নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৫
ফিরে আসা অতীত
আদবি দরজা খুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে একদম অবাক হয়ে গেল।
— আপনি! এত বছর পর এখানে কেন?
সামনের মানুষটি মৃদু হেসে বললেন,
— আমাকে দেখে এত অবাক হচ্ছিস কেন? নাকি ভেবেছিলি আমি আর কখনো ফিরব না?
আদবি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— ভেতরে আসুন।
লোকটি ঘরে ঢুকে চারপাশে তাকালেন। এরপর সোফায় বসে বললেন,
— অনেক কিছু বদলে গেছে দেখছি। কিন্তু তুই এখনো আগের মতোই রয়ে গেছিস।
আদবি গম্ভীর গলায় বলল,
— আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন, চাচা?
লোকটি আর কেউ নন, আদবির বাবার ছোট ভাই— রাশেদ সাহেব। পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে বহু বছর আগে তিনি বিদেশে চলে গিয়েছিলেন।
রাশেদ সাহেব বললেন,
— সব কথা বলব। তবে তার আগে একটা কথা জানতে চাই। তানিয়া কি আবার তোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে?
আদবি অবাক হয়ে গেল।
— আপনি তানিয়ার কথা জানলেন কীভাবে?
— কারণ তোর জীবনের ওই অধ্যায়ের সঙ্গে আমিও জড়িত।
আদবি এবার আরও অবাক হলো।
— আপনি কী বলতে চাইছেন?
রাশেদ সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— যে ঘটনাকে তুই এতদিন ভুল বোঝাবুঝি ভেবেছিস, তার পেছনে এমন কিছু সত্য লুকিয়ে আছে, যা তুই জানিস না।
আদবি কিছু বলার আগেই রাশেদ সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
— আজ থাক। কাল তোর সঙ্গে সব কথা বলব।
কথাটা বলে তিনি চলে গেলেন।
আদবি দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে একের পর এক প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।
সকালে রাফা ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিল। তানিয়ার কথাগুলো তার মনে পড়ল। আজ তার সঙ্গে দেখা করার কথা।
নিচে নাশতার টেবিলে গিয়ে বসতেই নুসাইবা বলল,
— আপু, আজ তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে!
রাফা হেসে বলল,
— প্রতিদিন কি আমাকে খারাপ লাগে?
— না, তবে আজ মনে হচ্ছে কোথাও যাচ্ছ।
রাফা অবাক হয়ে বলল,
— তুই কীভাবে বুঝলি?
নুসাইবা দুষ্টুমি করে হেসে বলল,
— আমার গোয়েন্দাগিরি খুব ভালো!
রাফা হেসে ফেলল।
নাশতা শেষ করে সে মাকে জানিয়ে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল।
নির্ধারিত রেস্টুরেন্টে পৌঁছে রাফা দেখল, তানিয়া আগে থেকেই বসে আছে।
রাফাকে দেখে তানিয়া বলল,
— আসুন, বসুন।
রাফা চেয়ারে বসে সরাসরি প্রশ্ন করল,
— আপনি আমাকে কেন ডেকেছেন?
তানিয়া কিছুক্ষণ রাফার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
— আপনি আদবিকে কতটুকু চেনেন?
— যতটুকু চেনার দরকার, ততটুকু।
তানিয়া হেসে বলল,
— মানুষকে বাইরে থেকে দেখে চেনা যায় না। আদবিও তার ব্যতিক্রম নয়।
রাফা শান্ত গলায় বলল,
— আপনি কি আমাকে ভয় দেখাতে চাইছেন?
— না। শুধু আপনাকে সাবধান করছি।
— কীসের জন্য?
তানিয়া এবার ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
ছবিতে আদবি, তানিয়া এবং আরও একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে।
রাফা ছবিটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল।
— এই মহিলাটি কে?
তানিয়া বলল,
— এই মানুষটির কারণেই আদবির জীবনে এত কিছু ঘটেছিল।
রাফা আরও কিছু জানতে চাইলে তানিয়া বলল,
— এখন সব বলতে পারব না। শুধু এটুকু বলব, আদবির পরিবারের সবাই আপনাকে সব সত্যি বলবে না।
রাফা ছবিটা টেবিলে রেখে বলল,
— আপনি যদি সত্যিই আমাকে সাহায্য করতে চান, তাহলে পুরো সত্যিটা বলুন। অর্ধেক কথা বলে কাউকে বিভ্রান্ত করবেন না।
তানিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— খুব শিগগিরই সব জানতে পারবেন।
এদিকে আদবি নিজের ঘরে বসে রাশেদ সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে রাফার নাম দেখে সে দ্রুত কল রিসিভ করল।
— হ্যালো, রাফা?
— জি।
— আপনি কোথায়?
— বাইরে।
— কার সঙ্গে?
রাফা একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
— সেটা জেনে আপনার কী হবে?
আদবি নরম গলায় বলল,
— আপনি কি তানিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেছেন?
রাফা অবাক হয়ে গেল।
— আপনি কীভাবে জানলেন?
— কারণ আমি জানি, তানিয়া আপনাকে নিজের মতো করে সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করবে।
রাফা বলল,
— তাহলে আপনি আমাকে সত্যিটা বলুন। তানিয়া যা বলেছে, তার চেয়েও বেশি কিছু কি আপনার অতীতে আছে?
আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আছে। কিন্তু আমি চাই না আপনি অন্য কারও কাছ থেকে সেই গল্প শুনুন।
— তাহলে কবে বলবেন?
— খুব শিগগিরই।
রাফা আর কিছু না বলে কল কেটে দিল।
সন্ধ্যায় রাশেদ সাহেব আবার আদবির ঘরে এলেন। এবার তাঁর হাতে একটি পুরোনো খাম।
তিনি খামটি আদবির হাতে দিয়ে বললেন,
— এটা তোর বাবার কাছে অনেক বছর ধরে রাখা ছিল। আমি আসার সময় নিয়ে এসেছি।
আদবি খামটি খুলল। ভেতরে কয়েকটি পুরোনো কাগজ এবং একটি ছবি।
ছবিটি দেখে আদবি অবাক হয়ে বলল,
— এ তো তানিয়ার মা!
রাশেদ সাহেব মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ। আর এই ছবির পেছনেই লুকিয়ে আছে সেই ঘটনার আসল রহস্য।
আদবি কাগজগুলো হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল। কয়েক লাইন পড়তেই তার মুখের রং বদলে গেল।
— চাচা, তাহলে এতদিন আমাকে যা বলা হয়েছে, সব কি ভুল ছিল?
রাশেদ সাহেব শান্ত গলায় বললেন,
— সবকিছু নয়। কিন্তু পুরো সত্যিটাও তোকে কেউ বলেনি।
আদবি অবিশ্বাসের চোখে তাঁর দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই আদবির ফোনে একটি মেসেজ এল।
অচেনা নম্বর থেকে লেখা—
“অতীতের সত্য খুঁজতে গিয়ে বর্তমানকে হারিয়ে ফেলো না। রাফাকে সবকিছু থেকে দূরে রাখো।”
আদবি মেসেজটি পড়ে দ্রুত জানালার বাইরে তাকাল।
তার মনে এবার নতুন সন্দেহ তৈরি হলো। এতদিন ধরে কে তাদের সবার ওপর নজর রাখছে?
অন্যদিকে রাফা বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকতেই তার ফোনে একটি ছবি এল। ছবিতে আদবির হাতে সেই পুরোনো খামটি দেখা যাচ্ছে।
ছবির নিচে লেখা—
“আসল সত্য জানতে চাইলে আদবির বাবার সঙ্গে কথা বলুন।”
রাফা ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।
এবার সে বুঝতে পারল, বিষয়টি শুধু আদবি আর তানিয়ার অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে দুই পরিবারের পুরোনো কোনো রহস্য জড়িয়ে আছে।
চলবে...