ওগো মেঘলা আকাশ একলা
লেখিকা : পুতুল
পর্ব, ৮
অপরিচিত নম্বর থেকে আসা সেই রহস্যময় মেসেজটা স্ক্রিনে ভেসে ওঠার পর থেকেই ডাক্তার আকাশ চৌধুরীর মাথার ভেতর যেন একটা ঝড় বইতে শুরু করেছে। "মেঘলাকেও সাথে আনতে ভুলো না যেন!"—এই একটি লাইন আকাশের ভেতরের পজেসিভনেস আর সুরক্ষাবোধকে এক নিমেষে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সে তার হাতের মুঠোয় ফোনটা এমনভাবে চেপে ধরল যে হাতের রগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। চোখ দুটো রাগে ও চিন্তায় লাল। একজন সিনিয়র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হিসেবে সে বহু জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, কিন্তু এই প্রথম নিজের পরিবারের সুরক্ষার প্রশ্নে তার বুকটা কেঁপে উঠল।
তবে সে দুর্বল হতে চাইল না। চোয়াল শক্ত করে সে মেসেজটি ডিলিট না করে সেভ করে রাখল।
হসপিটালের স্পেশাল কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে আয়েশা চৌধুরী ছেলের এই অস্বাভাবিক গম্ভীর ও থমথমে মুখটা লক্ষ্য করলেন।
তিনি আকাশের কাছে এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরে বললেন, "কী হয়েছে আকাশ? তোর মুখটা এমন শুকিয়ে গেল কেন রে বাবা? কোনো খারাপ খবর এসেছে?"
আকাশ নিজেকে সামলে নিয়ে মায়ের মুখে একটা জোরপূর্বক আশ্বাসমাখা হাসি ফুটিয়ে তুলল। সে মায়ের হাতটা হালকা চাপ দিয়ে বলল, "না আম্মু, হসপিটালের একটা ইমার্জেন্সি কেসের মেসেজ। তুমি চিন্তা কোরো না।
আর আব্বুকে বলো একদম ভেঙে না পড়তে। ফুঁপির সব রিপোর্ট আমি নিজে আবার খতিয়ে দেখছি। তোমরা কেবিনে গিয়ে বসো, আমি একটু আসছি।"
বাবা-মাকে কেবিনের ভেতরে পাঠিয়ে আকাশ হনহন করে হেঁটে চলে গেল হসপিটালের প্যাথলজি ল্যাবের দিকে। ল্যাবের চিফ ডক্টরকে ডেকে সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ফুঁপির রক্তের প্রতিটি প্যারামিটার আবার চেক করাল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, কোনো মেডিকেল সায়েন্স বা বিষক্রিয়ার লক্ষণ রিপোর্টে ধরা পড়ছে না। অথচ রাজিয়া বেগমের অর্গানগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। আকাশ ল্যাবের চেয়ারে বসে দুই হাতের তালুতে মুখ ঢাকল। মনে মনে ভাবল, "তবে কি এই অসুস্থতার পেছনে সত্যিই কোনো অতিপ্রাকৃতিক বা কোনো গভীর ষড়যন্ত্র জড়িয়ে আছে?
আর সেই রহস্যের চাবিকাঠি কি সত্যিই পুরান ঢাকার ওই পুরোনো রাজবাড়িতে?"
