রাত ৮টা ৩০ মিনিট |
নিজের ঘরে বসে ফোনের স্ক্রিনে একের পর এক ভিডিও দেখছে হিমু। সামনে বই-খাতা খোলা থাকলেও সেদিকে তার বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। কখনো ভিডিও দেখে হাসছে, কখনো আবার কোনো বন্ধুর মেসেজের উত্তর দিচ্ছে।
এমন সময় নিচ থেকে হালিমা বেগমের ডাক ভেসে এল—
— হিমু! মা, একটু নিচে আয় তো!
হিমু ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল—
হিমু: — কী হয়েছে, আম্মু?
হালিমা বেগম: — নিচে আয় বলছি। তোর সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।
হিমু: — কে এসেছে?
হালিমা বেগম: — এলেই দেখতে পাবি। তাড়াতাড়ি আয়।
হিমু বিরক্ত মুখে ফোনটা বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়াল। দরজা খুলে সিঁড়ির দিকে এগোতেই নিচে বসে থাকা মানুষটাকে দেখে তার পা থেমে গেল।
সোফায় বসে আছে জিসান!
পরনে কালো শার্ট, কালো প্যান্ট। এক হাতে ফোন, অন্য হাতটা সোফার হাতলের ওপর রাখা। মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।
হিমু মনে মনে বলল—
হিমু: — আবার এই লোকটা! আমার জীবনটা কি পড়াশোনা আর জিসান ভাইয়ার শাসনেই শেষ হবে?
জিসান যেন তার মনের কথাটা শুনতে পেয়েছে, এমনভাবে মাথা তুলে তাকাল।
জিসান: — কী হয়েছে? সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছ কেন? নেমে এসো।
হিমু মুখ বাঁকিয়ে নিচে নেমে এল।
হিমু: — আপনি আবার কখন এলেন?
জিসান: — এই তো, কিছুক্ষণ হলো।
হিমু: — কেন এসেছেন?
জিসান ভ্রু উঁচু করল।
জিসান: — নিজের বোনের বাড়িতে আসতে কি এখন কারণ দেখাতে হবে?
হিমু: — নিজের বোনের বাড়িতে আসতে হবে না। কিন্তু আমার শান্তি নষ্ট করতে এলে কারণ জানতে ইচ্ছা করতেই পারে!
কথাটা শুনে পাশের সোফায় বসে থাকা হালিমা বেগম হেসে ফেললেন।
হালিমা বেগম: — এই মেয়েটার মুখে একটুও লাগাম নেই! জিসান তোর ভালোর জন্যই আসে, আর তুই তার সঙ্গেই ঝগড়া করিস!
হিমু: — আম্মু, আমি কি ঝগড়া করেছি? আমি তো শুধু জানতে চাইলাম!
জিসান: — থাক, খালা। ওকে কিছু বলতে হবে না। আমি বুঝে গেছি, ওর পড়াশোনার চেয়ে কথা বলার আগ্রহ বেশি।
হিমু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—
হিমু: — আপনার কথা বলার আগ্রহও কিন্তু কম না!
জিসান এবার পুরোপুরি হিমুর দিকে ফিরল।
জিসান: — কী বললে?
হিমু: — কিছু না!
জিসান: — তাহলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ কেন? নিজের ঘরে যাও।
হিমু মনে মনে রাগে গজগজ করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
হালিমা বেগম জিসানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন—
হালিমা বেগম: — তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা। মেয়েটা একটু বেশি কথা বলে।
জিসান: — সমস্যা নেই, খালা। তবে ওর পড়াশোনার দিকে একটু নজর দিতে হবে। সামনে পরীক্ষা, অথচ ওর ভাব দেখে মনে হয় পরীক্ষা দিতে নয়, বেড়াতে যাবে।
হালিমা বেগম: — আমিও তো সেই কথাই বলি। আমার কথা তো কানেই নেয় না।
জিসান: — আজ একটু বুঝিয়ে বলি।
এই বলে জিসান উঠে দাঁড়াল।
জিসান: — আমি ওর ঘরে যাচ্ছি, খালা।
হালিমা বেগম: — যাও বাবা। ওকে একটু বুঝিয়ে বলো। তোমার কথা অন্তত শুনুক।
জিসান সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে হিমুর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা আধখোলা। ভেতরে তাকিয়ে দেখল, হিমু আবার বিছানায় বসে ফোন নিয়ে ব্যস্ত।
জিসান দরজায় দুবার টোকা দিল।
জিসান: — ভেতরে আসতে পারি?
হিমু ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল—
হিমু: — দরজা তো খোলাই আছে। আবার অনুমতি চাইছেন কেন?
জিসান ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল।
জিসান: — বাহ! কথার ধরন তো বেশ উন্নত হয়েছে দেখছি!
হিমু: — ধন্যবাদ।
জিসান: — আমি প্রশংসা করিনি।
হিমু: — তবুও ধন্যবাদ।
জিসান কয়েক সেকেন্ড হিমুর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার পাশে রাখা চেয়ারটায় বসল।
জিসান: — ফোনটা রাখো।
হিমু: — কেন?
জিসান: — কারণ তোমার সঙ্গে কথা আছে।
হিমু: — বলুন। শুনছি তো।
জিসান: — ফোনের দিকে তাকিয়ে শুনলে আমার কথা তোমার মাথায় ঢুকবে না।
হিমু: — আপনার কথা কি এত কঠিন যে ফোন হাতে থাকলে বুঝব না?
জিসান: — হিমু!
হিমু এবার ফোন থেকে মুখ তুলে তাকাল।
হিমু: — কী হয়েছে? এমনভাবে নাম ধরে ডাকছেন কেন?
জিসান: — সামনে তোমার পরীক্ষা, এটা মনে আছে?
হিমু: — জি, মনে আছে।
জিসান: — কত দিন বাকি?
হিমু: — বেশ কিছুদিন।
জিসান: — বেশ কিছুদিন মানে? নির্দিষ্ট করে বলো।
হিমু একটু ভেবে বলল—
হিমু: — প্রায় তিন সপ্তাহ।
জিসান: — আর তুমি এই তিন সপ্তাহে কী করছ?
হিমু: — পড়াশোনা করছি।
জিসান চোখ সরু করে বিছানার ওপর রাখা ফোনটার দিকে তাকাল।
জিসান: — এই যে ফোনটা হাতে নিয়ে বসে আছ, এটাও কি তোমার পড়াশোনার অংশ?
হিমু: — মাঝে মাঝে পড়ার ফাঁকে একটু ফোন দেখি। এতে কী হয়েছে?
জিসান: — একটু?
হিমু: — হ্যাঁ, একটু!
জিসান: — তোমার এই একটু কতক্ষণ চলে, সেটা আমার জানা আছে।
হিমু: — আপনি কি আমার ঘরে বসে থাকেন নাকি? কী করি না করি, সবই আপনার জানা!
জিসান এবার চোখ বড় করে হিমুর দিকে তাকাল।
জিসান: — কী বললে?
হিমু তার চোখের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল—
হিমু: — বললাম, আপনি সব জানেন।
জিসান: — হিমু, আমার সঙ্গে চালাকি করবে না। ফোনটা রেখে বই নিয়ে বসো।
হিমু বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে দিয়ে বলল—
হিমু: — সারাদিন শুধু পড়ো, পড়ো আর পড়ো! পড়াশোনা ছাড়া কি মানুষের জীবনে আর কিছু নেই?
জিসান: — অবশ্যই আছে। কিন্তু পড়াশোনার সময় পড়াশোনা করতে হয়, আর অবসর সময়ে অন্য কাজ। তোমার সমস্যা হলো, অবসর সময় আর পড়ার সময়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
হিমু: — আমার সমস্যা আমি বুঝব। আপনাকে এত চিন্তা করতে হবে না।
জিসান: — তোমার সমস্যা তুমি বুঝলে এতক্ষণ ফোন নিয়ে বসে থাকতে না।
হিমু: — আপনি কি আমার শিক্ষক নাকি?
জিসান: — আজ থেকে মনে করো, আমি তোমার শিক্ষক।
হিমু: — আল্লাহ! আমার কপালে আর কী কী আছে!
জিসান: — অনেক কিছুই আছে। আগে বই নিয়ে এসো।
হিমু: — আনছি!
জিসান: — আর মুখটা এমন করে রেখো না, যেন তোমাকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
হিমু: — আপনার সঙ্গে কথা বললেই আমার এমন অবস্থা হয়!
জিসান এবার একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
হিমু বুঝতে পারল, আর একটা কথা বললে আজ সত্যিই বিপদ আছে।
তাই সে চুপচাপ উঠে গিয়ে পড়ার টেবিল থেকে বই-খাতা নিয়ে এল।
জিসান ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি লুকিয়ে বলল—
জিসান: — এই তো, ভালো মেয়ের মতো বই নিয়ে এসেছ!
হিমু বই খুলতে খুলতে বিড়বিড় করল—
হিমু: — ভালো মেয়ে তো আমি সব সময়ই। আপনিই শুধু বুঝতে পারেন না।
জিসান: — কী বললে?
হিমু: — বললাম, আপনি বসুন।
জিসান মাথা নেড়ে বইয়ের দিকে তাকাল।
জিসান: — আচ্ছা, এবার বলো তো, এই অধ্যায়টা কতটুকু পড়েছ?
হিমু বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক সেকেন্ড পর বলল—
হিমু: — অর্ধেক।
জিসান: — কোন অর্ধেক?
হিমু: — মানে... প্রথম অর্ধেক।
জিসান: — আর বাকি অর্ধেক?
হিমু: — সেটাও পড়ব।
জিসান: — কবে?
হিমু: — পরীক্ষার আগে!
জিসান এবার কপালে হাত রাখল।
জিসান: — হে আল্লাহ! এই মেয়েকে নিয়ে আমি কী করব?
হিমু মুখ টিপে হাসল।
হিমু: — আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনি চাইলে চলে যেতে পারেন।
জিসান: — তোমার কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছে, তোমাকে পড়ানোর চেয়ে দেয়ালকে পড়ানো সহজ।
হিমু: — তাহলে দেয়ালকেই পড়ান না!
জিসান আবার চোখ বড় করে তাকাল।
এবার হিমু এক মুহূর্তও দেরি করল না। চুপচাপ সোজা হয়ে বসে বইয়ের দিকে মন দিল।
জিসান: — খুব ভালো। এবার দেখি, কতক্ষণ এই মনোযোগ থাকে।
হিমু মনে মনে বলল—
হিমু: — যতক্ষণ আপনি আমার সামনে বসে থাকবেন, ততক্ষণ তো আর উপায় নেই!
কিন্তু মুখে কিছু বলল না।
জিসান বইয়ের একটি অংশ দেখিয়ে বলল—
জিসান: — এটা পড়ো।
হিমু পড়তে শুরু করল। প্রথমে একটু আটকে গেলেও পরে ঠিকঠাক পড়ল।
জিসান মন দিয়ে শুনল। তারপর কয়েকটি প্রশ্ন করল।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর হিমু দিতে পারল।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আটকে গেল।
তৃতীয় প্রশ্নের সময় সে মুখ নিচু করে বলল—
হিমু: — এটা পারছি না।
জিসান: — কেন পারছ না?
হিমু: — পড়িনি।
জিসান: — তাহলে ফোনে এত সময় দেওয়ার ফলটা বুঝতে পারছ?
হিমু: — বুঝতে পারছি। এখন কি একটু শান্তি পাব?
জিসান: — উত্তরটা শিখে নাও, তারপর শান্তি পাবে।
হিমু বিরক্ত মুখে বলল—
হিমু: — আপনি একদম অত্যাচারী!
জিসান: — ধন্যবাদ। এবার মনোযোগ দাও।
হিমু আর কথা বাড়াল না।
জিসান তাকে উত্তরটা বুঝিয়ে দিল। এরপর নিজের মতো করে উত্তর লিখতে বলল। হিমু প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও ধীরে ধীরে লিখে ফেলল।
জিসান খাতা দেখে বলল—
জিসান: — খারাপ হয়নি।
হিমু সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে তাকাল।
হিমু: — সত্যি?
জিসান: — হ্যাঁ। তবে আরও ভালো করতে পারবে।
হিমুর মুখে এবার একটু হাসি ফুটল।
হিমু: — তাহলে আপনি সব সময় আমাকে বকেন কেন?
