আসসালামু আলাইকুম! 🌸
📖 উপন্যাস: আমার ডাক্তার বাবু
✍️ পর্ব: ০২
🖤 লেখিকা: মাহিয়া ইসলাম হিমি 🖤
সন্ধ্যা ৭টা
হিমু বসার ঘরে এসে মায়ের পাশে বসল। সবাই মিলে গল্প করছে, আর নিলয় আগের মতোই ফোন নিয়ে ব্যস্ত।
হঠাৎ হালিমা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— হিমু, মা! তুই কোথায় গিয়েছিলি? তোকে কতক্ষণ ধরে খুঁজছি!
হিমু মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল—
— আম্মু, মায়া ডেকেছিল। ওর সঙ্গে একটু দেখা করতে গিয়েছিলাম।
নিলয় ফোন থেকে চোখ তুলে বলল—
— ওহ্! বুঝেছি! বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করার নাম করে নিশ্চয়ই কোনো ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলি!
হিমু চোখ বড় বড় করে নিলয়ের দিকে তাকাল।
— নিলয়! তোর মাথায় সবসময় এসবই ঘোরে কেন?
নিলয় নির্বিকার মুখে বলল—
— কারণ, আমার মাথাটা খুবই উন্নত মানের! তোদের মতো সাধারণ মানুষের মাথা না!
— তোর মাথা যে কত উন্নত, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। ছোটবেলায় গাছে উঠে পড়ে গিয়ে মাথায় যে কয়টা বুদ্ধি ঢুকেছিল, সেগুলো এখনো বের হয়নি!
কথাটা শুনে রিমু খিলখিল করে হেসে উঠল।
নিলয় মুখ বাঁকিয়ে বলল—
— আম্মু! দেখো, তোমার ভাগনি আমাকে অপমান করছে!
হাদিয়া বেগম হেসে বললেন—
— তুই আগে মেয়েটাকে জ্বালানো বন্ধ কর। তাহলে ও তোকে কিছু বলবে না।
নিলয় অবাক হওয়ার ভান করে বলল—
— কী! নিজের ছেলে থাকতে ভাগনির পক্ষ নিচ্ছ?
হালিমা বেগম হেসে বললেন—
— আমার মেয়েকে জ্বালালে তো এমনই হবে!
হিমু জিতে যাওয়ার হাসি দিয়ে নিলয়ের দিকে তাকাল।
— শুনেছিস? এবার চুপচাপ বসে থাক!
নিলয় চোখ ছোট করে বলল—
— হাস, হাস! হাসতে থাক। সময় আসুক, সব হিসাব সুদে-আসলে বুঝিয়ে দেব!
হিমু জিভ বের করে বলল—
— আগে নিজের হিসাব ঠিক কর, তারপর অন্যের হিসাব বুঝতে আসিস!
আবারও সবাই হেসে উঠল।
বাড়িটা হাসি-আনন্দে ভরে রইল।
কিন্তু এই হাসির আড়ালেই হিমুর মনে বারবার ভেসে উঠছিল বিকেলে মাঠে দেখা সেই অচেনা ছেলেটার মুখের পাশের অংশটুকু।
ছেলেটার নামটাও সে জানে না!
তবু কেন জানি, মনে হচ্ছিল ছেলেটাকে সে আগে কোথাও দেখেছে।
হিমু নিজের মনেই বিড়বিড় করল—
— ধুর! একটা অচেনা ছেলেকে নিয়ে এত ভাবার কী আছে!
পাশ থেকে রিমু বলে উঠল—
— আপু, কার কথা ভাবছিস?
হিমু চমকে উঠল।
— ক-কই! কারও কথা ভাবছি না তো!
রিমু সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল—
— ওহ্! বুঝেছি! নিশ্চয়ই কোনো গোপন ব্যাপার আছে!
হিমু বোনের গাল টেনে বলল—
— বেশি পাকামি করলে কিন্তু তোর চুল কেটে দেব!
রিমু সঙ্গে সঙ্গে নিজের চুল ধরে পিছিয়ে গেল।
— আম্মু! আপু আমাকে ভয় দেখাচ্ছে!
