ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের শেষ কিস্তিমাত

৯ম পর্ব

লেখক: Farzana Yesmin

#প্রেমের_শেষ_কিস্তিমাত

#লেখনিতে_ফারজানা_ইয়াসমিন

#পর্ব_৯

❌কপি করা নিষিদ্ধ ❌

────୨ৎ────────୨ৎ────────୨ৎ────────

ইনায়া বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ধীর পায়ে মূল ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। ফাহিম তখন গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছিল। ইনায়াকে আসতে দেখে সে ভদ্রভাবে গাড়ির দরজা খুলে দিল।

— ম্যাডাম চলুন!

ইনায়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— হুম চলো!

ইনায়া গাড়িতে উঠে বসল। ফাহিম দরজাটা বন্ধ করে নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। কয়েক মুহূর্ত পর গাড়িটা ধীরে ধীরে বাড়ির বড় গেট ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

পুরো দৃশ্যটাই দ্বিতীয় তলার নিজের রুমের ব্যালকনি থেকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখছিল ইয়াশ।গাড়িটা চোখের আড়াল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তার দৃষ্টি সেদিকেই স্থির রইল। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। দু'হাত অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেছে।

হঠাৎই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক বিরক্তি জমে উঠল। বিরক্তিটা ঠিক কিসের, সে নিজেও বুঝতে পারল না। শুধু মনে হচ্ছিল, ফাহিমের সঙ্গে ইনায়াকে এভাবে হাসিমুখে চলে যেতে দেখে তার ভেতরে কোথাও যেন আগুন জ্বলে উঠেছে।ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল আদি।

ইয়াশের মুখের দিকে একবার তাকিয়েই সে বুঝে গেল, কিছু একটা হয়েছে।

— কী হয়েছে? এমন করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

ইয়াশ চোখ সরাল না।

— কিছু না।

আদি হেসে বলল,

— "কিছু না" বলার সময় তোর মুখটা এমন হয় না।

ইয়াশ এবার বিরক্ত হয়ে বলল,

— ওই ফাহিম ছেলেটা কে?

— কেন?তুই তো জানিসই!

ইয়াশ ঠোঁট চেপে ধরল।ছোট করে বলল,

— এমনি জিজ্ঞেস করলাম।

— এমনি?

আদি সন্দেহভরা চোখে তার দিকে তাকাল।

— তুই কি... ইনায়াকে নিয়ে ভাবছিস নাকি?

প্রশ্নটা শুনেই ইয়াশ যেন চমকে উঠল।

— কীসব আজেবাজে কথা বলছিস! আমি ওকে নিয়ে ভাবব কেন?

আদি হেসে ফেলল।

— তাহলে ফাহিমকে দেখে তোর মুখটা লাল হয়ে গেল কেন?ফাহিম ইনায়ার সাথে যাচ্ছে বলে?

ইয়াশ বিরক্ত হয়ে ব্যালকনি ছেড়ে ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

— আমার রাগ হচ্ছে, কারণ মেয়েটা অসম্ভব রাগী আর অহংকারী। সারাক্ষণ তর্ক করে। এমন মানুষকে সহ্য করতে পারি না।

আদি মৃদু হেসে নিজের মনেই বলল,

— সহ্য করতে পারিস না... নাকি অতিরিক্ত খেয়াল করতে শুরু করেছিস?

ইয়াশ আর কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু তার নীরবতাই যেন অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেল।

সে নিজেও বুঝতে পারছিল না, ইনায়াকে ফাহিমের সঙ্গে চলে যেতে দেখে তার বুকের ভেতর এতটা অস্বস্তি কেন হচ্ছে। এই অনুভূতির নাম সে এখনও জানে না। তবে অজান্তেই সেই অনুভূতি তার মনে ছোট্ট একটা জায়গা করে নিতে শুরু করেছে।

_________

বিকেলের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই পুরো বাড়িটা আবারও উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠল। সকাল থেকে যে বাড়িটা কিছুটা শান্ত ছিল, দুপুর গড়াতেই সেখানে শুরু হলো নতুন ব্যস্ততা। রঙিন ফুল দিয়ে গেট সাজানো হচ্ছে, লাইটিংয়ের শেষ কাজ চলছে, ক্যাটারিংয়ের লোকজন একের পর এক খাবারের কাউন্টার সাজিয়ে ফেলছে। বাড়ির প্রতিটি কোণেই যেন আনন্দের ছোঁয়া।

অন্যদিকে নিজের রুমে বসে ছিল ইয়াশ। বিছানায় আধশোয়া হয়ে মোবাইল স্ক্রল করছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা কোথাও স্থির হচ্ছিল না। বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সকালের সেই দৃশ্য—ফাহিমের গাড়িতে উঠে বসছে ইনায়া।হঠাৎ বিরক্ত হয়ে মোবাইলটা পাশে ছুড়ে ফেলল সে।

— ধুর!

নিজের ওপরই রাগ হচ্ছিল তার।

"আমি এসব নিয়ে ভাবছি কেন? ও কার সঙ্গে যাবে, কার সঙ্গে আসবে, তাতে আমার কী?"

বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু যতই বোঝাতে চাইছে, ততই যেন ভেতরের অস্থিরতা বাড়ছে।ঠিক তখনই দরজা ঠেলে রুমে ঢুকল আদি।ইয়াশের মুখের দিকে তাকিয়েই সে বুঝল, ছেলেটার মেজাজ এখনও ঠিক হয়নি।

— কী ব্যাপার? এখনও মুখটা এমন বাংলা পাঁচের মতো করে বসে আছিস কেন?

ইয়াশ বিরক্ত গলায় বলল,

— কিছু হয়নি তো!

— আমাকে বলছিস? তোকে আমি আজকের না, ছোটবেলা থেকে চিনি। তোর মুখ দেখলেই বুঝতে পারি মাথার ভেতর কী ঝড় চলছে।দেখ ভাই ওকে বলে দে তুই ওকে ভালোবাসিস।

ইয়াশ কোনো উত্তর দিল না।আদি মুচকি হেসে বিছানার এক কোণে বসে বলল,

— একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

— কর।

— ইনায়াকে ফাহিমের সঙ্গে যেতে দেখে তোর এত রাগ হলো কেন?তোর না মেয়েদের প্রতি ইন্টারেস্টড নেই?রোদেলা যে তিন বছর ধরে তোর পিছে ঘুরছে?ওকে পাত্তা দিচ্ছিস না আর কয়েকদিন আগে পরিচয় হওয়া মেয়ের সাথে এত টান?

প্রশ্নটা শুনে ইয়াশ কপাল কুঁচকে তাকাল।

— আবার সেই একই কথা!

— কারণ উত্তরটা এখনও পেলাম না।

ইয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

— জানি না। শুধু... ভালো লাগেনি।

আদি এবার আর হাসল না। প্রচন্ড সিরিয়াস দেখা গেল। সে শান্ত গলায় বলল,

— সব অনুভূতির কারণ শুরুতেই বোঝা যায় না, ইয়াশ।

কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।ঠিক তখনই নিচতলা থেকে ইমুর চিৎকার ভেসে এলো—

— ভাইয়া! ভাইয়া! তারা এসে গেছে! অবনি আপুর বাসা থেকে সবাই চলে এসেছে!আম্মু তোমাকে নিচে নামতে বলছে।

কথাটা শুনেই আদি উঠে দাঁড়াল।

— চল, মনে হয় ইনায়ারাও এসেছে।

ইয়াশ কিছু বলল না। কিন্তু "ইনায়া এসেছে" কথাটা কানে যেতেই অজান্তেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।সে দ্রুত নিজের মুখের ভাব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।

— আমি কেন যাব?

আদি ফিক করে হেসে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

— যাবি কি যাবি না, সেটা তোর ব্যাপার। তবে পাঁচ মিনিট পর যদি তোকে নিচে দেখি, তাহলে কিন্তু আমি অবাক হব না।

কথাটা বলেই সে বেরিয়ে গেল।রুমে একা দাঁড়িয়ে রইল ইয়াশ।কয়েক সেকেন্ড নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করল সে। তারপর বিরক্তি নিয়ে চুলে হাত চালিয়ে বিড়বিড় করল,

— ধুর! নিচে তো যেতেই হবে। অতিথিরা এসেছে... শুধু এই জন্যই।

কিন্তু সে নিজেও জানত, অতিথিদের জন্য নয়—তার চোখ খুঁজবে একজনকেই। আর সেই সত্যিটা যতই অস্বীকার করুক, হৃদয় ধীরে ধীরে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছে।

পুরো বাড়ি ঝলমলে আলোর সাজে সেজে উঠেছে। একে একে অতিথিরা আসতে শুরু করেছে। চারদিকে হাসি-আড্ডা, কোলাহল আর ব্যস্ততার শেষ নেই।ঠিক সেই সময় বাড়ির সামনে এসে থামল একটি কালো রঙের গাড়ি।

গাড়ি থেকে প্রথমে নামল ফাহিম। চারপাশে একবার তাকিয়ে সে গাড়ির অন্য পাশের দরজাটা খুলে দিল।কয়েক সেকেন্ড পর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল ইনায়া।

আজ সকালের সাধারণ সাজের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। হালকা মেকআপ, পরিপাটি করে পরা শাড়ি আর মুখজুড়ে এক অনাবিল সৌন্দর্য। সন্ধ্যার আলো যেন তাকে আরও মোহনীয় করে তুলেছে।

ফাহিম কিছু একটা বলতেই ইনায়া মুচকি হেসে উত্তর দিল। তারপর দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।

ইয়াশ কোথাও যাচ্ছিল।ইনায়াকে দেখেই কয়েক মুহূর্তের জন্য তার চোখ স্থির হয়ে গেল।কিন্তু পরক্ষণেই সেই দৃষ্টি গিয়ে আটকাল ফাহিমের ওপর।

ফাহিমের চোখেমুখের যত্নশীলতা, ইনায়ার প্রতি খেয়াল রাখা, দরজা খুলে দেওয়া, হাঁটার সময় আড়াল করে রাখা—সবকিছুই ইয়াশের চোখ এড়াল না।তার চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল।সে জানে, ফাহিম ইনায়ার মামাতো ভাই।এই সম্পর্ক নিয়ে তার কোনো ভুল ধারণা নেই।তবুও কেন যেন ফাহিমের প্রতিটি আচরণ তার ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করে।

গত কয়েক দিনে সে বহুবার লক্ষ্য করেছে, ফাহিম প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই ইনায়ার খোঁজ রাখে। ইনায়া ক্লান্ত কি না, খেয়েছে কি না, কোথাও যেতে অসুবিধা হচ্ছে কি না—ছেলেটার নজর সবসময় সেদিকেই থাকে।

হয়তো একজন মামাতো ভাই হিসেবেই করছে,আবার হয়তো...

ইয়াশ বাকিটা আর ভাবতে চাইল না।অকারণেই তার বুকের ভেতর একটা চাপা জ্বালা অনুভূত হলো।

ইনায়া দের বাড়ি থেকে ইনায়ার মা,বাবা,মামা,ছোট ভাই বোন আরও কিছু আত্মীয় স্বজন এসেছেন।খান বাড়ির সবাই অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অবনি দূর থেকেই বড় বোনকে দেখে শাড়ি সামলে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল। দুই বোনের হাসিমাখা মুখ দেখে আশেপাশের সবাইও মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।

অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশের চোখ এখনও নিচেই স্থির।ঠিক তখনই তার কাঁধে কেউ আলতো করে চাপড় দিল।

— কী রে? ওইখানে কি সোনা পুঁতে রেখেছে নাকি? এতক্ষণ ধরে একদৃষ্টিতে কী দেখছিস?

চেনা কণ্ঠস্বর শুনে ইয়াশ ফিরে তাকাল।

— আদি! তুই কখন এলি?

আদি হাসতে হাসতে বলল,

— এই তো পাঁচ মিনিট হলো। কিন্তু আমি আসার পর থেকে দেখছি, তুই স্টেজের দিকেই তাকিয়ে আছিস। ব্যাপারটা কী?

ইয়াশ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

— কিছু না। অনুষ্ঠান শুরু হবে, তাই দেখছিলাম।

আদি ভ্রু তুলে নিচের দিকে তাকাল। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ইনায়া আর ফাহিমের ওপর।কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে আবার ইয়াশের দিকে তাকাল সে।ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

— ও... তাহলে ব্যাপারটা এখনও এখানেই আটকে আছে।

ইয়াশ বিরক্ত হয়ে বলল,

— কোন ব্যাপার?

— যে ব্যাপারে তুই কোনোদিন মুখ খুলবি না, কিন্তু চোখ দুটো সব বলে দেয়।

ইয়াশ কপাল কুঁচকে তাকাল।

— আদি, বাজে কথা বলিস না।

— আমি বাজে কথা বলছি?

আদি হালকা হেসে রেলিংয়ে ভর দিল।

— তুই হয়তো কাউকে বলিসনি। এমনকি নিজেকেও না। কিন্তু আমি তোকে ছোটবেলা থেকে চিনি। তোর রাগ, বিরক্তি, ঈর্ষা—সবকিছুর মানে আমি বুঝি।

ইয়াশ এবার গম্ভীর হয়ে গেল।

— ঈর্ষা? আমি কেন ঈর্ষা করব?

আদি নিচের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

— কারণ ইনায়া এখন ওই চশমেশ এর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, আর সেটা তোর একদম ভালো লাগছে না।

ইয়াশের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

— ফাহিমকে আমার এমনিতেই ভালো লাগে না।

— কারণ?

— কারণ...

কথাটা শেষ করতে পারল না সে।আদি নিজেই উত্তর দিল,

— কারণ তোর মনে হয়, ফাহিম ইনায়াকে একটু বেশিই গুরুত্ব দেয়।

ইয়াশ এবার চুপ করে গেল।এই নীরবতাটুকুই আদির কাছে যথেষ্ট ছিল।সে মৃদু হেসে বলল,

— শোন, একটা কথা বলি? যদি সত্যিই ইনায়াকে ভালো লেগে থাকে, তাহলে অন্তত নিজের কাছেই স্বীকার কর। অন্য কারও কাছে না করলেও চলবে।

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

— অসম্ভব। ওই মেয়েটাকে আমি সহ্যই করতে পারি না। দেখা হলেই ঝগড়া লাগে।

আদি হেসে ফেলল।

— মজার ব্যাপার জানিস? যাদের দেখা হলেই ঝগড়া লাগে, অনেক সময় গল্পটা শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়েই লেখা হয়।

— সিনেমার ডায়লগ মারিস না।

— ঠিক আছে। তবে একটা কথা মনে রাখিস, বেশি দেরি করলে অনেক সময় মানুষটা অন্য কারও হয়ে যায়। তখন আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।

কথাগুলো বলে আদি চলে গেল।আর ইয়াশ?সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।নিচে ইনায়া তখন অবনির শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিচ্ছে। মুখে সেই পরিচিত শান্ত হাসি।

ইয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।নিজের মনকে যতই অস্বীকার করুক, একটা সত্য ধীরে ধীরে তার ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছে।

সে ইনায়াকে হারানোর কথা কল্পনাও করতে পারছে না। কিন্তু এই অনুভূতির কথা এখনও সে কাউকে বলবে না—এমনকি ইনায়াকেও নয়। তার বিশ্বাস, সময় এখনও আসেনি।

আদির কথাগুলো যেন মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। বিরক্ত হয়ে একবার চোখ বন্ধ করল ইয়াশ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচতলার দিকে এগিয়ে গেল।পুরো বাড়িটা তখন অতিথিদের কোলাহলে মুখর। কেউ ছবি তুলছে, কেউ গল্পে ব্যস্ত, আবার কেউ নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানাতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মঞ্চের ওপর পাশাপাশি বসে আছে লিহাব আর অবনি। নতুন জীবনের লাজুক হাসি দু'জনের মুখেই স্পষ্ট। একের পর এক অতিথি এসে তাদের সঙ্গে ছবি তুলছে।

ইনায়াও কখনো অবনির শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিচ্ছে, কখনো তার গয়না ঠিক আছে কি না দেখে নিচ্ছে। বড় বোন হিসেবে যেন প্রতিটা ছোটখাটো বিষয়েই তার খেয়াল।দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল ইয়াশ।তার চোখে আজ অবনির চেয়ে বেশি ধরা পড়ছিল একজনই ইনায়া।

হঠাৎই একজন বয়স্ক আত্মীয়া এগিয়ে এসে ইনায়ার হাত ধরে বললেন,

— মা, তুমি তো লিহাবের বউয়ের বড় বোন তাই না?

ইনায়া হালকা হেসে মাথা নাড়ালো।মঞ্চে উঠে অবনির পাশে দাঁড়াল।ঠিক সেই মুহূর্তে ফাহিমও ওদের পাশে এসে দাঁড়াল।ফটোগ্রাফার ক্যামেরা তাক করে বলল,

— একটু সবাই কাছে আসুন... হ্যাঁ, এবার স্মাইল!

ফাহিম স্বাভাবিকভাবেই এক পা এগিয়ে ইনায়ার পাশে দাঁড়াল।দৃশ্যটা দেখে ইয়াশের বুকের ভেতরটা আবারও কেমন করে উঠল।সে অজান্তেই হাতে ধরা জুসের গ্লাসটা একটু বেশি শক্ত করে চেপে ধরল।আদি ঠিক তখনই তার পাশে এসে দাঁড়াল।একবার ইয়াশের মুখের দিকে, আরেকবার মঞ্চের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

— গ্লাসটা ভাঙার ইচ্ছে থাকলে আগে আমাকে বলিস। আমি একটু দূরে সরে দাঁড়াই।

ইয়াশ বিরক্ত হয়ে গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে দিল।

— তুই না চুপ থাকতে পারিস না?

— আমি তো কিছুই বলিনি। তোর মুখটাই সব বলে দিচ্ছে।

ইয়াশ আর উত্তর দিল না।ছবি তোলা শেষ হতেই ইনায়া মঞ্চ থেকে নেমে এল। ঠিক তখনই তার শাড়ির আঁচলটা হাই হিলের সঙ্গে আটকে গেল।সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে সে নিজেও বুঝে উঠতে পারল না।শরীরটা সামনের দিকে হেলে পড়তেই।

— সাবধানে!

একসঙ্গে দুটো হাত তার দিকে বাড়িয়ে এলো।একটি ফাহিমের আর অন্যটি ইয়াশের।ইনায়া মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।দু'জনের হাতই তার সামনে প্রসারিত।

চারপাশের কয়েকজনও বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে।এক মুহূর্তের এই নীরবতা যেন অদৃশ্য এক টানাপোড়েনের সূচনা করে দিল। কে আগে ইনায়াকে সামলাবে, আর ইনায়া কার সাহায্য নেবে—সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তটুকুও যেন অদ্ভুতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।

ইনায়া একবার দু'জনের দিকেই তাকাল।

তারপর কোনো দ্বিধা না করেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফাহিমের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরল।ফাহিম আলতো টানে তাকে সামলে দিল।

— সাবধানে।

ইনায়া ছোট্ট করে হেসে বলল,

— থ্যাংক ইউ, ভাইয়া।

ফাহিম হালকা মাথা নাড়ল।

— এত তাড়াহুড়ো করলে এমনই হবে।

দু'জনের কথোপকথন ছিল একেবারেই স্বাভাবিক।কিন্তু কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশের কাছে দৃশ্যটা মোটেও স্বাভাবিক লাগল না।তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো।মুহূর্তের জন্য তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি ছিল না।শুধু চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকমের শান্ত।কিন্তু সেই শান্ত চোখের গভীরে যেন জমাট বাঁধছিল প্রচণ্ড এক ঝড়।

বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা কষ্ট ছড়িয়ে পড়ল।সে নিজেই বুঝতে পারছিল না কেন এমন লাগছে।কেন মনে হচ্ছে, কয়েক সেকেন্ড আগেই কেউ তার বুকের ভেতর থেকে কিছু একটা জোর করে কেড়ে নিয়েছে।

চারপাশের মানুষের হাসি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, গল্পের শব্দ—সবকিছু তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে গেল।নিঃশব্দে পাশের টেবিল থেকে একটি কাঁচের গ্লাস তুলে নিল সে।হাতে ধরা গ্লাসটির ওপর অজান্তেই তার আঙুলের চাপ বাড়তে লাগল।এতটাই যে...

ঠাস!

হঠাৎ করেই গ্লাসটি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।কাঁচের ধারালো টুকরোগুলো তার তালু আর আঙুলে গভীর আঁচড় কেটে দিল।এক নিমিষেই লাল রক্ত ঝরে পড়তে শুরু করল।

টুপ...

টুপ...

টুপ...

সাদা মার্বেলের মেঝেতে একের পর এক রক্তের ফোঁটা পড়ে ছোট ছোট লাল দাগ তৈরি হতে লাগল।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অতিথি চমকে উঠলেন।

— কী হয়েছে?

আদি দ্রুত দৌড়ে এসে ইয়াশের হাতটা ধরতে গেল।কিন্তু ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল।তার মুখে কোনো ব্যথার ছাপ নেই।মনে হচ্ছে, হাত থেকে ঝরে পড়া রক্তের চেয়ে বুকের ভেতরের অস্থিরতাই তাকে বেশি পুড়িয়ে দিচ্ছে।লিহাবও তাড়াতাড়ি এগিয়ে এল।ইয়াশের রক্তাক্ত হাত দেখে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

— ভাইয়া! তোমার হাত...! দাঁড়া, আমি ফার্স্ট এইড বক্স আনছি।

ইয়াশ নির্বিকার গলায় বলল,

— দরকার নেই।

— দরকার নেই মানে? এত রক্ত পড়ছে!

— বলেছি তো, কিছু হয়নি।

এই সময় ইমুও ভয় পেয়ে দৌড়ে এসে দাঁড়াল।তার চোখ দুটো ভিজে উঠেছে।

— ভাইয়া... তোমার হাত থেকে এত রক্ত বের হচ্ছে।

ইয়াশ একবারও নিজের হাতের দিকে তাকাল না।বরং শান্ত অথচ কঠিন গলায় বলল,

— ইমু।

— জি... ভাইয়া।

— আমার বাইকের চাবিটা এনে দে।

ইমু হতভম্ব হয়ে গেল।

— কোথায় যাবে? এই অবস্থায়?

— যা বলেছি, সেটা কর।

লিহাব এবার গম্ভীর হয়ে উঠল।

— তুমি কোথাও যাবে না। আগে ড্রেসিং হবে।

ইয়াশ তার দিকে তাকাল।চোখে একরাশ জেদ।

— আমার একটু একা থাকতে হবে।

— একা থাকার জন্য নিজের শরীরকে অবহেলা করতে হবে?

কোনো উত্তর দিল না ইয়াশ।ইমু ইতস্তত করতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে।একদিকে লিহাবের নিষেধ।অন্যদিকে ইয়াশের আদেশ।শেষ পর্যন্ত কাঁপা কাঁপা হাতে দৌড়ে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা বাইকের চাবিটা এনে দিল।

ইয়াশ চাবিটা নিয়ে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।রক্তে ভেজা হাতেই সে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল।পেছন থেকে আদি ডাকল,

— ইয়াশ! অন্তত ব্যান্ডেজটা করে যা!

কোনো সাড়া দিল না সে।লিহাব আবারও বলল,

— এই অবস্থায় বাইক চালানো ঠিক হবে না!

তবুও থামল না ইয়াশ।তার পদক্ষেপে ছিল অদ্ভুত এক একগুঁয়েমি।দরজা পেরিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাসে বেরিয়ে এল সে।আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা কালো স্পোর্টস বাইকটার সামনে গিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর এক ঝটকায় বাইকে উঠে বসল।ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই চারপাশে গর্জে উঠল বাইকের শব্দ।রক্ত এখনও ধীরে ধীরে ঝরছে।

তবুও যেন সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।দূরে দাঁড়িয়ে আদি গভীর দৃষ্টিতে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল।

সে জানত, ইয়াশের হাতের ক্ষত যতটা না গভীর, তার চেয়ে অনেক গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে তার মনের ভেতরে।

পরের মুহূর্তেই হেডলাইটের তীব্র আলো অন্ধকার চিরে সামনে এগিয়ে গেল।এক ঝটকায় বাইকটি গেট পেরিয়ে রাতের রাস্তায় মিলিয়ে গেল।আর পেছনে রয়ে গেল উদ্বিগ্ন কিছু মুখ... আর একরাশ অজানা আশঙ্কা।

গেট পেরিয়েই ইয়াশের বাইকটা রাতের নরম বাতাস চিরে এগিয়ে চলল।শহরের আলো একটার পর একটা পিছিয়ে পড়ছে। রাস্তার দু'পাশের দোকান, মানুষের কোলাহল, গাড়ির হর্ন—কিছুই যেন তার কানে পৌঁছাচ্ছে না। বুকের ভেতর জমে থাকা অদ্ভুত ভারটাই শুধু তাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে।

ডান হাতের তালু থেকে এখনও ধীরে ধীরে রক্ত বের হচ্ছে। হ্যান্ডেলের গ্রিপে লালচে দাগ লেগে গেছে। কিন্তু সে যেন কিছুই অনুভব করছে না।মাথার ভেতর বারবার একই দৃশ্য ভেসে উঠছে।

ইনায়া বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ফাহিমের হাতটা ধরে ফেলা।ইয়াশ চোখ বন্ধ করল না, তবু দৃশ্যটা বারবার ফিরে আসছে।

সে নিজের মনকে বোঝানোর চেষ্টা করল।

"ফাহিম ওর মামাতো ভাই... স্বাভাবিক ব্যাপার... এত ভাবছিস কেন?"

কিন্তু অন্য একটা কণ্ঠ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল—

"তবুও ভালো লাগেনি..."

একটা দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে এলো।কিছুক্ষণ পর শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি পথ ধরে সে পৌঁছে গেল বেউথা ব্রিজে।বাইকটা ব্রিজের একপাশে থামিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল।

মুহূর্তেই চারপাশে নেমে এল এক গভীর নীরবতা।নিচে নদীর কালচে পানি ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। রাতের হালকা বাতাস নদীর বুক ছুঁয়ে এসে তার এলোমেলো চুল উড়িয়ে দিচ্ছে।ইয়াশ ধীরে ধীরে বাইক থেকে নেমে ব্রিজের রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

দৃষ্টি নিবদ্ধ নদীর কালো জলের দিকে।কোনো শব্দ নেই।কোনো রাগ নেই।শুধু বুকের ভেতর জমে থাকা একরাশ প্রশ্ন।

ডান হাতটা রেলিংয়ের ওপর রাখতেই কাটা জায়গা থেকে আবারও অল্প রক্ত বেরিয়ে এল। তখনই যেন প্রথমবারের মতো ব্যথাটা অনুভব করল সে।নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের রক্তাক্ত হাতের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল।তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁট নড়ে উঠল।

"তুই আসলে কী চাস, ইয়াশ?"

প্রশ্নটা সে নিজেকেই করল।উত্তর এলো না।শুধু রাতের বাতাস নিঃশব্দে তার মুখ ছুঁয়ে চলে গেল।ঠিক তখনই পকেটের ভেতর রাখা মোবাইল ফোনটা কেঁপে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি নাম—

"আদি"

ইয়াশ কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।রিসিভ করবে নাকি ফোনটা বেজে বেজেই কেটে যেতে দেবে?রাতের নীরবতার মাঝখানে সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তটাই যেন হঠাৎ করে অনেক বড় হয়ে উঠল।

ইয়াশ কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করল।

— হুম।

ওপাশ থেকে আদির গলা ভেসে এলো।

— কোথায় আছিস?

— বাইরে।

— বাইরে কোথায়?

— বেউথা ব্রিজ।

এক মুহূর্ত নীরবতা।তারপর আদি শুধু একটা কথাই বলল,

— দাঁড়িয়ে থাক। আমি আসছি।

— আসার দরকার নেই।

— তোর দরকার আছে কি নেই, সেটা আমি ঠিক করব। পাঁচ মিনিট। কোথাও যাবি না।

কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল আদি।ইয়াশ বিরক্ত হয়ে মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে দিল।মুখ তুলে আবার নদীর দিকে তাকাল।

বেউথা ব্রিজের ওপর রাতটা অস্বাভাবিক রকমের শান্ত।নদীর কালো জলে চাঁদের আবছা প্রতিচ্ছবি কাঁপছে। মাঝেমধ্যে শীতল বাতাস এসে নদীর বুক ছুঁয়ে ইয়াশের এলোমেলো চুল উড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের কিছুই যেন তার চোখে পড়ছে না।

তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে নদীর বয়ে চলা পানির দিকে।

মুঠো করে রাখা ডান হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কাটা জায়গায় কাঁচের ছোট ছোট টুকরো আটকে আছে। ব্যথাটা ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে, তবুও মুখে তার কোনো পরিবর্তন নেই।

ঠিক তখনই দূরে একটা কালো গাড়ির হেডলাইট ব্রিজের রেলিংয়ে এসে পড়ল।গাড়িটা ইয়াশের বাইকের ঠিক পাশে এসে থামল।দরজা খুলেই দ্রুত নেমে এল আদি।দূর থেকেই বন্ধুর রক্তাক্ত হাতটা তার চোখে পড়ল।

এক মুহূর্তও দেরি না করে সে দৌড়ে ইয়াশের সামনে এসে দাঁড়াল।একবারও কোনো কথা না বলে শক্ত করে ইয়াশের কব্জিটা ধরে ফেলল।রক্তে ভেজা হাতটা দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

— তুই কি একেবারে পাগল হয়ে গেছিস?

ইয়াশ নির্বিকার।

— হাত ছাড়।

— ছাড়ব না।দেখেছিস কি হয়েছে?

— কাঁচ ভেঙেছে সামান্য ব্যাপার।

— কাঁচ নিজে নিজে ভাঙেনি। তুই ভেঙেছিস।

কথাটা শুনে ইয়াশ মুখ ফিরিয়ে নিল।আদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।সে জানত, এই মুহূর্তে বন্ধুকে বকা দিয়ে কোনো লাভ হবে না।নিজের গাড়ি থেকে ছোট্ট ফার্স্ট এইড বক্সটা বের করে আনল। কিন্তু ক্ষতটা দেখে সে বুঝে গেল, এটা সাধারণ ব্যান্ডেজে হবে না।

কাটা অনেক গভীর।রক্তও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।সে আর কোনো কথা না বলে দৃঢ় গলায় বলল,

— গাড়িতে ওঠ।

— যাব না।

— ইয়াশ... আমার ধৈর্য পরীক্ষা করিস না।

— বলেছি তো, কিছু হয়নি।

আদি এবার রাগ সামলাতে পারল না।সে এক ঝটকায় ইয়াশের শার্টের কলার চেপে ধরল।

— এই প্রথমবার তোকে আদেশ করছি। গাড়িতে ওঠ। নাহলে আমি এখান থেকেই আঙ্কেল কে ফোন করব।

আঙ্কেল বলতে সাফিকুল খানের কথা বোঝালো আদি। বাবার নাম শুনে ইয়াশ ভ্রু কুঁচকাল।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে অবশেষে হাল ছেড়ে দিল।কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।আদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।বাইকের চাবিটা খুলে নিজের পকেটে রাখল।

তারপর বাইকটা নিরাপদে ব্রিজের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে ইয়াশকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।

মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যেই তারা শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে পৌঁছে গেল।জরুরি বিভাগের সামনে গাড়ি থামতেই আদি দ্রুত নেমে এল।ইয়াশ এখনও নিশ্চুপ।মনে হচ্ছে, হাসপাতাল নয়, যেন অন্য কোথাও এসেছে।আদি তাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দায়িত্বরত নার্স রক্তাক্ত হাত দেখে আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ডিউটি ডাক্তার এসে ক্ষতটা পরীক্ষা করলেন।হাতের তালুতে গভীর কাটা।কাঁচের কয়েকটি সূক্ষ্ম টুকরো এখনও ভেতরে রয়ে গেছে।ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন,

— লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে কাঁচগুলো বের করতে হবে। তারপর সেলাই লাগতে পারে।

আদি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— খুব বেশি গভীর?

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ। সময়মতো নিয়ে এসেছেন বলেই ভালো হয়েছে। আর দেরি হলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ত।

কথাগুলো শুনে আদির বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল।সে একবার ইয়াশের দিকে তাকাল।ছেলেটা এখনও নির্বিকার মুখে চেয়ারে বসে আছে।যেন আহত হয়েছে তার হাত নয় বরং এমন কিছু, যার চিকিৎসা কোনো হাসপাতালের কাছেই নেই।আদি ধীরে ধীরে তার পাশে গিয়ে বসল।নিচু স্বরে বলল,

— হাতের ক্ষত ডাক্তার ঠিক করে দেবে, বন্ধু... কিন্তু মনের ক্ষতটা তোকেই সারাতে হবে।

ইয়াশ কোনো উত্তর দিল না।চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ করে ফেলল।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের করিডোরে অস্বাভাবিক নীরবতা।সাদা দেয়াল, ওষুধের গন্ধ আর নার্সদের দ্রুত পায়ের শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনো আওয়াজ নেই।

ড্রেসিং রুমের দরজার বাইরে চুপচাপ বসে আছে আদি। তার দৃষ্টি বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। কয়েক মিনিট আগে ডাক্তার ইয়াশকে ভেতরে নিয়ে গেছেন।আজ প্রায় দশ বছরের বন্ধুত্বে এই প্রথম ইয়াশকে এমন ভেঙে পড়তে দেখল সে।

বাইরে থেকে যতই শক্ত দেখাক না কেন, আদি খুব ভালো করেই জানে—বন্ধুটার ভেতরটা আজ সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে গেছে।কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার।আদি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

— ডাক্তার, কেমন আছে?

ডাক্তার চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন,

— চিন্তার কিছু নেই। কাঁচের টুকরোগুলো বের করে দিয়েছি। ক্ষতটা একটু গভীর ছিল, তাই কয়েকটা সেলাই দিতে হয়েছে। কিছুদিন হাতে চাপ দেওয়া যাবে না। নিয়মিত ড্রেসিং করতে হবে।

আদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

— ধন্যবাদ, ডাক্তার।

ডাক্তার চলে যেতেই ইয়াশ ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো।ডান হাতে মোটা ব্যান্ডেজ বাঁধা।মুখটা আগের মতোই নির্বিকার।মনে হচ্ছে, কিছুই হয়নি।আদি এগিয়ে এসে বলল,

— চল,তোকে বাসায় নিয়ে যাই।তুই ডাইরেক্ট নিজের রুমে ঢুকে রেস্ট নিবি!

ইয়াশ মাথা নাড়ল।

— না।

— না মানে?

— রিসেপশনে যাব।

আদি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল।

— এই অবস্থায়?

— হ্যাঁ।

— তোর হাতের এই অবস্থা। ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছে।

ইয়াশ শান্ত স্বরে উত্তর দিল,

— আজ লিহাবের রিসেপশন। আমি না গেলে ও কষ্ট পাবে।

আদি বুঝতে পারল, কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়।তবে সম্পূর্ণ সত্যও নয়।ইয়াশ আসলে অন্য একজনের জন্য ফিরতে চাইছে।কিন্তু সে আর কিছু বলল না।

এদিকে রিসেপশনের অনুষ্ঠান আরও জমে উঠেছে।

মঞ্চে অতিথিদের ভিড়।ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক ঝলসে উঠছে।কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও ইনায়ার মনটা কেমন যেন অস্থির।কয়েকবার চারপাশে তাকাল সে।ইয়াশকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।অদ্ভুত ব্যাপার সকাল থেকে যার সঙ্গে একের পর এক ঝগড়া হয়েছে, এখন সেই মানুষটাকেই খুঁজছে সে।

ঠিক তখনই ইমু দৌড়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।মেয়েটার চোখদুটো লাল।মনে হচ্ছে, একটু আগেই কেঁদেছে।ইনায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— কী হয়েছে, ইমু?

ইমু ঠোঁট কামড়ে ধরে নিচু গলায় বলল,

— ইয়াশ ভাইয়া!

— কী হয়েছে ওনার?

— ভাইয়ার হাত অনেক কেটে গেছে... অনেক রক্ত বের হচ্ছিল... তারপর ভাইয়া রাগ করে বাইক নিয়ে চলে গেছে।

কথাটা শুনে ইনায়ার বুকটা ধক করে উঠল।সে অজান্তেই জিজ্ঞেস করে ফেলল,

— এখন কোথায় আছে?

ইমু মাথা নাড়ল।

— জানি না... আদি ভাইয়া গেছে ওকে খুঁজতে।

ইনায়ার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।কেন জানি না, বুকের ভেতর একটা অজানা দুশ্চিন্তা কাজ করতে শুরু করল।সে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করল—

"আমার কী? উনি যেখানে ইচ্ছা যাবেন..."

কিন্তু মন সেই কথা মানল না।ঠিক তখনই বাড়ির সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামল।হেডলাইটের আলো পড়তেই সবাই সেদিকে তাকাল।গাড়ির দরজা খুলে প্রথমে নামল আদি।তারপর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল ইয়াশ।ডান হাতে সাদা ব্যান্ডেজ।মুখে ক্লান্তি।তবুও ঠোঁটে জোর করে টেনে আনা এক চিলতে হাসি।

দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে ইনায়ার ভ্রু কুঁচকে গেল।সে বুঝতে পারল না কেন, কিন্তু ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটা দেখেই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হলো।আর ঠিক সেই মুহূর্তে ইয়াশও চোখ তুলে তাকাল দু'জনের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক হয়ে গেল।কেউ কোনো কথা বলল না।তবু সেই নীরব দৃষ্টিবিনিময়ে যেন অজস্র না-বলা অনুভূতি লুকিয়ে রইল।

গাড়ি থেকে নামতেই ইমু আর থাকতে না পেরে ছুটে এসে ইয়াশের সামনে দাঁড়াল।চোখ দুটো এখনও লাল।

— ভাইয়া... এখন ব্যথা করছে?

ইয়াশ বাম হাত দিয়ে ইমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

— একদম না। আমার ছোট্ট পাগলিটা আবার কেঁদেছে নাকি?

ইমু ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

— অনেক রক্ত বের হচ্ছিল... আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।

ইয়াশ মুচকি হেসে বলল,

— দেখ, আমি তো ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে আছি। তাহলে আর ভয় কিসের?

ইমু কিছু বলল না।চুপচাপ ইয়াশের পাশেই দাঁড়িয়ে রইল।দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল ইনায়া।সে নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে, "এতে আমার কিছু যায় আসে না।"

কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার চোখ বারবার ইয়াশের ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটার দিকেই চলে যাচ্ছে।ঠিক তখনই অবনি এসে ইনায়ার কানে ফিসফিস করে বলল,

— ইনায়া, কী দেখছিস?

ইনায়া চমকে উঠল।

— কই? কিছু না তো।

অবনি দুষ্টু হেসে বলল,

— আমি কিন্তু দেখেছি। তুই কয়েক মিনিট ধরে একই দিকে তাকিয়ে আছিস।

— আজেবাজে কথা বলিস না।

অবনি হেসে অন্যদিকে চলে গেল।ইনায়া অস্বস্তিতে অন্যদিকে তাকাল।ঠিক সেই মুহূর্তেই ইয়াশের সঙ্গে আবারও চোখাচোখি হয়ে গেল।কয়েক সেকেন্ড কেউ চোখ সরাল না।শেষ পর্যন্ত ইয়াশ নিজেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।সে বুঝতে পারছিল, নিজের রাগটা এখনও পুরোপুরি কমেনি।আর ইনায়া সে বুঝতেই পারছে না কেন বুকের ভেতরটা কেমন ভারী লাগছে।

অনুষ্ঠান আবারও জমে উঠল।

ফটোগ্রাফার একের পর এক গ্রুপ ছবি তুলছে।হঠাৎ সে জোরে বলে উঠল,

— বরের পুরো কাজিন গ্রুপ! সবাই স্টেজে আসুন।

কথাটা শুনে একে একে সবাই মঞ্চে উঠে গেল।

ইয়াশও যেতে চাইল না।কিন্তু ডান হাতের ব্যথায় মুখটা সামান্য কুঁচকে উঠল।সেটা কেউ খেয়াল না করলেও ইনায়ার চোখ এড়াল না।সে এক মুহূর্ত ইতস্তত করল।

তারপর নিজের অজান্তেই দু'পা সামনে এগিয়ে গেল।নরম গলায় বলল,

— হাতে অনেক ব্যথা করছে?হাত কাটলেন কিভাবে?একটু আগেও না ঠিক ছিলেন?হুম!

প্রশ্নটা শুনে ইয়াশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।এতক্ষণ পর এটাই ছিল ইনায়ার প্রথম কথা।কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সে শান্ত গলায় উত্তর দিল,

— না... ঠিক আছি।তোমাকে জানতে হবে না?

ইনায়া ব্যান্ডেজটার দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল,

— 'ঠিক আছি' বললেই সব ঠিক হয়ে যায় না।অচেনা বউ বলে ডাকেন আবার সবকিছু খুলে বলতে পারেন না!এইটা কিন্তু ঠিক না মিস্টার খান!

কথাটা বলে সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না।ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

আর ইয়াশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তার কানে বারবার বাজতে লাগল সেই ছোট্ট কথাটা—

"অচেনা বউ বলে ডাকেন আবার সবকিছু খুলে বলতে পারেন না!এইটা কিন্তু ঠিক না মিস্টার খান!"

কেন জানি না, কথাটা শুনে তার বুকের ভেতরের জমাট রাগটা একটু একটু করে নরম হতে শুরু করল।দূরে দাঁড়িয়ে আদি সবকিছু দেখছিল।ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার।সে মনে মনে বলল,

"গল্পটা শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই... শুধু এরা দু'জন এখনও সেটা বুঝতে পারেনি।"

অবনি আর লিহাবের রিসেপশনের আনন্দ তখন যেন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। চারদিকে রঙিন আলোর ঝলকানি, অতিথিদের হাসি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর এক পরিবেশ।ঠিক তখনই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে হেসে বললেন,

— এবার আমরা চাই বরের সব কাজিন আর বন্ধুরা স্টেজে চলে আসুন। আপনাদের জন্য একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ পারফরম্যান্স আছে।

মুহূর্তেই চারদিক থেকে হইচই শুরু হয়ে গেল।ইমু, লিয়ানা, আর বাকিরা প্রায় দৌড়ে স্টেজে উঠে গেল।লিহাব মঞ্চে বসেই হেসে বলল,

— ইয়াশ ভাইয়া! পালানোর চেষ্টা করবে না। আজকে কিন্তু তোমাকেও উঠতে হবে।

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।গম্ভীর মুখে বলল,

— আমার দ্বারা হবে না। তোরা করো।

ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটা একটু তুলে ধরল সে।

— এই অবস্থায় নাচগান সম্ভব না।

কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না।আদি পেছন থেকে কাঁধে হাত রেখে হেসে বলল,

— নাচতে হবে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকবি। তোর মুখটাই যথেষ্ট।

ইয়াশ বিরক্ত চোখে তাকাল।

— তুই চুপ করবি?

— না। চল।

কথা শেষ না হতেই আদি একরকম টেনেই ইয়াশকে স্টেজের দিকে নিয়ে গেল।চারপাশ থেকে হাততালি পড়ে উঠল।ইয়াশ বাধ্য হয়ে স্টেজের এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল।তার মুখে এখনও সেই গম্ভীর ভাব।মনে হচ্ছে, এত মানুষের মাঝেও সে একা।স্টেজের ঠিক নিচেই দাঁড়িয়ে ছিল ইনায়া।অবনির পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল সে।

ইয়াশকে স্টেজে উঠতে দেখে তার চোখ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে রইল।ঠিক তখনই হলরুমের সব আলো কিছুটা ম্লান হয়ে এলো।স্পটলাইট গিয়ে থামল স্টেজের মাঝখানে।পরের মুহূর্তেই ধীর, স্নিগ্ধ এক সুর ভেসে উঠল চারদিকে।

❝ Is raat ka hai apna maza

Aa yaar masti mein tu jhoom ja

Ho is raat ka hai apna maza

Aa yaar masti mein tu jhoom ja

Baitha hai kya seeti baja

Lungi pakad ke zara ghoom ja ❞

গানের প্রথম সুর বাজতেই পুরো হল যেন অন্যরকম এক আবহে ডুবে গেল।

লাইটের নরম ঝিলিক, চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ফুলের সুবাস আর সুন্দর একটা গান—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল।

লিয়ানা, ইমু আর বাকিরা গানের তালে ছোট্ট একটা কোরিওগ্রাফি শুরু করল।লিহাব আর অবনিও হাসিমুখে তাদের দেখছিল।আদি ইচ্ছে করেই ইয়াশের পাশে এসে দাঁড়াল।বন্ধুর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ফেরাল নিচের দিকে।ইনায়া মেয়েটা গানের সুরে মুগ্ধ হয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে।

আর ইয়াশ?সে নিজেও বুঝতে পারল না, কখন থেকে তার দৃষ্টি শুধু একজন মানুষকেই অনুসরণ করছে।হলভর্তি এত মানুষের মাঝেও তার চোখ যেন বারবার গিয়ে থামছে ইনায়ার ওপর।

হঠাৎ করেই গানের বিট বদলে গেল।নরম, ধীর সুরের জায়গায় ভেসে উঠল তীব্র ছন্দ।স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। ঠিক কী করবে, যেন কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।আর সেই মুহূর্তেই ইয়াশ ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।বাম হাতটা আলতো করে চুলের ভেতর চালিয়ে একবার এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করল। ডান হাত ব্যান্ডেজে মোড়ানো, তাই সেটাকে শরীরের কাছেই রাখল।

পরের মুহূর্তেই গানের তালে এক পা সামনে বাড়াল সে।শুরুতে সবাই ভেবেছিল, হয়তো মজা করছে।কিন্তু না প্রথম স্টেপটা দিতেই পুরো হলরুম যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।তার শরীরের প্রতিটা মুভমেন্টে ছিল অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস। মুখে কোনো হাসি নেই, কোনো বাড়াবাড়ি নেই। তবু তার উপস্থিতিই যেন স্টেজের আলোটাকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছিল।

আদি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।সে তো জানেই, ইয়াশ ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ নাচে। কিন্তু এতদিন পর বন্ধুকে এভাবে নাচতে দেখবে, সেটা ভাবেনি।লিয়ানা মুখ হা করে ফিসফিসিয়ে বলল,

— ইমু... ইয়াশ ভাইয়া আবার ডান্স করছে!চিমটি কাট তো!

ইমু আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠল।

— ইয়া আল্লাহ! ভাইয়া তো একদম আগের মতো নাচছে!

স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অতিথিরা একে একে মোবাইল বের করে ভিডিও করতে শুরু করলেন।ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যেন থামার নামই নিচ্ছে না।ইয়াশ সেদিকে একবারও তাকাল না।সে শুধু গানের তালে নিজেকে ছেড়ে দিল।

❝ Rent laga rent laga Rent laga re

Main naacha to sabko Current laga re

Rent laga rent laga Rent laga re

Main naacha to sabko Current laga re

Thumka mera excellent laga re

Main naacha to sabko Current laga re ❞

ডান হাতটা আহত হওয়ায় প্রতিটি মুভমেন্ট খুব হিসেব করে করছে, যাতে ক্ষতস্থানে চাপ না পড়ে। কিন্তু তাতেও তার নাচের ধার এতটুকু কমেনি।একেকটা স্টেপে পুরো হলরুম হাততালিতে গর্জে উঠছে।চারদিকে শুধু একটাই আওয়াজ—

— ওয়াও!

— অসাধারণ!

— আরেকবার!

স্টেজে উপস্থিত সবাই ধীরে ধীরে ইয়াশের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করল।কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বোঝা গেল, আজ যেন পুরো স্টেজটা নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে সে।

তার উপস্থিতির সামনে বাকিরা যেন আপনাআপনিই একটু আড়ালে সরে যাচ্ছে।নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

এই প্রথম সে ইয়াশকে অন্য এক রূপে দেখল।সকালের সেই রাগী, তর্কপ্রিয়, একগুঁয়ে ছেলেটার সঙ্গে এই মানুষটার যেন কোনো মিলই নেই।

মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশকে আজ অদ্ভুত রকমের প্রাণবন্ত লাগছে।অজান্তেই ইনায়ার ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি ফুটে উঠল।

তার নিজেরও খেয়াল রইল না, কখন থেকে সে চারপাশের সবকিছু ভুলে শুধু একজন মানুষকেই দেখছে।

গানের শেষ বিট পড়তেই ইয়াশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।পুরো হলরুম কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ।তারপর একসঙ্গে করতালিতে ফেটে পড়ল চারদিক।সেই করতালির শব্দে পুরো অনুষ্ঠানস্থল মুখর হয়ে উঠল।

কিন্তু সেই করতালির মাঝেও ইয়াশের চোখ অবচেতনেই খুঁজে নিল একজনকে।

সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া।দু'জনের চোখ আবারও এক হলো।এইবার আর কেউ দৃষ্টি সরাল না। কয়েক মুহূর্তের নীরব দৃষ্টিবিনিময় যেন হাজারটা না-বলা কথার চেয়েও বেশি অর্থ বহন করে গেল।

To be continue...........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন