#প্রেমের_শেষ_কিস্তিমাত
#লেখনিতে_ফারজানা_ইয়াসমিন
#পর্ব_৮(শেষাংশ)
❌কপি করা নিষিদ্ধ❌
────୨ৎ────────୨ৎ────────୨ৎ────────
ছাদে উঠতেই শীতল বাতাস এসে সবার গা ছুঁয়ে গেল। চারপাশে রঙিন লাইটের ঝলকানি, দূরে শহরের আলোগুলো যেন আকাশের তারাদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। রাতটা বেশ মনোরম।
ইয়াশ রেলিংয়ে হেলান দিয়ে নিচের শহরটা দেখছিল। আর ইনায়া সবার সঙ্গে হেসে-খেলে গল্প করলেও বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল ইয়াশের দিকে।
হঠাৎ লিয়ানা বলে উঠল,
— এই যে সবাই শুনো! শুধু গল্প করলে হবে? আজকে একটা গেম খেলব।
— কী গেম? — সবাই একসাথে জিজ্ঞেস করল।
— ট্রুথ অর ডেয়ার!
কথাটা শুনেই ইনায়ার মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
— ওয়াও! আমি একদম রাজি।
সবাই কে গোল হয়ে বসার নির্দেশ দিলো।এখানে এখন, ইনায়া, লিয়ানা,ইমু,আদি,ইয়াশ,মিষ্টি,রোদেলা,রাজ,সামির,সোহাগ সহ লিয়ানা, ইয়াশদের কাজিন রা আছে।সবাই গোল হয়ে বসতেই বোতল ঘোরানো শুরু হলো।
বোতলটা ঘুরতে ঘুরতে ধীরে ধীরে গতি হারিয়ে থেমে গেল ইয়াশের সামনে।চারপাশে সঙ্গে সঙ্গে হইচই পড়ে গেল।
— উউউ... ইয়াশ ভাইয়া!
ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে বোতলের দিকে একবার তাকিয়ে আবার সবার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটলেও মুখের গাম্ভীর্য একটুও কমল না।
— ট্রুথ নাকি ডেয়ার?
লিয়ানা জানতে চাইল।ইয়াশ এক মুহূর্তও না ভেবে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— ডেয়ার।
সঙ্গে সঙ্গে ইমু হাত তুলে বলল,
— তাহলে ডেয়ার আমি দিচ্ছি!
— বল।
ইমু মুখে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
— ভাইয়া, একটা গান শোনাও।
ইয়াশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। সবাই ভেবেছিল সে হয়তো না করে দেবে। কিন্তু সবার অবাক করে দিয়ে সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
— আচ্ছা... গাইছি।
চারপাশ মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ছাদের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া রাতের হালকা বাতাস যেন থমকে দাঁড়াল। দূরের শহরের আলো, আকাশের আধখানা চাঁদ আর শীতল হাওয়ার মাঝে ইয়াশ রেলিংয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তার দৃষ্টি অজান্তেই গিয়ে থামল ইনায়ার চোখে।
ইনায়া প্রথমে বুঝতে না পারলেও কয়েক সেকেন্ড পর অনুভব করল—ইয়াশের সেই গভীর দৃষ্টিটা যেন শুধু তার জন্যই।
ইয়াশ গভীর দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়েই ধীর, ভারী অথচ অসাধারণ মায়াবী কণ্ঠে গাইতে শুরু করল—
❝ তোকে বলবো ভাবি, কিছু অল্প কথায়
তুই স্বপ্নে ছিলি, ছিলি গল্প কথায়
আজ তোর নামে , রাত নামে
দিন কেটে যায়
আমার মন তোর পাড়ায়,
এসেছে তোরই আস্কারায়
আমার মন তোর পাড়ায়,
এসেছে তোরই আস্কারায় ❞
তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক আবেগ। উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। কিন্তু ইনায়ার মনে হচ্ছিল, প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে।
গান শেষ হতেই কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। তারপর হঠাৎ করেই চারপাশ হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল।ইয়াশ এখনও গান গাইছে।
❝ যেই আমার হলি,
অলি গোলির ভীড়ে,
তোকে একলা খোঁজার অজুহাত
এই মন বলেছে,
তোর মন গলেছে,
হলো প্রেমীরই আজ শুরু আর ❞
— ওয়াও! ভাইয়া, তুমি এত সুন্দর গান গাইতে পারো?
