ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার ডাক্তার বাবু

পর্ব 8

লেখক: মাহিয়া ইসলাম হিমি

সকাল ৭টা ৩০ মিনিট |

সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে।

হিমু বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে ফোনে ভিডিও দেখছে। পাশে গত রাতে জিসানের দেওয়া পড়ার বইগুলো সুন্দর করে সাজানো থাকলেও সেগুলোর দিকে তার কোনো নজর নেই।

হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।

— হিমু! ঘুম থেকে উঠেছিস?

মায়ের কণ্ঠ শুনে হিমু তাড়াতাড়ি ফোনটা বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেলল।

হিমু: — জি, আম্মু! উঠেছি!

হালিমা বেগম দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন।

হালিমা: — উঠেছিস মানে? এখনো বিছানায় পড়ে আছিস কেন?

হিমু: — এই তো উঠছি!

হালিমা: — তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। নিলয় এসেছে।

হিমু এক লাফে উঠে বসল।

হিমু: — নিলয় ভাই এসেছে?

হালিমা: — হ্যাঁ। নিচে বসে আছে।

হিমু: — আমাকে আগে বলোনি কেন?

হালিমা হেসে বললেন—

হালিমা: — তোর এত আগ্রহ দেখে তো মনে হচ্ছে, ছেলেটাকে অনেক দিন পর দেখছিস!

হিমু: — আম্মু!

হালিমা: — আচ্ছা, আর কথা বাড়াস না। তাড়াতাড়ি আয়।

হালিমা বেগম চলে যেতেই হিমু বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করে টেবিলে রেখে দিল।

হিমু: — উফ! এই নিলয় ভাইটাও না! সকাল সকাল হাজির!

কথাটা বললেও তার মুখে হাসি লেগে রইল।

সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট |

নিলয় সোফায় বসে ফোন দেখছে। পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। পাশে রাখা টেবিল থেকে একবার বিস্কুট নিচ্ছে, আবার ফোনে মনোযোগ দিচ্ছে।

হিমু সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে তার সামনে দাঁড়াল।

হিমু: — এই যে মহাশয়! সকাল সকাল কী মনে করে?

নিলয় ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল—

নিলয়: — তোকে দেখতে এসেছি।

হিমু: — সত্যি?

নিলয়: — না। তোর মায়ের হাতের নাশতা খেতে এসেছি।

হিমু: — জানতাম! আপনার মতো লোভী মানুষ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টা নেই।

নিলয় এবার ফোন নামিয়ে হিমুর দিকে তাকাল।

নিলয়: — এই সুন্দরী, সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঝগড়া শুরু করেছিস কেন?

হিমু: — আমাকে সুন্দরী বলবেন না।

নিলয়: — কেন? আয়নায় দেখিস না নিজেকে?

হিমু: — আপনি আগে নিজের চেহারাটা দেখুন!

নিলয় হেসে ফেলল।

নিলয়: — আচ্ছা, মহারানি। এবার বল তো, পড়াশোনা কেমন চলছে?

হিমুর মুখের হাসি একটু কমে গেল।

হিমু: — ভালো।

নিলয়: — সত্যি?

হিমু: — হ্যাঁ।

নিলয়: — তাহলে গতকাল জিসান ভাই তোকে কতক্ষণ পড়িয়েছে?

হিমু চোখ বড় করে তাকাল।

হিমু: — আপনি জানলেন কীভাবে?

নিলয়: — জিসান ভাই নিজেই বলেছে।

হিমু: — উফ! ওই মানুষটা আমার পড়াশোনার খবর সবাইকে দিয়ে বেড়ায় কেন?

নিলয়: — কারণ তোর পড়াশোনার অবস্থা দেখে সবাই চিন্তিত।

হিমু: — আপনি আমার পক্ষ নেবেন, নাকি জিসান ভাইয়ার?

নিলয়: — অবশ্যই জিসান ভাইয়ের।

হিমু: — তাহলে আপনার সঙ্গে কথা নেই!

নিলয়: — বাহ! এত সহজে সম্পর্ক শেষ?

হিমু মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল।

ঠিক তখনই হালিমা বেগম নাশতার টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে বললেন—

হালিমা: — তোমরা দুজন সকাল সকাল শুরু করে দিয়েছ? আগে নাশতা করে নাও।

নিলয়: — খালামণি, আপনার মেয়েকে একটু বুঝিয়ে বলুন। আমাকে দেখলেই ঝগড়া শুরু করে।

হিমু: — আম্মু, দেখো! নিজে ঝগড়া করে আবার আমার নামে অভিযোগ দিচ্ছে!

হালিমা হেসে বললেন—

হালিমা: — দুজনেই চুপচাপ নাশতা করো।

সকাল ৮টা ১৫ মিনিট |

সবাই একসঙ্গে নাশতা করতে বসেছে।

নিলয় নিজের প্লেট থেকে একটা পরোটা নিয়ে হিমুর প্লেটে রাখল।

নিলয়: — নে, খা।

হিমু: — আমি কি আপনার কাছে খাবার চেয়েছি?

নিলয়: — না। কিন্তু তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, না খেলে সারাদিন রাগ করে থাকবি।

হিমু: — আমি রাগ করি না।

নিলয়: — হ্যাঁ, তুই তো খুব শান্ত মেয়ে!

হিমু: — অবশ্যই!

নিলয়: — বিশেষ করে যখন তুই কথা বলা বন্ধ করিস।

হিমু এবার পরোটার একটা অংশ ছিঁড়ে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বলল—

হিমু: — আপনার কথা বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা নেই?

নিলয় হেসে বলল—

নিলয়: — আছে। আমাকে আরেকটা পরোটা দে।

হিমু: — নিজের হাতে নিন!

নিলয়: — আচ্ছা, দিচ্ছি।

দুজনের খুনসুটি দেখে হালিমা বেগমও হাসলেন।

সকাল ৯টা |

নাশতা শেষ করে হিমু নিজের ঘরে এসে স্কুলের পোশাক বের করল।

আজ স্কুলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে। তাই তাড়াতাড়ি তৈরি হতে হবে।

কিন্তু পোশাক বের করতেই তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা বইয়ের দিকে।

গতকাল জিসান যে অধ্যায়টা পড়িয়েছিল, সেটার কয়েকটি প্রশ্ন আজ আবার দেখতে হবে।

হিমু বইটা হাতে নিয়ে কয়েক পৃষ্ঠা উল্টে দেখল।

হিমু: — উফ! এই পড়াশোনা আর কত!

তবুও সে বইটা খুলে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণ পর দরজার বাইরে থেকে নিলয়ের কণ্ঠ শোনা গেল—

নিলয়: — সুন্দরী! তৈরি হয়েছিস?

হিমু: — হচ্ছি!

নিলয়: — কতক্ষণ লাগবে?

হিমু: — পাঁচ মিনিট!

নিলয়: — তোর পাঁচ মিনিট মানে আধা ঘণ্টা। তাড়াতাড়ি কর।

হিমু বিরক্ত হয়ে বলল—

হিমু: — আপনি কি আমার পেছনে ঘড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন?

নিলয়: — না, তবে তোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমার বয়স বেড়ে যাচ্ছে।

হিমু: — তাহলে অপেক্ষা করবেন না!

নিলয়: — আচ্ছা, যাচ্ছি। কিন্তু তোর স্কুলের গাড়ি তোকে ছাড়াই চলে যাবে।

এই কথা শুনে হিমু তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।

হিমু: — আরে! দাঁড়ান!

বাইরে দাঁড়িয়ে নিলয় হেসে ফেলল।

সকাল ৯টা ৩০ মিনিট |

হিমু স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাইরে বের হলো।

নিলয় গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

নিলয়: — অবশেষে মহারানির আগমন!

হিমু: — আর একটা কথা বললে আমি স্কুলে যাব না।

নিলয়: — তাহলে তো খালামণি আমাকে আস্ত রাখবে না। ওঠ গাড়িতে।

হিমু গাড়িতে উঠে বসল।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি চলতে শুরু করল।

নিলয়: — আচ্ছা, একটা কথা বলি?

হিমু: — কী?

নিলয়: — জিসান ভাই যা বলে, সব সময় একটু মন দিয়ে শুনবি।

হিমু: — আপনিও শুরু করলেন?

নিলয়: — আমি শুধু বলছি, উনি তোর ভালো চান।

হিমু জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল—

হিমু: — জানি তো।

নিলয়: — তাহলে এত বিরক্ত হোস কেন?

হিমু: — কারণ উনি সব সময় পড়াশোনা নিয়ে বকেন।

নিলয়: — একদিন বুঝবি, এই বকাগুলোর মধ্যেও যত্ন থাকে।

হিমু আর কোনো উত্তর দিল না।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

সকাল ১০টা |

স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতেই হিমুর দেখা হলো মায়ার সঙ্গে।

মায়া দূর থেকেই হাত নেড়ে ডাকল—

মায়া: — এই হিমু!

