#শুকনো_পাতার_নূপুর_পায়ে
#আয়েশা_রিন
#পর্ব৫৭
[কপি ও রিপোস্ট করা থেকে বিরত থাকবেন]
তুরান কোনোমতে ইরানকে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে এল। দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে সে ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকে দিল। থরথর করে কাঁপতে থাকা ইরানকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিয়ে সে বলল,
“ভয় পাস না। কিচ্ছু হবে না... সীমান্ত ভাইয়া এক্ষুনি খবর পেয়ে চলে আসবে। ও সব ঠিক করে দেবে!”
ইরান ফুঁপিয়ে উঠল,
“ওরা চাচাকে মেরে ফেলেছে, আপা! চাচার মাথাটা... চোখের সামনে ওরা চাচাকে কে//টে আলাদা করে দিল! ভাইয়া যখন জানবে, কীভাবে সহ্য করবে?”
মেয়েটার আর্তনাদের রেশ ফুরোবার আগেই হঠাৎ বাইরে থেকে রূপালি বেগম আর সোহানা বেগমের বুকফাটা চি/ৎ/কারে চারপাশটা কেঁপে উঠল। শব্দ কানে যেতেই তুরান আর ইরান আঁতকে উঠল। দরজার দিকে ছুটে যেতে চাইল তুরান,
“আমার মাকে... ওরা আমার মাকেও শেষ করে দিল! আল্লাহ...”
কিন্তু ইরান তুরানের কোমর জড়িয়ে পেছন থেকে খপ করে আটকে ধরল,
“যেও না, আপু! যেও না! বাইরে বের হলে ওরা আমাদেরও কে/টে ফেলবে!”
অসহায় দুই বোন ঘরের এক কোণে মেঝেতে বসে পড়ল। দম বন্ধ করা এক আতঙ্কে কেটে যেতে লাগল প্রতিটা মুহূর্ত। ঠিক এই নিস্তব্ধতার বুক চিরে হঠাৎ করেই দরজায় আছড়ে পড়ার শব্দ হলো। ধড়াস ধড়াস করে কেউ বাইরে থেকে মত্ত প/শুর ন্যায় দরজা ধাক্কাতে শুরু করল।
ভয়ে ইরানের মুখের ভেতর থেকে কাফাসা শব্দ বেরিয়ে এল, সে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল আরও জোরে। তুরান তক্ষণাৎ নিজের একটা হাত দিয়ে ইরানের মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে শক্ত গলায় সান্ত্বনা দিল,
“চুপ! শব্দ করবি না, ভয় পাবি না একদম। আমি আছি না তোর সঙ্গে? কিচ্ছু হবে না!”
চোখের জল মুছতে মুছতে ইরান ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুটে বলে উঠল,
“ওরা আমাদের কাউকেই বাঁচতে দেবে না, আপা... সবাইকে মেরে ফেলবে ওরা!”
তুরান নিজের চোখের জল লুকিয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসাল,
“কাঁদিস না সোনা বোন আমার। তোর কিচ্ছু হবে না, আমি থাকতে কেউ তোর গায়ে হাত তুলতে পারবে না।”
সান্ত্বনার বাণী বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল দরজার ছিটকিনি। হুড়মুড় করে একাধিক ভারী পায়ের আওয়াজ তুলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করল একদল র/ক্তপিপাসু মানুষ।
তাদের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সেই পরিচিত মুখটি। শহরের সেই মধ্যবয়স্ক কুখ্যাত লোকটা, যে এর আগেও বহুবার তাদের বাড়িতে এসে জমি লিখে দেওয়ার জন্য নানা হুমকি ও চাপ দিয়ে গেছে। তুরানের ঠিক নামটা হয়তো তার জানা নেই, কিন্তু লোকটার এই কদাকার, লোলুপ চেহারা আর কুৎসিত চাহনি তুরানের মর্মে মর্মে চেনা।
লোকটা ঠোঁটে বিকৃত হাসি ঝুলিয়ে, হাতের র//ক্তমাখা অস্ত্রটা মেঝেতে ঘষতে ঘষতে এগিয়ে আসতে লাগল তাদের দিকে। ঘরের আবছা আলোয় তার মুখে ভেসে উঠল এক ন//রপিশাচের অবয়ব। শ//য়তানের মতো দাঁত বের করে সে বিকৃত উল্লাসে বলে উঠল,
“এই তো মামণি! অবশেষে তোদের খুঁজে বের করলাম!”