ইমু বিস্ময়ে বলে উঠল।লিয়ানা মুচকি হেসে বলল,
— এতদিন এই ট্যালেন্ট লুকিয়ে রেখেছিলি নাকি?
ইয়াশ শুধু হালকা হাসল। কোনো উত্তর দিল না।কিন্তু সেই মুহূর্তে ইনায়া চুপচাপ তাকিয়ে ছিল ইয়াশের দিকে। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন অচেনা অনুভূতিতে ভরে উঠল। মনে হচ্ছিল, এই মানুষটার গম্ভীর মুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সমুদ্র গভীর অনুভূতি।
আর ইয়াশ?সবার অগোচরে তার দৃষ্টি আবারও একবার গিয়ে থামল ইনায়ার চোখে। দু'জনের চোখ এক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়টা যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল এক নীরব, অপ্রকাশিত ভালোবাসার সুর। সবাই তার গানের প্রশংসায় ব্যস্ত। কিন্তু সবার ভিড় ঠেলে হঠাৎই রোদেলা দৌড়ে এসে ইয়াশের একেবারে সামনে দাঁড়াল।তার চোখে-মুখে স্পষ্ট উচ্ছ্বাস।
— ইয়াশ... আমি জানতাম! এই গানটা তুই আমার জন্যই গেয়েছিস, তাই না?
কথাটা শেষ করেই এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ইয়াশের বাহু জড়িয়ে ধরল। এমনকি মাথাটাও ইয়াশের কাঁধে হেলিয়ে দিল। মুহূর্তেই সবাই স্তব্ধ।
ইয়াশের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এমন আচরণে সে স্পষ্টই বিরক্ত।সে ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে রোদেলার হাত নিজের বাহু থেকে সরিয়ে দিল।
— এক্সকিউজ মি, প্লিজ।
রোদেলা থমকে গেল।
— মানে...?
ইয়াশ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
— তুই ভুল বুঝছিস। আমি কারও জন্য আলাদা করে গান গাইনি। আর আমি চাই না, কেউ আমার ব্যক্তিগত পরিসর এভাবে অতিক্রম করুক।
রোদেলার মুখের হাসি মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল।
— কিন্তু... আমি তো ভেবেছিলাম
— ভাবার আগে নিশ্চিত হওয়া উচিত ছিল।
কথাটা বলে ইয়াশ এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ এতটাই স্পষ্ট ছিল যে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
দূরে দাঁড়িয়ে ইনায়া পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠল তার।নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
— আরে বাবা! এত তাড়াহুড়ো করে নায়িকা হতে গিয়ে এবার তো উল্টোটাই হয়ে গেল!
রোদেলা অপমানে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। আর ইয়াশ আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে সোজা অন্যদিকে হেঁটে চলে গেল। তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল— এমন জোর করে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা সে একদমই পছন্দ করেনি।
রোদেলার অস্বস্তিকর পরিস্থিতিটা সামাল দিতে আদি জোরে তালি বাজিয়ে বলল,
— আচ্ছা আচ্ছা! ড্রামা শেষ। এবার আবার খেলায় ফেরা যাক। এত সহজে কিন্তু কাউকে ছাড়ছি না।
তার কথায় পরিবেশের ভারী ভাবটা একটু হালকা হয়ে এল। সবাই আবার নিজেদের জায়গায় গিয়ে বসল।
মাঝখানে একটা কাঁচের বোতল রাখা হলো। নিয়ম খুব সহজ— বোতল যার দিকে থামবে, তাকে ট্রুথ অথবা ডেয়ার— যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে।আদি বোতল ঘুরাল।
ঘুরতে ঘুরতে বোতলটা ধীরে ধীরে গতি হারিয়ে এসে থামল ইনায়ার সামনে।সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠল,
— ওহহহ... ইনায়া! ট্রুথ নাকি ডেয়ার?
ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে চারপাশে একবার তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল,
— ডেয়ার! ইনায়া কখনো ভয় পায় না।
কথাটা শুনে ইয়াশের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।সে দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে শান্ত গলায় বলল,
— ভেবেচিন্তে বলেন, বেয়াইন। ডেয়ার কিন্তু অনেক কঠিনও হতে পারে।
ইনায়া চোখ ছোট করে তাকিয়ে বলল,
— চ্যালেঞ্জ নিতে আমি ভালোবাসি, মিস্টার ইয়াশ। এখন দেখি, আপনারা আমাকে কী করাতে পারেন!
