নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৭
সকাল থেকেই রাফার মনটা অস্থির। গতকাল অচেনা নম্বর থেকে আসা ফোনটির কথা সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না। লোকটি বলেছিল, পুরোনো বাড়িতে গেলে সে নাকি অনেক প্রশ্নের উত্তর পাবে।
কিন্তু কোন বাড়ি? আর সেখানে কী এমন আছে?
রাফা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছিল। ঠিক তখনই তার ফোনে আদবির মেসেজ এল।
“সুপ্রভাত। ঘুম থেকে উঠেছেন?”
রাফা মেসেজটি পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর উত্তর দিল,
“জি, উঠেছি। আপনি?”
আদবি সঙ্গে সঙ্গে লিখল,
“আমিও। আজ আপনার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কোথায় দেখা করব?”
রাফা কিছুক্ষণ ভেবে লিখল,
“আজ আমাকে একটা পুরোনো বাড়িতে যেতে হবে। সেখানে কিছু জানার আছে।”
আদবি মেসেজটি পড়ে অবাক হলো।
“কোন পুরোনো বাড়ি? আপনি একা যাবেন না। ঠিকানা পাঠান, আমিও যাব।”
রাফা লিখল,
“আপনার যাওয়ার দরকার নেই।”
আদবি উত্তর দিল,
“দরকার আছে কি নেই, সেটা পরে বুঝবেন। আপাতত একা কোথাও যাবেন না।”
রাফা মেসেজটি পড়ে মৃদু হাসল। ছেলেটার ওপর রাগ থাকলেও তার যত্ন নেওয়ার ধরনটা অদ্ভুত।
দুপুরের দিকে রাফা তৈরি হয়ে নিচে নামল।
শারমিন বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
— কোথায় যাচ্ছিস মা?
— একটা কাজে যাচ্ছি আম্মু। একটু দেরি হতে পারে।
— কার সঙ্গে যাবি?
রাফা একটু থেমে বলল,
— একজন পরিচিত মানুষ যাবে।
মা বললেন,
— সাবধানে যাস। পৌঁছে আমাকে ফোন করিস।
— আচ্ছা আম্মু।
বাড়ির বাইরে এসে রাফা দেখল, আদবি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তাকে দেখে আদবি বলল,
— এত দেরি হলো কেন?
রাফা ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আমি কি আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছি?
আদবি হেসে বলল,
— না, কিন্তু অপেক্ষা করতে আমার খারাপ লাগেনি।
রাফা আর কিছু বলল না। দুজন গাড়িতে উঠে রওনা দিল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা একটি পুরোনো বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। বাড়িটির দেয়ালে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। চারপাশে বড় বড় গাছ, আর বাড়ির সামনে একটি পুরোনো লোহার গেট।
রাফা চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— এই বাড়িটা এত পুরোনো কেন?
আদবি বলল,
— মনে হচ্ছে অনেক বছর ধরে কেউ এখানে থাকে না।
ঠিক তখনই গেটের ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধ লোক বেরিয়ে এলেন।
— আপনারাই কি আদবি সাহেব আর রাফা মা?
আদবি অবাক হয়ে বলল,
— জি। আপনি আমাদের চেনেন?
বৃদ্ধ লোকটি বললেন,
— আপনাদের জন্যই তো অপেক্ষা করছি। ভেতরে আসুন।
রাফা আদবির দিকে তাকাল। আদবি চোখের ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করল।
তারা ভেতরে প্রবেশ করল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই রাফার চোখে পড়ল দেয়ালে টাঙানো বেশ কিছু পুরোনো ছবি। একটি ছবির সামনে এসে সে থেমে গেল।
ছবিতে আদবির বাবার সঙ্গে আরও দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।
রাফা বলল,
— আদবি সাহেব, এই ছবিটা দেখুন।
আদবি কাছে এসে ছবিটি দেখল। ছবির এক পাশে তার বাবা, অন্য পাশে চাচা রাশেদ। মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে সে চিনতে পারল না।
বৃদ্ধ লোকটি পেছন থেকে বললেন,
— মাঝখানে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনিই এই বাড়ির আসল মালিক ছিলেন।
আদবি প্রশ্ন করল,
— তিনি এখন কোথায়?
বৃদ্ধ লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— অনেক বছর আগে তিনি এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে কিছু জিনিস রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একদিন তাঁর পরিবারের কেউ এসে সেগুলো নিয়ে যাবে।
রাফা অবাক হয়ে বলল,
— সেই জিনিসগুলো কী?
বৃদ্ধ লোকটি তাদের একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের আলমারি। আলমারির ওপর রাখা ছোট একটি বাক্স।
তিনি বাক্সটি আদবির হাতে দিয়ে বললেন,
— এটা আপনার জন্য রেখে যাওয়া হয়েছিল।
আদবি বাক্সটি খুলল। ভেতরে একটি চিঠি, একটি পুরোনো চাবি এবং একটি ছবি ছিল।
চিঠির প্রথম লাইন পড়েই আদবির চোখ স্থির হয়ে গেল।
“আদবি, যদি কোনোদিন এই চিঠি তোর হাতে পৌঁছায়, তাহলে বুঝবি আমাদের পরিবারের সেই পুরোনো ঘটনা আবার সামনে এসেছে।”
রাফা আদবির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কী লেখা আছে?
আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— এখানে আমার পরিবারের কথা লেখা আছে। কিন্তু চিঠির শেষ অংশটা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
বৃদ্ধ লোকটি বললেন,
— শেষ অংশটি আমার কাছে নেই। তবে এই বাড়িতে আরও কিছু কাগজ থাকার কথা।
ঠিক তখনই রাফার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর।
সে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।
— বাড়িটিতে পৌঁছেছেন?
রাফা চমকে বলল,
— আপনি কে? আমাদের এখানে পাঠিয়েছেন কেন?
লোকটি বলল,
— কারণ সত্যিটা জানার সময় হয়েছে। তবে সাবধান, যাকে আপনি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন, তার কাছ থেকেই হয়তো কিছু লুকানো আছে।
রাফা দ্রুত বলল,
— আপনি পরিষ্কার করে বলুন!
কিন্তু লোকটি কল কেটে দিল।
আদবি কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,
— কে ফোন করেছিল?
রাফা বলল,
— সেই অচেনা মানুষটা। সে বলছে, আমাদের বিশ্বাসের মানুষই নাকি কিছু লুকিয়ে রেখেছে।
আদবি গম্ভীর হয়ে গেল।
— রাফা, একটা কথা বলব?
— বলুন।
— আপনি আমাকে সন্দেহ করতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু দয়া করে কোনো অচেনা মানুষের কথায় নিজের মনে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
রাফা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তাহলে আমাকে এমন একটা কারণ দিন, যাতে আপনাকে বিশ্বাস করতে পারি।
আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আমি চেষ্টা করব।
বাড়ি ফেরার আগে বৃদ্ধ লোকটি আদবির হাতে একটি ছোট চাবি দিলেন।
— এই চাবিটা আপনার বাবাকে দেখাবেন। তিনি জানবেন এটা কোথায় ব্যবহার করতে হবে।
আদবি চাবিটা পকেটে রেখে রাফাকে নিয়ে বেরিয়ে এল।
গাড়িতে ওঠার পর রাফা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।
আদবি বলল,
— কী ভাবছেন?
— ভাবছি, একটা পরিবারের অতীতের সঙ্গে এত মানুষের জীবন কীভাবে জড়িয়ে যেতে পারে!
আদবি মৃদু স্বরে বলল,
— সব রহস্যের উত্তর একদিন পাওয়া যাবে।
রাফা এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— উত্তর পাওয়ার আগে যেন কেউ আমাদের বিশ্বাস নষ্ট না করে দেয়।
আদবি কোনো উত্তর দিল না।
অন্যদিকে তানিয়া নিজের ঘরে বসে ফোনে কথা বলছিল।
— কী বলছেন! বাক্সটা আদবির হাতে পৌঁছে গেছে?
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
— জি। তবে চিঠির শেষ অংশটা এখনো পাওয়া যায়নি।
তানিয়া চিন্তিত হয়ে বলল,
— শেষ অংশটা যদি তারা পেয়ে যায়, তাহলে সব শেষ!
ফোন রেখে সে আলমারির ভেতর থেকে আরেকটি পুরোনো কাগজ বের করল।
কাগজটির ওপর লেখা ছিল—
“রাশেদ নয়, আসল সত্য জানে অন্য একজন।”
তানিয়া কাগজটি হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— এত বছর পরও কেন এই রহস্য শেষ হচ্ছে না?
চলবে..