লোকটার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই দুই বোনের গায়ের র//ক্ত যেন জমে বরফ হয়ে গেল। লোকটার লালসাভরা দৃষ্টি পরখ করল তুরানের নতুন বউ সাজানো পুরো শরীরে। পেছনের সাঙ্গোপাঙ্গরা তেড়ে এসে তাদের ধরে ফেলতে উদ্যত হতেই তুরান এক ঝটকায় ইরানকে নিজের পেছনে শক্ত করে আড়াল করে দাঁড়াল। দুই চোখ দিয়ে তার তখন আগুন ঝরছে, অথচ ভেতরে ভেতরে বুক কাঁপছে থরথর করে।
“খবরদার! এক পা এগোবেন না! দূরে থাকুন বলছি! কী চান আপনারা? কেন এমন বন্য পশুর মতো র//ক্ত নিয়ে খেলছেন?”
লোকটা কুৎসিত দাঁত বের করে বি/কৃত হাসিতে ফেটে পড়ল। লোভাতুর কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল,
“তোকে চাই মামনী, তারপর তোদের এই পুরো বাড়িটা।”
পায়ের তলার মাটি সরে গেল তুরানের। সারা শরীর যেন অবশ হয়ে আসছে। লোকটা ঠিক কী বোঝাতে চাইছে? এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে ওরা যদি সত্যিই কোনো পাশবিকতা চালায়, তবে সে কীভাবে রক্ষা করবে নিজেদের? নিজের কথা তো দূর অসীমে, এই মুহূর্তে তার সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে কেবল ছোট বোন ইরানের জন্য আতঙ্ক কাজ করছে। নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভয় হচ্ছে এই নিষ্পাপ মেয়েটার জন্য। লোকটা পাশ ফিরে তার সাথের লোকগুলোকে আদেশ দিল,
“এই ছোটটাকে ধরে নিয়ে যা তো! বাইরে নিয়ে গিয়ে টু//করো টু//করো করে কেটে ফেল!”
আদেশ শোনা মাত্রই ইরান ভয়ে তুরানের কোমর জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো ফুঁপিয়ে উঠল। লোকটা নিজে এগিয়ে এসে তুরানের গালে সজোরে একটা চ/ড় বসিয়ে দিল! চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল তুরানের। ছিটকে গিয়ে সে লুটিয়ে পড়ল বিছানার ওপর। সুযোগ বুঝে বাকি ন/রপিশাচগুলো ইরানকে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে মুখ চেপে ধরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় বাইরের দিকে।
বাইরে থেকে ইরানের কান্নার আর্তনাদ ভেসে আসছে,
“আপু! আমাকে বাঁচাও! ওরা আমাকেও কে//টে ফেলবে, আপু... আপু গো!”
মেয়েটার বুকফাটা কান্নার শব্দ একপর্যায়ে হঠাৎ করেই যেন কেমন যেন থেমে গেল, হয়তো লোকগুলো ওর মুখে হাত চাপা দিয়ে শক্ত করে আটকে ধরেছে। অসহনীয় দৃশ্য দেখে তুরানের মাথার ভেতরটা দাউদাউ করে জ্ব/লে উঠল। ঝড়ের বেগে বিছানা ছেড়ে উঠে বসল সে। তার আতঙ্কগ্রস্ত মস্তিষ্ক মুহূর্তের মধ্যে টের পেয়ে গেল এই ন/রপিশাচটা ঠিক কী করতে চলেছে তার সঙ্গে।
লোকটা তার দানবীয় মূর্তি নিয়ে একে একে তার শরীরের শার্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে কামার্ত হাসিতে এগিয়ে আসছে বিছানার দিকে। বিকৃত উল্লাসে সে দাঁত বের করে বলল,
“তোর ভাইকে অনেক বুঝিয়েছি। মাথায় তুলে বুঝিয়েছি। সে তো আমাদের পাত্তা দিল না। আজ তার সাধের হবু বউকে আদর দিয়ে, তাকে চিরদিনের মতো শিক্ষা দেব!”
সর্বস্ব হারানোর চরম মুহূর্তে তুরান নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে প্রতিবাদের শেষ চেষ্টা করল,
“আল্লাহর দোহাই লাগে... আপনি আমার বাবার বয়সি একজন মানুষ! নিজের মেয়ের বয়সি একটা মেয়ের সঙ্গে এমন পাশবিকতা করতে পারেন না, আপনার বিবেক কি একটুও কাঁপছে না?”
পৈশাচিক অট্টহাসিতে ঘর কাপিয়ে দিয়ে দাঁত চেপে বলল লোকটা,
“বিবেক? তোর এই রূপের বাজারে বিবেকের কোনো দাম নেই রে!”
বলেই সে দানবের মতো তুরানের ওপর ঝাঁ/পিয়ে পড়ল। হিংস্রভাবে সে তুরানের মাথার লাল ওড়নাটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল। কানের অলংকার দুটো দুই আঙুলে খপ করে ধরে এমন জোরালো টানে টেনে ছিঁড়ল যে মনে হলো কান ছিড়ে রক্ত ঝরে পড়বে। যন্ত্রণায় তুরান ‘আল্লাহ!’ বলে আকাশফাঁটা আর্তনাদ করে উঠল।
লোকটা যখন তার লালসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তুরানের বিয়ের লাল পোশাকের আঁচল ও কুঁচিতে হাত লাগাতে চাইল, ঠিক তখনই তুরান চোখ বন্ধ করে লোকটার প্যান্টের কোমরে গোঁজা থাকা ধারালো চা/কুটা ছোঁ মেরে টেনে বের করে ফেলল! সময় নষ্ট না করে সেকেন্ডের ভেতর সমস্ত শক্তি দিয়ে লোকটার পু/রু/ষাঙ্গে সরাসরি সজোরে চা//কুটা বসিয়ে দিল!
আ/ঘাতটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ও মর্মান্তিক ছিল যে লোকটা যন্ত্রণায় উচ্চস্বরে আর্তনাদ করে পেছনের দিকে কুঁকড়ে গেল লোকটা। তুরান সেখানেই থামল না; বিদ্যুৎগতিতে সেই ধারালো চা/কুটা সেখান থেকে বের করে বসিয়ে দিল লোকটার ঘাড়ে ও কাঁধের সংযোগস্থলে!
র/ক্তের ফোয়ারা ছুটিয়ে লোকটা দ্বিতীয়বারের মতো গগনবিদারি চি/ৎকারে বিছানার একপাশে লুটিয়ে পরল। কিন্তু জ্ঞান হারানোর আগে নরপিশাচটা রাগে অন্ধ হয়ে তার শেষ শক্তিতে তুরানের দিকে হাত বাড়িয়ে সেই চা/কুটা টেনে একেবারে তুরানের বুকে গেঁথে দিল।
সবকিছু…একদম সবকিছু কয়েক সেকেন্ডের ভেতর যেন ঘটে গেল।
মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত নেমে এল তুরানের। মৃ/ত্যুর শীতল ছোঁয়া টের পেল, তবুও তার মুখে কোনো ভয় বা পরাজয়ের ক্লান্তি নেই। বুকের ভেতর থেকে বয়ে চলা তীব্র যন্ত্রণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সে রক্তমাখা ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক করে এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি হাসল।
লোকটার চোখে চোখ রেখে র/ক্তমাখা গলায় সে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ জান দিয়ে দেব; তবু ইজ্জত দেব না, জা**নোয়ার!”