ইনায়ার কথা শুনে সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি হাসল। বোঝাই যাচ্ছে, এবার তার জন্য এমন একটা ডেয়ার আসতে চলেছে, যা তাকে ভালোই বিপদে ফেলবে।
তারপর সবাই নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে ইনায়ার জন্য ডেয়ার ঠিক করতে লাগল। একজনের প্রস্তাব আরেকজন নাকচ করে দিচ্ছে। কেউ খুব সহজ কিছু বলতে চাইছে, আবার কেউ এমন কিছু করতে চাইছে যাতে ইনায়ার দুষ্টুমি একবারের জন্য হলেও থেমে যায়।
কয়েক মিনিট ধরে আলোচনা করার পর আদি ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি টেনে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে এমন এক দুষ্টুমির ঝিলিক, যা দেখেই ইনায়ার মনে হালকা সন্দেহ জেগে উঠল।
__ এভাবে হাসছো কেন? নিশ্চয়ই ভালো কিছু না।
আদি কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়ল। চারপাশে বসে থাকা সবাইও চাপা হাসি হাসছে। যেন সবাই আগে থেকেই জানে কী হতে যাচ্ছে।রঙিন আলোয় ইনায়ার মুখটা আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বসে থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে বুঝতে পারছিল, আজকের ডেয়ারটা সহজ হবে না।অবশেষে আদি গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
— তোমার ডেয়ার হলো... এই রুমে যাকে সবচেয়ে বেশি হ্যান্ডসাম মনে হয়, তার কাছে গিয়ে তাকে একটা কমপ্লিমেন্ট বলতে হবে। তবে মিথ্যা বলা চলবে না। আর পুরো সময়টা তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
কথাটা শেষ হতেই পুরো রুম উত্তেজনায় গমগম করে উঠল।কেউ শিস দিল, কেউ আবার হেসে টেবিলে হাত চাপড়াতে লাগল।ইনায়ার মুখের আত্মবিশ্বাসী হাসিটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।এতক্ষণ পর্যন্ত সে ভেবেছিল হয়তো গান গাইতে হবে, নাচতে হবে কিংবা কোনো মজার অভিনয় করতে হবে। কিন্তু এমন ডেয়ার...!তার দৃষ্টি অজান্তেই পুরো জায়গা একবার ঘুরে এল।
আর ঠিক শেষে এসে থেমে গেল ইয়াশের ওপর।সেই মুহূর্তেই ইয়াশও ধীর দৃষ্টিতে তাকাল ইনায়ার দিকে।
দুজনের চোখ এক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইনায়া যেন অকারণেই অস্বস্তি অনুভব করল। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন একটু দ্রুত হয়ে উঠল। সে দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
চারপাশে সবাই চুপ করে অপেক্ষা করছে।কে হবে সেই মানুষ?
ইনায়া কি সত্যিই নিজের মনের কথা বলবে, নাকি সবাইকে চমকে দিয়ে অন্য কাউকে বেছে নেবে?
নীরবতা ধীরে ধীরে পুরো সবাই কে গ্রাস করল। সবাই যেন নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে ইনায়ার পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য।অবশ্যই। চারপাশে উপস্থিত সবাই অধীর আগ্রহে তার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। এতগুলো দৃষ্টি একসঙ্গে তার ওপর নিবদ্ধ থাকলেও সে যেন নিজের ভেতরেই কিছু খুঁজছিল।ধীরে ধীরে সে মাথা তুলে তাকাল।
একবার,দু'বার!তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ফাহিমের ওপর।
ফাহিম প্রথমে নিজেও একটু অবাক হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারেনি ইনায়া তার দিকে এভাবে তাকাবে। আশপাশে বসে থাকা সবাই একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। কয়েকজন আবার চাপা হেসে উঠল।
ইনায়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার মুখে মিষ্টি এক হাসি। এক পা... দুই পা... করে এগিয়ে গেল ফাহিমের দিকে।ওদিকে সোফার এক কোণে বসে থাকা ইয়াশের মুখের হাসিটা অদৃশ্য হয়ে গেল।তার চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল।
কেন যেন বুকের ভেতরটা অস্বস্তিতে ভরে উঠছে। অজানা এক অনুভূতি তাকে অস্থির করে তুলছে। নিজের অজান্তেই তার হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে মুঠো বেঁধে গেল।সে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করল— এটা তো একটা খেলা মাত্র।তবুও চোখ সরাতে পারল না।ইনায়া এখন ফাহিমের একদম সামনে দাঁড়িয়ে।
রঙিন আলোয় দুজনকে পাশাপাশি দেখে ইয়াশের ভেতরে যেন হিংসের একটা তীব্র ঢেউ বয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না, ঠিক কী কারণে এত বিরক্ত লাগছে। শুধু এটুকুই অনুভব করছিল— এই দৃশ্যটা তার একদমই ভালো লাগছে না।
চারপাশে বসে থাকা সবাই উত্তেজনায় তাকিয়ে আছে।ফাহিমও দাঁড়িয়ে আছে। আর ইনায়া ডেয়ার পূরণ করার জন্য তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেই দৃশ্যটা আর সহ্য করতে পারল না ইয়াশ।তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।হঠাৎ করেই সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল।চেয়ারটা হালকা শব্দ করে পেছনে সরে গেল। সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
কোনো কিছু না বলে ইয়াশ একবারও পেছনে না তাকিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করল।তার পদক্ষেপ ছিল দ্রুত, ভারী।মনে হচ্ছিল, আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকলে নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখতে পারবে না।
দরজাটা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে যেতেই রাতের শীতল বাতাস মুখে এসে লাগল। কিন্তু তাতেও বুকের ভেতরের অদ্ভুত জ্বালাটা কমল না।ভেতরে তখনও হাসি-ঠাট্টা চলছে।কিন্তু সেই হাসির শব্দ ইয়াশের কানে পৌঁছাচ্ছিল না।
তার মাথায় বারবার ভেসে উঠছিল একটাই দৃশ্য—ইনায়া ফাহিমের দিকে তাকিয়ে আছে।আর সেই দৃশ্যটাই তার শান্ত মনকে অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরে দিয়েছে।
সে নিজেও বুঝতে পারল না, এই রাগটা আসলে ফাহিমের ওপর নাকি নিজের হৃদয়ের ওপর, যা অজান্তেই ইনায়ার জন্য দুর্বল হয়ে পড়েছে।
_________
অনেক হাসি ঠাট্টার পর সবাই এখন ঘুমাতে যাবে।কিন্তু ইনায়ার মন টা কেমন যেন করছে।অস্থির লাগছে তার।সেটা দেখে ফাহিম বলল,
__ কি ব্যাপার ম্যাডাম?আপনাকে এমন লাগছে কেন?
ইনায়া ফাহিম এর দিকে তাকালো।তারপর ছোট করে বলল,
__ কিছু না, ফাহিম ভাইয়া!
ফাহিম আর কিছু বলতে যাবে তখন ইনায়া ইমু কে দেখতে পেল।অনেক্ষণ ধরে খুঁজছিল।সে ইমু কে ডাক দিল,
__ এই ইমু?একটু শোনো!
ইমু ইনায়ার ডাক শুনে এদিকে এলো।ইনায়া ইমু করে বলল,
__ আমার না টায়ার্ড লাগছে!ঘুমাতে চাই?কোথায় ঘুমাবো?
__ তুমি চাপ নিও না আপু!তুমি আমার সাথে ঘুমাবে।আমি তুমি লিয়ানা আপু একসাথে ঘুমাবো আর মজা করবো!ঠিক আছে?
ইনায়া মাথা নেড়ে হাসলো।ফাহিম তাকে বলল,
__ ইনায়া,আমি তাহলে যাই?
__ আচ্ছা ফাহিম ভাইয়া!
ফাহিম চলে গেল।ছেলেদের জন্য আলাদা ঘুমানোর ব্যবস্থা আছে।ইমু ইনায়া কে নিজের রুমে নিয়ে আসলো।ওইখানে লিয়ানা আগে থেকেই ছিল।শুয়ে শুয়ে ফোন দেখছে।সে ইনায়া কে দেখেই বলল,
