### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ১৩
### অপেক্ষার নতুন সকাল
সকালের নরম রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে রাফার ঘরে এসে পড়েছে। বিছানার পাশে বসে রাফা চুল আঁচড়াচ্ছিল। আজ তার মনটা বেশ ভালো। কারণ গতকাল দুই পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শুক্রবার আদবি আর রাফার আংটি বদলের ছোট্ট অনুষ্ঠান হবে।
রাফা আয়নার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। নিজের অজান্তেই তার মনে আদবির কথা চলে এল। ছেলেটা কখনো খুব গম্ভীর, আবার কখনো এমনভাবে কথা বলে যে রাগ করেও হাসি আটকে রাখা যায় না।
ঠিক তখনই ছোট বোন ঘরে ঢুকে বলল,
— আপু, তুমি কি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসছ?
রাফা তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— না তো! এমনিই।
— আমি কিন্তু সব বুঝি। নিশ্চয়ই আদবি ভাইয়ার কথা ভাবছ!
— বেশি কথা বলিস না। যা, নিচে যা।
ছোট বোন হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাফা লজ্জায় নিজের মুখে হাত রাখল।
অন্যদিকে আদবির বাড়িতেও সকাল থেকে বেশ আনন্দের পরিবেশ। মহিরা ভাইয়ের ঘরে এসে দেখল, আদবি ফোন হাতে বসে আছে।
— ভাইয়া!
— কী হয়েছে?
— ভাবিকে মেসেজ দিচ্ছ?
আদবি ফোনটা পাশে রেখে বলল,
— তোমার কি আর কোনো কাজ নেই?
মহিরা হেসে বলল,
— আছে। কিন্তু তোমাকে একটু বিরক্ত না করলে আমার দিনটাই ভালো যায় না।
আদবি হেসে মাথা নাড়ল।
কিছুক্ষণ পর আদবির ফোনে রাফার মেসেজ এল।
“আজ কী করছেন?”
আদবি উত্তর দিল,
“আপনার কথা ভাবছি। আপনি কী করছেন?”
রাফা লিখল,
“আমি তো ভাবছি, শুক্রবার আপনি আমাকে দেখে কী বলবেন!”
আদবি উত্তর দিল,
“বলব, আজ আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে।”
রাফা লিখল,
“শুধু আজ?”
আদবি মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“না, সবসময়। তবে শুক্রবার হয়তো একটু বেশিই সুন্দর লাগবে।”
মেসেজটি পড়ে রাফার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
দুপুরের দিকে আদবি তার মায়ের সঙ্গে রাফাদের বাড়িতে গেল। সেখানে আগে থেকেই আমিরুল সাহেব ও সোহাগ সাহেব বসে কথা বলছিলেন। দুই পরিবারের পুরোনো বন্ধুত্ব যেন আবার নতুন করে ফিরে এসেছে।
রাফা রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করছিল। আদবি বসার ঘরে বসে থাকলেও তার চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল।
মহিরা বিষয়টি বুঝতে পেরে আস্তে বলল,
— ভাইয়া, ভাবিকে খুঁজছ?
আদবি বিরক্তির ভান করে বলল,
— চুপ করো।
ঠিক তখনই রাফা নাশতার ট্রে হাতে ঘরে প্রবেশ করল। আদবির চোখ পড়তেই সে একটু লজ্জা পেল।
রাফা সবার সামনে নাশতা রেখে বলল,
— চা নেবেন?
