🖤 CRAZY LOVE
পর্ব ২: তুমি আমার অজানা রহস্য
✍️ লেখক: Mafiya Queen 👑
১. একটা অদ্ভুত সকাল
সকাল ৯টা।
BLACKWOOD CORPORATION-এর ৪২ তলার করিডোরে দ্রুত পায়ে হাঁটছে এলোরিয়া।
আজ তার অফিসে আসতে একটু দেরি হয়ে গেছে।
গত রাতে ডায়েরির ভেতরে পাওয়া ছবিটা নিয়ে অনেক ভেবেছে সে। ছবির মেয়েটি কে? স্যামের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? আর স্যাম কেন ছবিটার কথা শুনে এতটা অস্বাভাবিক আচরণ করল?
কোনো প্রশ্নের উত্তর পায়নি।
কেবিনে ঢুকে নিজের ডেস্কে ব্যাগ রাখতেই মিরা এসে হাজির।
— এই মেয়ে! তোর কী হয়েছে?
এলোরিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— আমার আবার কী হবে?
— মুখ দেখে মনে হচ্ছে সারারাত ঘুমাসনি।
— আসলে একটা বিষয় নিয়ে ভাবছিলাম।
— কী বিষয়?
এলোরিয়া একটু থেমে বলল,
— আমাদের CEO-কে নিয়ে।
মিরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় করল।
— আবার স্যাম ব্ল্যাকউড!
— আরে আস্তে বল!
— কী হয়েছে এবার?
এলোরিয়া চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
— কাল উনি আমাকে একটা ডায়েরি দিয়েছেন।
— কী!
— চিৎকার করিস না!
— স্যাম ব্ল্যাকউড তোকে ডায়েরি দিয়েছে?
— হ্যাঁ। কিন্তু তার ভেতরে একটা ছবি ছিল। ছবিতে উনার সঙ্গে একটা মেয়ে ছিল।
মিরার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কেমন মেয়ে?
— সুন্দর। তবে ছবিটা অনেক পুরোনো মনে হচ্ছে।
মিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— এলোরিয়া, একটা কথা বলি?
— বল।
— স্যামের অতীত নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করিস না।
এলোরিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— সবাই একই কথা বলে কেন?
— কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো।
এলোরিয়া হালকা হেসে বলল,
— আমি কিন্তু উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শান্তি পাই না।
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তুই একদিন বিপদে পড়বি।
২. মিস্টার ব্ল্যাকউডের মেজাজ
সকাল ১০টা ৩০ মিনিট।
স্যামের কেবিনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলছে।
টেবিলের চারপাশে কয়েকজন পরিচালক বসে আছেন।
স্যাম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র।
তার ব্যক্তিগত সহকারী রায়ান একটি ফাইল এগিয়ে দিল।
— স্যার, নতুন প্রজেক্টের রিপোর্ট।
স্যাম ফাইল খুলে দেখল।
কিছুক্ষণ পর ভ্রু কুঁচকে বলল,
— এই রিপোর্ট কে তৈরি করেছে?
রায়ান বলল,
— এলোরিয়া ম্যাম।
স্যাম ফাইল বন্ধ করল।
— তাকে আমার কেবিনে পাঠাও।
কয়েক মিনিট পর এলোরিয়া দরজায় এসে দাঁড়াল।
— মে আই কাম ইন?
— Come in.
এলোরিয়া ভেতরে ঢুকল।
— আমাকে ডেকেছেন, স্যার?
স্যাম ফাইলটা তার দিকে এগিয়ে দিল।
— এটা আপনি তৈরি করেছেন?
— জি।
— এখানে এই ভুলটা কেন?
এলোরিয়া ফাইলের দিকে তাকাল।
— কোথায় ভুল হয়েছে?
স্যাম নির্দিষ্ট জায়গাটা দেখিয়ে দিল।
এলোরিয়া মনোযোগ দিয়ে দেখল।
তারপর বলল,
— ওহ! এটা আমার ভুল হয়েছে। আমি ঠিক করে দিচ্ছি।
স্যাম কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— সবকিছু এত সহজভাবে মেনে নেন?