সময় যেন আজ ডানা মেপে উড়ছে। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে দুপুর একটা পার হতেই আকাশের মনটা ছটফট করে উঠল। মেঘলার কলেজ ছুটি হতে আর মাত্র আধা ঘণ্টা বাকি। আকাশ আর এক মুহূর্তও হসপিটালে বসে থাকতে পারল না। সে তার অ্যাপ্রনটা খুলে কেবিনের আলনাতে রাখল এবং হসপিটালের অন্য ডিউটি ডাক্তারকে ফুঁপির দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে দ্রুত গ্যারেজের দিকে নেমে গেল।
তার নীল রঙের ঝকঝকে রোলস রয়্যালস গাড়িটি যখন হসপিটালের গেট পেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠল, তখন আকাশের পুরো মনোযোগ ছিল শুধু একটা মানুষের ওপর—মেঘলা।
ঠিক দুপুর একটা বেজে চল্লিশ মিনিটে মেঘলাদের কলেজের গেটের সামনে এসে গাড়িটা থামল। গেটের বাইরে তখন ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়। মেঘলা তার বান্ধবীদের সাথে গল্প করতে করতে গেট দিয়ে বের হচ্ছিল। দূর থেকেই আকাশের চোখ দুটো মেঘলাকে খুঁজে নিল। তবে ঠিক তখনই আকাশের চোখ পড়ল মেঘলার ঠিক পেছনে হেঁটে আসা একটা ছেলের দিকে।
ছেলেটা মেঘলার খুব কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং হাসিমুখে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে।
লুকিং গ্লাসে এই দৃশ্য দেখামাত্রই আকাশের ভেতরে থাকা সেই প্রচণ্ড পজেসিভ পুরুষটা যেন জেগে উঠল। তার কপালে রাগের চওড়া ভাঁজ পড়ল। সে গাড়ির হর্নটা বেশ জোরে চেপে ধরল। হর্নের শব্দে মেঘলা চমকে সামনে তাকাল এবং আকাশের চেনা গাড়িটা দেখে তার মুখে একটা স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। সে বান্ধবীদের বিদায় জানিয়ে দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে এল।
মেঘলা পেছনের সিটের দরজা খুলতে যেতেই আকাশ ভেতর থেকে গম্ভীর গলায় বলল, "পেছনে নয় মেঘলা, সামনের সিটে এসে বসো।"
আকাশের গলার সেই গম্ভীর আর আদেশসূচক স্বর শুনে মেঘলা আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। সে চুপচাপ সামনের সিটের দরজা খুলে আকাশের পাশে এসে বসল। মেঘলা বসামাত্রই আকাশ গাড়ি স্টার্ট দিল এবং বেশ স্পিডেই গাড়িটি মেইন রোডের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল।
গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা তখন বেশ থমথমে। মেঘলা আড়চোখে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশের উজ্জ্বল শ্যামলা আর আকাশী রঙের চোখ এবং মুখটা রাগে থমথম করছে, স্টিয়ারিং ধরা হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আছে। মেঘলা কিছুটা ভয় পেয়ে আমতা আমতা করে বলল, "আকাশ , তুমি কি কোনো কারণে রেগে আছো? হসপিটালে কি ফুঁপির শরীর আরও খারাপ হয়েছে?"
আকাশ মেইন রোডের জ্যামে গাড়িটা ব্রেক করে মেঘলার দিকে পুরো ঘুরে বসল। তার তীব্র জোড়া চোখ সরাসরি মেঘলার চোখের ওপর রাখল। আকাশ খুব নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল, "কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় ওই ছেলেটা কে ছিল মেঘলা?
ও তোর এত কাছে এসে কী কথা বলছিল?"
মেঘলা আকাশের এই তীব্র চাউনি আর প্রশ্নে কিছুটা হকচকিয়ে গেল। সে ওড়নাটা একটু টেনে নিয়ে বলল, "ও তো আমাদের ক্লাসের মনিটর, রাজিন। ও জাস্ট কালকের অ্যাসাইনমেন্টের কথা জিজ্ঞেস করছিল আকাশ । আমি তো ওর সাথে বাড়তি কোনো কথাই বলিনি!"
আমি তোকে সকালে কী বলেছিলাম মেঘলা?" আকাশ আরও একধাপ এগিয়ে এল, তাদের মধ্যকার দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। আকাশের নিশ্বাসের উষ্ণতা মেঘলা নিজের গালে অনুভব করতে পারছিল।
আকাশ মেঘলার দুই কাঁধ আলতো কিন্তু দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে বলল, "কোনো ছেলের সাথে কথা বলবে না মানে বলবে না! অ্যাসাইনমেন্টের কথা হলে বান্ধবীদের থেকে জেনে নেবে। আমি কোনো ছেলের উপস্থিতি তোর আশেপাশে সহ্য করতে পারি না, ফুলটুসি। তুই শুধু আমার, এটা মাথায় রাখবি।"
আকাশের এই পজেসিভ ভালোবাসা আর তীব্র অধিকারবোধে মেঘলার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি হলো। তার চোখ দুটো লজ্জায় আর ভালোলাগায় নিজে থেকেই বুজে এল। সে কোনোমতে মাথা নেড়ে বলল, "আচ্ছা, আর কখনো কোনো ছেলের সাথে কথা বলব না।"
মেঘলার এই বাধ্য মেয়ের মতো রূপ দেখে আকাশের রাগী মুখটা মুহূর্তেই গলে একরাশ মায়ায় রূপ নিল। সে মেঘলার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে ওর কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট দুটো ছুঁইয়ে দিল। এক পরম ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দিয়ে আকাশ আবার স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখল।
গাড়ি যখন বাড়ির দিকে ছুটছে, তখন আকাশ লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলল, "মেঘলা, ফুঁপির অবস্থা ভালো না। ডাক্তার হিসেবে আমরা কোনো রোগ ধরতে পারছি না। কিন্তু আজ হসপিটালে একটা মেসেজ এসেছে।"
মেঘলা চট করে আকাশের দিকে তাকাল, "কীসের মেসেজ আকাশ ?"
আকাশ আর লুকিয়ে রাখল না। সে গাড়ি চালাতে চালাতেই বলল, "পুরান ঢাকার সেই পুরোনো রাজবাড়ি থেকে কেউ মেসেজ করেছে। ফুঁপিকে যদি বাঁচাতে হয়, তবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উনাকে সেই রাজবাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। আর..." আকাশ একটু থামল, মেঘলার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, "সেই মেসেজে তোর নামও লেখা আছে। তোকে ছাড়া সেখানে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।"
মেসেজের কথা শুনে মেঘলার ফর্সা মুখটা ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে নিজের অজান্তেই আকাশের একটা হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার মনে পড়ে গেল সকালের সেই কান্নার শব্দ আর ফুঁপির মলিন মুখের কথা।
ঠিক তখনই আকাশের ফোনে একটা রিং বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল 'আয়ান সিকদার'। আয়ান কুমিল্লা থেকে ফোন করেছে। আকাশ ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আয়ান অত্যন্ত উত্তেজিত ও হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "আকাশ ভাইয়া !
এক সর্বনাশা খবর! আমি কুমিল্লায় আম্মুর শ্বশুরের পুরোনো এক বিশ্বস্ত লোকের সন্ধান পেয়েছিলাম। সে মৃত্যুর আগে একটা সত্য ফাঁস করে গেছে। ফুঁপির এই রোগ কোনো সাধারণ রোগ নয়, এটা একটা স্লো পয়জন (ধীরে কাজ করা বিষ)! আর এই বিষের অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধকটা লুকিয়ে রাখা আছে পুরান ঢাকার সেই অভিশপ্ত রাজবাড়ির মাটির নিচের গোপন কুঠুরিতে! কিন্তু ভাইয়া, সেই গোপন কুঠুরির চাবিটা কার কাছে জানো?"
আকাশ গাড়িটা রাস্তার একপাশে ব্রেক চেপে থামিয়ে দিল। তার বুকটা ধক করে উঠল। সে উত্তেজিত গলায় বলল, "কার কাছে আয়ান? জলদি বল!"
ওপাশ থেকে আয়ান কাঁপা গলায় বলল, "চাবিটা আমাদের মেঘলার গলার সেই পুরোনো রুপোর লকেটের ভেতর লুকানো আছে, যেটা ফুঁপি ছোটবেলায় মেঘলাকে পরিয়ে দিয়েছিলেন! কিন্তু ভাইয়া, রাজবাড়িতে এক ভয়ঙ্কর ফাঁদ পাতা আছে। তোমরা ভুলেও এখন সেখানে যেও না, আমি ঢাকা ফিরছি!"
আয়ান ফোনটা কেটে দিল। আকাশের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে স্তম্ভিত হয়ে মেঘলার গলার দিকে তাকাল, যেখানে সত্যিই সেই পুরোনো রুপোর লকেটটা ঝুলছে। মেঘলাও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে লকেটটা হাত দিয়ে চেপে ধরল।
২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। একদিকে ফুঁপির নিভে যাওয়া জীবনপ্রদীপ, অন্যদিকে মেঘলাকে নিয়ে এক অজানা ভয়ঙ্কর ফাঁদের হাতছানি। কী করবে এখন ডাক্তার আকাশ চৌধুরী? সে কি তার ভালোবাসার ফুলটুসিকে এই বিপদের মুখে নিয়ে যাবে, নাকি নিজের ফুঁপির জীবন বাঁচাতে একাই লড়বে এই রহস্যের বিরুদ্ধে?
_____________________
(চলবে...)