### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ১৪
### ভালোবাসার উপহার
সকালের আলো ফুটতেই আদবি ঘুম থেকে উঠে পড়ল। গত রাতে বাবা আমিরুল সাহেব তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা বলেছিলেন। কিন্তু কী সেই দায়িত্ব, তা এখনো বলেননি।
আদবি তৈরি হয়ে নিচে নামতেই দেখল, বাবা নাশতার টেবিলে বসে আছেন।
— বাবা, আজ কি বাইরে যেতে হবে?
আমিরুল সাহেব চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,
— হ্যাঁ। তবে তার আগে নাশতা করে নাও।
আদবি বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পর বাবা বললেন,
— আদবি, শুক্রবার তোমার জীবনের একটা বিশেষ দিন। তুমি নতুন একটা সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছ। আমি চাই, সেই দায়িত্বের অর্থ তুমি ভালোভাবে বোঝো।
আদবি বাবার দিকে তাকাল।
— আমি বুঝতে চেষ্টা করছি, বাবা।
— শুধু নিজের ভালো লাগার কথা ভাবলে হবে না। রাফারও নিজের পছন্দ, স্বপ্ন আর মতামত আছে। সবসময় সেগুলোর সম্মান করবে।
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— বাবা, আমি চাই রাফা আমার সঙ্গে থেকে সবসময় নিজের মতো করে হাসতে পারুক।
আমিরুল সাহেব ছেলের কথা শুনে সন্তুষ্ট হলেন।
— এটাই তো চাই। আচ্ছা, আজ তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। শুক্রবারের অনুষ্ঠানের জন্য রাফার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে কিছু জিনিস কিনে আনবে।
আদবি হেসে বলল,
— তাহলে এটাই তোমার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব?
— দায়িত্ব ছোট বা বড় হয় না। নিজের পরিবারের জন্য কিছু করতে পারাও দায়িত্ব।
বাবার কথা শুনে আদবি মাথা নাড়ল।
অন্যদিকে রাফাদের বাড়িতে সকাল থেকেই ব্যস্ততা। শারমিন মেয়েকে নিয়ে অনুষ্ঠানের পোশাক দেখতে বসেছেন। বিছানার ওপর কয়েকটি সুন্দর পোশাক রাখা।
মা বললেন,
— রাফা, তোমার কোনটা পছন্দ?
রাফা নীল রঙের একটি পোশাক হাতে নিয়ে বলল,
— মা, এটা আমার ভালো লেগেছে।
— তাহলে এটাই রাখি?
— হ্যাঁ।
মা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তোমাকে আজকাল খুব হাসিখুশি দেখাচ্ছে।
রাফা লজ্জা পেয়ে বলল,
— তুমি আবার শুরু করলে!
শারমিন হেসে মেয়ের গালে হাত রাখলেন।
— মেয়েরা বড় হলে মায়ের চোখ এড়াতে পারে না।
রাফা মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
— মা, তুমি সবসময় আমার পাশে থাকবে তো?
— অবশ্যই। জীবনে যত পরিবর্তনই আসুক, তোমার মা তো তোমার মা-ই থাকবে।
কথাটি শুনে রাফার মনটা ভরে গেল।
দুপুরের দিকে আদবি তার বাবাকে নিয়ে কেনাকাটা করতে বের হলো। একটি দোকানে ঢুকে সে প্রথমে অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো দেখল। তারপর চোখ পড়ল একটি সুন্দর ব্রেসলেটের ওপর।
ব্রেসলেটটি খুব সাধারণ, কিন্তু দেখতে বেশ সুন্দর।
দোকানদার বললেন,
— স্যার, এটা উপহার দেওয়ার জন্য বেশ ভালো।
আদবি ব্রেসলেটটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল।
আমিরুল সাহেব পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
— পছন্দ হয়েছে?
— হ্যাঁ বাবা। রাফার জন্য নিতে চাই।
— তাহলে নিয়ে নাও।
আদবি ব্রেসলেটটি কিনে সুন্দর একটি বাক্সে রাখতে বলল। বাক্সটির ওপর ছোট্ট নীল ফুলের নকশা ছিল।
বাড়ি ফেরার পথে বাবা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন,
— রাফাকে কীভাবে চমকে দেবে?
আদবি হেসে বলল,
— সেটা এখন বলব না। তাহলে চমকটা নষ্ট হয়ে যাবে।
বিকেলে আদবি রাফাকে ফোন করল।
— কী করছেন?
রাফা বলল,
— মায়ের সঙ্গে বসে আছি। আপনি?
— আপনার সঙ্গে কথা বলার অপেক্ষায় ছিলাম।
— আপনার তো সারাদিন অনেক কাজ থাকে!
— কাজ থাকলেও আপনার জন্য সময় বের করা যায়।
রাফা হেসে বলল,
— আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— করুন।
— শুক্রবারের অনুষ্ঠানে আপনি কী পরবেন?
— সেটা তো এখন বলা যাবে না।
— কেন?
— আপনি আগে আপনার পোশাকের কথা বলুন।
রাফা বলল,
— আমি নীল রঙের পোশাক পরব।
আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— তাহলে আমিও নীল রঙের কিছু পরব।
— কেন? আমার সঙ্গে মিলিয়ে পরবেন?
— আপনার সঙ্গে একটু মিল থাকলে সমস্যা কী?
রাফা হেসে ফেলল।
কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ফোন রাখার আগে আদবি বলল,
— একটা কথা মনে রাখবেন, শুক্রবার যতই ব্যস্ত থাকুন, নিজের যত্ন নেবেন।
রাফা উত্তর দিল,
— আপনিও নিজের যত্ন নেবেন।
রাতের দিকে দুই পরিবারের সবাই আবার একসঙ্গে বসলেন। শুক্রবারের অনুষ্ঠানের শেষ প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হলো।
সোহাগ সাহেব বললেন,
— সবকিছু প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। এখন শুধু দিনটির অপেক্ষা।
আমিরুল সাহেব হাসলেন।
— আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন সবসময় সুখে থাকে, এটাই চাই।
মহিরা পাশ থেকে বলে উঠল,
— আমি কিন্তু শুক্রবার ভাবির সঙ্গে অনেক ছবি তুলব!
রাফা লজ্জা পেয়ে হাসল।
আদবি বলল,
— শুধু ছবি তুললেই হবে? ভাবিকে বিরক্ত করাও বন্ধ করতে হবে।
মহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভাইয়া, তুমি তো এখন থেকেই ভাবির পক্ষ নিচ্ছ!
সবাই হেসে উঠল।
রাত একটু গভীর হলে রাফা নিজের ঘরে চলে গেল। ফোন হাতে নিয়ে দেখল, আদবির একটি মেসেজ এসেছে।
“আজ একটা জিনিস কিনেছি। শুক্রবার আপনার হাতে পরিয়ে দেব।”
রাফা উত্তর দিল,
“এত রহস্য করছেন কেন? এখনই বলে দিন।”
আদবি লিখল,
“সবকিছু কি আগে থেকে বলে দিতে হয়? কিছু আনন্দ অপেক্ষার মধ্যেও থাকে।”
রাফা লিখল,
“ঠিক আছে, অপেক্ষা করব।”
আদবি শেষবারের মতো লিখল,
“শুভরাত্রি। ভালো থাকবেন।”
রাফা উত্তর দিল,
“আপনিও ভালো থাকবেন।”
ফোনটি পাশে রেখে রাফা জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে ছোট ছোট তারা জ্বলছিল। তার মনে হচ্ছিল, জীবনের এই সময়টা সে অনেক দিন মনে রাখবে।
অন্যদিকে আদবি নিজের টেবিলের ড্রয়ার খুলে উপহারের বাক্সটি বের করল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার যত্ন করে রেখে দিল।
তার মনে একটাই ইচ্ছা—শুক্রবার রাফার মুখে যেন সুন্দর একটি হাসি দেখতে পায়।
দুই পরিবারের ঘরে তখন আনন্দের প্রস্তুতি চলছে। শুক্রবারের দিনটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
কিন্তু আদবি ও রাফার জন্য সেই দিনটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি হবে বিশ্বাস, সম্মান আর ভালোবাসার নতুন একটি প্রতিশ্রুতির দিন।
চলবে...