জিসান: — কারণ তুমি ভালো করতে পারো, অথচ নিজের সময় নষ্ট করো।
হিমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
জিসান আবার বলল—
জিসান: — শোনো, আমি তোমাকে সারাদিন পড়তে বলছি না। কিন্তু প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করবে। ফোন দেখবে, গল্প করবে, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবে—সবই করবে। শুধু পড়াশোনাটাকে অবহেলা করবে না।
হিমু এবার মন দিয়ে তার কথা শুনল।
হিমু: — আচ্ছা, চেষ্টা করব।
জিসান: — শুধু চেষ্টা করলে হবে না। কাজেও দেখাতে হবে।
হিমু: — জি, স্যার!
জিসান ভ্রু তুলে তাকাল।
জিসান: — আবার স্যার বলছ কেন?
হিমু: — আপনি তো শিক্ষক সেজে বসেছেন। তাই স্যার বললাম।
জিসান মাথা নেড়ে হেসে ফেলল।
জিসান: — তোমার সঙ্গে তর্কে জেতা অসম্ভব।
হিমু: — অবশেষে বুঝতে পেরেছেন!
জিসান: — বেশি খুশি হয়ো না। পরের প্রশ্নের উত্তর দাও।
হিমুর মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
হিমু: — আবার?
জিসান: — হ্যাঁ, আবার!
তারপর শুরু হলো পড়াশোনা।
একটার পর একটা প্রশ্ন, উত্তর, ভুল ধরিয়ে দেওয়া আর নতুন করে বুঝিয়ে দেওয়া—এভাবেই কেটে গেল প্রায় দেড় ঘণ্টা।
মাঝেমধ্যে হিমু বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়েছে, আবার জিসানের চোখের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বইয়ে মন দিয়েছে।
অবশেষে জিসান খাতা বন্ধ করে বলল—
জিসান: — আজকের মতো শেষ। কাল এই অধ্যায়টা আবার দেখব।
হিমু আনন্দে বই বন্ধ করে বলল—
হিমু: — আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে মুক্তি!
জিসান: — কী বললে?
হিমু দ্রুত বইটা আবার খুলে বলল—
হিমু: — বললাম, পড়াটা খুব ভালো লাগল!
জিসান: — মিথ্যা কথা বলার অভ্যাসটা বাদ দাও।
হিমু: — আপনি কীভাবে বুঝলেন?
জিসান: — তোমার মুখ দেখেই।
হিমু মুখ ফুলিয়ে বসে রইল।
জিসান উঠে দাঁড়িয়ে বইগুলো গুছিয়ে দিল।
জিসান: — আমি এখন যাচ্ছি। কাল থেকে প্রতিদিন নিজের পড়া নিজে শেষ করবে।
হিমু: — আচ্ছা।
জিসান: — আর ফোন নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করবে না।
হিমু: — আচ্ছা।
জিসান: — আমি কিন্তু আবার খোঁজ নেব।
হিমু এবার মাথা তুলে বলল—
হিমু: — আপনি কি আমার পেছনে গোয়েন্দা লাগাবেন?
জিসান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল—
জিসান: — তোমার মাথায় গোয়েন্দাগিরি ছাড়া আর কিছু ঢোকে না?
হিমু হেসে ফেলল।
হিমু: — আপনিই তো সব সময় সন্দেহ করেন!
জিসান: — আচ্ছা, এবার চুপ করো। আমি যাচ্ছি।
হিমু দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলল—
হিমু: — সাবধানে যাবেন।
জিসান একবার তার দিকে তাকাল।
গম্ভীর মুখে বলল—
জিসান: — তুমি ঠিকমতো পড়বে। তাহলেই আমি সাবধানে যেতে পারব।
হিমু: — আবার পড়াশোনা!
জিসান হেসে মাথা নেড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
হিমু দরজা বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বিছানায় গিয়ে বসে ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিনে কয়েকটি মেসেজ জমে আছে।
হিমু মেসেজগুলো খুলতে গিয়েও থেমে গেল।
জিসানের কথাগুলো মনে পড়ল।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা টেবিলে রেখে বই খুলল।
হিমু: — ঠিক আছে, জিসান ভাইয়া! আজকে আপনার কথা শুনলাম। কিন্তু কাল আবার ফোন দেখব!
কথাটা বলে নিজেই হেসে ফেলল।
তবে তার অজান্তেই ফোনের স্ক্রিনে একটি নতুন মেসেজ এসে জমা হলো।
অপরিচিত নম্বর: আজ জিসান তোমাকে পড়িয়েছে?
হিমু বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকায় মেসেজটা দেখতে পেল না।
আর দূরে কোথাও বসে একজন মানুষ অপেক্ষা করতে লাগল, কখন হিমু আবার ফোনটা হাতে নেবে।
অন্যদিকে | রাত ১০টা ১৫ মিনিট |
গাড়ি থেকে নেমে জিসান বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
সারাদিনের কাজের পর সে বেশ ক্লান্ত। হিমুকে পড়াতে গিয়ে নিজেরও অনেকটা সময় চলে গেছে। তার ওপর অফিসের কিছু জরুরি কাজ এখনো বাকি।
বসার ঘরে ঢুকতেই রিতু এগিয়ে এল।
রিতু জিসানের চাচাতো বোন। বয়সে জিসানের চেয়ে ছোট। মুখে সব সময় হাসি লেগে থাকলেও জিসানের সামনে এলে মেয়েটা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
রিতু: — ভাইয়া, তুমি এসেছ?
জিসান ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে বলল—
জিসান: — হুম।
রিতু: — অনেক রাত হয়ে গেল আজ।
জিসান: — কাজ ছিল।
রিতু: — খেয়েছ?
জিসান: — এখনো না।
রিতু একটু ইতস্তত করে বলল—
রিতু: — তোমার জন্য কফি বানিয়ে এনেছি। ভাবলাম, কাজ করার আগে খেয়ে নেবে।
জিসান এবারও তার দিকে তাকাল না।
জিসান: — টেবিলে রাখো।
রিতুর মুখের হাসিটা একটু ম্লান হয়ে গেল।
তবু সে নিজের মন খারাপটা আড়াল করে বলল—
রিতু: — শুধু কফি খেলে হবে? কিছু খাবে না?
জিসান: — পরে খাব।
রিতু: — আচ্ছা।
রিতু নিজের হাতে বানানো কফির কাপটা এগিয়ে দিল।
জিসান কাপটা হাতে নিল। তারপর কোনো কথা না বলে সোজা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
একবারও পেছন ফিরে তাকাল না।
একবারও জিজ্ঞেস করল না, রিতু নিজে খেয়েছে কি না।
রিতু সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
যে মানুষটার জন্য সে এত যত্ন করে কফি বানিয়েছে, সেই মানুষটা তার দিকে একবার তাকানোরও প্রয়োজন মনে করল না।
রিতু ধীরে ধীরে নিজের হাত দুটো নামিয়ে নিল।
তার চোখের কোণে জমে উঠল অভিমান।
রিতু মনে মনে বলল—
রিতু: — আমি কি এতটাই বিরক্তিকর, ভাইয়া? আমার সঙ্গে দুটো কথা বলতেও কি তোমার ভালো লাগে না?
কিন্তু প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার মতো কেউ সেখানে ছিল না।
রিতু ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই বাড়ির বসার ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল।
রাত ১০টা ৩০ মিনিট |
জিসান টেবিলের ওপর কফির কাপটা রেখে ল্যাপটপ খুলল।
কাজ শুরু করার আগেই তার ফোনে একটি কল এল।
স্ক্রিনে নম্বরটা দেখে তার মুখের ভাব বদলে গেল।
কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে কলটা রিসিভ করল।
জিসান: — বলো।
ওপাশ থেকে একজনের কণ্ঠ ভেসে এল—
— স্যার, মেয়েটা আজও কয়েকবার ফোন হাতে নিয়েছে। তবে নতুন কোনো মেসেজের উত্তর দেয়নি।
জিসানের ভ্রু কুঁচকে গেল।
জিসান: — কোন মেয়ের কথা বলছ?
— হিমু ম্যাডামের কথা, স্যার।
জিসান চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে বসল।
জিসান: — তোমাকে কে বলেছে ওর ওপর নজর রাখতে?
ওপাশের লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল—
— আমি শুধু আপনার নির্দেশ অনুযায়ী—
জিসান: — আমার নির্দেশ? আমি তোমাকে কখনো হিমুর ওপর নজর রাখতে বলিনি!
কথাটা বলে সে থেমে গেল।
তারপর গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল—
জিসান: — তুমি কে? আর কার হয়ে কাজ করছ?
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না।
জিসান: — হ্যালো? শুনতে পাচ্ছ?
কয়েক সেকেন্ড পর কলটা কেটে গেল।
জিসান ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দ্রুত নম্বরটিতে কল ব্যাক করল।
কিন্তু নম্বরটি বন্ধ।
জিসান এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
জিসান: — হিমুর ওপর নজর রাখছে কে?
সে নিজের মনেই কথাটা বলল।
গত কয়েক দিন ধরে হিমুর আচরণে কিছু পরিবর্তন সে লক্ষ করেছে। মেয়েটা আগের মতোই কথা বলে, ঝগড়া করে, হাসে। কিন্তু মাঝেমধ্যে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। যেন কোনো একটা বিষয় তাকে ভাবিয়ে তুলছে।
আজ সকালে অপরিচিত নম্বরের কথা জানার পর থেকেই তার মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
আর এখন এই ফোনকল!
জিসান টেবিলের ওপর রাখা কফির কাপটার দিকে একবার তাকাল। কফিটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
কিন্তু সেদিকে তার আর মন গেল না।
সে ফোনটা হাতে নিয়ে আরেকটি নম্বরে কল করল।
জিসান: — আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
— বলুন।
জিসান: — হিমুর ফোনে যে নম্বর থেকে মেসেজ আসছে, সেটার বিষয়ে যতটুকু সম্ভব খোঁজ নাও। তবে কোনোভাবেই হিমুকে ভয় দেখাবে না। আর ওর কোনো ক্ষতি যেন না হয়।
— ঠিক আছে।
জিসান: — আর একটা কথা। আমার অনুমতি ছাড়া কেউ যেন ওর আশপাশে ঘোরাঘুরি না করে।
— বুঝেছি।
কল শেষ করে জিসান ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের চেয়ারে ফিরে এল।
জিসান: — যে-ই হও তুমি, হিমুর কোনো ক্ষতি হতে দেব না।
কিন্তু সে জানত না, এই রহস্যের জাল ইতিমধ্যেই অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে।
আর সেই জালের এক প্রান্তে জিসান নিজেও জড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে | রাত ১০টা ৪৫ মিনিট |
বই পড়তে পড়তে হিমুর চোখে ঘুম নেমে এসেছে।
সে বই বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখল। তারপর ফোনটা হাতে নিতেই নতুন মেসেজটা চোখে পড়ল।
অপরিচিত নম্বর: আজ জিসান তোমাকে পড়িয়েছে?
হিমুর মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
হিমু: — আবার শুরু হয়েছে!
সে দ্রুত টাইপ করল—
হিমু: আপনি কে? আমার প্রতিটি কাজ কীভাবে জানেন?
মেসেজ পাঠানোর পর কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল।
তারপর আবার লিখল—
হিমু: আপনি যদি আমার ভালো চান, তাহলে সামনে এসে কথা বলুন। এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে মেসেজ করবেন না।
মেসেজের পাশে ডেলিভারির চিহ্ন দেখা গেল।
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
হিমু বিরক্ত হয়ে ফোনটা বিছানায় রেখে দিল।
হিমু: — একদিন না একদিন তোমাকে খুঁজে বের করবই!
ঠিক তখনই ফোনটা আবার কেঁপে উঠল।
নতুন মেসেজ।
অপরিচিত নম্বর: জিসানকে বিশ্বাস করো। তবে মনে রেখো, ও নিজেও সব সত্যি জানে না।
হিমু স্থির হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
হিমু: — মানে? জিসান ভাইয়া কী জানেন না?
সে তাড়াতাড়ি উত্তর দিতে গেল।
কিন্তু তার আগেই নম্বরটি থেকে আরেকটি মেসেজ এল।
অপরিচিত নম্বর: শুভরাত্রি, হিমু। কাল তোমার জন্য নতুন একটা প্রশ্ন অপেক্ষা করছে।
হিমু ফোনটা শক্ত করে ধরে বসে রইল।
এবার তার আর হাসি পেল না।
তার মনে হলো, কেউ একজন তার প্রতিটি পদক্ষেপের খবর রাখছে। শুধু তাই নয়, সেই মানুষটি জিসানকেও চেনে।
কিন্তু কেন?
আর জিসানের সঙ্গে তার সম্পর্কটাই বা কী?
হিমু জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে রাতের অন্ধকার আরও গভীর হয়েছে।
সে ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
হিমু: — যেই হও তুমি, আমার সব প্রশ্নের উত্তর একদিন দিতেই হবে।