__ আরেহ্!বেয়াইন যে বসেন!বসেন!
ইমু বলল,
__ ইনায়া আপু বলছিল আপু নাকি ঘুম পাচ্ছে?কোথায় ঘুমাবে?আমি আপু কে এখানে নিয়ে আসলাম।একসাথে ঘুমাবো আর অনেক গল্প করবো!
__ ঠিক করেছিস!
ইমু সব কিছু গোছাতে লাগলো। তা দেখে ইনায়া বলল,
__ আমি সাহায্য করি?
ইনায়ার ব্যবহার ইমুর ভালো লাগলো।কিন্তু সে ইনায়া কে নাকোচ করে বললে,
__ না আপু! তুমি আমাদের নতুন ভাবীর বড় বোন!তোমাকে দিয়ে কিভাবে কাজ করাই?
কিন্তু ইনায়ার কথা ইমু শুনলো না।সে কোন কাজ করতে দিবে না।
ইনায়া হালকা হেসে বলল,
— আরে, এতে আবার এত ভদ্রতার কী আছে? সবাই মিলে করলে কাজও তাড়াতাড়ি শেষ হবে।
কিন্তু ইমু নিজের সিদ্ধান্তে অটল। সে কিছুতেই ইনায়ার হাতে কোনো কাজ তুলে দিতে রাজি নয়। বরং আরও তাড়াহুড়ো করে সব গুছিয়ে ফেলতে লাগল।
পুরো দৃশ্যটা দেখে লিয়ানার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। ইমুর সাথে ইনায়ার এমন ব্যাবহার তার ভীষণ ভালো লাগছিল। মনে মনে সে ভাবল, এই মেয়েটা সত্যিই অন্যরকম। এত বড় পরিবারের মাঝেও একটুও অহংকার নেই, বরং সবার সঙ্গে খুব সহজেই মিশে যেতে পারে।
সবকিছু গুছিয়ে শেষ করে ইমু দু'হাত কোমরে রেখে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,
— হয়ে গেছে! এবার কেউ আর কোনো কাজ করবে না। এখন শুধু গল্প, তারপর ঘুম।
তার কথায় তিনজনের মুখেই একসাথে হাসি ফুটে উঠল। দিনের ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বাইরে রাত আরও গভীর হচ্ছিল, আর ঘরের ভেতর তৈরি হচ্ছিল নতুন এক আন্তরিক সম্পর্কের উষ্ণতা।
_________
পরদিন সকালে...
ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে জানালার সাদা পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ল। বাইরে পাখিদের কিচিরমিচির, দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা ফজরের আজানের শেষ সুর আর সকালের শীতল বাতাস মিলে চারপাশে এক প্রশান্ত পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
রাতভর গল্প করতে করতে কখন যে তিনজন ঘুমিয়ে পড়েছিল, তা কেউই টের পায়নি। বিছানার একপাশে লিয়ানা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আরেক পাশে ইমু ঘুমের মাঝেই শক্ত করে ইনায়ার হাত জড়িয়ে ধরে আছে, যেন ছেড়ে দিলেই মানুষটা কোথাও হারিয়ে যাবে।
ইনায়ার ঘুম ভাঙল সূর্যের কোমল আলো মুখে পড়তেই। চোখ মেলে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল সে। গত রাতের সব ঘটনা ধীরে ধীরে মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
আস্তে করে বিছানা থেকে নামতেই ইমু আধোঘুমে বিড়বিড় করে উঠল,
— আপু... কোথায় যাচ্ছ?
ইনায়া ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল,
— কোথাও না।আমি ওযু করে আসছি।
কথাটা শুনেই ইমু আবার নিশ্চিন্তে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেল।
ইনায়া ফ্রেশ হয়ে নামাজ আদায় করল। সিজদায় মাথা রেখে সে নিঃশব্দে আল্লাহর কাছে নিজের এবং প্রিয় মানুষগুলোর জন্য দোয়া করল। নামাজ শেষে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সকালের নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ গভীর শ্বাস নিল। বহুদিন পর তার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে।
এরই মধ্যে নিচতলা থেকে হাঁড়ি-পাতিলের টুংটাং শব্দ, মানুষের কথাবার্তা আর রান্নার সুগন্ধ ভেসে আসতে লাগল। বুঝতে বাকি রইল না, বাড়ির সকালের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।
ইনায়া নিচে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াতেই বিছানার ওপর কুঁকড়ে থাকা ইমু চোখ মেলে তাকাল। চোখ দুটো এখনও ঘুমে জড়ানো।
— আপু তুমি ঘুম থেকে উঠে গেছো?
ইনায়া মুচকি হেসে তার কাছে এসে বসে পড়ল।
— হ্যাঁ?