হিমু হেসে গড়িয়ে পড়ল।
এভাবেই সন্ধ্যাটা কেটে গেল।
কিন্তু হিমু জানত না, তার জীবনের গল্পে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেছে।
আর সেই অধ্যায়ের নায়ক কে, তা জানার জন্য তাকে আরও অনেকটা পথ অপেক্ষা করতে হবে
শহরের অন্য প্রান্তে একটি সুন্দর বাড়ি।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল, একজন যুবক সোফায় বসে আছে। পরনে কালো টি-শার্ট, চুলগুলো এলোমেলো। হাতে একটি বই, কিন্তু তার মন বইয়ের পাতায় নেই।
সে জিসান।
বয়স উনিশ।
চেহারায় গাম্ভীর্য থাকলেও আপনজনদের সঙ্গে সে বেশ হাসিখুশি। তবে রাগ উঠলে তাকে সামলানো সহজ নয়।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে বড় ভাইয়ের নাম ভেসে উঠতেই জিসান কল রিসিভ করল।
— হ্যালো, ভাইয়া!
ওপাশ থেকে তার বড় ভাই নিলয় বলল—
— কী করছিস?
জিসান বইটা বন্ধ করে বলল—
— বসে আছি। তুমি কোথায়?
— বাসায়। আজকে তোদের খালামণিদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। অনেক বছর পর দেখা হলো।
জিসান আগ্রহ নিয়ে বলল—
— তাই নাকি? সবাই কেমন আছে?
নিলয় হেসে বলল—
— সবাই ভালো আছে। আর শোন, তোর একটা মামাতো বোন আছে। নাম হিমু। মেয়েটা একদম আগের মতোই পাগলি আছে!
জিসান একটু হেসে বলল—
— তুমি নিজে একটা পাগল, আবার অন্যকে পাগলি বলছ!
— এই ছেলে! বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার আদবকায়দা ভুলে গেছিস?
— আদবকায়দা তো তোমার কাছ থেকেই শিখেছি!
নিলয় বিরক্ত হয়ে বলল—
— রাখ, তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল হয়েছে!
জিসান হেসে বলল—
— আচ্ছা, রাগ করো না। তা, কবে আসবে বাসায়?
— কয়েক দিন থাকব এখানে। তুই চাইলে কাল চলে আসতে পারিস।
— দেখা যাবে।
— কী দেখা যাবে? আসবি!
— আচ্ছা বাবা, আসব!
কথা শেষ করে জিসান ফোন রেখে দিল।
তারপর আবার বইটা হাতে তুলে নিল।
কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই তার মা ঘরে এসে বললেন—
— জিসান, বাবা! কাল সকালে হাসপাতালে যেতে ভুলিস না। তোর বাবার একটা রিপোর্ট আনতে হবে।
জিসান বইটা নামিয়ে বলল—
— আচ্ছা, আম্মু। সকালে চলে যাব।
মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেলেন।
জিসান আবার বইয়ের দিকে মন দিল।
সে জানত না, তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের নাম আজ প্রথমবার তার কানে এসেছে।
হিমু।
কিন্তু সেই নামের সঙ্গে কোনো মুখ জুড়ে দেওয়ার সুযোগ তার হয়নি।
আর হিমুও জানত না, বিকেলে মাঠে যে অচেনা ছেলেটাকে দেখে তার মনে অদ্ভুত ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল, সেই ছেলেটার নাম জিসান।
তাদের গল্প শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পরিচয় হতে এখনো অনেক দেরি!
হিমু নিজের ঘরে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। রিমু বিছানায় শুয়ে কার্টুন দেখছে।
হঠাৎ হিমুর ফোনে মেসেজ এল।
মায়া: এই হিমু, ঘুমিয়ে পড়েছিস?
হিমু: না। বল।
মায়া: আজকের ছেলেটার কথা মনে আছে?
মেসেজটা পড়েই হিমুর চোখ বড় হয়ে গেল।
হিমু: কোন ছেলে?
মায়া: আহা! এমন ভাব করছিস যেন কিছুই জানিস না! মাঠে যে ছেলেটাকে দেখেছিলাম!
হিমু ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে লিখল—
হিমু: ধুর পাগলি! আমি আবার ওর কথা কেন ভাবব?
মায়া: হাহাহা! ঠিক আছে। তুই ভাবিস না, আমি ভাবব!
হিমু ফোনটা বুকে চেপে হেসে উঠল।
ঠিক তখনই রিমু পাশ ফিরে বলল—
— আপু, একা একা হাসছিস কেন?
হিমু তাড়াতাড়ি ফোন লুকিয়ে বলল—
— কিছু না!
রিমু চোখ ছোট করে বলল—
— তোর কিছু একটা হয়েছে!
হিমু বালিশ তুলে বোনের দিকে ছুড়ে মারল।
— চুপচাপ ঘুমা তো!
রিমু হেসে বালিশটা সরিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর ঘরের আলো নিভে গেল।
হিমু চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু ঘুম আসছিল না।
বারবার মনে পড়ছিল সেই ছেলেটার কথা।
<!-- empty paragraph -->সকাল ৮টা
— হিমুউউউ! ওঠ! আর কত ঘুমাবি?
হালিমা বেগমের ডাক শুড়াশব্দ নেই। সে কাঁথা মুড়ি দিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে।
হালিমা বেগম মেয়ের কাছে এসে কাঁথা টেনে সরিয়ে দিলেন।
— এই মেয়ে! সূর্য মাথার ওপর উঠে গেছে, আর তোর ঘুম ভাঙছে না!
হিমু চোখ বন্ধ রেখেই বলল—
— আম্মু, সূর্যকে বলো একটু নিচে নামতে। আমার ঘুমটা শেষ হোক!
হালিমা বেগম অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।
— কী বললি?
হিমু এবার চোখ খুলে মিষ্টি করে হাসল।
— কিছু না, আম্মু! আমি তো বলছিলাম, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মা!
— ঢং দেখে বাঁচি না! তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। নাশতা তৈরি।
— আচ্ছা, আম্মু!
হালিমা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই হিমু আবার বালিশে মাথা রাখল।
কিন্তু পরমুহূর্তেই দরজা ঠেলে রিমু ঢুকে পড়ল।
— আপু! আম্মু বলেছে পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে যেতে হবে!
হিমু চোখ বন্ধ রেখেই বলল—
— তুই গিয়ে বল, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে স্বপ্নে নাশতা করে ফেলব!
রিমু কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল।
— ঠিক আছে! আমি গিয়ে বলছি, আপু আজকে নাশতা খাবে না। শুধু ঘুমাবে!
হিমু ধড়মড় করে উঠে বসল।
— এই দাঁড়া! তুই কোথাও যাবি না!
রিমু খিলখিল করে হেসে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
হিমু বিরক্ত হয়ে বালিশটা ছুড়ে মারল।
— শয়তানের বাচ্চা!
তারপর নিজেই হেসে ফ্রেশ হতে চলে গেল।
খাবার টেবিলে সবাই বসে নাশতা করছে। নিলয় এক হাতে পরোটা খাচ্ছে, অন্য হাতে ফোন টিপছে।
হিমু এসে তার পাশের চেয়ারটায় বসতেই নিলয় ফোন থেকে চোখ তুলে তাকাল।
— সুপ্রভাত, ঘুমকুমারী!
হিমু পরোটার টুকরো মুখে দিয়ে বলল—
— সুপ্রভাত, বকবক মেশিন!
নিলয় ভ্রু উঁচু করল।
— আমাকে বকবক মেশিন বললি?
— কেন? তোর আপত্তি আছে?
— অবশ্যই আছে! আমি একজন ভদ্র ছেলে।
হিমু পানি খেতে গিয়ে প্রায় কাশতে শুরু করল।
— তুই? ভদ্র ছেলে?
নিলয় বুক ফুলিয়ে বলল—
— হ্যাঁ! কেন, বিশ্বাস হয় না?
হিমু হেসে বলল—
— তোর মতো ভদ্র ছেলে পৃথিবীতে আর একটাও নেই। থাকলে পৃথিবীটা এত দিনে মাথায় তুলে ফেলত!
রিমু হাসতে হাসতে টেবিলে মাথা রাখল।
নিলয় চোখ পাকিয়ে বলল—
— তোরা দুই বোন মিলে আমার জীবনটা অতিষ্ঠ করে তুলেছিস!
হিমু মিষ্টি করে বলল—
— ভালোবাসি তোকে, তাই!
নিলয় এক মুহূর্ত থেমে গেল। তারপর মুখ বাঁকিয়ে বলল—
— এই কথাটা রেকর্ড করে রাখব। পরে যখন আমাকে মারতে আসবি, তখন শুনিয়ে দেব!
হিমু আবার হেসে উঠল।
খাওয়ার মাঝেই নিলয়ের ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম দেখে সে কল রিসিভ করল।
— হ্যালো, জিসান!
ওপাশ থেকে জিসান বলল—
— ভাইয়া, তুমি কখন আসবে? তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
— আজকে আসতে পারব না রে। এখানে একটু কাজ আছে। তুই চাইলে বিকেলে চলে আয়।
— আচ্ছা, দেখি।
— আর শোন, আসার সময় আমার জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসিস।
জিসান বিরক্ত হয়ে বলল—
— আমি কি তোমার কাজের লোক?
নিলয় হেসে বলল—
— ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব পালন কর!
— তোমার মতো ভাই পাওয়ার চেয়ে এতিম হওয়া ভালো ছিল!
কথাটা বলেই জিসান ফোন কেটে দিল।
নিলয় ফোনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল—
— শয়তান একটা!
পাশ থেকে হিমু জিজ্ঞেস করল—
— কে ফোন করেছিল?
নিলয় স্বাভাবিকভাবে বলল—
— আমার ছোট ভাই। জিসান।
হিমু নামটা শুনে একবার তাকাল, তারপর আবার নিজের খাবারে মন দিল।
— ওহ্! তোর ভাই আছে নাকি?
নিলয় অবাক হয়ে বলল—
— কী! এত বছর ধরে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করিস, আর জানিস না আমার একটা ভাই আছে?
হিমু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল—
— তুই তো কখনো বলিসনি!
— সব কথা কি তোকে ঢাকঢোল পিটিয়ে বলতে হবে?
— হ্যাঁ! তোর মতো বকবক মেশিনের সব খবর আমাকে জানাতে হবে!
নিলয় মাথায় হাত দিয়ে বলল—
— আল্লাহ, আমাকে ধৈর্য দাও!
সবাই আবার হেসে উঠল।
কেউ জানত না, এই ছোট্ট কথোপকথনটাই একদিন হিমুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ের শুরু হয়ে দাঁড়াবে।
জিসান নিজের ঘরে তৈরি হচ্ছিল।
আজ তাকে হাসপাতালে যেতে হবে। পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। চুলগুলো যত্ন করে আঁচড়াতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত এলোমেলো রেখেই দিল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
— ব্যস! ডাক্তার সাহেবের মতোই লাগছে!
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে তার মা ডাকলেন—
— জিসান, বাবা! তৈরি হয়েছিস?
— হ্যাঁ, আম্মু! আসছি!
ঘর থেকে বেরিয়ে মায়ের কাছে এসে বলল—
— দোয়া করো, যেন সব কাজ ঠিকমতো করতে পারি।
মা ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বললেন—
— আল্লাহ তোকে অনেক বড় করুক, বাবা।
জিসান মায়ের হাত ধরে বলল—
— তোমাদের মুখে হাসি রাখাই তো আমার স্বপ্ন।
তারপর ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
গাড়িতে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল সে।
রাস্তার দুপাশে মানুষের ব্যস্ততা, গাড়ির হর্ন, দোকানপাট—সবকিছুই প্রতিদিনের মতো।
কিন্তু আজ তার মনটা কেমন যেন অস্থির।
কেন, সে নিজেও জানে না।
হয়তো কিছু কিছু গল্প শুরু হওয়ার আগে মন এমনই অকারণে অস্থির হয়ে ওঠে।
<!-- empty paragraph -->হিমু নিজের ঘরে বসে পড়ছিল। সামনে বই খোলা, কিন্তু মনোযোগ বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ ফোনে মায়ার কল এল।
— হ্যালো, মায়া!
— এই হিমু! আজ বিকেলে আমার সঙ্গে বের হবি?
— কোথায়?
— একটা কাজ আছে। তুই গেলে ভালো হয়।
— কী কাজ?
— আরে, আগে আয়! সব কথা ফোনে বলতে হবে?
হিমু হেসে বলল—
— আচ্ছা, কোথায় আসব?
— আমাদের বাসার সামনে। বিকেল চারটায়।
— ঠিক আছে। তবে বেশি ঘোরাঘুরি করাবি না!
মায়া হেসে বলল—
— হ্যাঁ, মহারানি! আপনার হুকুম মাথা পেতে নিলাম!
ফোন কেটে হিমু আবার বইয়ের দিকে তাকাল।
কিন্তু বইয়ের অক্ষরগুলো যেন আজ কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না।
তার মনে হঠাৎ সেই মাঠটার কথা পড়ল।
সেই অচেনা ছেলেটা কি আজও সেখানে আসবে?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই হিমু নিজেই চমকে উঠল।
— ধুর! আমি আবার এসব কী ভাবছি!
বইটা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল সে।
কিন্তু মনের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নগুলো কিছুতেই থামল না।
ছেলেটার নাম কী?
সে কোথায় থাকে?
আর কেনই বা তাকে আবার দেখতে ইচ্ছে করছে?
হিমু জানত না, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে তাকে আরও অপেক্ষা করতে হবে।
হিমু মায়ার সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে পড়ল।
আজ তার পরনে হালকা নীল রঙের সালোয়ার-কামিজ। লম্বা চুলগুলো বেণি করে রেখেছে।
মায়ার বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই বান্ধবী হাত ধরে টেনে বলল—
— চল, আজ তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব!
হিমু সন্দেহের চোখে তাকাল।
— আবার কী ফন্দি আঁটছিস?
মায়া হেসে বলল—
— এত প্রশ্ন করলে কিন্তু তোকে নিয়ে যাব না!
— আচ্ছা বাবা, চল!
দুজন হাঁটতে হাঁটতে একটা ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছাল।
সেখানে একটি ছোট্ট বইয়ের দোকান। দোকানের সামনে কয়েকজন তরুণ দাঁড়িয়ে গল্প করছে।
মায়া হঠাৎ থেমে গেল।
হিমু অবাক হয়ে বলল—
— কী হলো?
মায়া নিচু গলায় বলল—
— ওই যে, দেখ! ছেলেটা দেখতে বেশ সুন্দর না?
হিমু বিরক্ত হয়ে বলল—
— তুই কি সারাক্ষণ শুধু ছেলেদেরই দেখিস?
— হ্যাঁ! তাতে তোর কী?
হিমু মাথা নাড়িয়ে বলল—
— তোর চিকিৎসা দরকার!
দুজন হাসতে হাসতে সামনে এগিয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামল জিসান।
সে তার বন্ধুর জন্য একটি বই কিনতে এসেছে।
হাতে ফোন নিয়ে দোকানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার সামনে দিয়ে কয়েকজন মানুষ চলে গেল।
হিমুও তখন মায়ার সঙ্গে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটছিল।
দুজনের মাঝখানে ছিল কয়েকজন পথচারী, একটি রিকশা আর রাস্তার ব্যস্ততা।
জিসান একবার মাথা তুলে তাকাল।
দূরে একটি মেয়েকে দেখা গেল, নীল পোশাকে, লম্বা বেণি দুলিয়ে বান্ধবীর সঙ্গে হাঁটছে।
কিন্তু মুখটা দেখা গেল না।
জিসান আর দ্বিতীয়বার তাকাল না। ফোনে বন্ধুর মেসেজ এসেছে, সেটার উত্তর দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
অন্যদিকে হিমুও খেয়াল করেনি রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে।
সে তখন মায়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
একই জায়গায় থেকেও তাদের দেখা হলো না।
পরিচয় তো দূরের কথা!
জীবন কখনো কখনো মানুষকে একে অপরের এত কাছে নিয়ে আসে, অথচ পরিচয়ের দরজাটা বন্ধই রাখে
বাড়িতে ফিরে হিমু দেখল, নিলয় সোফায় বসে আছে।
তাকে দেখেই নিলয় বলল—
— কোথায় গিয়েছিলি, সুন্দরী?
হিমু জুতা খুলতে খুলতে বলল—
— তোর মাথায় এত প্রশ্ন কেন?
— কারণ, তোর জীবনটা আমার কাছে একটা রহস্য!
— তোর নিজের জীবনই একটা সার্কাস, আবার আমার রহস্য বুঝতে এসেছিস!
নিলয় হেসে উঠল।
— আচ্ছা, ঠিক আছে। আজকে আর জ্বালাব না।
হিমু অবাক হয়ে তাকাল।
— সত্যি?
— হ্যাঁ।
— তোর শরীর খারাপ?
নিলয় কুশন তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল।
— যা ভাগ!
হিমু হেসে নিজের ঘরে চলে গেল।
রাতে খাওয়া শেষ করে সে জানালার পাশে দাঁড়াল।
আকাশে চাঁদ উঠেছে। হালকা বাতাসে পর্দা দুলছে।
হিমু নিজের অজান্তেই ভাবল—
'জীবনে কি এমন কেউ আসবে, যার জন্য আমার মন এভাবে অকারণে অস্থির হবে?'
তারপর নিজেই হেসে মাথা নাড়ল।
— ধুর! আমি আবার কবি হয়ে যাচ্ছি!
ঠিক তখনই নিচ থেকে হালিমা বেগমের ডাক এল—
— হিমু! ঘুমাতে আয় মা!
হিমু জানালা বন্ধ করে বলল—
— আসছি, আম্মু!
সে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করল।
অন্যদিকে জিসানও নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল।
দুজনের রাত কাটল আলাদা দুটি বাড়িতে, আলাদা দুটি জগতে।
তাদের কেউ জানত না, ভবিষ্যতে একজন আরেকজনের জীবনের কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখনো তাদের পরিচয় হয়নি।
এখনো কেউ কাউকে চেনে না।
তবু সময় নিজের মতো করে তাদের গল্প এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
চলবে.....!! 💗