বাক্যটা শেষ হতেই লোকটা তুরানের নিথরপ্রায় শরীরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে আরও একবার চা//কু চালিয়ে দিল। যন্ত্রণার তীব্র ঢেউ ছাপিয়ে তুরানের মুখের ভেতর থেকে তখন কেবল দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছু বের হচ্ছে না।
ওদিকে র//ক্তে ভেসে যাওয়া উঠোনে যখন পা রাখল সীমান্ত, তখন তার পৃথিবী পুরোটা নড়ে উঠল। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই অবর্ণনীয় বিভীষিকা দেখে তার মাথাটা ঘুরে গেল, ফুসফুসের বাতাস যেন এক লহমায় আটকে গেল গলায়। বাবা আর মায়ের শরীর থেকে মা/থাটা আ/লাদা হয়ে পড়ে আছে মাটিতে, চাচীর নিথর দেহটা র/ক্তে ভেসে যাচ্ছে, আর পাশে গুরুতর আ/হত অবস্থায় পড়ে আছেন চাচা সুলতান সাহেব। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার উপক্রম হওয়া সুলতান সাহেব পাগলের মতো নিজের স্ত্রীর মৃ/তদেহ জড়িয়ে ধরে অস্পষ্টস্বরে ডাকছেন। সীমান্তের ইচ্ছা করল চিৎকার করে কাঁদতে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেতর থেকে ভেসে এল একটা চাপা, দমবন্ধ করা আর্তনাদ। তুরান আর ইরানের কথা বিদ্যুতের মতো চমকে উঠল সীমান্তের মাথায়। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সে ঝড়ের বেগে ছুটে গেল তুরানের রুমের দিকে। ঘরের ভেতর পা রাখতেই দেখল সেই ন/রপিশাচ লোকটা রক্তাক্ত শরীরে তুরানের ওপর আংশিক ঝুড়ে পড়ে আবারও একটা মারাত্মক আ/ঘাত হানার জন্য চা/কু উঁচিয়ে ধরেছে।
দেখা মাত্রই সীমান্ত দমকা হাওয়ার বেগে গিয়ে লোকটার পিঠে লা/থি মারল! ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল লোকটা, তার নিজের শরীরটাও ততক্ষণে তুরানের আ/ঘাতে র/ক্তাক্ত হয়ে গেছে। এদিকে ঝাপসা হয়ে আসা চোখে সীমান্তের মুখখানা দেখতে পেতেই তুরানের প্রায় চলে যাওয়া প্রাণটুকু যেন এক পলকে ফিরে এল। ঠোঁটে রক্তমাখা হাসি ফুটিয়ে সে অস্ফুটে, ভাঙা গলায় বলল,
“ও... ও আমার সম্মান কেড়ে নিতে চেয়েছিল, ভাইয়া...আমি ওকে ছেড়ে দিইনি, নিজের হাতে শাস্তি দিয়েছি...”
“তুরান... তুরান! তুই কি ঠিক আছিস?” বলতে বলতেই সীমান্তের চোখ আটকে গেল তুরানের বুকের গভীর ক্ষতে। পুরো বুকটা তখন র/ক্তে ভেসে যাচ্ছে। আর ওদিকে মেঝেতে পড়ে থাকা লোকটা গোঙাতে গোঙাতে আবারও তেরছাভাবে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
দেরি না করে সীমান্ত তুরানকে পাজা কোলে তুলে নিল এবং ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“তুরান! বল, ইরান কোথায়?”
বহু কষ্টে তুরান ফিসফিস করে জানাল,
“ওরা... ওরা ইরানকে কোথায় যেন নিয়ে গেছে। প্লিজ, আমার বোনটাকে বাঁচান...”
বাইরের দিক থেকে তখন পিশাচগুলোর হইচই আর খোঁজ নেওয়ার শোরগোল কানে ভেসে আসছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সীমান্ত তুরানকে পাজা কোল থেকে খুব সাবধানে কাধে ঝুলিয়ে নিল; আর তার অন্য হাত দিয়ে মেঝেতে র/ক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা চাচা সুলতান সাহেবকে হেঁচকে এক টানে টেনে তুলল। দাঁতে দাঁত চেপে সে কঠোর গলায় বলে উঠল,
“এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা যাবে না, চাচা। আমাদের যেভাবেই হোক পালাতে হবে। চলুন!”
কিন্তু আপনহারা সুলতান সাহেব যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন,
“না! আমি আমার স্ত্রীকে একা ফেলে কোথাও যাব না!”
সীমান্তের নিজের বুক তখন কান্নায় ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল, তবুও সে নিজেকে পাথর বানিয়ে কঠিন গলায় বলল,
“ওরা মা/রা গেছে, চাচা! ওরা আর নেই! ওদের আর ফিরিয়ে আনা যাবে না! আমাদের বাঁচাতে হলে এখনই এখান থেকে পালাতে হবে!”
সুলতান সাহেব যেতে না চাইলেও সীমান্ত তুরানকে কাঁধে বহন করেই সে এক হাতে জখম চাচাকে জোর করে টেনে তুলল। রাতের অন্ধকারেই তাদের নিয়ে ছুটল অজানা এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
বাড়ির প্রধান ফটক পেরিয়ে বাইরে পা রাখার আগে শেষবারের মতো পেছনের দিকে চোখ ফিরিয়ে তাকাল সীমান্ত। চোখের সামনে তখন ছবির মতো ভেসে উঠল পারিবারিক জীবনের চেনা সেই টুকরো টুকরো স্মৃতি। মায়ের যত্নে, বাবার রাগী অথচ গভীর ভালোবাসার শাসন, আর চাচীর স্নেহের চাদরে জড়িয়ে থাকা দিনগুলো। চোখের পলকে চোখের সামনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল! এক নিমেষে সব শেষ!
তারা যখন বাড়ির ফটকের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন অন্ধকার ভেদ করে দুই-একজন স/ন্ত্রাস তাদের গতিবিধি টের পেয়ে তেড়ে এল। সময় নষ্ট না করে সীমান্ত ছুটতে শুরু করল; তার ঠিক পেছনেই জখম শরীর নিয়ে কোনোমতে পা টেনে টেনে দৌড়াচ্ছেন চাচা সুলতান সাহেব।
একটু দূরে চলে যেতেই সাময়িকভাবে লোকগুলোর দৃষ্টি এড়ানো সম্ভব হলো বটে, কিন্তু পায়ের আওয়াজ আর গলার আওয়াজ ইঙ্গিত দিল যে ওরা পিছু ধাওয়া করছে। সামনেই একটা ঘন জঙ্গলের ঝোপঝাড় দেখতে পেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওরা সেখানে লুকিয়ে পড়ল। ততক্ষণে অতিরিক্ত র/ক্তক্ষরণে তুরানের জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয়েছে। সে আর নিজের ওজন ধরে রাখতে পারছে না দেখে সীমান্ত তাকে খুব সাবধানে ঘাসের ওপর শুইয়ে দিল।
ঝোপের অন্যপাশ থেকে আচমকা দৌড়ে এসে সীমান্তকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল ইরান,
“ভাইয়া! তুমি এখানে?”
হাঁপাতে হাঁপাতে সীমান্ত ফিসফিস করে বলল,
“তুই... তুই এখানে কীভাবে এলি?”
ইরান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল,
“ওই লোকগুলো আমার গায়ে হাত তুলতে চেয়েছিল... আমি সুযোগ বুঝে পালিয়ে এসে এখানে লুকিয়েছি। ওরা এই আশপাশেই আছে, যেকোনো মুহূর্তে এখানে চলে আসবে! আমাদের এখনই এখান থেকে পালাতে হবে।”
“ভয় পাস না, কিচ্ছু হবে না।” বলেই সীমান্ত তুরানকে আবার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু তুরান তার দুর্বল হাত দিয়ে বাধা দিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“আপনারা... আপনারা এখান থেকে চলে যান। ইরান আর বাবাকে বাঁচান, ভাইয়া, প্লিজ! আমার... আমার মনে হয় সময় ফুরিয়ে আসছে। আপনারা চলে যান, আপনারা বাঁচুন!”
তুরানের দু’গাল নিজের শক্ত হাতে চেপে ধরে ধমকের সুরে বলে উঠল সীমান্ত,
“চুপ কর! কিচ্ছু হবে না তোর। চুপচাপ আমার সঙ্গে চল।”
তুরান বাধা দিল না। সে বড্ড ক্লান্ত, বড্ড দুর্বল। অন্ধকারের মাঝেই মৃ/ত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে সে তার কাঁপাকাঁপা হাত দুটো বাড়িয়ে দিল সীমান্তের মুখের ওপর। চোখ দুটো কোনোমতে মেলে সে তাকিয়ে রইল সেই মানুষটির পানে, যাকে সে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিল। ভাঙা, ক্ষীণ গলায় বলে উঠল,
“আপনাকে খুব ভালোবাসি, সীমান্ত! আমায় কোনো দিন ভুলবেন না! কখনো না...”
সীমান্তের গলাটা অসহায়ত্বে আটকে গেছে, সে কোনোমতে ফুঁপিয়ে বলে উঠল,
“তুরান! তোর কিচ্ছু হবে না, একটুও না...”
তুরান নিজের সমস্ত শক্তিটুকু জড়ো করে একটু উঁচুতে উঠে সীমান্তের গলা জড়িয়ে ধরল। নিভে আসা চোখের পলকগুলো ভারী হয়ে এল তার। অস্ফুটে মিনতি করে বসল সে,
“আমার... আমার শ্বাস ফুরিয়ে আসছে, ভাইয়া... অন্তত একবার বলুন না, আপনিও আমাকে ভালোবাসেন?”
“ভালোবাসব তোকে। অনেক ভালোবাসব! তোর কোনোদিন কোনো কষ্ট হতে দেব না, তুই শুধু চোখ খোলা রাখ তুরান…!”
তুরান শেষবারের মতো একটা বড় ও গভীর শ্বাস টানল। মানুষটা তবু বলল না সে তুরানকে ভালোবাসে। তার ঠোঁটের কোণে যেন ঝুলে রইল অভিমানী রেখা। ফিসফিস করে বলল,
“তাহাজ্জুদে চেয়েও আপনার নামে ‘কবুল’ বলা হলো না... এই আক্ষেপ আমার পরকালেও থেকে যাবে...”
সীমান্ত ধমকে উঠল,
“বেশি বড় বড় কথা বলছিস তুই! মা/র খাবি আমার হাতে! চল আমার সঙ্গে, হাসপাতালে যেতে হবে!”
বলে সে তুরানকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য আবারও তাকে টানল। কিন্তু মেয়েটার শরীরটা হুট করে বড্ড বেশি ভারী ঠেকলো সীমান্তের কাছে। তার নিজের হাত-পা গুলোও কেমন যেন অসাড় ও অবশ হয়ে আসছে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক ফাঁকা শূন্যতায় হাহাকার করে উঠল। তুরানকে আবার আলতো করে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে উন্মাদের মতো ডাকল,
“এই মেয়ে! এই, আমার দিকে তাকা! তুরান... তুরান আমার দিকে চোখ খোল!”
কিন্তু তুরান আর তাকাল না। শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। ইরান তুরানের নিথর শরীরের ওপর আছড়ে পড়ে ভেঙে পড়ল,
“আপু! আপু, ও আপু, চোখ খোল না! তুই না সীমান্ত ভাইয়াকে বিয়ে করবি বলেছিলে? তার বউ হবি না? আজ না তোর বিয়ের দিন! তাহলে আজ তুই এমন করে শুয়ে আছিস কেন, আপু? দেখ, ভাইয়ার গায়ে এখনো বিয়ের শেরওয়ানি... সে তোর স্বামী সেজে তোর পাশেই বসে আছে দেখ!”
তুরান আগের মতোই চুপচাপ শুয়ে রইল। ইরান পাগলের মতো আবার কেঁদে উঠল,
“সারাজীবন যা চেয়ে গেলি—আজ নিজের বিয়ের দিনে এমন করছিস কেন, আপু? তাকাস না কেন আমার দিকে! এমন অবুঝের মতো করিস না...”
সীমান্ত স্তব্ধ হয়ে নিজের পরনের বিয়ের সাজের শেরওয়ানিটার দিকে একবার তাকাল। তারপর চোখ গেল তুরানের নিথর দেহের ওপর। সিনেমার স্ক্রিনের মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল তুরানের সঙ্গে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত। তার সেই ছোট্ট ছোট্ট আবদার, যত্ন, দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে সীমান্তকে দেখার চেষ্টা, স্বাভাবিক কথাবার্তায় লজ্জা রাঙা মুখ আর মিষ্টি হাসি। এমনকি এর বাইরে ভেসে উঠল তুরানের শৈশবটাও। এই মেয়েটার শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সীমান্ত জড়িয়ে ছিল। সীমান্তর সঙ্গে হাত ধরে ঘুরতে যাওয়া, এক থালায় খাবার খাওয়া, এক ছাদের নিচে বড় হয়ে ওঠা একটা মেয়ে তাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসত! আর এই কয়েকদিনে সে কতবার নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছে!
সীমান্তের দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল সমুদ্রসমান জল। নিজেকে সামলাতে না পেরে তুরানের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া নিথর হাতটা নিজের মুঠোয় দাঁত চেপে বলল,
“কে নেবে রে আমার এত যত্ন? এত খেয়াল আর কেউ রাখবে না, তুরান! এই মেয়ে... চোখ খোল তুই! প্লিজ একটা বার চোখ খোল...”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুলতান সাহেব তখন পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে মেয়ের নিথর ম/রদেহের দিকে তাকিয়ে আছেন। একটু আগে একই ভাবে নিজের স্ত্রী, ভাই এবং ভাইয়ের স্ত্রীর ম/রদেহ সে দেখে এসেছে।
ইরানের কান্নার আওয়াজটা রাতের নীরবতা চিরে দূর থেকে ভেসে আসতেই টের পেল সন্ত্রাসীরা তাদের এই গোপন আস্তানার দিকেই এগিয়ে আসছে!
সীমান্ত দ্রুত ইরানের মুখের ওপর হাত চেপে কঠোর গলায় ফিসফিস করে বলল,
“চল এখান থেকে, ইরান।”
ইরান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে তুরানের কাপড় খামচে ধরে বলল,
“না! আমি আমার আপাকে এখানে ফেলে কোথাও যাব না, ভাইয়া!”
“চল বলছি! ওরা এসে পড়লে আমাদের কাউকেই বাঁচতে দেবে না!” বলে সীমান্ত নিজের এক হাত দিয়ে ইরানকে শক্ত করে টেনে তুলল। কিন্তু তার ডান হাতটা তখনও তুরানের নিথর আঙুলের সঙ্গে আটকে থাকছে।
বুকটা মুচড়ে র/ক্তক্ষরণ হলো সীমান্তের। তুরানকে এই অন্ধকার জঙ্গলে ওই অবস্থায় একা ফেলে চলে যেতে মন চাইছে না। বারবার তার মনে হচ্ছে, এই মেয়েটি তো একটু আগেও তার কাঁধে মাথা রেখে তাকে ভালোবেসে গেছে, তার জন্য নিজের জীবনটা পর্যন্ত উজাড় করে দিয়েছে। তাকে সে কীভাবে এই ন/রপিশাচগুলোর থাবায় অরক্ষিত ফেলে রেখে যায়? কিন্তু উপায় নেই। নিজের জীবন্ত বোন আর আহত চাচাকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় এই মুহূর্তের পলায়ন।
দ্বিধাদ্বন্দ্বের সঙ্গে লড়াই করে সে আবারও তুরানের নিথর দেহটাকে কাঁধে তুলে নিল। এরপর জখম চাচা সুলতান সাহেবকে নিয়ে কোনোমতে সামনে থাকা ইরানকে সঙ্গে করে আবার ছুটতে শুরু করল।
কিন্তু মানুষের শরীরের সহনশীলতারও তো একটা সীমা আছে! কয়েক মিনিট দৌড়ানোর পরেই সীমান্তের পায়ের পেশিগুলো যেন অবশ হয়ে এল। ফুসফুসে আর বাতাস মিলছে না, চোখে অন্ধকার নেমে আসছে। সামনে এসে পড়ল একটা পরিচিত মসজিদ প্রাঙ্গণ। লোকগুলোর হাত থেকে তুরানের পবিত্র শরীরটাকে কোনোমতে রক্ষা করার জন্য সীমান্ত তুরানকে নামিয়ে মসজিদের বারান্দার একটা আড়ালে শুইয়ে দিল। ইরান তখনো বাবাকে এক হাতে টেনে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে সামনে এগোচ্ছে। তুরানকে রেখে সীমান্তও ঘুরে দাড়াল। তবে বুকটা কেমন মুচড়ে উঠল ফের। সে শেষবারের মতো তুরানের নিথর দেহের ওপর ঝুঁকে পড়ল। মেয়েটার বরফশীতল কপালে নিজের কপালটা ঠেকিয়ে তার দুই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জলে তুরানের মুখ ভিজিয়ে দিল। রুদ্ধশ্বাসে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“আই অ্যাম সরি, তুরান... আমায় মাফ করে দিস! তোকে নিজের করে নেওয়া হলো না। পারিনি আমি তোকে ভালোবাসতে!”
বলেই সে নিজেকে পাথর বানিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছন ফিরে আর তাকাল না। চাচা আর ইরানকে নিয়ে সে যখন দৌড়ে মূল সড়কে এসে পৌঁছাল, ভাগ্যক্রমে সেখানে একটা রাতের দূরপাল্লার বাস দাঁড়িয়ে ছিল। কোনো কিছু না ভেবেই তারা হুড়মুড় করে সেই চলন্ত বাসে উঠে পড়ল।
বাসটা মুহূর্তের মধ্যে গতি বাড়িয়ে অন্ধকার চিরে মিলিয়ে গেল দূরে। আর পেছনে, সেই নীরব মসজিদ প্রাঙ্গণের অন্ধকার কোণে পড়ে রইল তুরানের র/ক্তাক্ত, নিথর দেহটি। নতুন লাল শাড়িতে মোড়ানো মেয়েটার মুখটা মৃ/ত্যুর পরও কেমন যেন একটা অভিমানী হয়ে আছে; যেন জীবনযুদ্ধে সব হারিয়েও সে নিভৃতে অভিযোগ করে যাচ্ছে ভাগ্যের সঙ্গে। অথচ কী অদ্ভুত পরিহাস! যে মানুষটিকে ভালোবেসে সে নিজের সর্বস্ব সমর্পণ করে দিয়েছিল, যার নামের পাশে নিজের নামটা জুড়ে দেওয়ার জন্য সে জীবনের শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়াই করল আজ মৃ/ত্যুর ওপারে গিয়েও সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সান্নিধ্য বা হৃদয়ে নিজের চিরস্থায়ী নামটা লিখে যাওয়ার ছোট্ট আশাটিও তার অপূর্ণই রয়ে গেল।
———
The tragic chapter of Turan's journey comes to its end. আগামী অংশ অনেক বড় হবে, তাই আজকের পর্ব এতটুকুই। রেসপন্স পূর্ণ করে ফেলুন দ্রুত চলে আসবে।
চলবে...