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— আপনি দিলে অবশ্যই নেব।
রাফা নিচু স্বরে বলল,
— সবার সামনে এমন কথা বলবেন না।
আদবি হেসে চায়ের কাপ হাতে নিল।
কিছুক্ষণ পর বাড়ির বড়রা শুক্রবারের অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। কীভাবে সাজানো হবে, কারা আসবেন, কী পোশাক পরা হবে—সবকিছু নিয়েই কথা চলছিল।
রাফার মা শারমিন বললেন,
— আমি চাই, অনুষ্ঠানটা খুব সুন্দর হোক। তবে অতিরিক্ত আয়োজনের প্রয়োজন নেই।
আদবির মা বললেন,
— আমিও তাই চাই। দুই পরিবারের মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করলেই যথেষ্ট।
আদবি শান্তভাবে বলল,
— আমারও কোনো বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। সবাই খুশি থাকলেই হবে।
সোহাগ সাহেব হাসলেন।
— তাহলে ঠিক আছে। শুক্রবার আমাদের পরিবারের জন্য বিশেষ একটা দিন।
সবাই সম্মতি জানাল।
বিকেলে রাফা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে শীতল অনুভূতি। কিছুক্ষণ পর আদবি ছাদে এল।
— এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
রাফা ফিরে তাকিয়ে বলল,
— একটু বাতাস খাচ্ছি।
আদবি পাশে এসে দাঁড়াল।
— শুক্রবারের কথা ভাবছেন?
— হ্যাঁ। একটু আনন্দ লাগছে, আবার একটু ভয়ও হচ্ছে।
— ভয় কিসের?
রাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— এতদিন সবকিছু আগের মতো ছিল। এখন নতুন একটা সম্পর্কের দায়িত্ব আসবে। আমি যদি কোনো ভুল করি?
আদবি তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— ভুল তো সবারই হয়। আমি চাই না আপনি সবসময় নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করুন। আপনি যেমন, তেমনই থাকবেন। কোনো সমস্যা হলে আমরা দুজন মিলে সমাধান করব।
রাফা মৃদু হেসে বলল,
— আপনি সবসময় এত সুন্দর করে কথা বলেন কীভাবে?
— কারণ আপনার সঙ্গে কথা বলার সময় ভালো কথাগুলো নিজে থেকেই মনে আসে।
রাফা লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকাল।
আদবি আবার বলল,
— একটা কথা বলব?
— বলুন।
— শুক্রবার আপনাকে একটা ছোট্ট উপহার দেব।
— কী উপহার?
— সেটা এখন বললে তো আর চমক থাকবে না।
— আমি কিন্তু খুব কৌতূহলী হয়ে গেলাম।
— তাহলে শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
দুজনের কথার মাঝেই নিচ থেকে মহিরার ডাক শোনা গেল।
— ভাইয়া! ভাবি! সবাই আপনাদের খুঁজছে!
রাফা তাড়াতাড়ি নিচে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল। আদবি পেছন থেকে মৃদু হেসে বলল,
— শুক্রবার দেখা হবে, হবু বউ!
রাফা ফিরে তাকিয়ে বলল,
— আগে নিচে চলুন!
দুজন একসঙ্গে নিচে নেমে গেল।
রাতের খাবারের পর আদবি নিজের ঘরে ফিরে এল। তখনই তার বাবা আমিরুল সাহেব ঘরে প্রবেশ করলেন।
— আদবি, একটু কথা ছিল।
— বলো বাবা।
— আগামীকাল সকালে আমার সঙ্গে একটু বাইরে যেতে হবে।
— কোথায়?
আমিরুল সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
— একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আছে। তোমাকে সেটা বুঝতে হবে।
আদবি অবাক হয়ে বলল,
— কী দায়িত্ব?
— কাল সকালে সব জানতে পারবে।
বাবার কথায় আদবি কিছুটা কৌতূহলী হলেও আর প্রশ্ন করল না।
অন্যদিকে রাফাও ঘুমানোর আগে শুক্রবারের কথা ভাবছিল। তার মনে হচ্ছিল, দিনটি যত কাছে আসছে, অপেক্ষাটা তত দীর্ঘ হচ্ছে।
সে জানত না, পরের সকালেই আদবির জন্য অপেক্ষা করছে পরিবারের পক্ষ থেকে একটি সুন্দর দায়িত্ব।
আর সেই দায়িত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাফার জীবনের নতুন একটি অধ্যায়।
চলবে...