হিমু এগিয়ে গেল।

হিমু: — কী রে?

মায়া: — এত দেরি করলি কেন?

হিমু: — নিলয় ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে।

মায়া: — ওহ! নিলয় ভাই এসেছিল?

হিমু: — হুম। আর পুরো রাস্তা আমাকে জ্বালিয়েছে।

মায়া হেসে বলল—

মায়া: — তুইও তো কম যাস না!

হিমু: — চুপ কর!

দুজন গল্প করতে করতে ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

ক্লাসে ঢুকে হিমু নিজের জায়গায় বসে ব্যাগ থেকে বই বের করল।

মায়া অবাক হয়ে তাকাল।

মায়া: — কী ব্যাপার? আজ নিজে থেকে বই বের করছিস?

হিমু: — কেন? আমি কি পড়াশোনা করি না?

মায়া: — তোর মুখে এই কথা শুনে আমার খুব অবাক লাগছে।

হিমু: — কাল জিসান ভাই পড়িয়েছেন। আজ একটু পড়া দেখে এসেছি।

মায়া: — বাহ! তাহলে তো জিসান ভাইকে আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।

হিমু: — মায়া!

মায়া হেসে ফেলল।

ঠিক তখনই ক্লাসের ঘণ্টা বেজে উঠল।

শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশ করতেই সবাই নিজেদের জায়গায় সোজা হয়ে বসল।

হিমুও বই খুলে মনোযোগ দিল।

আজ সে ঠিক করেছে, জিসান ভাইয়ের কাছে আর বকা খাবে না।

কিন্তু তার এই সিদ্ধান্ত কতক্ষণ টিকবে, সেটা অবশ্য সময়ই বলে দেবে।

সাদা অ্যাপ্রন পরে নিজের চেম্বারে বসে আছে জিসান।

সামনে কয়েকটি মেডিকেল রিপোর্ট রাখা। সে মনোযোগ দিয়ে সেগুলো দেখছে।

এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল।

— স্যার, আসতে পারি?

জিসান: — আসুন।

একজন নার্স ভেতরে এসে বলল—

নার্স: — স্যার, আপনার পরের রোগী অপেক্ষা করছেন।

জিসান: — পাঠিয়ে দিন।

নার্স চলে যেতেই জিসান আবার রিপোর্টের দিকে মনোযোগ দিল।

কয়েক মুহূর্ত পর দরজা খুলে একজন রোগী ভেতরে প্রবেশ করলেন।

জিসান চেয়ার থেকে উঠে রোগীকে বসতে বলল।

তার কণ্ঠ শান্ত, মুখ গম্ভীর।

জিসান: — বলুন, কী সমস্যা হচ্ছে?

রোগী নিজের সমস্যার কথা বলতে শুরু করলেন।

জিসান মনোযোগ দিয়ে সব শুনল।

কিছুক্ষণ পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার পরামর্শ দিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখে দিল।

কাজ শেষ করে সে ঘড়ির দিকে তাকাল।

তারপর ফোন হাতে নিয়ে হিমুর নম্বরে কল করল।

ক্লাস চলায় হিমু ফোন ধরল না।

জিসান ফোনটা নামিয়ে রেখে নিজের মনেই বলল—

জিসান: — নিশ্চয়ই ক্লাসে আছে।

তারপর আবার কাজে মন দিল।

দুপুর ১টা ৩০ মিনিট

টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই হিমু আর মায়া ক্লাস থেকে বেরিয়ে এল।

মায়া: — চল, ক্যান্টিনে যাই।

হিমু: — চল।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

হঠাৎ মায়া বলল—

মায়া: — আচ্ছা, আজ স্কুল শেষে কোথাও যাবি?

হিমু: — কোথায়?

মায়া: — একটু ঘুরতে।

হিমু: — আজ পারব না। বাসায় ফিরতে হবে।

মায়া: — কেন?

হিমু: — জিসান ভাই বলেছেন, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করতে হবে।

মায়া কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হেসে বলল—

মায়া: — তোর জীবন তো এখন জিসান ভাইয়ের রুটিনে চলছে!

হিমু: — আর বলিস না!

দুজন হাসতে হাসতে ক্যান্টিনে ঢুকে গেল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 8 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন