ফন্ট সাইজ:
থিম:
অবরুদ্ধ অভিমান

পর্ব 17

লেখক: নুসরাত জাহানের রাফা

### নিষিদ্ধ অনুভূতি

লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা

পর্ব সংখ্যা ১৭

### নতুন স্বপ্নের শুরু

সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে রাফার ঘরে এসে পড়েছে। ঘুম থেকে উঠে রাফা কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে গাছের পাতাগুলো বাতাসে দুলছে। চারপাশে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ।

আজ তার মনটা অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি ভালো। কারণ গত রাতে আদবির সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে নিজের মনের অনেক না বলা কথা প্রকাশ করেছে। নিজের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ আর পরিবারের জন্য কিছু করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে।

আদবি শুধু মন দিয়ে তার কথাগুলো শুনেছিল। একবারও তাকে থামায়নি।

রাফা ফোনটা হাতে নিয়ে আদবির নামের ওপর আঙুল রাখল। কয়েকবার ভেবে শেষ পর্যন্ত একটা মেসেজ পাঠাল।

—আসসালামু আলাইকুম। ঘুম থেকে উঠেছেন?

কিছুক্ষণ পরই উত্তর এল।

—ওয়ালাইকুমুস সালাম। হ্যাঁ, উঠেছি। আপনি কি নাশতা করেছেন?

রাফা মুচকি হেসে লিখল,

—না, এখনো করিনি। আপনি করেছেন?

—আমি করেছি। আর আপনি না খেয়ে থাকলে কিন্তু ভালো হবে না।

—আপনি সবসময় আমাকে বকেন কেন?

—কারণ আপনার নিজের যত্ন নেওয়ার দায়িত্বটা আপনাকে মনে করিয়ে দিতে হয়।

রাফা হেসে ফোনটা পাশে রাখল। এমন ছোট ছোট কথার মধ্যেও আদবির যত্ন যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কিছুক্ষণ পর শারমিন বেগম ঘরে এসে বললেন,

—কী রে মা, আজ এত সকাল সকাল হাসছিস কেন?

রাফা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,

—এমনিই আম্মু।

—এমনিই নাকি কারও সঙ্গে কথা হয়েছে?

—আম্মু!

শারমিন বেগম হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

—আচ্ছা, আর কিছু বললাম না। তবে একটা কথা মনে রাখিস, জীবনে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের স্বপ্নগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হয়।

রাফা মায়ের হাত ধরে বলল,

—আমি চাই পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। আপনাদের জন্য কিছু করতে চাই। আমার স্বপ্নগুলো যেন শুধু স্বপ্ন হয়েই না থাকে।

মেয়ের কথা শুনে শারমিন বেগমের চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।

—ইনশাআল্লাহ, তোর স্বপ্ন পূরণ হবে। আমরা সবসময় তোর পাশে আছি।

অন্যদিকে আদবি নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিল। এমন সময় তার ছোট বোন মাহিরা দরজায় উঁকি দিল।

—ভাইয়া, ভেতরে আসব?

আদবি চোখ তুলে তাকাল।

—আয়, অনুমতি নেওয়ার কী আছে?

মাহিরা ঘরে ঢুকে ভাইয়ের পাশে বসে বলল,

—ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

—বল।

—আপনি কি এখন আগের চেয়ে বেশি হাসেন?

আদবি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

—মানে?

—মানে, আগে তো আপনাকে সবসময় গম্ভীর দেখতাম। এখন ফোনের দিকে তাকিয়ে হাসেন। নিশ্চয়ই ভাবির সঙ্গে কথা বলেন!

আদবি মুচকি হেসে বলল,

—তোর কাজ নেই?

—আছে তো! কিন্তু ভাইয়ের খবর নেওয়াও আমার দায়িত্ব।

আদবি হেসে মাথা নাড়ল।

—বেশি কথা বলিস না। যা, আম্মুকে গিয়ে বল আমি একটু পর নিচে আসছি।

মাহিরা যাওয়ার আগে দুষ্টুমি করে বলল,

—ভাবিকে কিন্তু আমার পক্ষ থেকে সালাম দেবেন!

আদবি কিছু না বলে হাসল।

দুপুরের দিকে আদবি রাফাকে ফোন করল।

—কী করছেন?

—পড়তে বসেছি। আপনি?

—কাজ শেষ করে একটু সময় পেয়েছি। ভাবলাম আপনার সঙ্গে কথা বলি।

—আমার পড়ার সময় নষ্ট করবেন না কিন্তু।

—আমি কি আপনার পড়ার সময় নষ্ট করতে ফোন করেছি?

—তাহলে?

—আপনার পড়াশোনার খবর নিতে।

রাফা হেসে বলল,

—আমার পড়াশোনার খবর নিয়ে আপনার এত চিন্তা কেন?

আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—কারণ আপনার স্বপ্নগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই না, কোনো কারণে আপনি নিজের ইচ্ছাগুলো থেকে দূরে সরে যান।

রাফার মুখের হাসি ধীরে ধীরে কোমল হয়ে এল।

—সবাই তো এমনভাবে ভাবে না। অনেকেই মনে করে মেয়েদের স্বপ্নের চেয়ে সংসারের দায়িত্ব বড়।

আদবি শান্ত গলায় বলল,

—সংসারের দায়িত্ব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাই বলে আপনার পরিচয়, আপনার পড়াশোনা কিংবা আপনার স্বপ্ন হারিয়ে যাবে কেন? জীবনে দুজন মানুষ পাশাপাশি চললে একজনের স্বপ্ন অন্যজনের কাছে বোঝা হওয়ার কথা নয়।

রাফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—আপনি সত্যিই আমার স্বপ্নগুলোকে এতটা গুরুত্ব দেন?

—অবশ্যই। তবে একটা শর্ত আছে।

রাফা অবাক হয়ে বলল,

—কী শর্ত?

—নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের শরীরের যত্ন নিতে ভুলবেন না। সময়মতো খাবেন, বিশ্রাম নেবেন আর মন দিয়ে পড়াশোনা করবেন।

রাফা হেসে ফেলল।

—আপনার শর্তগুলোও না!

—কী করব? আপনাকে নিয়ে চিন্তা হয়।

কথাটা শুনে রাফার গাল লাল হয়ে উঠল। সে অন্যদিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

—আপনিও নিজের যত্ন নেবেন।

—জি, ম্যাডাম। আপনার আদেশ পালন করা হবে।

দুজনেই হেসে উঠল।

বিকেলে খান বাড়িতে আমিরুল সাহেব ও সোহাগ সাহেব একসঙ্গে বসে কথা বলছিলেন। তাঁদের পাশে শারমিন বেগম এবং আদবির মা ছিলেন।

সোহাগ সাহেব বললেন,

—রাফা পড়াশোনাটা শেষ করতে চায়। আমি চাই, ও নিজের পছন্দমতো এগিয়ে যাক।

আমিরুল সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,

—একদম ঠিক বলেছেন। আমাদের ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেওয়া উচিত। আদবিও এ বিষয়ে খুব আগ্রহী। সেদিন ও আমাকে বলছিল, রাফার পড়াশোনার ব্যাপারে যেন কোনো বাধা না আসে।

শারমিন বেগম খুশি হয়ে বললেন,

—রাফা ছোটবেলা থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে। ওর স্বপ্নগুলো পূরণ হলে আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না।

আদবির মা মৃদু হেসে বললেন,

—তাহলে আমরা সবাই মিলে ওকে সহযোগিতা করব। একটা সংসার শুধু ভালোবাসা দিয়ে নয়, একে অপরের স্বপ্নকে সম্মান করেও সুন্দর হয়।

কথাগুলো শুনে সোহাগ সাহেবের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।

সন্ধ্যায় রাফা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে তখন হালকা কমলা রঙের আভা। কিছুক্ষণ পর আদবির ফোন এল।

—কোথায় আপনি?

—ছাদে। আকাশ দেখছি।

—আকাশে আজ কী এমন দেখার আছে?

—অনেক কিছু। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, পাখিরা বাসায় ফিরছে। সুন্দর লাগছে।

আদবি বলল,

—আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।

—বলুন।

—আগামী সপ্তাহে আপনার পড়াশোনার জন্য কিছু বই নিয়ে আসব। আপনি যে বিষয়গুলো পড়তে চেয়েছিলেন, সেগুলোও দেখে রেখেছি।

রাফা অবাক হয়ে বলল,

—আপনি এত কিছু করলেন কখন?

—সময় বের করতে হয়। আপনার স্বপ্নের পথে ছোট্ট একটা সাহায্য করতে পারলেও আমার ভালো লাগবে।

রাফা মৃদু স্বরে বলল,

—ধন্যবাদ, আদবি।

—শুধু ধন্যবাদ দিলে হবে?

—তাহলে কী দিতে হবে?

—আপনার স্বপ্ন পূরণের খবর শুনতে চাই। একদিন যখন বলবেন, আপনি নিজের লক্ষ্যে পৌঁছেছেন, সেদিন আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগবে।

রাফার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।

—আমি চেষ্টা করব। কথা দিলাম।

আদবি বলল,

—আমি জানি, আপনি পারবেন।

কথা শেষ হওয়ার পরও রাফা বেশ কিছুক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে রইল। আজ তার মনে হচ্ছিল, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিজের চেষ্টা, পরিবারের দোয়া আর কাছের মানুষের সহযোগিতা থাকলে অনেক কঠিন পথও সহজ হয়ে যায়।

রাতের খাবারের পর রাফা পড়ার টেবিলে বসে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করল। খাতার প্রথম পাতায় নিজের লক্ষ্যগুলো লিখে রাখল। তারপর নিচে ছোট করে লিখল—

“আমি থেমে যাব না। নিজের স্বপ্ন পূরণ করব, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাব এবং একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠব।”

ঠিক তখনই ফোনে আদবির মেসেজ এল।

—ঘুমানোর আগে একটু মনে রাখবেন, আপনার ওপর আমার বিশ্বাস আছে।

রাফা উত্তর দিল,

—আর আমার বিশ্বাস, আপনি সবসময় আমার পাশে থাকবেন।

আদবি লিখল,

—ইনশাআল্লাহ। তবে আপনার পথ আপনাকেই এগিয়ে নিতে হবে। আমি শুধু পাশে থেকে সাহস দেব।

রাফা ফোনটা বুকের কাছে ধরে কিছুক্ষণ বসে রইল। তার জীবনে ভালোবাসার পাশাপাশি এবার নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে স্বপ্ন, সাহস আর নিজের পরিচয় গড়ে তোলার ইচ্ছা।

সে জানে না সামনে কতটা পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে এটুকু জানে, সে আর নিজের স্বপ্নগুলোকে অবহেলা করবে না।

আর আদবি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, রাফার হাসির মতোই তার স্বপ্নগুলোও যেন সুন্দরভাবে পূর্ণতা পায়, সেই চেষ্টাই সে করবে।

সেদিন রাতেই রাফার জীবনে শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়—যেখানে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের স্বপ্ন পূরণের দৃঢ় অঙ্গীকারও রইল।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 17 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন