### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ১৬
### অভিমানের আড়ালে ভালোবাসা
আংটি বদলের অনুষ্ঠানের পর কয়েকটি দিন কেটে গেছে। দুই পরিবারের মধ্যে এখন আগের চেয়েও বেশি যোগাযোগ। রাফা আর আদবির কথাও প্রায় প্রতিদিন হয়। কখনো ফোনে, কখনো মেসেজে। ছোট ছোট কথার মধ্যেই যেন তাদের দিন কেটে যায়।
সেদিন সকালে রাফা ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিল। আদবির কাছ থেকে কোনো মেসেজ আসেনি। অথচ প্রতিদিন সকালে আদবিই প্রথম তাকে শুভ সকাল জানায়।
রাফা কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজেই মেসেজ লিখল,
“আজ কি খুব ব্যস্ত?”
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো উত্তর এল না।
রাফা ভাবল, হয়তো আদবি কাজে ব্যস্ত। তাই আর মেসেজ দিল না।
অন্যদিকে আদবি সকাল থেকেই বাবার সঙ্গে একটি পারিবারিক কাজে ব্যস্ত ছিল। ফোনটি ঘরের টেবিলে রেখে বেরিয়ে যাওয়ায় রাফার মেসেজ তার চোখে পড়েনি।
দুপুরে বাড়ি ফিরে ফোন হাতে নিতেই সে রাফার মেসেজটি দেখতে পেল।
আদবি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল।
— হ্যালো, কী করছেন?
রাফা একটু গম্ভীর স্বরে বলল,
— কিছু না।
— আপনার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?
— এমনিই।
— আমার ওপর রাগ করেছেন?
রাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— সকালে একটা মেসেজ দিয়েছিলাম। উত্তর দেননি।
আদবি বুঝতে পারল, রাফার মন খারাপ হয়েছে।
— আসলে সকালে বাবার সঙ্গে কাজে বের হয়েছিলাম। ফোনটা ঘরে রেখে গিয়েছিলাম। ফিরে এসেই আপনার মেসেজ দেখেছি।
রাফা বলল,
— জানি, আপনি ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু একটা উত্তর পেলে ভালো লাগত।
আদবি শান্তভাবে বলল,
— আপনি ঠিক বলেছেন। তবে বিশ্বাস করুন, ইচ্ছা করে উত্তর দিইনি এমন নয়।
রাফার অভিমান কিছুটা কমে এল।
— আচ্ছা, আর রাগ করব না।
আদবি হেসে বলল,
— এত সহজে অভিমান শেষ হয়ে গেল?
— না। একটু বাকি আছে।
— তাহলে কী করলে শেষ হবে?
রাফা মুচকি হেসে বলল,
— সেটা আপনাকেই বুঝতে হবে।
আদবি হেসে উঠল।
বিকেলে রাফা মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে ছিল। শারমিন মেয়েকে দেখে বললেন,
— কী রে, আজ তোকে বেশ হাসিখুশি লাগছে।
রাফা বলল,
— কিছু না মা।
— আদবির সঙ্গে কথা হয়েছে?
রাফা একটু লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়ল।
শারমিন মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— একটা কথা মনে রাখিস মা। সম্পর্ক সুন্দর রাখতে দুজনেরই চেষ্টা প্রয়োজন। একজন অভিমান করলে অন্যজনের উচিত তাকে বোঝার চেষ্টা করা।
রাফা মায়ের কথা মন দিয়ে শুনল।
সন্ধ্যায় আদবি আবার ফোন করল।
— আজ বিকেলে কী করেছেন?
— মায়ের সঙ্গে রান্না করেছি।
— কী রান্না করেছেন?
— আপনার পছন্দের খাবার।
আদবি অবাক হয়ে বলল,
— আমার পছন্দের খাবার? আপনি জানলেন কীভাবে?
রাফা হেসে বলল,
— আপনার মা বলেছিলেন।
আদবি বলল,
— তাহলে তো একদিন আপনার হাতের রান্না খেতেই হবে।
রাফা বলল,
— আগে সময়মতো বাড়িতে আসতে শিখুন। তারপর রান্না খাওয়ার কথা ভাববেন।
আদবি মজা করে বলল,
— জি, ম্যাডাম। চেষ্টা করব।
কথা বলতে বলতে দুজনের অনেকটা সময় কেটে গেল।
এদিকে আদবির মা ছেলেকে ডেকে বললেন,
— বাবা, শুক্রবার তোমরা সবাই আমাদের বাড়িতে আসবে। রাফার সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটানোরও সুযোগ হবে।
আদবি বলল,
— ঠিক আছে মা। আমি বাবার সঙ্গে কথা বলব।
পরদিন সকালে আদবি রাফাদের বাড়িতে গেল। রাফা তখন বারান্দায় বসে একটি বই পড়ছিল। আদবিকে দেখে সে বইটি বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল।
— আপনি এসেছেন?
— হ্যাঁ। কেন, আসতে নিষেধ আছে?
রাফা হেসে বলল,
— তা নেই। কিন্তু আগে জানালে ভালো হতো।
আদবি বলল,
— তাহলে কি আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করতেন?
রাফা উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসল।
আদবি তার হাতে একটি ছোট্ট প্যাকেট দিল।
— এটা আপনার জন্য।
রাফা অবাক হয়ে বলল,
— আবার কী এনেছেন?
— খুলে দেখুন।
প্যাকেটের ভেতরে ছিল একটি সুন্দর বই।
রাফা আনন্দিত হয়ে বলল,
— বইটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে!
আদবি বলল,
— আপনার বই পড়তে ভালো লাগে, তাই ভেবেছি এটা আপনার ভালো লাগবে।
রাফা বইটি হাতে নিয়ে বলল,
— আপনি আমার পছন্দগুলো এত মনে রাখেন কীভাবে?
আদবি শান্তভাবে উত্তর দিল,
— কারণ আপনার বলা ছোট ছোট কথাগুলোও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
রাফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— আপনি জানেন, আপনার সঙ্গে কথা বললে আমার মন ভালো হয়ে যায়?
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— তাহলে আমি প্রতিদিন আপনার মন ভালো করার চেষ্টা করব।
দুজনের কথার মাঝেই রাফার ছোট বোন এসে হাজির হলো।
— আপু! মা তোমাদের নিচে ডাকছে। আর আদবি ভাইয়া, আপনাকেও!
আদবি হেসে বলল,
— চলুন, তাহলে।
রাফা বইটি যত্ন করে রেখে তার সঙ্গে নিচে গেল।
সেদিন দুই পরিবারের সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেলেন। হাসি-আড্ডায় সময়টা বেশ ভালো কাটল।
খাবারের পর সোহাগ সাহেব আদবিকে বললেন,
— বাবা, তোমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের অনেক আশা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তোমরা একে অপরকে বুঝবে।
আদবি সম্মানের সঙ্গে বলল,
— জি, চাচা। আমি সবসময় রাফার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করব।
রাফা পাশে বসে কথাগুলো শুনছিল। তার মনে হলো, আদবি শুধু সুন্দর কথা বলে না, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও আন্তরিকভাবে ভাবে।
বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় আদবি রাফাকে বলল,
— আজকের দিনটা ভালো কাটল।
রাফা বলল,
— আমারও।
— আর সকালে যে অভিমান করেছিলেন, সেটা কি পুরোপুরি শেষ?
রাফা হেসে বলল,
— সেটা তো আপনাকে মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিতে হবে!
আদবি হেসে উত্তর দিল,
— তাহলে বুঝলাম, আমার সামনে অনেক দায়িত্ব অপেক্ষা করছে।
রাফা বলল,
— শুধু দায়িত্ব নয়, অনেক ভালোবাসাও।
আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৃদু স্বরে বলল,
— সেই ভালোবাসার যত্ন নেওয়ার চেষ্টা আমি করব।
দুজনের মুখেই হাসি ফুটে উঠল।
তবে তাদের সামনে এখনো অনেক পথ বাকি। ছোট ছোট অভিমান, আনন্দ আর পরিবারের ভালোবাসা নিয়েই এগিয়ে যাবে তাদের গল্প।
চলবে...