#Cry_Even_Better_If_You_Beg
#Translator_by_গল্প
#পর্বঃ১১৬
⚠️ সতর্কবার্তাঃ এখানে অনেক ডার্ক সিন রয়েছে, নিজ দায়িত্বে পড়ুন। যারা অতিরিক্ত রোমান্টিকতা পছন্দ করেন না তারা চাইলে এটি স্কিপ করতে পারেন।
Chapter 116
রাতভর প্রবল বর্ষণের পর অবশেষে ভোর ভাঙল, আর সকাল এসে উপস্থিত হলো। পশ্চিম দিকের জানালার সামনে রাখা তার উইং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে Matthias পূর্ব দিগন্ত থেকে উঠতে থাকা উজ্জ্বল সকালের সূর্যটাকে দেখছিল।
খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল, সঙ্গে নিয়ে আসছিল গোলাপ ফুলের সতেজ সুবাস। মনে হচ্ছিল, গতকালের সেই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেই বুঝি ফুলগুলো ফুটে উঠেছে।
এই ভেবে সে তিক্তভাবে একচোট হেসে উঠল।
গোলাপ ফোটার সময় এসে গেছে, অথচ Leyla আর এখানে নেই—এই সৌন্দর্য দেখার জন্য। আর যে সময়ে সে আশা করেছিল সব জীব আবার ঘরে ফিরবে, তার জগৎকে প্রাণবন্ত করে তুলবে, ঠিক তখনই তার পাখিটা হঠাৎ মারা গেল।
Matthias-এর দৃষ্টি চলে গেল সেই ফাঁকা খাঁচার দিকে, যেখানে একসময় তার ক্যানারি থাকত।
খাঁচাটিতে যে কখনো প্রাণ ছিল, তার একমাত্র প্রমাণ ছিল চারদিকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি হলুদ পালক আর খাবার ও পানির বাটিতে পড়ে থাকা অখাওয়া চাল। এই সামান্য জিনিসগুলোই ছিল তার ক্যানারির অস্তিত্বের শেষ স্মারক।
তার পাখিটা চলে গেছে।
তারপর Matthias-এর চোখ চলে এলো সামনে রাখা টেবিলটির দিকে। তার ওপর রাখা ছিল একটি ছোট কাঠের বাক্স—যার ভেতরে শুয়ে আছে তার ক্যানারির ঠান্ডা নিথর দেহ। একসময় নরম আর ক্ষুদ্র শরীরটি এখন চিরনিদ্রার ভঙ্গিতে শক্ত হয়ে আছে। পাখিটির সঙ্গে কাটানো স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে তার মনে ভিড় করতে লাগল, আর সে নিজেকে সেগুলোর টানে ভেসে যেতে বাধা দিতে পারল না।
সে মনে করতে পারল, প্রথমবার যখন সে পাখিটিকে দেখেছিল—একটি ছোট্ট, তেমন চোখে পড়ার মতো নয় এমন প্রাণী, অথচ এক ঝলকেই তার হৃদয় কেড়ে নিয়েছিল। ধীরে ধীরে সেই পাখিটিকে নিজের মতো করে পোষ মানাতে দেখাটা তার ভীষণ উপভোগ্য লাগত।
শুরুর দিকে পাখিটা জোরে ছটফট করত, সে কাছে এলেই পালিয়ে যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে তার স্বভাব নরম হয়ে এসেছিল, আর সে তার আত্মাটাকেও বশে আনতে পেরেছিল। সেই সময়ে যে আনন্দ সে পেয়েছিল, তা ছিল অদ্ভুতভাবে নির্মল—ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। যেন একটি সুন্দর গান পুরো ঘর ভরে দেয়, তেমন করেই তা তার হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছিল।
এই উপলব্ধি— যে প্রাণীটি তার অধীন… যে সম্পূর্ণরূপে তার…
এই ভাবনাটাই তার ভালোবাসাকে আরও মিষ্টি করে তুলেছিল।
পাখিটা যখন খুশিমনে কিচিরমিচির করত, ঘরের ভেতর খেলাধুলা করত, আশপাশে তাকে খুঁজে বেড়াত—এসবই তাকে অপার আনন্দ দিত। আর সেই মুহূর্তগুলো, যখন পাখিটা তার হাতের পিঠে বসে থাকত, সে আঙুল বুলিয়ে দিত তার নরম পালকের ওপর, আর পাখিটা কেবল তার দিকেই তাকিয়ে থাকত—এসব ছিল তার জীবনের পরম সুখের অংশ। প্রতিটি মুহূর্ত সে ভালোবেসেছিল।
কিন্তু এখন…
এই স্মৃতিগুলো আর কিছুই নয়—একসময় জ্বলতে থাকা আগুনের ছাইমাত্র।
সে চেয়ার থেকে উঠে টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল, ধীরে হাত বাড়িয়ে পাখিটির ঠান্ডা শরীরটায় হাত বুলিয়ে দিল। সোনালি ডানার পালকগুলো এখনও এতটাই নরম যে মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—এই বুঝি পাখিটা চোখ খুলবে আর উড়ে আসবে তার কাছে।
সব ঠিক আছে, সে নিজেকে বলল… তার ক্যানারি তো এখনও আছে।
লোকেরা তাকে বলেছিল, তারা পাখিটার মৃত্যুর কারণ জানে না। ওটা এমনিই মারা গেছে।
হয়তো তার সঙ্গে নীরবে কষ্ট সহ্য করছিল… যতক্ষণ না দুশ্চিন্তা তাকে নিজের নিষ্ঠুর বাহুতে জড়িয়ে শ্বাসরোধ করে ফেলল, আর ধীরে ধীরে জীবনটুকু নিংড়ে নিল। আর এইভাবেই— চিরতরে হারিয়ে গেল তার জীবন থেকে। যেভাবে সে চলে গিয়েছিল।
Leyla-এর মতোই।
দীর্ঘ সময় ধরে Matthias যেন জড়বৎ হয়ে বসে রইল। টেবিলের ওপারে বসে সে নীরবে তাকিয়ে ছিল তার মৃত পাখিটির দিকে। যেন অপেক্ষা করছিল—এই বুঝি ও ডানা ঝাপটাবে, আবার তার মিষ্টি গান গাইবে, যেমনটা করত ভারী বৃষ্টির পর উজ্জ্বল সকালে।
সময় যে গড়িয়ে যাচ্ছিল, তা টের পাওয়া গেল যখন জানালার ভেতর দিয়ে সূর্যের নরম আলো সরে সরে টেবিলের ওপর রাখা সূক্ষ্ম কারুকার্যখচিত বাক্সটার ওপর এসে পড়ল।
সেই উষ্ণ আলো পড়তে দেখে Matthias নিঃশব্দে পাখিটার নাম ডাকল, “Leyla…”
এই নামটাই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত। ছোট্ট পাখিটাকে দেখামাত্রই সে জানত—এর নাম Leyla-ই হবে।
লোকজন এটাকে হাস্যকর ভাবলেও তার কিছু যায় আসত না। সে পছন্দ করত, এই পাখিটার সঙ্গে সে ইচ্ছে মতো মিষ্টি হতে পারে, আর পাখিটাও তাকে ততটাই ভালোবাসে, যতটা সে তাকে স্নেহ করে।
Matthias এই অনুভূতিটা পছন্দ করত— ভালোবাসা আর পাল্টা ভালোবাসা পাওয়ার অনুভূতি। কিন্তু বাতাসে বারবার সেই মিষ্টি নাম ফিসফিস করে বললেও পাখিটা চোখ খুলল না। স্পর্শে তা রইল ঠান্ডা আর প্রাণহীন।
তার ভেতরের কোনো গভীর শূন্যতার প্রতিধ্বনি যেন।
দিনটা তো সবে শুরু হয়েছে, Matthias ভাবল, অন্যমনস্কভাবে বাক্সটার ওপর আঙুল বুলাতে বুলাতে। বাইরে তাকিয়ে দেখল—এখনও সকাল।
ধীরে ধীরে তার মনকে গ্রাস করতে লাগল এক অশুভ আশঙ্কা।
তার পাখির গান হারানোটা কেবল শুরু।
*************
Leyla ঘুম ভাঙল শরীরজুড়ে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার ঢেউ নিয়ে। মনে হচ্ছিল, রাতে যে হালকা জ্বর ছিল, তা আরও বেড়ে গেছে; পুরো শরীরটা যেন থেঁতলানো, ব্যথায় কাঁপছে। তার কোনো ক্ষুধা ছিল না, কিছু খাওয়ার শক্তিও সে খুঁজে পাচ্ছিল না। সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কম্বল টেনে মাথার ওপর পর্যন্ত ঢেকে নিল। চারপাশের পৃথিবীটাকে ডুবিয়ে দিতে চাইল সেই অন্ধকারের নিচে। সত্যি বলতে, এই অবস্থাতেও দিনটা তার কাছে রাতের মতো অসহনীয় লাগছিল না। রাতগুলোই তার জন্য সবসময় সবচেয়ে কঠিন ছিল…
কারণ রাতগুলো ছিল তার… এখন তার ভেতরে স্থায়ীভাবে গেঁথে গেছে—এই সময়টা তারই। চিরকাল Matthias-এর।
সে চোখ শক্ত করে বন্ধ করল আর বালিশটা বুকে চেপে ধরল, কারণ সে এই দুঃস্বপ্নের মতো স্মৃতিগুলো ভাবতে ঘৃণা করত… তার ঠোঁটে তার চুমু, তার শরীরজুড়ে—ভেতরে—ঘুরে বেড়ানো হাত, তার উষ্ণ শরীরের চাপ… সবকিছু বারবার ফিরে আসছিল, যেন সে এখনও তার সঙ্গেই আছে। আর তার ভেতরের কিছু একটা ব্যথায় মোচড় দিচ্ছিল… যতই সে তাকে মুছে ফেলতে চাইত, তার মন ঠিকই ফিরে যেত তার কাছেই। কিছুই তাকে ভুলতে সাহায্য করছিল না।
অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে Leyla বিছানা ছেড়ে উঠল। ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। গ্রীষ্মের আকাশে ঝলমলে তারাগুলো তার জলভরা চোখে ধরা দিল… সবই ঝাপসা।
Arvis-এর পরিষ্কার আকাশের মতো নয়।
‘আমার ইচ্ছেটা কি পূরণ হয়েছে?’ সে প্রশ্ন করল ওপরে থাকা নির্দয় দেবতার কাছে—ঝাপসা রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে। ভাবল, তার অনুপস্থিতিতে কি Matthias এখন সত্যিই কষ্ট পাচ্ছে?
*************
“My Lord,”
একটি পরিচিত কণ্ঠ সেই নীরব জগতে ভেসে এলো, যেখানে শব্দগুলো মিলিয়ে যায়, আর তাকে ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে…
“আপনাকে এখন উঠতেই হবে, my Lord।”
কণ্ঠটা আবার বলল—এবার আরও কাছে থেকে।
Matthias অঙ্গ না নড়িয়েই ধীরে চোখ খুলল। প্রথমে সবকিছু ঝাপসা ছিল। কয়েকবার চোখ পিটপিট করতেই দৃশ্য পরিষ্কার হতে শুরু করল, আর সঙ্গে সঙ্গেই সে দেখল তার পরিচারকের বিব্রত মুখ।
লোকটি তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
ভয়ে সে মাথা নিচু করে বলল,
“অনুগ্রহ করে ক্ষমা করবেন, my Lord। আপনার অনুমতি ছাড়া এখানে ঢুকে পড়ার জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত।” তারপর দ্রুত যোগ করল, “কিন্তু সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের সভায় আপনাকে উপস্থিত থাকতে হবে।”
কিছুক্ষণ Matthias নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, লোকটাকে অস্বস্তিতে ছটফট করতে দেখল। তারপর হালকা বিরক্তি নিয়ে একবার নিশ্বাস ফেলল।
“ঠিক আছে,” সে সংক্ষিপ্তভাবে বলল, “আমি শিগগিরই প্রস্তুত হব।”
তার কণ্ঠ ছিল শান্ত—ঘুম থেকে ওঠা একজন মানুষের কাছ থেকে যেমনটা আশা করা যায়, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
সে উঠে বালিশে ঠেস দিয়ে বসল।
অপেক্ষমাণ দাসীরা ঢুকে পর্দা সরিয়ে দিল, সূর্যের আলো ঘরে ঢুকে পড়ল। উষ্ণতায় ঘর ভরে উঠলেও Matthias-এর চোখ আটকে রইল পাশের ঘড়ির দিকে—দুপুর গড়িয়ে গেছে, একটারও বেশি।
তবুও এতে তার কিছু যায় এল না। সে নির্লিপ্তভাবে বিছানা ছাড়ল। সত্যি বলতে, সময় যে আর কোনো মানে রাখে না—এই জীবনযাত্রায় সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়।
তার পা দুটো ভারী লাগছিল, আর সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, ঘোরলাগা চোখে সূর্যের দিকে তাকিয়ে। দাসীরা চলে গেলেও, চারপাশ নীরব হলেও, কোথাও যেন অস্বস্তি ছিল। মনের ভেতর একটানা জ্বালা—যেন চুলকানি, কিন্তু চুলকানোর জায়গাটা খুঁজে পাচ্ছে না।
শেষমেশ সে হালকা শিস দিতে শুরু করল—নীরবতাটা ভাঙার জন্য। শব্দটা শুনে সে নিজেই হেসে ফেলল।
কিন্তু সঙ্গীটা কোথায়? কেউ কেন গেয়ে উঠছে না?
‘আহ… ঠিকই তো। আর কোনো Leyla নেই।’
তার দৃষ্টি চলে গেল ঘরের এক কোণে। সেখানেই থাকার কথা ছিল তার পাখির। সেখানেই ছিল খাঁচাটা। কিন্তু এখন সেখানে কেবল শূন্যতা। কোনো চিহ্ন নেই যে কখনো সেখানে কোনো প্রাণ ছিল।
‘ঠিকই তো… ও মারা গেছে।’
ভাবল সে নির্বিকারভাবে। মৃত্যু তো জীবনেরই অংশ, তাই না? যেমন আবহাওয়া প্রতিদিনের জীবনের অংশ। এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে অবশেষে বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো, আর তার স্নায়ুগুলোও শান্ত লাগছিল। পোশাক পরে গলায় টাই বেঁধেই পরিচারক আবার মনে করিয়ে দিল—আজ তাকে এক সভায় যেতে হবে।
‘সভা?’
সে অন্যমনস্কভাবে ভাবল—কোন পার্থিব বিষয়ই বা এখন তার এমন মনোযোগ দাবি করে?
আজকের সভা সম্পর্কে Matthias কিছুই মনে করতে পারছিল না। আন্দাজ করা যেতে পারত বটে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে জানার কোনো উপায় ছিল না। কার সঙ্গে তার দেখা ছিল? নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে? সহকর্মীদের? নাকি অধস্তনদের?
নিজের চেহারা একবারও যাচাই না করেই সে ড্রেসিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ইদানীং তার লক্ষ্য করছিল—কাপড়গুলো তার গায়ে একটু ঢিলা লাগছে। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে তৎক্ষণাৎ ভাবার মতো মনোযোগ তার ছিল না। ইদানীং সবকিছুই যেন… অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। সে ঠিকমতো পোশাক পরেছে কি না, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও তার কাছে সময়ের চূড়ান্ত অপচয় বলে মনে হচ্ছিল। বিরক্ত হওয়ার মতো কিছুই নয়—কারণ এগুলোর কোনোটাই তাকে বিনোদিত করছিল না।
পোশাক পরা এখন তার কাছে আরেকটি অর্থহীন, যান্ত্রিক কাজ মাত্র।
লবির হলঘরে নামতেই Matthias তার মাকে দেখল। Elysee তাকে একটি অস্বস্তিকর হাসি দিয়ে অভিবাদন জানালেন। সম্ভবত তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন, কারণ নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়া সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। তিনি কাছে এগিয়ে এসে অবশেষে বললেন, “তুমি কি বেরোচ্ছ, Matthias?”
তার কণ্ঠে অদ্ভুত একটা সুর ছিল।
“হ্যাঁ, মা।”
সে সাদাসিধেভাবে উত্তর দিল।
“কাজের জন্য?”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন। Matthias শক্তভাবে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। আজ বোর্ড মিটিং।”
সে তার চিরাচরিত মার্জিত হাসি নিয়ে অনায়াসে উত্তর দিল।
তার সংক্ষিপ্ত উত্তরগুলো Elysee-কে বিব্রত করে তুলল। ছেলের অবস্থা নিয়ে এতটা উদ্বেগ দেখানোটা বোধহয় অপ্রয়োজনীয়ই ছিল। অসুস্থ চেহারা সত্ত্বেও, Matthias আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। আর তিনি কীই বা বলতে পারতেন?
Matthias যেন তাকেও গুরুত্বহীন বলে মনে করল—কারণ সে কেবল বিদায়ের একটি ছোট্ট মাথা নাড়া দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল এবং চলে গেল।
বাইরে পা রাখতেই সে পুরোপুরি টের পেল—গ্রীষ্মের উষ্ণতা কীভাবে তার বরফশীতল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ঢুকে পড়তে চাইছে। কত বিচিত্র এই উষ্ণ অনুভূতি।
অনায়াসেই সেটা তাকে আবার তার কথা মনে করিয়ে দিল। শেষ কবে সে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল?
আসলে কত সময় পেরিয়ে গেছে? সে বলতে পারল না। তাই ভাবারও কোনো মানে নেই।
‘বিয়ে কি আগামী মাসে ছিল?’
কিন্তু এত বড় একটা জীবনের সিদ্ধান্তও এখন আর ততটা গুরুত্ব পাচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন এক ভিন্ন জগৎ থেকে ফিরে এসেছে। একটা এমন জগৎ, যেখানে কেবল সে আর Leyla-ই থাকতে পারে।
সে বোধহয় অনেকক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল, কারণ তার পরিচারক উদ্বিগ্ন মুখে এগিয়ে এসে ডাকল, “My Lord…”
Matthias ধীরে হাত তুলল—নিজের চিন্তায় আর কোনো বাধা চায়নি সে—তারপর নিজেই গাড়িতে উঠে পড়ল। Mark Ever-এর প্রস্তুত করা আজকের সভার নথিপত্র গাড়ির পেছনের সিটের এক পাশে গোছানো অবস্থায় রাখা ছিল। গাড়ি চলতে শুরু করতেই সে সেগুলো চোখ বুলিয়ে পড়তে লাগল, স্মৃতিটা ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
মনের গভীরে কোথাও মনোযোগ ধরে রাখা তার জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে উঠছিল, তবুও সে পড়তে থাকল—শান্তভাবে বোঝার চেষ্টা করল। শেষ পর্যন্ত এটাই তো তার করণীয়। Matthias-এর জীবনে কখনো এমন দিন আসেনি, যেদিন সে তার দায়িত্ব আর অঙ্গীকার পূরণ করেনি। আজও তেমনই একদিন।
আর এইভাবেই সময় নির্বিঘ্নে গড়িয়ে যেতে লাগল। তার ভাবভঙ্গিতে কোনো বিশেষ পরিবর্তন এলো না—এমনকি যখন গাড়ি শহরের কেন্দ্রে পৌঁছে কোম্পানির ভবনের সামনে থামল। চালক তাড়াহুড়ো করে নেমে এসে সম্মান দেখিয়ে পেছনের দরজাটা খুলে দিল।
Matthias হালকা মন নিয়ে গাড়ি থেকে নামল।
সে অপেক্ষমান পরিচালকদের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অভিবাদন জানাল এবং কোনো দৃষ্টি বিনিময় ছাড়াই কনফারেন্স রুমের টেবিলের সামনে বসে পড়ল। প্রত্যাশামতো, সভা শুরু থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল। তার সন্দেহ হচ্ছিল—খুব শিগগিরই এই ঘরটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে।
আজ তাকে একটি স্পষ্ট পথ বেছে নিতে হবে, আর এই সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ—Matthias তা ভালোভাবেই জানত। Duke of Herhardt হিসেবে এটিই তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—দিকনির্দেশ ঠিক করা, কোথায় এগোতে হবে তা নির্ধারণ করা।
সে সামনে থাকা নথিগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করল, মাথার ভেতর ধীরে ধীরে শুরু হওয়া হালকা যন্ত্রণাটাকে উপেক্ষা করে। কিন্তু জটিল সংখ্যাগুলো আর শব্দগুলো তার মনে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগল—সে কিছুই ধরতে পারছিল না। একসময় সে নিজেও বুঝতে পারল না—সে আসলে কী দেখছে।
ঠিক তখনই সে এমন কিছু শব্দ শুনতে শুরু করল, যেগুলোর কোনো অর্থ তার কাছে ছিল না। কিন্তু শিগগিরই সে পরিচিত সুর চিনে ফেলল—একটা সাইকেল পড়ে যাওয়ার শব্দ, বাতাসে ঘুরতে থাকা চাকার ঘর্ষণ, পাতার ব্যস্ত মর্মর… আর তার হৃদস্পন্দনের নরম ছন্দ। সবকিছু দ্রুত তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল।
সে কাঁপা আঙুলে সামনে রাখা পানির গ্লাসটার দিকে হাত বাড়াল। ফ্যাকাশে চামড়ার নিচে হাড়ের সন্ধিগুলো অসুস্থভাবে বেরিয়ে পড়ছিল। কিন্তু যতই সে বর্তমানের ওপর মনোযোগ দিতে চাইছিল, ততই সেই বিভ্রম আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—আর তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল কাদামাখা এক স্মৃতির ভেতর।
তার মনে সে এগিয়ে যাচ্ছিল পড়ে যেতে থাকা Leyla-এর দিকে, আর তার হৃদয় বুকে আছড়ে পড়ছিল।
দূরত্ব সত্ত্বেও তার মনে হচ্ছিল—সে তার গন্ধ পাচ্ছে। যেন তার শরীর গোলাপে ভিজে আছে। তার ঠোঁট হঠাৎ শুকিয়ে গেল, গলা তৃষ্ণায় জ্বলতে লাগল। কিন্তু সেই সব শব্দ—যেগুলো শিশুসুলভ ছড়ার মতো লাগছিল—ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
Leyla যখন তার দিকে তাকাল—ঠিক সেই মুহূর্তেই সবকিছু ফিকে হয়ে গেল। শুধু সে-ই রইল।
ধুলোমাখা রাস্তায় পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো ছোট্ট একটি মেয়ের ছবি Matthias-কে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলল। যদিও সে অবস্থানে ছিল—যেখানে সে তার দিকে নিচু হয়ে তাকিয়ে আছে—তবুও সেই দৃশ্য তাকে অদ্ভুতভাবে বিনম্র করে তুলল।
সে আগে কখনো এমন কিছু অনুভব করেনি…
হয়তো তখন সে জানত না… কিন্তু তার হৃদয় শুরু থেকেই জানত। সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল—এগুলো স্বাভাবিক অনুভূতি। Leyla-এর সামনে সে এমনিতেই এমন হয়ে যায়। এখনও তাই।
তার শক্তি আর অর্থ থাকা সত্ত্বেও, Leyla-এর উপস্থিতিতে সে নিজেকে সীমাহীন দুর্বল আর জীর্ণ মনে করত। হয়তো এ কারণেই সে তাকে বারবার ঠেলে দিয়েছিল—নিজেকে তার পাশে শক্তিশালী মনে করার জন্য।
“Excuse me… Duke.”
কেউ ডাকতেই Matthias মাথা তুলল।
তার ভেতরের সেই বিশাল শূন্যতা ছাড়া আর কিছুতে সে মন দিতে পারছিল না। সে কেবল এলোমেলো কিছু বলে কাজ শেষ করতে চাইছিল, বাড়ি ফিরে আবার ঘুমের ওষুধ গিলে নিতে চাইছিল। আর কিছুই তার দেখার ইচ্ছা ছিল না। এই মুহূর্তে পৃথিবী শেষ হয়ে গেলেও, তার কিছুই এসে যেত না।
সে চাইলে এই মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারত—আর তাতেও তার আপত্তি থাকত না। পাগলামি মনে হলেও—এইটাই এখন তার সত্য। এই একটাই সত্য তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তার চোখ ধীরে ধীরে পুরো কনফারেন্স রুমটা ঘুরে দেখল। সেই আভিজাত্যপূর্ণ দেয়ালের ভেতর নিজেকে সে অদ্ভুতভাবে বেমানান মনে করল।
অবশেষে Matthias নিজেকে সামলে নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করল—এর আগেই যেন তার শক্তি আর স্থিরতা পুরোপুরি ভেঙে না পড়ে।
“আমি দুঃখিত।”
সে বলল, শরীরের বাড়তে থাকা টান কমাতে গলা এদিক-ওদিক নাড়তে নাড়তে। “এই মুহূর্তে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় আমি নেই।”
“না—আপনি কী বলতে চাইছেন…”
তার আপত্তিগুলো মুহূর্তেই থেমে গেল, যখন তারা দেখল Matthias তার গলা মালিশ করছে।
ঘরে নীরবতা নেমে এলো। তারপর উপস্থিত সবার পক্ষ থেকে কেউ একজন কথা বলল।
“আমার মনে হয়, আরও পর্যাপ্ত আলোচনার পর বোর্ডের সিদ্ধান্তকেই Herhardts-দের সম্মান জানাতে হবে।”
নির্বাহী পরিচালক ঘোষণা করলেন, Matthias-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
“আমি নিশ্চিত—Mr. Hessen চূড়ান্ত সমন্বয়ের দায়িত্ব সামলাতে পারবেন।”
এটা ছিল যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত,
Herhardt-এর পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই যে ব্যক্তি বাস্তব ব্যবস্থাপনা সামলাচ্ছিলেন—Hessen—তিনিই তো Matthias-এর গুরু, যিনি তাকে কোম্পানির সবকিছু শিখিয়েছিলেন। ঘরের নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল।
কারও মনে প্রশ্ন জাগছিল—
গুজবগুলো কি সত্যি? Duke-এর স্বাস্থ্য কি সত্যিই এতটা খারাপ? এর প্রভাব কতটা পড়েছে তার ওপর?
Herhardts-দের ভবিষ্যৎ তাহলে কী?
সবাই দম আটকে তাকিয়ে রইল—তরুণ Duke-এর মনে কী চলছে, তা বোঝার চেষ্টা করে।
ধীরে ধীরে Matthias তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। নির্বাহী পরিচালকের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সে সম্মত হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া হলো।
“আবারও ক্ষমাপ্রার্থী।”
কাজ শেষ করতে না পারার হতাশা স্পষ্ট থাকলেও, তার কণ্ঠ রইল নির্লিপ্ত, গম্ভীর আর মার্জিত। তবে বাতাসে তার দৃষ্টির বিচরণ সবার ভেতর অস্বস্তির সঞ্চার করল।
তার উপস্থিতি যেন ঠান্ডা আগুনে মোড়া ছিল।
না—সে নিজেই যেন আগুনে পরিণত হয়েছিল।
তবুও, Matthias ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নির্বাহীরা হতাশা লুকোতে পারল না। ফিসফাস শুরু হয়ে গেল—তরুণ Duke-এর সঙ্গে আসলে কী হচ্ছে, তা নিয়ে।
সেখান থেকে সরে আসার সময় তার জ্যাকেট খুলে ফেলতে ইচ্ছা করছিল, কিন্তু উপরের বোতামগুলো খুলতেই তার হাত কেঁপে উঠল। সে রুক্ষভাবে টাইটা টেনে খুলে নিয়ে মুঠো করে ভাঁজ করল আর বুকের পকেটে গুঁজে দিল।
“আজকের বাকি সময়ের জন্য আমার আর আপনার বা অন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই।”
Mark Evers-কে আদেশ দিল Matthias, যে তার পেছনে পেছনে আসছিল। কথার শেষে তার কণ্ঠ খানিকটা ভেঙে গেল।
পরিচারকটি মুহূর্তখানেক ইতস্তত করল—সে কি তার মাস্টারের সঙ্গে থাকবে? কিন্তু Matthias কোনো উত্তর অপেক্ষা না করেই মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে বিশাল লবির ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল।
খুব বেশি সময় লাগল না—তরুণ Duke নিজেকে এক অসম্ভব উজ্জ্বল পৃথিবীতে টলতে টলতে বেরিয়ে যেতে দেখল।
চলবে....