এলোরিয়া অবাক হলো।
— মানে?
— কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করেন?
এলোরিয়া মুচকি হেসে বলল,
— ভুল করলে স্বীকার করতে সমস্যা কোথায়?
স্যাম কোনো উত্তর দিল না।
এলোরিয়া ফাইলটা নিয়ে বের হওয়ার জন্য ঘুরতেই স্যাম বলল,
— মিস এলোরিয়া।
— জি?
— গতকালের ছবিটা নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন করবেন না।
এলোরিয়া এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
— কেন?
— কারণ আমি বলেছি।
— কিন্তু আমি তো শুধু জানতে চেয়েছিলাম।
স্যামের কণ্ঠ কঠিন হলো।
— সবকিছু জানার প্রয়োজন হয় না।
এলোরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা বলি?
— বলুন।
— আপনি সব সময় মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখেন কেন?
স্যাম স্থির হয়ে গেল।
এলোরিয়া আর কিছু না বলে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর স্যাম ধীরে চোখ নামিয়ে আনল।
কেউ তাকে এমন প্রশ্ন করে না।
কেউ তার কাছে এত সহজভাবে সত্য জানতে চায় না।
৩. প্রথম ঈর্ষা
দুপুর ১টা।
ক্যান্টিনে বসে হাসাহাসি করছে এলোরিয়া ও মিরা।
তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে অফিসের নতুন কর্মী আরহাম।
আরহাম বেশ হাসিখুশি স্বভাবের ছেলে।
— এলোরিয়া, তুমি কি জানো? আমাদের অফিসে তোমার মতো এত কথা বলা মানুষ আগে দেখিনি।
এলোরিয়া হেসে বলল,
— তাহলে আমার জন্য একটা পুরস্কার থাকা উচিত।
আরহামও হেসে ফেলল।
— অবশ্যই। সবচেয়ে বেশি কথা বলার পুরস্কার!
তিনজনের হাসির শব্দ ক্যান্টিনে ছড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু ক্যান্টিনের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে থাকা স্যামের মুখে কোনো হাসি নেই।
তার চোখ আটকে আছে এলোরিয়ার দিকে।
রায়ান পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— স্যার, মিটিং শুরু হতে পাঁচ মিনিট বাকি।
স্যাম চোখ না সরিয়েই বলল,
— ওই ছেলেটা কে?
— আরহাম স্যার। মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে নতুন যোগ দিয়েছে।
— ওর কাজ কী?
— মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ।
স্যাম এবার এলোরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— বুঝলাম।
তারপর সেখান থেকে চলে গেল।
রায়ান মনে মনে ভাবল,
'আজকে আবার কী হলো স্যারের?'
কিছুক্ষণ পর এলোরিয়ার ফোনে মেসেজ এল।
Sam Blackwood:
'আমার কেবিনে আসুন।'
এলোরিয়া মেসেজ পড়ে মিরার দিকে তাকাল।
— আবার কী হলো?
মিরা হেসে বলল,
— তোর CEO তোকে খুব পছন্দ করে মনে হয়!
— চুপ কর!
৪. তুমি এত হাসো কেন?
স্যামের কেবিনে ঢুকতেই এলোরিয়া বলল,
— ডাকছিলেন?
স্যাম ল্যাপটপ বন্ধ করল।
— বসুন।
এলোরিয়া বসল।
— আপনার কোনো কাজ ছিল?
স্যাম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— ক্যান্টিনে বেশ আনন্দ করছিলেন দেখলাম।
এলোরিয়া অবাক।
— জি। লাঞ্চ করছিলাম।
— নতুন ছেলেটার সঙ্গে বেশ ভালো পরিচয় হয়েছে মনে হচ্ছে।
এলোরিয়া এবার বুঝতে পারল।
তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
— আপনি কি আমার লাঞ্চের হিসাবও রাখেন?
স্যাম চোখ সরু করল।
— কী বলতে চাইছেন?
— কিছু না। তবে আপনি যদি জানতে চান, আরহাম আমার সহকর্মী। তার সঙ্গে কথা বলতেই পারি।
স্যাম চুপ করে রইল।
এলোরিয়া আবার বলল,
— নাকি আপনার কোম্পানিতে হাসাহাসি করাও নিষেধ?
স্যাম এবার একটু বিরক্ত হলো।
— আপনি সবকিছু নিয়ে মজা করেন কেন?
এলোরিয়া মৃদু হেসে বলল,
— কারণ সব সময় গম্ভীর হয়ে থাকলে জীবনটা খুব বিরক্তিকর হয়ে যায়।
স্যাম তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— আপনার কোনো ভয় নেই?
— কীসের ভয়?
— আমার।
এলোরিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
— প্রথম দিন একটু ছিল। এখন আর নেই।
— কেন?
— কারণ আপনি যতটা ভয়ংকর দেখান, ততটা নন।
কথাটা শুনে স্যাম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— You may leave.
এলোরিয়া উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ঘুরে বলল,
— আর একটা কথা, মিস্টার ব্ল্যাকউড।
— কী?
— একটু হাসতে শিখুন। আপনাকে মানাবে।
এই বলে সে চলে গেল।
স্যাম এবার সত্যিই হেসে ফেলল।
খুব সামান্য।
কিন্তু বহুদিন পর।
৫. সেই পুরোনো বাড়ি
সন্ধ্যা ৭টা।
BLACKWOOD MANSION।
স্যাম নিজের ঘরে বসে পুরোনো একটি অ্যালবাম দেখছিল।
অ্যালবামের প্রতিটি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার জীবনের কিছু স্মৃতি।
একটি ছবির সামনে এসে তার হাত থেমে গেল।
ছবিতে একটি মেয়ে।
নাম—লুনা।
স্যামের জীবনের একসময়ের খুব কাছের মানুষ।
হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল।
রায়ান ভেতরে ঢুকল।
— স্যার, আপনি যে তথ্যগুলো চেয়েছিলেন, সেগুলো পেয়েছি।
স্যাম অ্যালবাম বন্ধ করল।
— বলো।
— এলোরিয়া রহমান। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে না। বর্তমানে নিজের বান্ধবীর সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেছে। চাকরির রেকর্ডও ভালো।
স্যাম মনোযোগ দিয়ে শুনল।
— আর কিছু?
রায়ান একটু ইতস্তত করল।
— জি, স্যার। একটা বিষয় আছে।
— কী?
— এলোরিয়ার মায়ের নামের সঙ্গে আমাদের পুরোনো একটা রেকর্ডের মিল পাওয়া গেছে।
স্যামের চোখ স্থির হয়ে গেল।
— কী বললে?
— এখনো নিশ্চিত নই, স্যার। তবে নামটা...
স্যাম উঠে দাঁড়াল।
— সব তথ্য আবার যাচাই করো।
— জি, স্যার।
— আর বিষয়টা আপাতত কাউকে জানাবে না।
রায়ান মাথা নাড়ল।
স্যাম জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
এলোরিয়া।
এই মেয়েটি তার জীবনে আসার পর থেকে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে।
এটা কি কেবলই কাকতালীয়?
নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?
৬. বৃষ্টির রাতে
রাত ৮টা ১৫ মিনিট।
এলোরিয়া অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
আজ মিরা আগে চলে গেছে।
বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
সে ব্যাগ থেকে ছাতা বের করতে গিয়ে বুঝল, ছাতাটা বাসায় ফেলে এসেছে।
— অসাধারণ! আজকেই ছাতাটা বাসায় রেখে আসতে হলো!
ঠিক তখন পেছন থেকে একটি পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।
— আপনার কি বৃষ্টির সঙ্গে বিশেষ কোনো সম্পর্ক আছে?
এলোরিয়া ঘুরে তাকাল।
স্যাম।
কালো শার্ট, হাতে গাড়ির চাবি।
এলোরিয়া হেসে বলল,
— আপনি কি সব সময় ঠিক সময়ে হাজির হন?
— সেটা কীভাবে?
— যখনই আমি বিপদে পড়ি, তখনই আপনাকে দেখতে পাই।
স্যাম বলল,
— তাহলে এটাকে কাকতালীয় ভাবতে পারেন।
— আর আপনি?
— আমি কী?
— আপনিও কি কাকতালীয় ভাবেন?
স্যাম উত্তর দিল না।
গাড়ির দরজা খুলে বলল,
— উঠুন।
এলোরিয়া এবার কোনো আপত্তি করল না।
গাড়ির ভেতরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর স্যাম বলল,
— আজ খুব চুপচাপ।
এলোরিয়া মৃদু হেসে বলল,
— আমি কথা বললে তো আপনার বিরক্ত লাগে।
— কে বলেছে?
— আপনার মুখই বলে দেয়।
স্যাম এবার তার দিকে তাকাল।
— আমার মুখের কথা এত মনোযোগ দিয়ে পড়েন?
এলোরিয়া হেসে ফেলল।
— আপনার মুখের ভাষা পড়তে খুব বেশি কষ্ট হয় না।
স্যামও এবার মৃদু হাসল।
গাড়ির ভেতর কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।
তারপর এলোরিয়া হঠাৎ বলল,
— একটা প্রশ্ন করব?
— আবার?
— হ্যাঁ, আবার।
— করুন।
— আপনি কি কখনো কাউকে সত্যিকারের ভালোবেসেছেন?
প্রশ্নটা শুনে স্যামের হাত স্টিয়ারিংয়ে স্থির হয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— কিছু প্রশ্নের উত্তর সময়ের কাছে রেখে দিতে হয়।
এলোরিয়া জানালার বাইরে তাকাল।
— আপনার সব উত্তরই এত রহস্যময় কেন?
স্যাম এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— কারণ আমার সব গল্পের শেষটা সুন্দর নয়।
এলোরিয়া আর কোনো প্রশ্ন করল না।
৭. অচেনা একটি ফুল
গাড়ি এলোরিয়ার অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল।
নামার আগে স্যাম বলল,
— এক মিনিট।
সে পাশের সিট থেকে একটি ছোট্ট বাক্স তুলে এলোরিয়ার হাতে দিল।
এলোরিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
— এটা কী?
— খুলে দেখুন।
বাক্স খুলতেই ভেতরে একটি কালো গোলাপের বুকমার্ক।
সেটার ওপর ছোট্ট করে লেখা—
ELORIA
এলোরিয়ার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— এটা খুব সুন্দর!
স্যাম বলল,
— ডায়েরির সঙ্গে মানাবে।
এলোরিয়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
— আপনি কি সবার জন্য এমন উপহার কিনে দেন?
স্যাম কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— না।
— তাহলে?
— সবাই আপনার মতো এত প্রশ্ন করে না।
এলোরিয়া হেসে ফেলল।
— গুড নাইট, মিস্টার ব্ল্যাকউড।
— গুড নাইট, এলোরিয়া।
প্রথমবার স্যাম তাকে মিস এলোরিয়া না বলে শুধু এলোরিয়া বলে ডাকল।
ছোট্ট একটি বিষয়।
কিন্তু এলোরিয়ার কাছে অদ্ভুতভাবে ভালো লাগল।
৮. মধ্যরাতের ফোন
রাত ১২টা ৩৫ মিনিট।
এলোরিয়া বিছানায় শুয়ে ডায়েরিতে কিছু লিখছিল।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাম দেখে সে অবাক হলো।
Sam Blackwood Calling...
এত রাতে স্যাম ফোন করছে কেন?