ইনায়া দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। করিডোরজুড়ে সকালের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন একটা দিনের সূচনা যেন এই বাড়ির প্রতিটি কোণে নতুন আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছে। তবে কেউই তখনও জানত না, এই সুন্দর সকালের আড়ালেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
করিডোরের মোড় ঘুরতেই হঠাৎ করেই বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা একজনের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেল ইনায়া।
"উফ!"
ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার আগেই সামনের মানুষটা নিজের ভার সামলে নিল। কিন্তু ইনায়ার হাতে থাকা মোবাইলটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল।
ইনায়া বিরক্ত মুখে নিচু হয়ে মোবাইলটা তুলে নিল। স্ক্রিনে হালকা আঁচড় পড়েছে দেখে তার বিরক্তি আরও বেড়ে গেল।
— চোখে দেখে হাঁটতে পারেন না?
কথাটা শুনে সামনের ছেলেটা ভ্রু উঁচু করল। সে আর কেউ নয়, ইয়াশ।হাতে কফির মগ, মুখে গম্ভীরয্য!
— বাহ! ধাক্কা তো তুমি মারলে, দোষটাও আমার?
ইনায়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
— আমি নিজের রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিলাম। আপনি দৌড়াতে দৌড়াতে আসছিলেন।
— ও আচ্ছা! তাহলে এখন করিডোরটাও তোমার নামে লিখে দিতে হবে?
— ফালতু কথা বলার অভ্যাসটা কী জন্মগত?
ইয়াশ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
__ আর নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া কি তোমার জন্মগত অভ্যাস?
ইনায়া এক পা এগিয়ে এল।সামান্য রাগ নিয়েই বলল,
— দেখুন, সকাল সকাল ঝগড়া করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। তাই সামনে থেকে সরে দাঁড়ান।
— আমিও তো সেটাই চাই। কিন্তু সমস্যা হলো, তুমি যেখানে যাও, ঝামেলাও সেখানেই চলে আসে।
— মিস্টার ইয়াশ, নিজের গুরুত্বটা একটু কমিয়ে ভাবুন। পৃথিবীর সবাই আপনাকে নিয়ে ভাবার সময় পায় না।
— সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। প্রথম দেখাতেই আমার সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া খেয়ে আমাকেই থাপ্পড় মেরেছিলে! আজকে আবার আমার সাথে ধাক্কা খেয়ে আমার ঘাড়েই দোষ দিচ্ছো?
কথাটা শুনে ইনায়ার রাগ সপ্তমে উঠল।
— আপনার আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক লাগছে! নিজের ভুল স্বীকার করার ন্যূনতম ভদ্রতাটুকুও নেই!
দুজনের কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে উঁচু হতে লাগল। করিডোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে তাদের তর্ক চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই পাশের রুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল লিহাব।দুজনকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে কপালে হাত ঠেকিয়ে বিরক্ত স্বরে বলল,
— সকাল সকাল আবার কী শুরু করেছ তোমরা? একদিনও কি শান্তিতে থাকতে পারো না?
ইয়াশ আর ইনায়া একসঙ্গে মুখ খুলতেই লিহাব হাত তুলে থামিয়ে দিল।
— একজন করে বলো। আর যদি ঝগড়াই করতে চাও, তাহলে বাড়ির বাইরে করো।ভাইয়া, ইনায়া আপু!প্লিজ আমার বিয়ে হয়েছে কালকে!
লিহাবের কথায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য করিডোরে নীরবতা নেমে এল। তবে দুজনের চোখে চোখে যে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে, সেটা একটুও কমল না।
ইনায়া আর ইয়াশ দুজনেই মুখ ফিরিয়ে নিল। তবে দুজনের চোখেমুখেই স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ।ইনায়া আর বিষয়টা বাড়াল না। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল অবনির সঙ্গে দেখা করা। তাই লিহাবের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
— কী রে, লিহাব? বাসর রাত কেমন কাটল? আমার বোনটা এখনও ঘুমিয়ে আছে নাকি উঠে পড়েছে?রাতে ঘুমানোর সুযোগ দিয়েছিলি তো?
প্রশ্নটা শুনেই লিহাবের কানে যেন হঠাৎ করেই লজ্জার রঙ ছড়িয়ে পড়ল। সে অপ্রস্তুত হয়ে একবার ইয়াশের দিকে, আরেকবার ইনায়ার দিকে তাকাল।
ইয়াশ সুযোগটা হাতছাড়া করার ছেলে নয়।সেও এখন ইনায়ার সাথে ঝগড়া করার একটা সুযোগ পেয়ে গেল। গম্ভীর হয়ে বলল,
— তোমার একটু লজ্জা থাকা উচিত।সম্পর্কে লিহাব তোমার ছোট বোনের হাসবেন্ড হয়।বড় বোন হয়ে কি করে তুমি বোনের হাসবেন্ড কে এসব কথা জিজ্ঞাসা করো?
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে ইয়াশের দিকে কটমট করে তাকাল।
— আমি কি আপনার সাথে কথা বলছি?আপনার এত জ্বলে কেন?আপনার থেকে এক বছরের ছোট ভাই বিয়ে করে ফেলেছে বলে?আপনি বিয়ে করলেন না কেন তাহলে?
ইয়াশ দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল, কিন্তু ঠোঁটের কোণের হাসিটা বাঁকা হাসি।ইনায়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই লিহাব হালকা কাশে গলা পরিষ্কার করে ইনায়ার দিকে তাকাল।
— তোমার বোন এখনও ঘুমাচ্ছে। কাল অনেক ক্লান্ত ছিল। ভাবলাম, একটু বিশ্রাম নিক।
— হুম... ঠিকই করেছিস। কাল সারাদিন ওর ওপর দিয়েই তো ঝড়টা গেল।বাই দ্য ওয়ে আমি কি তোদের ঘরে যেতে পারি?
লিহাব মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— চলো, আমি তোমাকে রুমে নিয়ে যাচ্ছি।কিন্তু বেশি কথা বলো না ওর মাথা টা ব্যথা করছে।
ইনায়া হেসে বলল,
— আরে বাবা, আমি ওর বড় বোন। আমার বোনকে কীভাবে সামলাতে হয়, সেটা আমাকে শেখাতে হবে না।
কথাটা শুনে লিহাব হেসে ফেলল। অবনির রুমের দিকে হাঁটতে লাগল। তবে সবার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে ইয়াশ মনে মনে বলল,
"মেয়েটা যতটা শান্ত দেখায়, মুখটা ততটাই ধারালো..."
অবনির ঘরের সামনে এসে লিহাব আলতো করে দরজায় নক করল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে দিল।
ঘরে ঢুকতেই ইনায়ার চোখ সোজা গিয়ে পড়ল বিছানার দিকে। বড় বিছানার মাঝখানে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে অবনি। মুখটা অদ্ভুত শান্ত, যেন গতকালের সব ক্লান্তি ঘুমের সঙ্গে মিলিয়ে গেছে। হাতে মেহেদির রঙ আর লাল চুড়িগুলো তাকে নতুন কনের পরিচয় আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বোনকে এভাবে দেখে ইনায়ার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। ধীরে ধীরে বিছানার পাশে গিয়ে বসে খুব যত্ন করে অবনির কপালের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিল। সেই স্পর্শ পেতেই অবনি কুঁকড়ে উঠে আধোঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে বলল,
— ইনায়া?
ইনায়ার বুকটা হঠাৎ করেই ভরে উঠল। ছোটবেলা থেকেই অবনি ঘুমের মধ্যে তাকে এভাবেই ডাকত।
— এই যে, রাজকুমারী এখনও ঘুমাচ্ছিস? সকাল তো অনেক হয়ে গেছে।ভুলে গেলি নাকি তুই এখন শশুর বাড়ি আছিস?
ইনায়ার কণ্ঠস্বর শুনেই অবনি ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড বোঝার চেষ্টা করল, তারপর সামনে বড় বোনকে দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এক ঝটকায় উঠে বসে ইনায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
— ইনায়া!
ইনায়াও বোনকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।অবনি মুখটা ইনায়ার কাঁধে গুঁজে দিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— রাতে কোথায় ঘুমিয়ে ছিলি?ঘুমাতে কোন অসুবিধা হয় নি তো?
__ বাবা! বিয়ের পর বোন আমার বড় হয়ে গেছে।আমার খোঁজ নিচ্ছে?
অবনি ভেঙচি কেটে বলল,
__ তোর তো সব যায়গায় ঘুম হয় না তাই জিজ্ঞাসা করলাম!
__ হ্যাঁ রে!ঘুম ভালো হয় নি!আমি একটু পরেই ফাহিম ভাইয়ে সাথে চলে যাবো।ওই বাড়িতে গিয়ে একটু ঘুমাবো।
দুই বোনের সেই আবেগঘন মুহূর্তটা নীরবে দাঁড়িয়ে দেখছিল লিহাব। তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক টুকরো তৃপ্তির হাসি। সে বুঝতে পারছিল, এই দুই বোনের বন্ধনটা কতটা গভীর।ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ভেসে এলো পরিচিত এক কণ্ঠ।
— লিহাব!নিচে সবাই নাস্তার টেবিলে অপেক্ষা করছে। আর তোমরা এখানে পারিবারিক মিলনমেলা বসিয়ে রেখেছ!
ইনায়া বিরক্ত চোখে দরজার দিকে তাকাতেই ইয়াশ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তাকে দেখেই ইনায়া মনে মনে বলল,
"সকালে এই লোকটার মুখ দেখাটাই আজকের সবচেয়ে বড় অশুভ ঘটনা!"
অন্যদিকে ইয়াশের মনে তখন একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে—
"রাগলে মেয়েটাকে আরও বেশি সুন্দর লাগে..."
অবনি হালকা হেসে বলল,
— ভাইয়া, ওকে কিছু বলবেন না। সকালে সকালেই আবার শুরু করে দিয়েছে, তাই না?
ইয়াশ ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— আমি? আমি তো কিছুই করিনি। তোমার আপুই আমাকে দেখামাত্র যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
— মিথ্যা কথা বলবেন না। ধাক্কা কে মেরেছিল?
— লিহাব বিরক্ত হয়ে দু'হাত তুলে বলল,
— তোমরা কি এক মিনিটও ঝগড়া না করে থাকতে পারো না?
ইয়াশ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে চুপ করে গেল।এদিকে অবনি বিছানা থেকে নেমে ইনায়ার হাত ধরে বলল,
— ইনায়া। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি। তারপর আমরা একসাথে নিচে যাব।
— ঠিক আছে। তুই ধীরে ধীরে আয়। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।
ইনায়া ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে দাঁড়াল। লিহাবও নিচে চলে গেল, সবাইকে জানিয়ে দিতে যে অবনি একটু পরেই আসছে।করিডোরে তখন শুধু ইনায়া আর ইয়াশ।কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর ইয়াশ দেয়ালে হেলান দিয়ে মুচকি হেসে বলল,
— তোমার রাগটা সবসময় এত নাকের ডগায় থাকে?
ইনায়া কোনো উত্তর দিল না।
— নাকি আমাকে দেখলেই বেড়ে যায়?
এবার ইনায়া ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরল।
— আপনি কি সবসময় এত বিরক্তিকর?
— তুমি নিজে কি সেটা জানো?
— খুব দুঃখের বিষয় হলো সেটা জানি না ওকে?আমি আপনার ছোট ভাইয়ের বউয়ের বড় বোন আপনার উচিত আমাকে সম্মান দিয়ে কথা বলা ওকে!
— আমিও তোমার ছোট বোনের স্বামীর বড় ভাই!
ইনায়া বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— দেখুন, আপনার সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। তাই দয়া করে একটু দূরে থাকুন।
ইয়াশ হদুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করল।
— তুমি যতই আমাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করো না কেন, মনে হচ্ছে আমাদের দেখা বারবার হবেই।
— ওটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই না।
কথাটা বলে ইনায়া আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।ইয়াশ তার চলে যাওয়া দেখল। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।সে আস্তে করে নিজের মনেই বলল,
— অচেনা বউ... খেলাটা তো সবে শুরু। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কে কাকে হার মানায়।
দূর থেকে দাঁড়িয়ে লিহাব পুরো দৃশ্যটাই দেখে ফেলেছিল। মাথা নেড়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
— আল্লাহই জানেন, এই দুজনের ঝগড়ার শেষ কোথায় গিয়ে থামবে!
তারপর সে নিচে নেমে গেল, যেখানে সকালের নাস্তার টেবিলে ইতোমধ্যেই পরিবারের সবাই একত্র হতে শুরু করেছে।
To be continue..........
(গল্প টা না গুলিয়ে ফেলছি!কিন্তু আস্তে আস্তে চেষ্টা করছি।পর্বটা বেশি ছোট হয়ে গেছে।সরি।নেক্স পার্ট সুন্দর করে করবো।অনেক দিন পর শুরু করলাম তো গুলিয়ে ফেলছি।কমেন্ট করে বলো কেমন হইছে?😌)