নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৬
গোপন সত্যের দরজা
রাত তখন প্রায় এগারোটা। আদবি নিজের ঘরে বসে পুরোনো খাম থেকে বের করা কাগজগুলো বারবার পড়ছিল। প্রতিটি লাইন যেন তার সামনে নতুন নতুন প্রশ্ন তুলে ধরছে।
এত বছর ধরে সে যে ঘটনাকে সত্যি বলে জেনে এসেছে, সেটাই যদি ভুল হয়, তাহলে এতদিন তাকে মিথ্যা বলেছে কে?
আদবি কাগজগুলো টেবিলের ওপর রেখে বাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার ডাকল,
— বাবা, ভেতরে আসব?
ভেতর থেকে উত্তর এল,
— আয় বাবা।
আদবি ঘরে ঢুকে বাবার সামনে বসল।
— বাবা, আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
সোহেল সাহেব ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— কী হয়েছে? তোকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
আদবি পকেট থেকে পুরোনো ছবিটা বের করে বাবার সামনে রাখল।
ছবিটা দেখেই সোহেল সাহেবের মুখের ভাব বদলে গেল।
— এই ছবিটা তুই কোথায় পেলি?
— চাচা দিয়েছেন। বাবা, এই ছবির পেছনে কী রহস্য আছে? আমাকে সব খুলে বলুন।
সোহেল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— কিছু কথা আছে, যা এত বছর ধরে কাউকে বলতে পারিনি।
— কিন্তু এখন তো জানার অধিকার আমার আছে, বাবা।
সোহেল সাহেব কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,
— অনেক বছর আগে তোর আর তানিয়ার পরিবারের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় দুই পরিবারের মধ্যে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যার কারণে সবকিছু ভেঙে যায়।
আদবি দ্রুত প্রশ্ন করল,
— কী ঘটনা?
— তোর চাচা রাশেদ সেই ঘটনার অনেক কিছু জানে। তবে একটা বিষয় মনে রাখিস, তানিয়ার বলা প্রতিটি কথা বিশ্বাস করবি না।
আদবি অবাক হয়ে বলল,
— তাহলে কি তানিয়া সত্যিটা জানে না?
— সেটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না।
আদবি এবার বুঝতে পারল, রহস্যটা তার ধারণার চেয়েও অনেক গভীর।
অন্যদিকে রাফা নিজের ঘরে বসে ছিল। আদবির বাবার সঙ্গে কথা বলার জন্য সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিন্তু কীভাবে কথাটা শুরু করবে বুঝতে পারছে না।
ঠিক তখনই দরজায় নুসাইবা এসে দাঁড়াল।
— আপু, কী ভাবছ?
— কিছু না।
— তোমার কিছু না মানেই অনেক কিছু!
রাফা হেসে বলল,
— তুই তো দেখি সব বুঝে ফেলিস।
নুসাইবা বিছানায় বসে বলল,
— আচ্ছা আপু, একটা কথা বলি? তুমি কি আদবি ভাইয়াকে পছন্দ করো?
রাফা একটু থমকে গেল।
— হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
— এমনিই। তোমার ফোনে উনার নাম দেখলেই তোমার মুখের ভাব বদলে যায়।
রাফা লজ্জা লুকিয়ে বলল,
— তুই এখন পড়তে যা।
নুসাইবা হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাফা আবার ফোনের দিকে তাকাল। আদবির সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা হলেও সে নিজেকে থামিয়ে রাখল।
পরদিন সকালে আদবি রাফাকে ফোন করল।
— আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুম আসসালাম।
— কেমন আছেন?
— ভালো। আপনি?
— আলহামদুলিল্লাহ। আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল।
রাফা বলল,
— বলুন।
— গতকাল বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি, আমার অতীতের কিছু ঘটনা সম্পর্কে আমি নিজেও সব জানি না।
রাফা অবাক হয়ে বলল,
— মানে?
— আমার বাবা কিছু কথা বলতে চাইছেন না। তবে আমি সত্যিটা জানার চেষ্টা করছি।
রাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমি একটা কথা জানতে চাই। আপনার জীবনে কি এমন কিছু আছে, যা জানলে আমি আপনার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলব?
আদবি নরম গলায় বলল,
— আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। তবে আমি চাই না আপনার কাছে কোনো সত্য লুকিয়ে থাকুক।
রাফার কণ্ঠ একটু নরম হলো।
— তাহলে সত্যিটা খুঁজে বের করুন। আমি অর্ধেক গল্প শুনে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— ধন্যবাদ।
— ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই।
কথা শেষ করে রাফা ফোন রেখে দিল। কিন্তু তার মনে অজানা একটা আশঙ্কা থেকেই গেল।
দুপুরে তানিয়া নিজের ঘরে বসে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল।
— কী বললেন? আদবি সব জানতে শুরু করেছে?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— হ্যাঁ। তার চাচা ফিরে এসেছে। পুরোনো কাগজগুলোও তার হাতে পৌঁছে গেছে।
তানিয়া চিন্তিত হয়ে বলল,
— এটা তো হওয়ার কথা ছিল না!
— এখন কী করবেন?
তানিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— রাফাকে আগে থামাতে হবে। মেয়েটা যদি সব জেনে যায়, তাহলে আমাদের পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে যাবে।
ওপাশ থেকে লোকটি বলল,
— আপনি কি নিশ্চিত, রাফা সব জানে না?
তানিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,
— আমি যা বলছি, সেটাই করুন।
ফোন রেখে তানিয়া আলমারির ভেতর থেকে একটি পুরোনো ডায়েরি বের করল। ডায়েরির প্রথম পাতায় একটি নাম লেখা ছিল।
নামটি দেখে তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
বিকেলে রাফার ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।
— হ্যালো, কে বলছেন?
— আমি এমন একজন মানুষ, যে আপনার অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে।
রাফা অবাক হয়ে বলল,
— আপনি কে?
— আমার পরিচয় পরে দেব। শুধু একটা কথা বলব, আদবির পরিবারে এমন কিছু ঘটেছিল, যা এখনো সবাইকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
রাফা দ্রুত প্রশ্ন করল,
— আপনি এসব জানেন কীভাবে?
— কারণ সেই ঘটনার সঙ্গে আমার পরিবারও জড়িত।
— তাহলে আপনি আমাকে সব বলুন।
লোকটি বলল,
— আগামীকাল বিকেলে পুরোনো বাড়িতে আসবেন। সেখানে আপনার জন্য কিছু রাখা আছে।
রাফা আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কল কেটে গেল।
সে ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
সন্ধ্যায় আদবি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। রাশেদ সাহেব এসে পাশে দাঁড়ালেন।
— কী ভাবছিস?
— চাচা, একটা কথা বলুন। এত বছর আগে ঠিক কী হয়েছিল?
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— কাল তোকে এমন একজনের সঙ্গে দেখা করাব, যে পুরো ঘটনাটা নিজের চোখে দেখেছিল।
আদবি অবাক হয়ে বলল,
— কে তিনি?
রাশেদ সাহেব উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন,
— ধৈর্য ধর। সব সত্য একসঙ্গে সামনে এলে তুই নিজেই বুঝতে পারবি।
ঠিক তখনই আদবির ফোনে রাফার মেসেজ এল।
“আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। কাল দেখা করতে হবে।”
আদবি দ্রুত উত্তর দিল,
“অবশ্যই। আপনি ভালো আছেন তো?”
রাফা লিখল,
“জানি না। মনে হচ্ছে আমাদের চারপাশে এমন কিছু ঘটছে, যা আমরা কেউ বুঝতে পারছি না।”
আদবি মেসেজটি পড়ে গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।
সে জানত না, পরদিনের সেই দেখা তাদের দুজনের জীবনেই নতুন মোড় নিয়ে আসবে।
চলবে...