সে কল রিসিভ করল।
— হ্যালো?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর স্যামের কণ্ঠ।
— ঘুমাচ্ছিলেন?
— না। কিছু লিখছিলাম।
— কী লিখছিলেন?
— ডায়েরিতে।
— কী নিয়ে?
এলোরিয়া হেসে বলল,
— এত প্রশ্ন করছেন কেন? আমি তো আপনাকে প্রশ্ন করলে বিরক্ত হন।
স্যাম মৃদু হেসে বলল,
— আজ বিরক্ত হচ্ছি না।
এলোরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— আপনার ঘুম আসছে না?
— না।
— কেন?
— জানি না।
— তাহলে একটা কাজ করুন। জানালার পর্দা খুলে আকাশ দেখুন।
স্যাম নীরব হয়ে গেল।
এলোরিয়া বলল,
— কী হলো?
— আপনি সব সময় জানালা নিয়ে কথা বলেন কেন?
— কারণ জানালার ওপারে একটা সুন্দর পৃথিবী আছে। আপনি সেটা দেখেন না কেন?
স্যাম ধীরে নিজের ঘরের জানালার দিকে তাকাল।
বহু বছর পর সে পর্দাটা সরিয়ে দিল।
বাইরে চাঁদ দেখা যাচ্ছে।
সে মৃদু স্বরে বলল,
— আজ আকাশটা সুন্দর।
এলোরিয়া হাসল।
— দেখলেন? সবকিছু এত খারাপও নয়।
স্যাম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— শুভরাত্রি, এলোরিয়া।
— শুভরাত্রি, স্যাম।
কল কেটে গেল।
স্যাম ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কেউ তাকে এত সহজভাবে আকাশ দেখতে শেখাবে, এটা সে কখনো ভাবেনি।
৯. ছবির পেছনের নাম
পরদিন সকাল।
এলোরিয়া ডায়েরির ভেতরের ছবিটা আবার বের করল।
আজ সে ছবির পেছনের লেখাটা ভালো করে দেখতে চায়।
ছবিটা উল্টাতেই ছোট্ট একটি নাম চোখে পড়ল।
LUNA BLACKWOOD.
এলোরিয়া নামটা পড়ে থমকে গেল।
লুনা ব্ল্যাকউড!
সে দ্রুত ফোন বের করে নামটা খুঁজতে শুরু করল।
কিন্তু ইন্টারনেটে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া গেল না।
শুধু একটি পুরোনো সংবাদ।
শিরোনাম—
BLACKWOOD FAMILY'S MYSTERIOUS PAST.
সংবাদের তারিখ প্রায় আট বছর আগের।
এলোরিয়া পুরো লেখাটা পড়ার আগেই দরজায় টোকা পড়ল।
মিরা ঢুকে বলল,
— কী করছিস?
এলোরিয়া তাড়াতাড়ি ফোনটা লক করে ফেলল।
— কিছু না।
— তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে আবার কোনো রহস্য পেয়েছিস।
এলোরিয়া মুচকি হাসল।
— মিরা, লুনা ব্ল্যাকউড কে?
নামটা শুনে মিরার মুখের রং বদলে গেল।
— তুই এই নাম কোথায় পেলি?
— একটা ছবিতে।
মিরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
— এলোরিয়া, প্লিজ। এই নামটা নিয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করিস না।
— কেন?
— কারণ এই নামের সঙ্গে স্যামের জীবনের এমন একটা অধ্যায় জড়িয়ে আছে, যেটা কেউ মনে করতে চায় না।
এলোরিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।
Sam Blackwood:
'আজ আমার কেবিনে আসবেন। জরুরি কথা আছে।'
এলোরিয়া মেসেজের দিকে তাকাল।
তারপর মিরার দিকে।
— মনে হচ্ছে আজকে আবার একটা নতুন রহস্যের মুখোমুখি হতে হবে।
১০. শেষ প্রশ্ন
সকাল ১১টা।
স্যামের কেবিন।
এলোরিয়া দরজায় নক করল।
— Come in.
সে ভেতরে ঢুকল।
স্যাম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
আজ তার মুখে সেই পরিচিত গম্ভীর ভাব।
— বসুন।
এলোরিয়া বসল।
স্যাম ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
— আপনি কি লুনা সম্পর্কে খোঁজ করছেন?
এলোরিয়া চমকে উঠল।
— আপনি জানলেন কীভাবে?
— আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।
এলোরিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— ছবিটা দেখেছি। তাই জানতে ইচ্ছে হয়েছে।
স্যাম টেবিলের ওপর হাত রাখল।
— আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম, এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করবেন না।
এলোরিয়া এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, একটা পুরোনো ছবি নিয়ে এত সমস্যা কোথায়!
স্যাম তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে বলল,
— কারণ ওই ছবির মানুষটা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন ছিল।
এলোরিয়া চুপ করে গেল।
— সে এখন কোথায়?
প্রশ্নটা শুনে স্যামের চোখে অদ্ভুত এক শূন্যতা নেমে এল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
— জানি না।
এলোরিয়া এবার আর কিছু বলল না।
স্যাম জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আপনি কি জানেন, কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাদের স্মৃতি একটা মানুষের পুরো জীবন আটকে রাখতে পারে?
এলোরিয়া ধীরে বলল,
— জানি না। তবে হয়তো একদিন বুঝতে পারব।
স্যাম তার দিকে তাকাল।
— আশা করি বুঝতে হবে না।
দুজনের চোখাচোখি হলো।
কয়েক সেকেন্ড।
তারপর এলোরিয়া উঠে দাঁড়াল।
— আমি তাহলে যাই?
স্যাম মাথা নাড়ল।
এলোরিয়া দরজার কাছে পৌঁছাতেই স্যাম আবার ডাকল।
— এলোরিয়া।
— জি?
— একটা কথা মনে রাখবেন।
— কী?
স্যাম তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমার জীবনে প্রবেশ করা খুব সহজ। কিন্তু আমার অতীতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এতটা সহজ নয়।
এলোরিয়া মৃদু হেসে বলল,
— আমি আপনার অতীত হতে চাই না, স্যাম। আমি চাইলে আপনার বর্তমানের একজন ভালো বন্ধু হতে পারি।
কথাটা বলে সে বেরিয়ে গেল।
স্যাম দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের ডেস্কের ড্রয়ার খুলল।
ভেতরে রাখা পুরোনো ছবিটা বের করল।
ছবির পেছনে লেখা ছিল—
'Forever isn't promised to anyone.'
স্যাম ধীরে ছবিটা বন্ধ করল।
তার ফোনে নতুন একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর।
Unknown:
'তুমি কি সত্যিই ভেবেছ, অতীত তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে, স্যাম?'
স্যামের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
সে রিপ্লাই দিল,
'কে তুমি?'
উত্তর এল—
'যে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য জানে।'
স্যাম ফোনটা শক্ত করে ধরে রইল।
তারপর আরও একটি মেসেজ এল।
'এলোরিয়াকে নিয়ে সাবধান হও। তুমি জানো না, সে আসলে কে।'
স্যাম ধীরে চোখ বন্ধ করল।
আজ প্রথমবার তার মনে হলো, এলোরিয়ার আগমন হয়তো নিছক কাকতালীয় নয়।
আর এই গল্পে এমন কিছু রহস্য আছে, যার উত্তর সে নিজেও জানে না।
চলবে...
🥀 পরবর্তী পর্বে:
অচেনা নম্বর থেকে আসা রহস্যময় মেসেজ।
স্যামের জীবনে লুনার আসল পরিচয়।
এলোরিয়া ও স্যামের প্রথম বড় অভিমান।
এমন একটি ঘটনা, যা তাদের সম্পর্ককে নতুন দিকে নিয়ে যাবে।
CRAZY LOVE — To be continued...