে কি প্রাপকের নাম আছে?

মিজানুর কাগজের মাঝের অংশ দেখালেন।

সেখানে লেখা—

Document received for temporary preservation. Final recipient identity not verified.

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—এখানে তো স্পষ্ট লেখা, প্রাপকের পরিচয় যাচাই করা হয়নি!

মিজানুর বললেন,

—ঠিক। আমি এই কথাটাই তখন লিখতে বলেছিলাম।

আরিয়ান বলল,

—কিন্তু পরবর্তী রেকর্ডে আপনাকে সাক্ষী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

মিজানুর মাথা নাড়লেন।

—আমার স্বাক্ষর ছিল। কিন্তু সেই স্বাক্ষরের অর্থ কী ছিল, সেটা না বুঝে অন্য কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।

নীরা কাগজটি সাবধানে ব্যাগে রাখল।

এবার তাদের হাতে এমন একটি প্রমাণ এসেছে, যা অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করে—

মিজানুর রহমান M-04-এর পরিচয় নিশ্চিত করেননি।

৩. দ্বিতীয় কাগজটি

মিজানুর আবার ফাইলের ভেতর খুঁজতে লাগলেন।

হঠাৎ তিনি একটি পাতলা কাগজ বের করলেন।

—আরেকটা জিনিস আছে। এটা এতদিন আলাদা করে রেখেছিলাম।

আরিয়ান কাগজটা হাতে নিল।

এটি একটি ছোট নোট।

উপরে লেখা—

Witness Clarification — 18 October 2008

নিচে কয়েকটি লাইন।

The undersigned confirms presence during document preservation procedure only.

No confirmation of final custodian identity is made.

Original signature specimen to be retained separately.

নীরা বলল,

—এটাই তো আমরা খুঁজছিলাম!

আরিয়ান জিজ্ঞেস করল,

—এই কাগজের সঙ্গে মূল স্বাক্ষরের নমুনা ছিল?

মিজানুর বললেন,

—ছিল। কিন্তু আমি যখন কাগজগুলো পাই, তখন নমুনাটি আলাদা খামে রাখা ছিল।

—খামটা কোথায়?

মিজানুর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—সেই খাম আমার কাছে নেই।

নীরা হতাশ হয়ে বলল,

—হারিয়ে গেছে?

—ঠিক জানি না। একসময় অফিসের নথি গোছানোর সময় খামটি অন্য ফাইলে রাখা হয়েছিল। পরে আর খুঁজে পাইনি।

আরিয়ান বলল,

—কোন অফিসে রাখা হয়েছিল?

মিজানুর উত্তর দিলেন,

—পুরোনো ট্রাস্ট বোর্ডের প্রশাসনিক কক্ষে।

৪. তৃষার অজানা কথা

কথা চলার মাঝেই তৃষা ঘরে প্রবেশ করল।

—বাবা, তুমি কি আমাকে ডাকছিলে?

মিজানুর বললেন,

—না মা। নীরা আর আরিয়ান এসেছে।

তৃষা নীরার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।

—তোমাদের আবার পুরোনো কাগজ নিয়ে কাজ চলছে?

নীরা বলল,

—হ্যাঁ। একটা গুরুত্বপূর্ণ নথি খুঁজছি।

তৃষা টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলো দেখতে লাগল।

হঠাৎ তার চোখ একটি পুরোনো রেফারেন্স নম্বরে আটকে গেল।

A-17/18-10

সে বলল,

—এই নম্বরটা আমি আগে দেখেছি।

আরিয়ান দ্রুত তার দিকে তাকাল।

—কোথায়?

তৃষা একটু ভেবে বলল,

—বাবার পুরোনো অফিসের একটা ফাইলে। সেখানে এই নম্বরের পাশে লেখা ছিল, ‘Original dispatch — pending acknowledgment’।

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—তুমি নিশ্চিত?

—পুরোপুরি নয়। তবে মনে আছে, বাবা একবার ফাইলটা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন।

মিজানুর বললেন,

—তৃষা, তুমি কি সেই ফাইলটা এখনো দেখেছ?

—না বাবা। তবে আমার পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে ফাইলটির একটি সূচিপত্র থাকতে পারে।

আরিয়ান বলল,

—সেটা কি খুঁজে পাওয়া সম্ভব?

তৃষা মাথা নাড়ল।

—আমি চেষ্টা করতে পারি।

নীরা এবার একটু স্বস্তি পেল।

মিজানুরের অজানা ফাইল থেকে হয়তো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যাবে।

৫. পুরোনো প্রশাসনিক কক্ষ

সন্ধ্যার দিকে রাফি ফোন করে জানাল, পুরোনো ট্রাস্ট বোর্ডের প্রশাসনিক কক্ষের সংরক্ষণ তালিকা পাওয়া গেছে।

আরিয়ান বলল,

—সেখানে কি A-17-এর উল্লেখ আছে?

রাফি উত্তর দিল,

—হ্যাঁ স্যার। ১৮ অক্টোবর ২০০৮-এর একটি নথি প্রশাসনিক কক্ষে জমা পড়েছিল। কিন্তু পরদিন সেটি অন্য বিভাগে পাঠানো হয়।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—কোন বিভাগে?

—Private Archive Review Section।

আরিয়ান বলল,

—সেই বিভাগের দায়িত্বে কে ছিলেন?

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—এখানে একটি নাম আছে।

—কী নাম?

—মাহবুব আলম।

নীরা চমকে উঠল।

—আবার মাহবুব আলম!

আরিয়ান বলল,

—তাঁর সঙ্গে তো আগেও C-14-এর নথির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

রাফি বলল,

—তবে একটা বিষয় আছে। এই রেকর্ডে মাহবুব আলমের নাম দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং নথি পর্যালোচনার অনুমোদনকারী হিসেবে লেখা।

আরিয়ান বলল,

—ঠিক আছে। কাগজটার কপি পাঠাও।

৬. তৃষার পাওয়া সূচিপত্র

রাত আটটার দিকে তৃষা নীরাকে ফোন করল।

—নীরা, আমি একটা জিনিস পেয়েছি।

—কী পেয়েছ?

—বাবার পুরোনো ফাইলের সূচিপত্র। সেখানে A-17-এর উল্লেখ আছে।

নীরা উত্তেজিত হয়ে বলল,

—কী লেখা?

তৃষা কাগজটা পড়ে শোনাল।

—‘A-17 — Final Authorization. Original acknowledgment pending. Review copy transferred to Private Archive.’

নীরা বলল,

—আর কিছু?

—হ্যাঁ। নিচে লেখা আছে, ‘Do not merge with C-14 second copy.’

নীরা থমকে গেল।

C-14-এর দ্বিতীয় কপি থেকে আলাদা রাখতে বলা হয়েছিল A-17-এর স্বীকৃতিপত্র।

তাহলে দুটি নথিকে আলাদা রাখার পেছনে নিশ্চয়ই বিশেষ কারণ ছিল।

তৃষা আবার বলল,

—আরেকটা ছোট নোট আছে।

—কী?

—‘Identity specimen received from external witness.’

নীরা দ্রুত আরিয়ানকে ফোন করল।

আরিয়ান সব শুনে বলল,

—তাহলে স্বাক্ষরের নমুনা বাইরের কোনো সাক্ষীর কাছ থেকে এসেছিল।

নীরা বলল,

—কিন্তু সেই সাক্ষী কে?

আরিয়ান উত্তর দিল,

—এখন সেটাই খুঁজতে হবে।

৭. নতুন নাম

রাত গভীর হয়েছে।

আরিয়ান নিজের অফিসে বসে রাফির পাঠানো নথিগুলো পরীক্ষা করছিল।

নীরা ভিডিও কলে যুক্ত ছিল।

আরিয়ান বলল,

—তৃষার পাওয়া সূচিপত্র আর রাফির পাওয়া রেকর্ড মিলিয়ে একটা বিষয় বোঝা যাচ্ছে।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—কী?

—১৮ অক্টোবর A-17 তৈরি হয়েছিল। কিন্তু M-04-এর স্বীকৃতি তখনো পাওয়া যায়নি। এরপর স্বাক্ষরের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল বাইরের একজন সাক্ষীর কাছ থেকে।

—তারপর?

—তারপর নথিটা Private Archive-এ পাঠানো হয়।

নীরা বলল,

—মানে সেই আর্কাইভেই হয়তো স্বীকৃতির আসল কাগজ আছে।

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

ঠিক তখন রাফির আরেকটি মেসেজ এল।

একটি স্ক্যান করা পুরোনো তালিকা।

তালিকার শিরোনাম—

External Witness Record — October 2008

নিচে কয়েকটি নাম।

শেষের দিকে একটি নাম দেখে আরিয়ান থেমে গেল।

নীরা জিজ্ঞেস করল,

—কী হয়েছে?

আরিয়ান ধীরে বলল,

—এই নামটা আগে আমাদের সামনে আসেনি।

—কার নাম?

আরিয়ান স্ক্রিনটা নীরার দিকে ঘুরিয়ে দিল।

সেখানে লেখা—

Witness: Dr. Nasrin Akter

নীরা অবাক হয়ে বলল,

—ডা. নাসরিন আক্তার!

আরিয়ান বলল,

—হ্যাঁ। নীরার জন্মের রাতের হাসপাতালের রেকর্ড নিয়ে যিনি আমাদের সাহায্য করেছিলেন।

নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—তিনি তো হাসপাতালের নথি সম্পর্কে জানতেন। কিন্তু C-14-এর স্বাক্ষরের নমুনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী?

আরিয়ান বলল,

—এটা জানার জন্য তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে।

নীরা ধীরে বলল,

—তাহলে এতদিনের দুই রহস্য কি আবার একই মানুষের কাছে এসে মিলল?

আরিয়ান উত্তর দিল,

—হয়তো মিলেছে। আবার হয়তো শুধু একজন সাক্ষীর কারণে একই তালিকায় তাঁর নাম এসেছে।

সে কাগজটা ভালোভাবে পরীক্ষা করল।

ডা. নাসরিনের নামের পাশে একটি ছোট মন্তব্য ছিল—

“Original specimen seen. Identity not certified.”

নীরা নিঃশব্দে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

ডা. নাসরিন স্বাক্ষরের নমুনা দেখেছিলেন।

কিন্তু পরিচয় নিশ্চিত করেননি।

তাহলে তিনি কী দেখেছিলেন?

আর সেই নমুনাটি এখন কোথায়?

ঠিক তখন নীরার ফোনে একটি মেসেজ এল।

অপরিচিত নম্বর।

“ডা. নাসরিনকে জিজ্ঞেস করার আগে তাঁর পুরোনো নোটবুকটি খুঁজুন। সেখানে ১৮ অক্টোবরের একটি নাম লেখা আছে।”

নীরা মেসেজটি আরিয়ানকে দেখাল।

আরিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

—এবার আমাদের ডা. নাসরিনের কাছে যেতে হবে।

নীরা জানালার বাইরে তাকাল।

এতদিন ধরে তারা ভেবেছিল, হাসপাতালের রহস্য আর ব্যবসার নথির রহস্য আলাদা।

কিন্তু ১৮ অক্টোবরের একটি স্বাক্ষর আবার তাদের সেই পুরোনো হাসপাতালের রাতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

চলবে... :::

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 92 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন