### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ১৯
### আনন্দের আড়ালে নতুন চিন্তা
সকালের নরম আলো জানালার কাঁচে এসে পড়েছে। রাফা পড়ার টেবিলে বসে নতুন বই থেকে পড়ছিল। গত কয়েক দিন ধরে সে নিয়ম করে পড়াশোনা করছে। আদবির দেওয়া বইগুলো তার বেশ কাজে লাগছে।
হঠাৎ ফোনে মায়ের ডাক শোনার আগেই একটি কল এল। স্ক্রিনে আদবির নাম দেখে রাফার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—আসসালামু আলাইকুম।
—ওয়ালাইকুমুস সালাম। কী করছেন?
—পড়ছি। আপনি?
—আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য একটু সময় বের করেছি।
—আপনার কি কোনো কাজ নেই?
—কাজ আছে। তবে সব কাজের মাঝেও কিছু মানুষের খোঁজ নিতে হয়।
রাফা মৃদু হেসে বলল,
—আপনি আজকাল খুব সুন্দর কথা বলেন।
—আগেও বলতাম, আপনি খেয়াল করতেন না।
—আচ্ছা, তাই নাকি?
দুজনেই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ কথা বলার পর আদবি বলল,
—আজ একটা খবর আছে।
রাফা আগ্রহ নিয়ে বলল,
—কী খবর?
—আপনার বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। আগামী মাসে আপনার পড়াশোনার জন্য একটা নতুন কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ এসেছে। আপনার বাবা চান, আপনি আগে ভালোভাবে সবকিছু বুঝে সিদ্ধান্ত নিন।
রাফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
—সত্যি বলছেন?
—জি। তবে সিদ্ধান্তটা আপনার। আপনি আগ্রহী হলে আমরা সবাই সহযোগিতা করব।
রাফার চোখে আনন্দ ফুটে উঠল।
—আমি তো অনেক দিন ধরে এমন একটা সুযোগের অপেক্ষা করছিলাম!
—তাহলে বাবার সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জেনে নেবেন।
—আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
—আবার ধন্যবাদ! আপনার আনন্দটাই তো আমার ভালো লাগা।
দুপুরে সোহাগ সাহেব মেয়েকে নিজের ঘরে ডাকলেন।
—রাফা, মা, একটু বসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।
রাফা বাবার পাশে বসে বলল,
—কী হয়েছে বাবা?
সোহাগ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—তোমার পড়াশোনার জন্য একটা ভালো সুযোগ এসেছে। তুমি চাইলে আগামী মাস থেকে নতুন কোর্স শুরু করতে পারবে।
রাফা আনন্দিত হয়ে বলল,
—সত্যি বাবা? আমি কি ভর্তি হতে পারব?
—অবশ্যই। তবে আগে তোমাকে সব তথ্য বুঝে নিতে হবে। তোমার পড়াশোনার পাশাপাশি বিশ্রাম ও পরিবারের জন্যও সময় রাখতে হবে।
রাফা বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—বাবা, আমি চেষ্টা করব। আপনাদের মুখ উজ্জ্বল করতে চাই।
সোহাগ সাহেব মেয়েকে আদর করে বললেন,
—আমাদের কাছে তোমার ভালো থাকাটাই সবচেয়ে বড় কথা। তুমি ভালো মানুষ হও, নিজের স্বপ্ন পূরণ করো—এটাই আমাদের চাওয়া।
বিকেলে রাফা তার ছোট বোনের সঙ্গে বসে বই দেখছিল। ছোট বোন হঠাৎ বলল,
—আপু, তুমি এত পড়াশোনা করছ কেন?
রাফা হেসে বলল,
—কারণ আমি বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।
—তাহলে আমিও তোমার মতো পড়ব!
—অবশ্যই। আমরা দুজনেই মন দিয়ে পড়ব।
ছোট বোন আনন্দে হাততালি দিল।
ঠিক তখনই শারমিন বেগম ঘরে ঢুকলেন।
—কী নিয়ে এত আনন্দ হচ্ছে?
রাফা মাকে সব খুলে বলল। নতুন কোর্সের খবর শুনে মাও খুব খুশি হলেন।
—আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ যেন তোমার জন্য সব সহজ করে দেন।
রাফা বলল,
—আমিন, আম্মু।
সন্ধ্যায় আদবি খান বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে তখন সন্ধ্যার তারা দেখা যাচ্ছে। ফোনে রাফার কল আসতেই সে রিসিভ করল।
—কী খবর, নতুন ছাত্রী?
রাফা হেসে বলল,
—ভালো। আর আপনি?
—আপনার আনন্দ দেখে আমারও ভালো লাগছে।
—আজ বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। বাবা রাজি হয়েছেন।
—আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে এখন থেকে আরও মন দিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে।
রাফা একটু চুপ করে বলল,
—একটা কথা বলব?
—বলুন।
—আমার মাঝে মাঝে ভয় হয়। যদি সবকিছু ঠিকমতো করতে না পারি?
আদবি শান্তভাবে উত্তর দিল,
—ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভয়কে নিজের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেবেন না। আপনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবেন। আর মনে রাখবেন, কোনো কিছু না বুঝলে সাহায্য চাইতে লজ্জা নেই।
—আপনি কি সত্যিই মনে করেন আমি পারব?
—আমি বিশ্বাস করি, আপনি চেষ্টা করলে অনেক দূর যেতে পারবেন।
রাফার কণ্ঠে এবার আত্মবিশ্বাস ফিরে এল।
—আমি চেষ্টা করব। এবার আর মাঝপথে থামব না।
আদবি মৃদু হেসে বলল,
—এই কথাটাই শুনতে চেয়েছিলাম।
রাতের খাবারের পর খান বাড়িতে সবাই একসঙ্গে বসেছিল। আমিরুল সাহেব আদবিকে বললেন,
—বাবা, রাফার পড়াশোনার ব্যাপারে তুমি যেভাবে সহযোগিতা করছ, সেটা ভালো লাগছে। তবে মনে রেখো, ওর নিজের সিদ্ধান্তকে সবসময় সম্মান করবে।
আদবি মাথা নেড়ে বলল,
—জি, আব্বু। ওর স্বপ্ন ওর নিজের। আমি শুধু চাই, ও নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাক।
আদবির মা খুশি হয়ে বললেন,
—একটা সম্পর্ক সুন্দর হয় তখনই, যখন দুজন মানুষ একে অপরের ভালো চায়।
মাহিরা পাশ থেকে বলে উঠল,
—তাহলে ভাবি একদিন অনেক বড় হবেন, আর ভাইয়া ভাবির জন্য গর্ব করবেন!
আদবি হেসে বলল,
—তুই আগে নিজের পড়াশোনাটা ঠিক কর।
সবাই হেসে উঠল।
রাত গভীর হলে রাফা নিজের পড়ার টেবিলে বসল। নতুন কোর্সের জন্য কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে, সেগুলো খাতায় লিখে রাখল। তারপর ফোন হাতে নিয়ে আদবিকে একটি মেসেজ পাঠাল।
—আজকের দিনটা আমার খুব ভালো কেটেছে। মনে হচ্ছে, আমার স্বপ্নগুলো একটু একটু করে সত্যি হওয়ার পথে এগোচ্ছে।
আদবি উত্তর দিল,
—এভাবেই এগিয়ে যান। আপনার পরিশ্রম একদিন নিশ্চয়ই সুন্দর ফল নিয়ে আসবে, ইনশাআল্লাহ।
রাফা লিখল,
—আপনিও আমার জন্য দোয়া করবেন।
—সবসময়। আল্লাহ আপনার জন্য সহজ করে দিন।
রাফা ফোনটা পাশে রেখে আবার বই খুলল। তার মনে আজ অনেক আনন্দ, কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে।
সে জানে, সামনে নতুন পথ, নতুন অভিজ্ঞতা আর অনেক পরিশ্রম অপেক্ষা করছে।
আর আদবি বুঝতে পারছে, ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো—প্রিয় মানুষটির স্বপ্নকে নিজের স্বার্থের চেয়ে বড় করে দেখতে শেখা।
কিন্তু পরদিন রাফার কোর্সে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে এমন একটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হলো, যার সমাধান খুঁজতে পুরো পরিবারকে একসঙ্গে বসতে হবে।
আমার সুন্দর গল্প,
চলবে...