উপন্যাস: আমার ডাক্তার বাবু
✍️ পর্ব: ০৬
🖤 লেখিকা: মাহিয়া ইসলাম হিমি 🖤
রাত ৮টা ১৫ মিনিট |
— উফ্! এই জিসান নামটাই আমার জীবনে যত ঝামেলা নিয়ে এসেছে!
কথাটা বলে হিমু বালিশটা পাশে ছুড়ে মারল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই আবার ফোনটা হাতে তুলে নিল।
অপরিচিত নম্বরটার মেসেজগুলো বারবার পড়তে লাগল।
জিসানকে নিয়ে বেশি কৌতূহলী হয়ো না, হিমু। সব প্রশ্নের উত্তর জানা ভালো নয়।
হিমু ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করল—
হিমু: — হুহ্! আমি কি ভয় পেয়েছি নাকি? সামনে আসুক, এমন প্রশ্ন করব যে নিজের নামও ভুলে যাবে!
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
— আপু, আসব?
হিমু ফোনটা বালিশের নিচে রেখে বলল—
— আয়, রিমু!
এগারো বছরের রিমু দৌড়ে ঘরে ঢুকে বিছানায় উঠে বসল।
রিমু: — আপু, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
হিমু: — কারও সঙ্গে না তো!
রিমু: — তাহলে একা একা এত কথা বলছ কেন?
হিমু চোখ ছোট করে তাকাল।
হিমু: — তুই কি আমার গোয়েন্দা নাকি?
রিমু দাঁত বের করে হেসে বলল—
রিমু: — না, আমি তোমার ছোট বোন। তবে চাইলে গোয়েন্দাও হতে পারি!
হিমু বোনের গাল টেনে বলল—
হিমু: — আগে ক্লাসের পড়া শেষ কর, তারপর গোয়েন্দাগিরি করিস!
রিমু মুখ ফুলিয়ে বলল—
রিমু: — তুমি সব সময় আমাকে পড়তে বলো। আর নিজে ফোন নিয়ে বসে থাকো!
হিমু: — এই মেয়ে! আমার ফোনের সঙ্গে তোর পড়ার কী সম্পর্ক?
রিমু: — অনেক সম্পর্ক! তুমি ফোন দেখলে হাসো, আবার কখনো রাগ করো। আমার তো মনে হয়, তোমার ফোনের মধ্যে ভূত আছে!
হিমু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হেসে ফেলল।
হিমু: — যা, তোর মাথার মধ্যে ভূত আছে!
রিমু জিভ বের করে ঘর থেকে দৌড়ে পালাল।
হিমু হাসতে হাসতে আবার ফোনটা হাতে নিল।
কিন্তু এবার তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
ফোনের পর্দায় নতুন একটি মেসেজ!
অপরিচিত নম্বর: আজ জিসান তোমার বাড়িতে গিয়েছিল, তাই না?
হিমু এবার সত্যিই অবাক হয়ে গেল।
হিমু: — লোকটা কি আমাদের বাড়ির আশেপাশে থাকে নাকি?
সে দ্রুত লিখল—
হিমু: আপনি আমার বাড়ির কথা কীভাবে জানেন?
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
অপরিচিত নম্বর: তোমার ক্ষতি চাই না। শুধু বলছি, জিসানের কাছ থেকে একটু দূরে থেকো।
হিমু এবার রেগে গিয়ে লিখল—
হিমু: আমার কার সঙ্গে মিশব, সেটা আমি ঠিক করব। আপনি কে যে আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন?
এবার আর কোনো উত্তর এল না।
হিমু কয়েকবার মেসেজ পাঠাল। কিন্তু কোনো লাভ হলো না।
বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় রেখে দিল সে।
হিমু: — সামনে আসুন একবার! তারপর বুঝবেন হিমু কাকে বলে!
কিন্তু মেয়েটা জানত না, তার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেউ একজন ইচ্ছা করেই তার কাছ থেকে সত্যিটা লুকিয়ে রাখছে।
আর সেই সত্যির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জিসানের নাম।
---
পরদিন সকাল ৭টা |
— হিমুউউউ! তোর কি আজ কলেজে যাওয়ার ইচ্ছা নেই?
নিচ থেকে নিলয়ের চিৎকার শুনে হিমু চোখ খুলল।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সকাল সাতটা।
হিমু: — ভাইয়া! সকাল সকাল চিৎকার করছ কেন?
নিলয়: — তোকে ডাকছি!
হিমু: — আমি কি কানে কম শুনি?
নিলয়: — সেটা জানি না। তবে তোর ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ করা অসম্ভব!
হিমু বালিশটা মুখের ওপর টেনে বলল—
হিমু: — যাও তো! আমাকে ঘুমাতে দাও!
নিলয়: — ঠিক আছে। তাহলে জিসানকে বলে দিই, তুই আজ কলেজে যাবি না!
কথাটা শুনেই হিমু ধড়মড় করে উঠে বসল।
হিমু: — কীইই! জিসান ভাইয়া এখানে?
নিলয় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হেসে বলল—
নিলয়: — না তো! তবে তোর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, নামটা শুনেই ঘুম পালিয়ে গেছে!
হিমু বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
হিমু: — নিলয় ভাইয়া, তোমাকে যদি এখন একটা বালিশ দিয়ে মারি, তাহলে কেমন হবে?
নিলয়: — খুব ভালো হবে। তবে আগে মুখ ধুয়ে আয়। বালিশটা নোংরা হয়ে যাবে!
হিমু: — তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল!
নিলয় হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
হিমু দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
তারপর নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল—
হিমু: — জিসান ভাইয়া এখানে থাকলেও আমার কী! আমি কি ওকে ভয় পাই নাকি?
কথাটা বলেই সে থেমে গেল।
গতকালের কথা মনে পড়তেই আবার ভ্রু কুঁচকে গেল তার।
হিমু: — কিন্তু ওই লোকটা জিসান ভাইয়াকে নিয়ে আমাকে সাবধান করছে কেন?
প্রশ্নটার উত্তর তার কাছে নেই।
আর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তার মাথা যে শান্ত হবে না, সেটা সে ভালো করেই জানে।
---
সকাল ৯টা ৩০ মিনিট
কলেজের গেট দিয়ে ঢুকেই হিমু মায়াকে দেখতে পেল।
মায়া দূর থেকে হাত নেড়ে ডাকল—
মায়া: — এই যে, মহারানি! এদিকে আয়!
হিমু কাছে যেতেই মায়া তার হাত ধরে বলল—
মায়া: — তোর মুখ এমন শুকনো কেন? রাতে ঘুমাসনি?
হিমু: — ঘুমিয়েছি তো!
মায়া: — তাহলে চোখের নিচে এমন অবস্থা কেন?
হিমু: — তোর চোখের নিচে আয়না ধরব?
মায়া: — আমার কথা বাদ দে। তুই কিছু একটা লুকাচ্ছিস!
হিমু একটু ইতস্তত করে চারপাশে তাকাল।
তারপর ফোনটা বের করে গত রাতের মেসেজগুলো মায়াকে দেখাল।
সবটা পড়ে মায়ার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
মায়া: — হিমু, ব্যাপারটা কিন্তু মজা করার মতো নয়।
হিমু: — আমিও তো মজা করছি না!
মায়া: — নম্বরটা ব্লক করেছিস?
হিমু মাথা নাড়ল।
হিমু: — না। লোকটা কে, সেটা আগে জানতে চাই।
মায়া: — কিন্তু এভাবে অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলা ঠিক হচ্ছে না। অন্তত তোর আম্মুকে জানাস।
হিমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
হিমু: — আচ্ছা, আগে দেখি আজ আবার মেসেজ দেয় কি না। এরপর আম্মুকে বলব।
মায়া: — তুই একদম জেদি!
হিমু: — ধন্যবাদ!
মায়া: — এটা প্রশংসা ছিল না!
হিমু হেসে ফেলল।
ঠিক তখনই কলেজের মূল গেটের সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামল জিসান।
পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। হাতে ঘড়ি, মুখে সেই গম্ভীর ভাব।
তার সঙ্গে আরও একজন ছিল।
জিসান চারপাশে তাকিয়ে কাউকে খুঁজছিল।
মায়া হিমুর কনুইয়ে খোঁচা দিয়ে ফিসফিস করল—
মায়া: — ওই যে, তোর গম্ভীর ভাইয়া!
হিমু সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
হিমু: — আস্তে কথা বল! উনি শুনে ফেলবেন!
মায়া চোখ বড় করে বলল—
মায়া: — ওমা! তুই তো বললি, ওনাকে ভয় পাস না!
হিমু: — ভয় পাই না। কিন্তু তুই চুপ কর!
জিসানের চোখ হঠাৎ হিমুর ওপর পড়ল।
সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে এগিয়ে এল।
জিসান: — হিমু, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
হিমু অবাক হয়ে বলল—
হিমু: — আমার সঙ্গে? কী কথা?
জিসান: — একটু এদিকে এসো।
মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল—
মায়া: — আমি কিন্তু এখানেই আছি!
জিসান একবার মায়ার দিকে তাকাল।
জিসান: — তোমার বান্ধবীকে কিছুক্ষণের জন্য ধার নিচ্ছি। ফেরত দিয়ে দেব।
মায়া হা করে তাকিয়ে রইল।
জিসান আর কোনো কথা না বলে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
হিমু মায়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল—
হিমু: — দেখলি? কথাও বলে আবার এমন ভাব নেয়, যেন পুরো কলেজটা ওনার!
মায়া হাসি চেপে বলল—
মায়া: — যা, গিয়ে শুনে আয়। পরে সব আমাকে বলবি!
হিমু বিরক্ত মুখে জিসানের পেছনে হাঁটতে লাগল।
কিন্তু তার মনে তখন একটাই প্রশ্ন—
জিসান ভাইয়া হঠাৎ কলেজে এলেন কেন?
---
সকাল ৯টা ৪০ মিনিট |
জিসান থেমে হিমুর দিকে তাকাল।
জিসান: — গতকাল রাতে কোনো অপরিচিত নম্বর থেকে মেসেজ পেয়েছ?
প্রশ্নটা শুনেই হিমুর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
সে অবাক হয়ে তাকাল।
হিমু: — আপনি কীভাবে জানলেন?
জিসান: — আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
হিমু: — হ্যাঁ, পেয়েছি। কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?
জিসান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর গম্ভীর গলায় বলল—
জিসান: — নম্বরটা আমাকে দেখাও।
হিমু ফোন বের করে নম্বরটা দেখাল।
নম্বরটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে জিসানের মুখের ভাব বদলে গেল।
চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠল।
হিমু সেটা লক্ষ করে ফেলল।
হিমু: — কী হয়েছে? আপনি নম্বরটা চেনেন?
জিসান ফোনটা ফেরত দিয়ে বলল—
জিসান: — এই নম্বর থেকে আবার মেসেজ এলে আমাকে জানাবে।
হিমু বিরক্ত হয়ে বলল—
হিমু: — আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না কেন? লোকটা কে?
জিসান: — এখন সেটা জানার প্রয়োজন নেই।
হিমু: — আমার ফোনে মেসেজ আসছে, আমাকে সাবধান করা হচ্ছে, আর আপনি বলছেন জানার প্রয়োজন নেই?
জিসান শান্ত গলায় বলল—
জিসান: — হিমু, সবকিছুর উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না।
হিমু: — আমি আপনার ছোট বোন বলে কি আমাকে কিছুই বলবেন না?
জিসান এবার একটু থেমে গেল।
তারপর নিচু গলায় বলল—
জিসান: — তোমার নিরাপত্তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলছি, একা কোথাও যেও না। আর অপরিচিত কাউকে নিজের কোনো তথ্য দেবে না।
হিমুর রাগটা কিছুটা কমে এল।
তবু সে মুখ গম্ভীর করে বলল—
হিমু: — আপনি এমনভাবে বলছেন, মনে হচ্ছে আমি বাচ্চা!
জিসান: — মাঝে মাঝে তোমার কাজকর্ম দেখে সেটাই মনে হয়।
হিমু: — জিসান ভাইয়া!
জিসান: — ক্লাসে যাও। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
হিমু রাগ করে ঘুরে দাঁড়াল।
দু-পা এগিয়ে আবার থেমে গেল।
হিমু: — একটা কথা!
জিসান: — কী?
হিমু: — আপনি কি ওই লোকটাকে চেনেন?
জিসান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল—
জিসান: — চিনি কি না, সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
হিমু: — তাহলে কী গুরুত্বপূর্ণ?
জিসান গম্ভীর গলায় বলল—
জিসান: — তুমি যেন কোনো বিপদে না পড়ো।
কথাটা বলে জিসান চলে গেল।
হিমু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আজ প্রথমবার তার মনে হলো, জিসান হয়তো সত্যিই কোনো কিছু নিয়ে চিন্তিত।
কিন্তু কী নিয়ে?
আর সেই অপরিচিত মানুষটিই বা কে?
---
দুপুর ১২টা |
ঘরটিতে পর্দা টানা।
টেবিলের ওপর একটি ল্যাপটপ খোলা। পাশে রাখা ফোনের স্ক্রিনে হিমুর ছবির নিচে কয়েকটি মেসেজ দেখা যাচ্ছে।
একজন লোক ফোনটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সামনে বসা মানুষটি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল—
— মেয়েটার সঙ্গে কথা হয়েছে?
লোকটি মাথা নাড়ল।
— জি। কিন্তু মেয়েটা বেশ জেদি। কিছুতেই ভয় পাচ্ছে না।
সামনে বসা মানুষটি মৃদু হাসল।
— ভয় দেখাতে কে বলেছে?
লোকটি চুপ করে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর মানুষটি আবার বলল—
— জিসান কি নম্বরটা চিনতে পেরেছে?
— জি, স্যার। আজ সকালে মেয়েটার সঙ্গে কথা বলেছে।
মানুষটি এবার টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকল।
— তাহলে জিসান বুঝে গেছে, কেউ তাদের ওপর নজর রাখছে।
লোকটি জিজ্ঞেস করল—
— এখন কী করব, স্যার?
মানুষটি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল—
— আপাতত কিছুই না। মেয়েটার ওপর নজর রাখো। তবে ওর কোনো ক্ষতি যেন না হয়।
লোকটি মাথা নুইয়ে বলল—
— ঠিক আছে, স্যার।
লোকটি বেরিয়ে যেতেই মানুষটি ফোন হাতে তুলে নিল।
হিমুর ছবিটার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল—
— তুমি এখনো জানো না, হিমু... তোমার চারপাশে কতগুলো প্রশ্ন জমে আছে।
একটু থেমে সে আবার বলল—
— আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে, তোমাকে জিসানের আরও কাছাকাছি যেতে হবে।
ফোনের স্ক্রিন নিভে গেল।
ঘরটাও আবার অন্ধকার হয়ে রইল।
চলবে... 🌸