### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ২০
### পরিবারের পাশে ভালোবাসা
সকালের নাশতা শেষ করে রাফা নিজের ঘরে এসে পড়ার টেবিলে বসল। আজ তার মনটা একটু অস্থির। গতকাল বাবার কাছ থেকে নতুন কোর্সে ভর্তি হওয়ার খবর শুনে সে অনেক খুশি হয়েছিল। কিন্তু ভর্তি হওয়ার জন্য কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন জমা দিতে হবে।
রাফা সব কাগজ এক জায়গায় গুছিয়ে রাখল। তারপর ফোন হাতে নিয়ে আদবিকে মেসেজ দিল।
—আপনি কি এখন ব্যস্ত?
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল,
—না, বলুন। কোনো সমস্যা হয়েছে?
—ভর্তির জন্য কিছু কাগজপত্র লাগবে। কিন্তু একটা কাগজ এখন খুঁজে পাচ্ছি না।
—কোন কাগজ?
—আমার আগের পরীক্ষার নম্বরপত্র। আম্মু বলছেন, ফাইলের মধ্যে রেখেছিলেন। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেন না।
আদবি লিখল,
—চিন্তা করবেন না। আগে ভালোভাবে সব জায়গায় খুঁজে দেখুন। না পেলে আপনার বাবার সঙ্গে কথা বলে অন্য ব্যবস্থা করা যাবে।
রাফা উত্তর দিল,
—আমার খুব ভয় হচ্ছে। যদি সময়মতো জমা দিতে না পারি?
—এত তাড়াতাড়ি হতাশ হবেন না। একটা সমস্যার কারণে আপনার স্বপ্ন থেমে যাবে না।
কথাগুলো পড়ে রাফার মন কিছুটা শান্ত হলো।
এদিকে শারমিন বেগম ঘরের আলমারি, ড্রয়ার, পুরোনো ফাইল—সব জায়গায় খুঁজছিলেন। কিন্তু নম্বরপত্রটি কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না।
সোহাগ সাহেব অফিস থেকে ফিরে বিষয়টি শুনে বললেন,
—এত চিন্তার কিছু নেই। কাল স্কুলে গিয়ে খোঁজ নেব। প্রয়োজন হলে নতুন কপি তোলার ব্যবস্থা করব।
রাফা বাবার সামনে এসে বলল,
—বাবা, আমার জন্য আপনাদের এত কষ্ট হচ্ছে।
সোহাগ সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—তুমি কি আমাদের কাছে কষ্টের কারণ? তোমার স্বপ্ন পূরণে পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব নয়, আনন্দ।
মায়ের চোখেও তখন মমতা।
—তুই শুধু মন খারাপ করিস না। কাগজটা নিশ্চয়ই কোথাও আছে।
রাফা মাকে জড়িয়ে ধরল।
—আম্মু, আমি চাই না আমার জন্য আপনাদের চিন্তা করতে হোক।
শারমিন বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
—সন্তানের জন্য মা-বাবা চিন্তা করবে না তো কে করবে?
বিকেলে আদবি তার বাবা আমিরুল সাহেবকে নিয়ে রাফাদের বাড়িতে এল। সঙ্গে মাহিরাও এসেছে।
মাহিরা ঘরে ঢুকেই রাফাকে বলল,
—ভাবি, আপনার মুখ এমন শুকনো কেন?
রাফা হেসে বলল,
—কিছু হয়নি। একটা কাগজ খুঁজে পাচ্ছি না।
মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আমি খুঁজে দিতে পারি! ছোটবেলায় আমার হারানো জিনিসও আমি নিজেই খুঁজে বের করতাম।
আদবি মুচকি হেসে বলল,
—তুই আগে নিজের জিনিসগুলো ঠিকমতো রাখ।
সবাই হেসে উঠল।
এরপর আদবি সোহাগ সাহেবের সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে কথা বলল।
—আঙ্কেল, নম্বরপত্র না পাওয়া গেলে স্কুল থেকে নতুন কপি সংগ্রহ করা সম্ভব কি না, সেটা জেনে নেওয়া যেতে পারে।
সোহাগ সাহেব বললেন,
—হ্যাঁ বাবা, কালই স্কুলে যাব। তবে আগে আরেকবার খুঁজে দেখি।
আমিরুল সাহেবও বললেন,
—কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন। আমরা একসঙ্গে সমাধান বের করব।
রাফা সবার কথা শুনে বুঝতে পারল, তার পরিবার এবং কাছের মানুষগুলো তাকে কতটা ভালোবাসে।
কিছুক্ষণ পর মাহিরা রাফার ঘরে গেল। দুজন মিলে আলমারির নিচের তাক থেকে পুরোনো বইগুলো বের করতে লাগল।
হঠাৎ মাহিরা একটা নীল ফাইল হাতে নিয়ে বলল,
—ভাবি, এটা কী?
রাফা অবাক হয়ে তাকাল।
—দেখি তো!
ফাইলটি খুলতেই রাফার চোখ আনন্দে বড় হয়ে গেল। ভেতরে তার হারিয়ে যাওয়া নম্বরপত্রটি সুন্দর করে রাখা!
—আলহামদুলিল্লাহ! পেয়ে গেছি!
মাহিরা আনন্দে বলে উঠল,
—দেখলেন! আমি বলেছিলাম না, খুঁজে দেব!
রাফা হেসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
—তুমি তো আজ আমার অনেক বড় উপকার করলে।
মাহিরা গর্বের সঙ্গে বলল,
—এখন থেকে আমাকে কিছু খুঁজে দিতে বলবেন!
দুজনের হাসির শব্দ শুনে আদবি দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
—কী হয়েছে? এত আনন্দ কিসের?
রাফা হাতে নম্বরপত্রটি দেখিয়ে বলল,
—পেয়ে গেছি!
আদবির মুখেও স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল।
—আলহামদুলিল্লাহ। এবার নিশ্চিন্তে আবেদন করতে পারবেন।
রাফা বলল,
—আপনি না থাকলে হয়তো এতটা সাহস পেতাম না।
আদবি মৃদু স্বরে বলল,
—সাহসটা আপনার নিজের মধ্যেই ছিল। আমি শুধু মনে করিয়ে দিয়েছি।
সন্ধ্যায় সবাই একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছিল। সোহাগ সাহেব হাসিমুখে বললেন,
—আজ একটা বিষয় বুঝলাম। বিপদ যত ছোটই হোক, সবাই মিলে চেষ্টা করলে সমাধান পাওয়া যায়।
আমিরুল সাহেব বললেন,
—ঠিক বলেছেন। পরিবার মানে শুধু এক ছাদের নিচে থাকা নয়, একে অপরের পাশে দাঁড়ানোও।
শারমিন বেগম রাফার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আমার মেয়েটা যেন নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, এটাই চাই।
আদবির মা বললেন,
—ইনশাআল্লাহ, ও পারবে। আমরা সবাই ওর জন্য দোয়া করব।
রাফা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
মাহিরা আবার দুষ্টুমি করে বলল,
—ভাবি, আপনি ভর্তি হলে কিন্তু আমাকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে!
রাফা হেসে বলল,
—অবশ্যই খাওয়াব।
আদবি বলল,
—আমাকেও কিন্তু বাদ দেওয়া যাবে না।
রাফা মুচকি হেসে বলল,
—আপনাকে বাদ দেওয়ার সাহস আমার আছে নাকি?
আদবি হেসে ফেলল।
রাতে রাফা নিজের ঘরে এসে নম্বরপত্রটি নতুন ফাইলে রাখল। এরপর ভর্তি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজ আবার পরীক্ষা করল।
কাজ শেষ করে সে আদবিকে ফোন করল।
—আজ আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।
—বলুন।
—আজ যখন কাগজটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন খুব ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমার সব পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে যাবে।
আদবি বলল,
—জীবনে এমন ছোটখাটো সমস্যা আসবেই। কিন্তু একটা সমস্যা মানেই সব শেষ নয়।
—আজ আপনার কথাটা বুঝেছি।
—কোন কথাটা?
—নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে হলে ধৈর্য ধরতে হয়।
আদবি মৃদু হেসে বলল,
—একদম ঠিক।
রাফা একটু থেমে বলল,
—আর একটা কথা। আজ আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন বলে ভালো লেগেছে।
—কেন?
—সবাইকে একসঙ্গে দেখে মনে হয়েছে, আমাদের সম্পর্ক শুধু দুজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুই পরিবারের মধ্যেও সুন্দর একটা বন্ধন তৈরি হচ্ছে।
আদবি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
—আমি চাই এই বন্ধন সবসময় এমনই থাকুক। সম্মান, বিশ্বাস আর ভালোবাসায় ভরা।
রাফা মৃদু স্বরে বলল,
—আমিন।
পরদিন সকালে সোহাগ সাহেব রাফার ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। রাফাও নিজের কাগজপত্র গুছিয়ে রাখল।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে একবার আকাশের দিকে তাকাল। মনে মনে বলল, আল্লাহ যেন তার পথ সহজ করে দেন।
আজ সে বুঝেছে, জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো শুধু আনন্দের মধ্যেই থাকে না; কখনো একটি ছোট সমস্যার সমাধানেও পরিবারের ভালোবাসা নতুন করে অনুভব করা যায়।
আর আদবি দূর থেকে হলেও তার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে চায়।
রাফার জীবনে এবার নতুন দায়িত্বের পাশাপাশি আসতে চলেছে একটি বিশেষ আনন্দের দিন—যেদিন তার স্বপ্ন পূরণের পথে প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
চলবে...