ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবরুদ্ধ অভিমান

পর্ব 4

লেখক: নুসরাত জাহানের রাফা

নিষিদ্ধ অনুভূতি

লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা

পর্ব সংখ্যা: ৪

অতীতের ছায়া

সকালের সূর্যের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে রাফার ঘরে প্রবেশ করছিল। কিন্তু এত সুন্দর সকালেও রাফার মনটা ভালো ছিল না। সারারাত সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আদবির সঙ্গে তানিয়ার সেই ছবিটি।

ছবিটা দেখার পর থেকে তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— আদবি কি সত্যিই তার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছে?

রাফা বিছানা থেকে উঠে জানালার পাশে দাঁড়াল। হাতে ফোন নিয়ে আদবির নামের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকবার কল করার কথা ভেবেও শেষ পর্যন্ত করল না।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

— রাফা, কী হয়েছে মা? সকাল থেকে ঘরে বসে আছিস কেন?

শারমিন বেগমের কণ্ঠ শুনে রাফা পেছনে ফিরে তাকাল।

— কিছু হয়নি আম্মু। একটু ভালো লাগছে না।

— শরীর খারাপ?

— না, আম্মু।

শারমিন মেয়ের কপালে হাত রেখে বললেন,

— মন খারাপ থাকলে মায়ের কাছে বলতে হয়। সব কথা নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখলে কষ্ট আরও বেড়ে যায়।

রাফা মায়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

— পরে বলব আম্মু।

অন্যদিকে আদবি নিজের ঘরে বসে ছিল। তার সামনে একটি পুরোনো ছবি রাখা। ছবিতে তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তানিয়া। ছবিটির দিকে তাকিয়ে আদবি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

এমন সময় তার মা ঘরে প্রবেশ করলেন।

— আদবি, কী হয়েছে তোর? কয়েক দিন ধরে তোকে কেমন অস্থির দেখাচ্ছে।

আদবি ছবিটা উল্টে রেখে বলল,

— কিছু না মা।

— তানিয়া কি আবার যোগাযোগ করেছে?

মায়ের প্রশ্নে আদবি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

— হ্যাঁ, মা। আবার ফোন করেছিল।

— তুই কি এখনো ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাস?

আদবি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

— না মা। আমি শুধু চাই, অতীতের বিষয়গুলো আর নতুন করে সামনে না আসুক।

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

— অতীতকে লুকিয়ে রাখলে একদিন সেটা আরও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। রাফাকে যদি কোনো বিষয়ে জানানো দরকার হয়, তাহলে সময় থাকতে জানিয়ে দিস।

আদবি মাথা নাড়ল।

— আমি জানি মা। এবার আর কিছু লুকাব না।

দুপুরের দিকে রাফা নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল। নুসাইবা এসে বিছানায় বসে বলল,

— আপু, তুমি কি কারও ওপর রাগ করেছ?

রাফা বই থেকে চোখ তুলে বলল,

— কেন?

— কারণ তুমি আজ একদম চুপচাপ। আমার সঙ্গে ঝগড়াও করছ না!

রাফা হেসে ফেলল।

— তোর সঙ্গে ঝগড়া না করলে কি আমার দিন কাটে না?

নুসাইবা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— সেটা তো জানি না। তবে তোমাকে এমন দেখলে আমার ভালো লাগে না।

রাফা ছোট বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ এল।

আদবি লিখেছে—

“আপনার সঙ্গে জরুরি কিছু কথা আছে। আজ বিকেলে একটু দেখা করতে চাই। দয়া করে আসবেন।”

রাফা কিছুক্ষণ মেসেজটির দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল,

“ঠিক আছে। তবে আজ সব প্রশ্নের উত্তর চাই।”

বিকেলে নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে রাফা দেখল, আদবি আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছে। রাফাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল।

— এসেছেন?

— জি। কী কথা বলবেন?

আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— প্রথমেই একটা কথা বলতে চাই। গত কয়েক দিন ধরে যা হচ্ছে, তার জন্য আমি দুঃখিত।

রাফা শান্ত গলায় বলল,

— দুঃখিত বললেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে?

— না। কিন্তু আমি চাই আপনি আমার কথাটা একবার শুনুন।

রাফা কিছু না বলে চুপ করে রইল।

আদবি বলতে শুরু করল,

— তানিয়া আমার অতীতের একজন মানুষ। একসময় আমাদের পরিবারের মধ্যে বিয়ের কথাবার্তাও হয়েছিল। কিন্তু কিছু পারিবারিক সমস্যা আর ভুল বোঝাবুঝির কারণে সেই সম্পর্ক আর এগোয়নি।

রাফা অবাক হয়ে বলল,

— তাহলে আপনি আগে আমাকে বলেননি কেন?

— কারণ আমি অতীতের বিষয়গুলো আবার মনে করতে চাইনি। ভেবেছিলাম, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।

— কিন্তু তানিয়া তো আবার ফিরে এসেছে।

আদবি মাথা নিচু করে বলল,

— হ্যাঁ। আর আমি নিজেও বুঝতে পারছি না, সে আসলে কী চায়।

রাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— আপনি জানেন, আমি মিথ্যা একদম পছন্দ করি না। কাউকে বিশ্বাস করতে সময় লাগে, কিন্তু সেই বিশ্বাস ভাঙতে এক মুহূর্তই যথেষ্ট।

আদবি রাফার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আমি আপনার বিশ্বাস ভাঙতে চাইনি।

— তাহলে সত্যিটা লুকিয়েছিলেন কেন?

আদবি কোনো উত্তর দিতে পারল না।

রাফা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

— যেদিন আপনার মনে হবে আমাকে সব সত্যি বলা যায়, সেদিন কথা বলবেন।

কথাটা বলে সে চলে গেল। আদবি কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে রইল।

সন্ধ্যার পর তানিয়া একটি রেস্টুরেন্টে বসে কারও জন্য অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর একজন লোক এসে তার সামনে বসল।

লোকটি বলল,

— আপনি যা করতে বলেছিলেন, সব করেছি। মেয়েটি এখন আদবিকে সন্দেহ করছে।

তানিয়া মুচকি হেসে বলল,

— ভালো। কিন্তু কাজ এখনো শেষ হয়নি।

— এরপর কী করতে হবে?

তানিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— আদবির জীবনে এমন কিছু ঘটাতে হবে, যাতে সে আর কোনোভাবেই অতীত থেকে বের হতে না পারে।

লোকটি অবাক হয়ে বলল,

— কিন্তু এত বছর পর এসব করার কারণ কী?

তানিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,

— সেটা আপনার জানার দরকার নেই। শুধু মনে রাখবেন, আদবি যেন কিছু বুঝতে না পারে।

রাত প্রায় দশটা। রাফা নিজের ঘরে বসে ফোন দেখছিল। হঠাৎ অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

— হ্যালো, কে বলছেন?

ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল।

— আমি তানিয়া বলছি।

রাফা একটু অবাক হলো।

— আপনি আমাকে ফোন করেছেন কেন?

— আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল। আদবিকে নিয়ে।

— কী কথা?

তানিয়া মৃদু স্বরে বলল,

— আপনি কি সত্যিই মনে করেন, আদবি আপনাকে তার জীবনের সব কথা বলেছে?

রাফা চুপ করে রইল।

তানিয়া আবার বলল,

— আগামীকাল আমার সঙ্গে দেখা করুন। তাহলে বুঝতে পারবেন, আদবি আসলে কেমন মানুষ।

রাফা দৃঢ় গলায় বলল,

— আপনার যদি কিছু বলার থাকে, ফোনেই বলতে পারেন।

তানিয়া হালকা হেসে বলল,

— কিছু সত্যি আছে, যা ফোনে বলা যায় না। সামনে বসে শুনতে হয়।

কথাটা বলেই তানিয়া ফোন কেটে দিল।

রাফা ফোন হাতে নিয়ে বসে রইল। তার মনে এখন হাজারো প্রশ্ন।

অন্যদিকে আদবি নিজের ঘরে বসে আলমারির একটি গোপন ড্রয়ার খুলল। সেখানে পুরোনো কিছু ছবি, কাগজ আর একটি ডায়েরি রাখা ছিল।

সে ডায়েরিটি খুলে শেষ পাতায় চোখ রাখল।

সেখানে লেখা—

“যেদিন সত্যিটা প্রকাশ পাবে, সেদিন হয়তো আমার জীবনের সব হিসাব বদলে যাবে।”

আদবি ডায়েরিটা বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।

— আদবি, দরজাটা খোলো। তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

কণ্ঠটা শুনে আদবি থমকে গেল।

এই কণ্ঠ সে বহু বছর ধরে শোনেনি।

সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

আদবি কাঁপা কণ্ঠে বলল,

— আপনি! এত বছর পর এখানে কেন?

মানুষটি শান্ত গলায় বলল,

— তোমার অতীতের কিছু হিসাব এখনো বাকি আছে, আদবি। এবার সেগুলোর উত্তর তোমাকে দিতেই হবে।

চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন