ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার ডাক্তার বাবু

পর্ব 3

লেখক: মাহিয়া ইসলাম হিমি

উপন্যাস: আমার ডাক্তার বাবু

✍️ পর্ব: ০৩

🖤 লেখিকা: মাহিয়া ইসলাম হিমি 🖤

🌷 সকাল ৮টা 🌷

— হিমুউউউ! এই হিমু! ওঠ বলছি! আর কত ঘুমাবি?

হালিমা বেগমের চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। কিন্তু যার জন্য এত চিৎকার, তার ঘুমের কোনো ব্যাঘাত ঘটল না। সে কাঁথা মুড়ি দিয়ে এমনভাবে ঘুমাচ্ছে, যেন পৃথিবীতে কোনো সমস্যা নেই।

হালিমা বেগম মেয়ের ঘরে ঢুকে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন।

— আল্লাহ! এই মেয়েকে নিয়ে আমি কোথায় যাই? সকাল আটটা বাজে, আর এখনো ঘুমাচ্ছে!

হিমু কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করে চোখ বন্ধ রেখেই বলল—

— আম্মু, তুমি না প্রতিদিন সকালে আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দাও!

— কী বললি?

— বললাম, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মা!

— আমার সঙ্গে ফাজলামি করিস? ওঠ, নিচে আয়। তোর নিলয় ভাই এসেছে।

নিলয় এসেছে শুনেই হিমু চোখ খুলল।

— নিলয় এসেছে? এত সকালে? ওর কি কোনো কাজকর্ম নেই?

হালিমা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন—

— তুই আগে বিছানা থেকে নাম। তারপর তোর ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করিস।

— আম্মু, আমি কি ঝগড়া করি? ও-ই তো আমাকে দেখলেই ঝগড়া শুরু করে!

— হ্যাঁ, সব দোষ নিলয়ের। তুই একদম ধোয়া তুলসীপাতা!

হিমু মিষ্টি করে হেসে বলল—

— এই তো আমার আম্মু! আমার মনের কথা বুঝতে পেরেছ!

হালিমা বেগম মাথায় হাত দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

হিমু আবার বালিশে মাথা রাখতেই দরজা ঠেলে রিমু ঢুকে পড়ল।

— আপু!

— কী হয়েছে?

— নিলয় ভাইয়া বলেছে, তুই নাকি ঘুমের মধ্যে বিয়ে করে ফেলেছিস!

হিমু ধড়মড় করে উঠে বসল।

— কীইই! কোন শয়তান বলেছে?

রিমু দাঁত বের করে হাসল।

— নিলয় ভাইয়া!

হিমু বিছানা থেকে নেমে দাঁত কটমট করে বলল—

— দাঁড়া! আজ ওর একদিন কী আমার একদিন!

রিমু হাসতে হাসতে ঘর থেকে পালিয়ে গেল।

হিমু দ্রুত ফ্রেশ হয়ে একটা সুন্দর পোশাক পরে চুল আঁচড়াতে লাগল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল সেই অচেনা ছেলেটার কথা।

মাঠে দেখা ছেলেটা।

কালো পোশাক পরা ছেলেটা।

যার মুখটা সে ঠিকমতো দেখতেই পারেনি!

হিমু চিরুনি থামিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল—

— আচ্ছা, ছেলেটা কি আজও মাঠে আসবে?

পরমুহূর্তেই নিজের কথায় নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল।

— ধুর! আমি কেন ওর জন্য অপেক্ষা করব? আমার কি আর কোনো কাজ নেই?

চিরুনিটা টেবিলে রেখে সে দ্রুত নিচে নেমে গেল।

কিন্তু মনের মধ্যে একটা ছোট্ট প্রশ্ন থেকেই গেল।

নিলয় সোফায় বসে ফোন দেখছিল। হিমুকে দেখেই মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল—

— ওহে ঘুমকুমারী! অবশেষে সূর্যের আলো দেখতে পেলে?

হিমু চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল—

— তুই কি সকালে ঘুম থেকে উঠেই মানুষের পেছনে লাগিস?

— মানুষ না, বিশেষ মানুষ!

— তোর মতো অদ্ভুত প্রাণীকে বিশেষ মানুষ বলা হয় নাকি?

নিলয় বুকের ওপর হাত রেখে অভিনয় করে বলল—

— হায় আল্লাহ! নিজের বোনের মুখে এমন কথা শুনতে হলো! কোথায় আমার মা? কোথায় আমার বিচার?

পাশ থেকে রিমু বলে উঠল—

— বিচার হবে! তবে আগে তোমার অপরাধের তালিকা দিতে হবে।

নিলয় চোখ বড় করে বলল—

— এই বাড়িতে আমার কোনো সম্মান নেই!

হিমু পরোটার টুকরো মুখে দিয়ে বলল—

— সম্মান অর্জন করতে হয়, ভাইজান। তোর মতো শুধু বকবক করলে হয় না!

— আচ্ছা, তোর এত সাহস কোথা থেকে আসে বল তো?

— আম্মুর কাছ থেকে!

হালিমা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বললেন—

— আমার নাম নিয়ে আবার কী হচ্ছে?

নিলয় সঙ্গে সঙ্গে বলল—

— আম্মু, তোমার মেয়ে আমাকে সকাল থেকে মানসিক নির্যাতন করছে!

হিমু অবাক হওয়ার অভিনয় করে বলল—

— আম্মু, দেখো! নিজের অপরাধ ঢাকতে এখন আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছে!

হালিমা বেগম হেসে বললেন—

— তোরা দুজন একটু চুপ করে নাশতা করবি?

দুজন একসঙ্গে বলল—

— ও আগে শুরু করেছে!

এক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ।

তারপর রিমু এমনভাবে হেসে উঠল যে তার হাতের গ্লাস থেকে পানি পড়ে গেল।

হালিমা বেগম মাথা নাড়িয়ে বললেন—

— আল্লাহ জানেন, তোদের বড় করতে গিয়ে আমার কত পরীক্ষা দিতে হচ্ছে!

নিলয় হিমুর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—

— তোর জন্যই আমার এত বদনাম!

হিমু মুচকি হেসে উত্তর দিল—

— বদনাম না, এটা তোর আসল পরিচয়!

নিলয় মুখ বাঁকিয়ে নিজের খাবারে মন দিল।

কিছুক্ষণ পর হিমু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল—

— আচ্ছা, তোর ভাই কি আজ আসবে?

নিলয় খাবার থামিয়ে তাকাল।

— কোন ভাই?

— তোর ছোট ভাই জিসান!

— ওহ্! জিসান! হ্যাঁ, আসার কথা তো। কেন?

হিমু একটু থমকে গেল।

— না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম।

নিলয় চোখ ছোট করে বলল—

— কেন? আমার ভাইকে নিয়ে এত আগ্রহ কেন? প্রেমে পড়ে গেলি নাকি?

হিমু প্রায় পানিতে দম আটকে ফেলল।

— কীইই! তোর ভাইকে আমি চিনিই না, তার প্রেমে পড়ব কীভাবে?

নিলয় হেসে বলল—

— প্রেমে পড়ার জন্য আগে চেনা লাগে নাকি? আজকাল তো ছবি দেখেই মানুষ বিয়ে করে ফেলে!

হিমু টেবিল থেকে একটা টিস্যু নিয়ে তার দিকে ছুড়ে মারল।

— তুই একদম চুপ কর!

নিলয় টিস্যুটা ধরে হেসে বলল—

— আচ্ছা, আচ্ছা! রাগ করিস না। তবে একটা কথা বলি, আমার ভাইটা কিন্তু দেখতে বেশ ভালো!

হিমু ভ্রু কুঁচকে বলল—

— তোর মতো হলে তো আর দেখার দরকার নেই!

— এই মেয়ে! আমার চেহারা নিয়ে কথা বলবি না!

— কেন? চেহারাটা কি তোর নিজের তৈরি?

রিমু আবারও হেসে উঠল।

নিলয় বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল।

— আমি যাচ্ছি। তোদের সঙ্গে কথা বললে আমার মাথার সব বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যাবে!

হিমু পেছন থেকে চিৎকার করে বলল—

— আগে বুদ্ধি থাকলে তো নষ্ট হবে!

নিলয় পেছন ফিরে আঙুল উঁচিয়ে বলল—

— হিসাব থাকবে, হিমু! সব হিসাব থাকবে!

হিমু হেসে হাত নাড়ল।

— যাও, যাও! হিসাবের খাতা নিয়ে বসে থেকো!

নিলয় চলে যেতেই হিমু হাসতে হাসতে নিজের ঘরের দিকে গেল।

কিন্তু সে জানত না, আজকের দিনটা তার জন্য একটা অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে অপেক্ষা করছে।

আর সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একজন, যার নাম সে ইতিমধ্যে শুনেছে।

জিসান।

তবু নামের সঙ্গে মুখটার কোনো মিল সে এখনো খুঁজে পায়নি।

জিসান নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিল। টেবিলের ওপর বই, কয়েকটা কাগজ আর একটা কফির মগ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

তার পরনে সাদা টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে হালকা ক্লান্তি।

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে তার মা ঢুকলেন।

— জিসান, বাবা!

জিসান ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে বলল—

— জি, আম্মু?

— তোর বড় ভাই ফোন করেছিল। বলেছে, আজ বিকেলে ওদের বাসায় যেতে।

জিসান ভ্রু কুঁচকে বলল—

— ওদের বাসায়? কেন?

— তোর খালামণিদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। অনেক বছর পর সবাই একসঙ্গে হয়েছে। তুই গেলে ভালো লাগবে ওদের।

জিসান একটু ভেবে বলল—

— আচ্ছা, যাব।

মা ছেলের পাশে বসে বললেন—

— আর শোন, তোর মামাতো বোন হিমুর সঙ্গে দেখা করিস। ছোটবেলায় তোরা একসঙ্গে কত খেলেছিস!

জিসান অবাক হয়ে বলল—

— হিমু? আমার আবার কোন মামাতো বোন?

মা হেসে বললেন—

— আরে বাবা, তোর খালামণির মেয়ে! তুই ছোট থাকতে ওদের বাড়িতে কতবার গিয়েছিস। এখন হয়তো মনে নেই।

জিসান মাথা চুলকে বলল—

— সত্যি বলতে, আমার কিছুই মনে নেই, আম্মু!

— মনে না থাকলে সমস্যা কী? আবার পরিচয় হবে। মেয়েটা নাকি বেশ দুষ্টু হয়েছে।

জিসান মুচকি হেসে বলল—

— তাহলে তো আমার সঙ্গে ভালোই জমবে!

মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—

— তুই শুধু দুষ্টুমি করিস না যেন!

— আম্মু, আমি কি আর ছোট আছি?

— তোর মতো ছেলেকে দেখলে আমার এখনো ছোটই মনে হয়।

জিসান মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বলল—

— আচ্ছা, আচ্ছা! বিকেলে যাব। এবার খুশি?

মা হেসে ছেলের কপালে চুমু দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

জিসান আবার ল্যাপটপের দিকে তাকাল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তার মনে পড়ল, গতকাল নিলয় ফোনে একটা মেয়ের কথা বলেছিল।

নামটা কী যেন?

হিমু!

জিসান নিজের মনেই বলল—

— হিমু! নামটা তো সুন্দর!

তারপরই মাথা ঝাঁকিয়ে কাজে মন দিল।

— ধুর! একটা নাম শুনেই এত ভাবার কী আছে?

সে জানত না, এই নামের মেয়েটার সঙ্গেই তার জীবনের গল্পটা ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাচ্ছে।

হিমু নিজের ঘরে বসে ফোনে মায়ার সঙ্গে কথা বলছিল।

— এই মায়া, তুই কাল আমাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলি বল তো? এত হাঁটাহাঁটি করালি যে আমার পা ব্যথা হয়ে গেছে!

ওপাশ থেকে মায়া হেসে বলল—

— আহা! একটু হাঁটলেই তোর পা ব্যথা হয়ে যায়? তুই তো একদিন বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি গিয়েই অসুস্থ হয়ে যাবি!

হিমু চোখ বড় করে বলল—

— এই! আমার বিয়ে নিয়ে কথা বলবি না!

— কেন? তোর কি বিয়ে করার ইচ্ছা নেই?

— আছে। কিন্তু তোর মতো পাগলির সঙ্গে এসব আলোচনা করার ইচ্ছা নেই!

মায়া হেসে বলল—

— আচ্ছা, বাদ দে। একটা কথা বল তো, সেই ছেলেটার কথা কি এখনো মনে পড়ে?

হিমুর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

— আবার সেই কথা?

— হ্যাঁ, সেই কথা! বল, মনে পড়ে?

— না!

— মিথ্যা বলছিস!

— তুই কীভাবে বুঝলি?

— কারণ, তোর গলার স্বর বদলে গেছে!

হিমু নিজের গলায় হাত দিয়ে বলল—

— আমার গলার স্বর আবার বদলাল কখন?

মায়া হাসতে হাসতে বলল—

— এই যে এখন তুই রেগে যাচ্ছিস, এটাই প্রমাণ!

হিমু বালিশে মুখ গুঁজে বলল—

— আল্লাহ! এই মেয়ের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও!

মায়া এবার একটু শান্ত হয়ে বলল—

— আচ্ছা, সত্যি করে বল তো, ছেলেটাকে আবার দেখতে ইচ্ছা করে?

হিমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল—

— জানি না।

— কী জানিস না?

— জানি না, মায়া! আমি ছেলেটাকে চিনিই না। ওর নাম জানি না, কোথায় থাকে জানি না। শুধু একবার দেখেছি। অথচ কেন জানি, মাঝে মাঝে ওর কথা মনে পড়ে।

ওপাশ থেকে মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল—

— হিমু, কাউকে ভালো লাগার জন্য সবসময় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটা ছোট্ট মুহূর্তও মনে দাগ কেটে যায়।

হিমু জানালার বাইরে তাকাল।

— কিন্তু একটা মুহূর্ত দিয়ে তো কাউকে চেনা যায় না!

— একদম ঠিক। তাই বলে মনের অনুভূতিটাও মিথ্যা হয়ে যায় না।

হিমু আর কিছু বলল না।

মায়া আবার বলল—

— শোন, আজ বিকেলে তোর কোথাও যাওয়ার প্ল্যান আছে?

— না। কেন?

— তাহলে আমার সঙ্গে একটু বের হবি?

— কোথায়?

— সেটা গেলে বুঝবি!

হিমু হেসে বলল—

— তুই একদিন আমাকে কোনো বিপদে ফেলবি, দেখিস!

— বিপদে ফেলব না, বান্ধবী! তোর জীবনে একটু রোমাঞ্চ নিয়ে আসব!

— তোর রোমাঞ্চ তুই নিজের কাছে রাখ!

দুজনেই হেসে উঠল।

ফোন রাখার পর হিমু বিছানায় শুয়ে পড়ল।

তার চোখের সামনে আবারও ভেসে উঠল সেই অচেনা মুখের পাশের অংশটুকু।

হিমু বালিশ জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করল—

— একবার যদি আবার দেখা হতো!

কথাটা বলেই সে থেমে গেল।

তারপর নিজের মুখে বালিশ চেপে ধরল।

— না, না! আমি এসব কী বলছি!

কিন্তু মনের ভেতরের ছোট্ট ইচ্ছেটাকে কি এত সহজে চুপ করানো যায়!

জিসান তৈরি হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করছিল।

তার পরনে কালো শার্ট আর নীল জিনস। হাতে ঘড়ি, কাঁধে একটা ছোট ব্যাগ।

ঠিক তখনই নিলয়ের ফোন এল।

জিসান কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নিলয় বলল—

— এই, কোথায় তুই?

— বাসায়। কেন?

— বিকেলে আসছিস তো?

— হ্যাঁ, আসব। তবে একটা কথা বলি, আমি কিন্তু তোর কোনো ফাইফরমাশ খাটতে আসছি না!

নিলয় হেসে বলল—

— আরে বাবা, তোকে দিয়ে কাজ করাব কেন? তুই আমার আদরের ছোট ভাই!

জিসান সন্দেহের চোখে ফোনের দিকে তাকাল।

— ভাইয়া, তুমি ভালো আছ তো?

— কেন?

— তুমি আমার সঙ্গে এত ভালোভাবে কথা বলছ কেন? নিশ্চয়ই কোনো মতলব আছে!

নিলয় হেসে উঠল।

— তোর মাথায় শুধু মতলব ঘোরে কেন?

— কারণ, তোমাকে আমি চিনি!

— আচ্ছা, ঠিক আছে। বিকেলে আসিস। আর শোন, হিমুর সঙ্গে দেখা করবি।

জিসান ভ্রু কুঁচকে বলল—

— হিমু কে?

— আরে, আমার খালামণির মেয়ে! তোকে তো বললাম!

— ওহ্! আচ্ছা, দেখা হবে।

নিলয় একটু থেমে বলল—

— তবে সাবধান! মেয়েটা কিন্তু সাংঘাতিক দুষ্টু। তোর মতো শান্ত ছেলেকে একদম নাস্তানাবুদ করে দেবে!

জিসান হেসে বলল—

— আমাকে নাস্তানাবুদ করা এত সহজ না, ভাইজান!

— দেখা যাবে!

— ঠিক আছে, বিকেলে দেখা হচ্ছে।

কল কেটে জিসান ফোনটা পকেটে রাখল।

তারপর গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

গাড়িতে বসে ইঞ্জিন চালু করতেই ফোনে একটা মেসেজ এল।

বন্ধু লিখেছে—

জিসান মেসেজের উত্তর দিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করল।

আজ তার গন্তব্য নিলয়দের বাড়ি।

কিন্তু সেই বাড়িতে যে একজন মেয়ে আছে, যার মনে ইতিমধ্যে তার জন্য অজানা কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি।

হিমু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছিল।

আজ তার পরনে সাদা আর গোলাপি রঙের সুন্দর একটা সালোয়ার-কামিজ। লম্বা চুলগুলো খোলা, কপালে ছোট্ট একটা টিপ।

রিমু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আপুর দিকে তাকিয়ে বলল—

— আপু!

— কী?

— আজ এত সাজছিস কেন?

হিমু চিরুনি থামিয়ে বলল—

— আমি কি সাজতে পারি না?

— পারিস। কিন্তু তুই তো সাধারণত সাজতে গেলেই বিরক্ত হয়ে যাস!

হিমু চোখ পাকিয়ে বলল—

— তোর এত কথা কেন? যা, নিজের পড়া পড়!

রিমু ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে পড়ল।

— আচ্ছা, একটা কথা বলবি?

— না!

— আমি তো এখনো প্রশ্নই করিনি!

— তবু উত্তর না!

রিমু হেসে বলল—

— তোর কি কাউকে ভালো লেগেছে?

হিমুর হাত থেকে চিরুনিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

— কীইই! তুই এসব কোথা থেকে শিখেছিস?

— টিভি থেকে!

— টিভি বন্ধ করে দেব!

রিমু মুখ বাঁকিয়ে বলল—

— আচ্ছা, বুঝেছি! নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে!

হিমু বোনের কপালে টোকা দিয়ে বলল—

— তোর মাথায় শুধু গোয়েন্দাগিরি চলে কেন?

রিমু হেসে পালিয়ে গেল।

হিমু আয়নায় নিজের দিকে তাকাল।

তারপর নিচু গলায় বলল—

— কাউকে ভালো লেগেছে নাকি?

একটু ভেবে নিজেই মাথা নাড়ল।

— না! একবার দেখেছি, ব্যস! এটাকে ভালো লাগা বলে না।

কথাটা বললেও তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি থেকে গেল।

ঠিক তখনই নিচ থেকে নিলয়ের ডাক এল—

— হিমুউউউ! নিচে আয়!

হিমু বিরক্ত হয়ে বলল—

— কী হয়েছে আবার?

— নিচে আয়, তারপর বলছি!

হিমু দ্রুত নিচে নেমে এল।

সোফায় বসে নিলয় ফোন দেখছিল।

হিমু সামনে দাঁড়িয়ে বলল—

— বল, কী হয়েছে?

নিলয় ফোন থেকে চোখ তুলে বলল—

— আজ আমার ছোট ভাই আসবে।

হিমু স্বাভাবিকভাবে বলল—

— আচ্ছা, তো?

— তোকে ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।

— পরিচয় করিয়ে দিবি তো করাবি। এতে এত চিৎকার করার কী আছে?

নিলয় মুচকি হেসে বলল—

— না, মানে তোকে আগে থেকেই সাবধান করে দিচ্ছি। ও কিন্তু খুব ভদ্র ছেলে। তুই আবার তোর মতো করে ওকে জ্বালাস না!

হিমু অবাক হয়ে বলল—

— আমি মানুষকে জ্বালাই?

নিলয় মাথা নেড়ে বলল—

— না, না! তুই তো ফেরেশতা! তোর মতো নিষ্পাপ মেয়ে পৃথিবীতে দ্বিতীয়টা নেই!

হিমু হাত বাড়িয়ে নিলয়ের মাথায় টোকা দিল।

— এই নে, তোর ফেরেশতার আশীর্বাদ!

নিলয় মাথা চেপে বলল—

— অসভ্য মেয়ে!

হিমু হেসে নিজের ঘরে চলে গেল।

কিন্তু ঘরে ঢুকতেই তার মনে হলো, বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।

নিলয়ের ছোট ভাই আজ আসবে।

জিসান!

নামটা মনে পড়তেই সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর নিজেকে বোঝাল—

— আরে, জিসান তো একটা সাধারণ নাম! পৃথিবীতে কত জিসান আছে!

কিন্তু ভাগ্য যে তার জন্য অন্যরকম একটা গল্প লিখে রেখেছে, তা কি সে জানত

জিসানের গাড়ি তখন যানজটে আটকে আছে।

সে বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল।

— উফ! এই শহরের রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হওয়াটাই একটা অপরাধ!

সামনের গাড়ি একটু এগোতেই সেও গাড়ি এগিয়ে নিল।

ঠিক তখন রাস্তার পাশ দিয়ে একটা ছোট্ট বাচ্চা দৌড়ে রাস্তা পার হতে গেল।

জিসান দ্রুত ব্রেক করল।

গাড়ি থেমে গেল বাচ্চাটার একদম সামনে।

— এই যে! সাবধানে!

জিসান গাড়ি থেকে নেমে বাচ্চাটার কাছে গেল।

— কী হয়েছে? এভাবে রাস্তা পার হচ্ছ কেন?

বাচ্চাটা ভয়ে মাথা নিচু করে বলল—

— আমার বলটা ওই পাশে চলে গেছে।

জিসান বলটা তুলে তার হাতে দিয়ে বলল—

— বলের জন্য নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হয় না। বুঝেছ?

বাচ্চাটা মাথা নাড়ল।

জিসান তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—

— এবার যাও। আর সাবধানে রাস্তা পার হবে।

বাচ্চাটা হাসিমুখে চলে গেল।

জিসান গাড়িতে উঠে আবার রওনা হলো।

তার মুখে কোনো বিরক্তি নেই। বরং অদ্ভুত একটা শান্তি।

সে হয়তো একটু রাগী, একটু দুষ্টু, কিন্তু মানুষের বিপদ দেখলে সাহায্য করতে কখনো পিছপা হয় না।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামল নিলয়দের বাড়ির সামনে।

জিসান গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটার দিকে তাকাল।

তারপর ফোন বের করে নিলয়কে কল দিল।

— ভাইয়া, আমি এসে গেছি।

ওপাশ থেকে নিলয় বলল—

— তাহলে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে আয়!

জিসান হেসে বলল—

— আসছি, মহারাজ!

ফোন রেখে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

আর বাড়ির ভেতরে তখন হিমু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে জানত না, কয়েক মুহূর্ত পরেই তার জীবনের একটা অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে।

নিলয় দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল—

— এই যে! আমার ছোট ভাই এসে গেছে!

জিসান ঘরে ঢুকতেই নিলয় উঠে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

— কিরে! এত দেরি করলি কেন?

জিসান বিরক্ত হয়ে বলল—

— রাস্তায় যানজট ছিল, ভাইয়া! আমি কি আকাশ দিয়ে উড়ে আসব?

— তোর জন্য তো একটা হেলিকপ্টার কেনা উচিত!

— আগে নিজের জন্য একটা বুদ্ধি কিনে নাও!

নিলয় জিসানের মাথায় হালকা চাপড় দিয়ে বলল—

— বেশি কথা বলিস না!

জিসান হেসে সোফায় বসল।

ঠিক তখন হালিমা বেগম ঘরে এসে বললেন—

— আরে, জিসান এসেছ বাবা? কেমন আছ?

জিসান উঠে সালাম দিয়ে বলল—

— আসসালামু আলাইকুম, খালামণি। ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

হালিমা বেগম খুশি হয়ে বললেন—

— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। কত বড় হয়ে গেছিস! শেষ যখন দেখেছি, তখন তো ছোট্ট একটা ছেলে ছিলি!

জিসান হেসে বলল—

— এখনো খুব একটা বড় হইনি, খালামণি!

— তা তো বটেই! আয়, বস। তোর খালুকে ডাকছি।

জিসান আবার সোফায় বসল।

নিলয় তার পাশে বসে কানে কানে বলল—

— এই যে, তোর সেই মামাতো বোনটা কোথায় জানিস?

জিসান মাথা নাড়িয়ে বলল—

— না তো!

— হিমু! আমার জানের দুশমন!

জিসান হেসে বলল—

— নিজের বোনকে জানের দুশমন বলছ?

— তুই চিনিস না ওকে! একটু পরেই বুঝবি!

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ হলো।

হিমু রিমুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে নিচে নামছিল।

— রিমু, আমি কিন্তু তোকে বলে দিলাম, আমার ফোনে হাত দিবি না!

— আপু, আমি তো শুধু দেখতে চেয়েছিলাম!

— তোর দেখার জন্য আমার ফোন কেন?

— কারণ, তুই আমার আপু!

— এই যুক্তি নিয়ে তুই একদিন অনেক বড় উকিল হবি!

দুজন কথা বলতে বলতে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে এল।

নিলয় হিমুকে দেখেই বলল—

— এই যে, হিমু! এদিকে আয়। তোকে একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।

হিমু অন্যমনস্কভাবে বলল—

— কে আবার?

— আমার ছোট ভাই!

হিমু এবার সোফার দিকে তাকাল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই—

তার পা যেন মেঝেতে আটকে গেল।

সোফায় বসে থাকা ছেলেটার পরনে কালো শার্ট।

চুলগুলো সামান্য এলোমেলো।

মুখে হালকা হাসি।

হিমুর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

এই মুখ!

এই ছেলেটাকেই তো সে দেখেছিল!

মাঠে!

সেদিন দূর থেকে যার মুখের পাশটুকু দেখেছিল, আজ সেই ছেলেটাই তার সামনে বসে আছে!

হিমু অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।

অন্যদিকে জিসানও সিঁড়ির দিক থেকে আসা মেয়েটার দিকে তাকাল।

সাদা-গোলাপি পোশাক, লম্বা চুল, কপালে ছোট্ট টিপ।

মেয়েটাকে সে আগে দেখেনি।

তবু কেন জানি, তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

নিলয় হেসে বলল—

— এই যে, পরিচয় করিয়ে দিই। ও আমার ছোট ভাই জিসান। আর জিসান, এই হলো আমার পাগলি বোন হিমু!

হিমু চমকে উঠল।

জিসান!

এই সেই জিসান, যার নাম সে গতকাল শুনেছিল!

আর এই সেই ছেলে, যাকে সে কয়েক দিন ধরে মনে মনে খুঁজছে!

জিসান উঠে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল—

— হাই! আমি জিসান।

হিমু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেকে সামলে নিল।

তারপর মুখে স্বাভাবিক হাসি এনে বলল—

— হ্যালো! আমি হিমু।

জিসান হেসে বলল—

— নামটা সুন্দর।

কথাটা শুনে হিমুর বুকের ভেতর আবারও কেমন যেন হলো।

সে চোখ নামিয়ে বলল—

— ধন্যবাদ।

পাশ থেকে নিলয় দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—

— আরে! তোরা এমনভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আগে কখনো মানুষ দেখিসনি নাকি?

হিমু তাড়াতাড়ি বলল—

— না তো!

জিসানও হেসে বলল—

— ভাইয়া, তুমি একটু চুপ করবে?

নিলয় চোখ বড় করে বলল—

— কী! আমার নিজের বাড়িতে আমাকে চুপ থাকতে বলছিস?

জিসান নির্বিকারভাবে বলল—

— হ্যাঁ। পরিবেশটা সুন্দর ছিল, তুমি এসে নষ্ট করে দিলে!

হিমু মুখ চেপে হাসল।

নিলয় দুজনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল—

— বাহ! পরিচয়ের প্রথম দিনেই দুজন মিলে আমার বিরুদ্ধে জোট বাঁধছিস!

হিমু হেসে বলল—

— ভাইয়া, তুমি একটু চুপ করলেই তো সব সুন্দর থাকে!

জিসান এবার হিমুর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।

হিমুও হেসে উঠল।

আর সেই হাসির মাঝেই দুজনের চোখ আবার একবার মিলিত হলো।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশের শব্দগুলো যেন হিমুর কানে পৌঁছাল না।

সে মনে মনে বলল—

'তাহলে তুমি জিসান! এত দিন যার নাম জানতাম না, আজ তার নামটাও জেনে গেলাম!'

অন্যদিকে জিসানও মনে মনে ভাবল—

'মেয়েটা তো বেশ মজার!'

কিন্তু তাদের কেউই জানত না, এই ছোট্ট পরিচয়ের আড়ালে ভবিষ্যতে কত হাসি, অভিমান, ঝগড়া আর ভালোবাসা অপেক্ষা করছে!

হিমু ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল।

তার মনটা আজ অদ্ভুত রকম ভালো।

যে ছেলেটাকে সে এত দিন অচেনা ভেবেছে, আজ তার নাম জেনে গেছে।

শুধু নাম নয়, তার সঙ্গে কথাও হয়েছে!

হিমু নিজের মনেই হাসল।

— হিমু, তুই কি সত্যিই পাগল হয়ে যাচ্ছিস?

পেছন থেকে রিমুর কণ্ঠ ভেসে এল—

— আপু, কার সঙ্গে কথা বলছিস?

হিমু চমকে পেছনে তাকাল।

— তুই এখানে কী করছিস?

রিমু হেসে বলল—

— তোকে খুঁজতে এসেছি। তুই একা একা ছাদে এসে হাসছিস কেন?

— আমি হাসব না?

— হাসবি। তবে কারণটা জানতে হবে!

হিমু বোনের গাল টেনে বলল—

— তুই না একদম গোয়েন্দা!

রিমু চোখ টিপে বলল—

— কিছু একটা তো আছেই!

হিমু আর কিছু না বলে নিচে নামতে শুরু করল।

কিন্তু সিঁড়ির কাছে এসে সে থেমে গেল।

নিচে বসার ঘরে জিসানের হাসির শব্দ ভেসে আসছে।

হিমু কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে শুনল।

তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

সে জানত না, এই হাসিটাই একদিন তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠবে।

জিসান সোফায় বসে নিলয়ের সঙ্গে গল্প করছিল।

নিলয় বলল—

— তা, ডাক্তার সাহেব! কবে আমাদের বাড়িতে চেম্বার খুলছিস?

জিসান হেসে বলল—

— তোমার মাথার চিকিৎসা দিয়ে শুরু করব!

— এই ছেলে!

— সত্যি বলছি, ভাইয়া। তোমার জন্য আলাদা একটা বিভাগ খুলতে হবে।

নিলয় কুশন তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল।

জিসান সেটা ধরে হেসে ফেলল।

ঠিক তখন হিমু হাতে এক গ্লাস পানি নিয়ে ঘরে ঢুকল।

জিসানের সামনে পানি রাখতে গিয়ে তার হাত থেকে গ্লাসটা সামান্য কেঁপে উঠল।

জিসান খেয়াল করে বলল—

— সাবধানে! পড়ে গেলে তো ভিজে যাব!

হিমু দ্রুত গ্লাসটা টেবিলে রেখে বলল—

— আমি ঠিক আছি!

জিসান মুচকি হেসে বলল—

— আমি তো শুধু সাবধান করলাম।

হিমু একটু বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল—

— আপনি কি সবাইকে এত কথা বলেন?

জিসান ভ্রু উঁচু করল।

— আপনি?

হিমু থমকে গেল।

তারপর বলল—

— মানে, তুমি!

জিসান হেসে বলল—

— ওহ্! বুঝেছি। আপনি থেকে তুমি হতে এত তাড়াতাড়ি?

হিমু লজ্জা লুকিয়ে বলল—

— আপনি চাইলে আবার আপনি বলতে পারি!

জিসান হেসে মাথা নাড়ল।

— না, থাক। তুমি বললেই হবে।

পাশ থেকে নিলয় চিৎকার করে উঠল—

— এই যে! তোদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছি বলে এত গল্প করতে হবে নাকি? আমার সঙ্গে তো কেউ এত কথা বলে না!

হিমু সঙ্গে সঙ্গে বলল—

— তোমার সঙ্গে কথা বলার মতো ধৈর্য কারও নেই!

জিসান হেসে বলল—

— কথাটা কিন্তু ঠিক বলেছে!

নিলয় দুজনের দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত দিল।

— আল্লাহ! আজকেই আমার বিরুদ্ধে দুজনের জোট হয়ে গেল!

হিমু আর জিসান একসঙ্গে হেসে উঠল।

সেই হাসির শব্দে বাড়িটা আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

কিন্তু হিমুর মনে তখন অন্যরকম একটা অনুভূতি।

জিসানের সঙ্গে কথা বলাটা এত সহজ কেন?

কেন তার সামনে দাঁড়ালে অকারণে লজ্জা লাগে?

কেন তার হাসিটা দেখলে নিজের অজান্তেই হাসি চলে আসে?

হিমু নিজেকে বোঝাল—

'না! এসব কিছু না। ছেলেটা ভালো, তাই হয়তো ওর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে।'

অন্যদিকে জিসানও মাঝে মাঝে হিমুর দিকে তাকাচ্ছিল।

মেয়েটা কখনো হাসছে, কখনো নিলয়ের সঙ্গে ঝগড়া করছে, আবার কখনো ছোট বোনকে বকছে।

জিসানের মনে হলো, মেয়েটা একদম আলাদা।

শান্ত হয়ে বসে থাকার ক্ষমতা তার নেই।

তবু তার এই চঞ্চলতা দেখতে খারাপ লাগছে না।

বরং ভালোই লাগছে।

কিন্তু কেন ভালো লাগছে, সেই প্রশ্নের উত্তর জিসানের কাছেও নেই।

রাতের খাবার শেষ করে হিমু নিজের ঘরে চলে এসেছে।

রিমু বিছানায় শুয়ে ফোন দেখছে।

হিমু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

হঠাৎ ফোনে মেসেজ এল।

মায়া: এই হিমু! কী খবর? আজ সেই ছেলেটাকে দেখেছিস?

হিমুর চোখ বড় হয়ে গেল।

সে দ্রুত লিখল—

হিমু: দেখেছি!

মায়া: কীইই! সত্যি? কোথায়?

হিমু: আমাদের বাড়িতে!

মায়া: মানে? 😳

হিমু: আরে, সে নিলয়ের বড় ভাই!

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মায়ার উত্তর এল।

মায়া: হায় আল্লাহ! তাহলে তো তোর কপাল খুলে গেছে!

হিমু: চুপ কর! কী সব বলছিস!

মায়া: নাম কী?

হিমু: জিসান।

মায়া: বাহ! নামটাও সুন্দর! এবার বল, কথা হয়েছে?

হিমু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিখল—

হিমু: হ্যাঁ। কথা হয়েছে।

মায়া: কেমন লেগেছে?

হিমু ঠোঁট কামড়ে হাসল।

তারপর লিখল—

হিমু: জানি না রে। ছেলেটা ভালো।

মায়া: শুধু ভালো?

হিমু: আর কিছু না!

মায়া: ঠিক আছে, আমি কিছু বললাম না। তবে তোর হাসিটা আমি ফোনের এপার থেকেও দেখতে পাচ্ছি!

হিমু তাড়াতাড়ি ফোনটা বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেলল।

রিমু পাশ ফিরে বলল—

— আপু, আবার কার সঙ্গে কথা বলছিস?

— কারও সঙ্গে না!

— তাহলে ফোন লুকালি কেন?

হিমু বালিশ তুলে বোনের দিকে তাকাল।

— তোর ঘুম পাচ্ছে না?

রিমু হাসতে হাসতে বলল—

— পাচ্ছে। কিন্তু তোর রহস্যের সমাধান না করে ঘুমাব না!

হিমু বালিশ ছুড়ে মারল।

— ঘুমা, গোয়েন্দা!

রিমু হাসতে হাসতে বালিশটা জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করল।

হিমু আবার ফোন হাতে নিল।

জিসানের নামটা মনে পড়তেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সে ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে।

হিমু আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—

'জিসান, তুমি হয়তো জানোও না, তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকেই তোমার কথা আমার মনে পড়ে। আজ তোমার সঙ্গে পরিচয় হলো। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছে, এই পরিচয়টা শুধু পরিচয়েই থেমে থাকবে না।'

কথাটা ভাবতেই তার গাল লাল হয়ে উঠল।

সে দ্রুত পর্দা টেনে দিল।

— ধুর! আমি আবার কী সব ভাবছি!

কিন্তু মনকে কি এত সহজে বোঝানো যায়?

জিসান বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ফোন দেখছিল।

নিলয়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকেই তার মাথায় হিমুর কথাগুলো ঘুরছিল।

মেয়েটার চোখে অদ্ভুত একটা চঞ্চলতা।

কথায় কথায় ঝগড়া করে।

আবার একটু পরেই এমনভাবে হাসে, যেন পৃথিবীর সব আনন্দ তার কাছে জমা আছে।

জিসান নিজের মনেই হেসে বলল—

— মেয়েটা তো একদম পাগলি!

ঠিক তখনই নিলয়ের মেসেজ এল।

নিলয়: কিরে, আমার বোনকে কেমন লাগল?

জিসান লিখল—

জিসান: তোর বোন তোর মতোই পাগলি!

নিলয়: এই! আমার বোনকে পাগলি বলবি না!

জিসান: তাহলে তুই কেন আমাকে সারাক্ষণ পাগল বলিস?

নিলয়: আমি বড় ভাই!

জিসান: আর আমি দুর্ভাগা ছোট ভাই!

নিলয়: দাঁড়া, তোকে পরে দেখাচ্ছি!

জিসান হেসে ফোনটা পাশে রেখে দিল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবার ফোন হাতে নিল।

তার মনে পড়ল, হিমু যখন প্রথম তাকে দেখেছিল, তখন মেয়েটার চোখে যেন অদ্ভুত একটা চমক ছিল।

কেন?

সে কি আগে থেকেই তাকে চিনত?

জিসান কিছুক্ষণ ভেবে নিজেই মাথা নাড়ল।

— অসম্ভব! আগে কখনো তো দেখিনি!

<!-- empty paragraph -->

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন