### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ২৪
### অপেক্ষার রঙিন দিন
সকালের দিকে রাফা নিজের ঘরে বসে পড়ছিল। হঠাৎ শারমিন বেগম এসে বললেন,
—রাফা, মা, আজ বিকেলে একটু সময় রাখিস। তোকে নিয়ে কিছু কেনাকাটা করতে যাব।
রাফা বই বন্ধ করে মায়ের দিকে তাকাল।
—কী কিনবেন আম্মু?
—সেটা গেলে বুঝতে পারবি।
রাফা মুচকি হেসে বলল,
—আপনি আবার কিছু লুকাচ্ছেন!
শারমিন বেগম হেসে মেয়ের গালে হাত বুলিয়ে দিলেন।
—সব কথা কি আগে থেকেই বলে দিতে হয়?
রাফা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। তবে তার মনে কৌতূহল তৈরি হলো।
অন্যদিকে খান বাড়িতে আদবির মা ছেলের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
—বাবা, আগামী শুক্রবার দুই পরিবারের জন্য একটা সুন্দর আয়োজন করতে চাই।
আদবি বলল,
—কী আয়োজন, আম্মু?
—তোমাদের বাগদানের পর পরিবারের সবাই মিলে একটা ছোট অনুষ্ঠান করতে চাই। আত্মীয়স্বজনও থাকবে। তবে রাফার মতামত নিয়ে সব ঠিক করব।
আদবি মাথা নেড়ে বলল,
—রাফা যদি রাজি থাকে, আমার কোনো আপত্তি নেই।
মা হেসে বললেন,
—তোমাদের দুজনের সম্মতিই সবচেয়ে জরুরি।
বিকেলে শারমিন বেগম রাফাকে নিয়ে কেনাকাটা করতে গেলেন। দোকানে গিয়ে রাফার জন্য একটি সুন্দর পোশাক পছন্দ করলেন।
রাফা পোশাকটি দেখে বলল,
—আম্মু, এটা তো অনেক সুন্দর!
—তোর পছন্দ হয়েছে?
—জি।
—তাহলে এটাই নেওয়া যাক।
রাফা মায়ের হাত ধরে বলল,
—আম্মু, এত আয়োজনের কী দরকার? সবাই একসঙ্গে থাকলেই তো ভালো লাগে।
শারমিন বেগম বললেন,
—মা, কিছু দিন জীবনে বিশেষ হয়ে থাকে। সেগুলো সুন্দর করে মনে রাখতে ইচ্ছা করে।
রাফা মায়ের কথায় মৃদু হাসল।
সন্ধ্যায় আদবি রাফাকে ফোন করল।
—আজ কী করলেন?
—আম্মুর সঙ্গে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলাম।
—কী কিনলেন?
—বলব না।
—কেন?
—চমক থাকুক।
আদবি হেসে বলল,
—বেশ, তাহলে আমিও একটা চমক রাখব।
রাফা কৌতূহলী হয়ে বলল,
—কী চমক?
—এখন বললে তো আর চমক থাকবে না।
—আপনি খুব বিরক্তিকর!
—তবুও কথা বলছেন কেন?
রাফা হেসে বলল,
—কারণ আপনি ফোন করেছেন।
আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—শুক্রবারের আয়োজন নিয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।
রাফা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
—আম্মু কিছু বলেছেন।
—আপনি রাজি আছেন তো?
—জি। তবে খুব বেশি আয়োজন যেন না হয়।
—আপনার পছন্দের কথাই সবাইকে বলব।
পরদিন সকাল থেকেই দুই বাড়িতে ব্যস্ততা শুরু হলো। রাফার ছোট বোন বারবার তার ঘরে এসে পোশাক দেখতে চাইছিল।
—আপু, শুক্রবার তুমি কী পরবে?
—এখনই বলব না।
—তুমি কিছুই বলো না!
রাফা হেসে বলল,
—সময় হলে দেখতে পাবে।
এদিকে মাহিরাও আদবিকে ছাড়ছিল না।
—ভাইয়া, শুক্রবার কিন্তু আপনাকে সুন্দর করে তৈরি হতে হবে।
আদবি বলল,
—আমি কি প্রতিদিন অগোছালো থাকি?
—না, কিন্তু শুক্রবার একটু বেশি সুন্দর হতে হবে!
আদবি হেসে মাথা নাড়ল।
শুক্রবার বিকেলে রাফাদের বাড়ি ফুল ও আলো দিয়ে সাজানো হলো। বসার ঘরে সুন্দর করে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিবারের সবাই ব্যস্ত থাকলেও রাফাকে কেউ বেশি কাজ করতে দিল না।
শারমিন বেগম মেয়েকে বললেন,
—তুই শুধু তৈরি হ। বাকি কাজ আমরা সামলে নেব।
রাফা বলল,
—আম্মু, আমিও তো সাহায্য করতে পারি।
—আজ তোর কাজ শুধু হাসিমুখে সবার সঙ্গে সময় কাটানো।
রাফা মায়ের কথা শুনে নিজের ঘরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর খান বাড়ির সবাই এসে পৌঁছালেন। মাহিরা এসেই রাফাকে খুঁজতে লাগল।
—ভাবি কোথায়?
রাফা ঘর থেকে বের হতেই মাহিরা আনন্দে বলে উঠল,
—ভাবি! আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে!
রাফা হেসে বলল,
—তুমিও তো সুন্দর করে সেজেছ।
মাহিরা বলল,
—আজ কিন্তু অনেক ছবি তুলব!
বসার ঘরে দুই পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসলেন। হাসি, গল্প আর আনন্দে সময় কেটে যাচ্ছিল।
একসময় আমিরুল সাহেব বললেন,
—আলহামদুলিল্লাহ, দুই পরিবারকে এভাবে একসঙ্গে দেখে খুব ভালো লাগছে।
সোহাগ সাহেব বললেন,
—আল্লাহ যেন এই সম্পর্কের মধ্যে সবসময় ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখেন।
সবাই আমিন বললেন।
এরপর আদবি রাফার কাছে এসে মৃদু স্বরে বলল,
—আজকের আয়োজন কেমন লাগছে?
রাফা বলল,
—অনেক সুন্দর। তবে এত আয়োজন দেখে একটু অস্বস্তি লাগছে।
আদবি হেসে বলল,
—কেন?
—সবাই শুধু আমার দিকেই তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে।
আদবি বলল,
—তাহলে আমার দিকেও তাকাতে বলুন। একা আপনার দিকে তাকানোর কী আছে?
রাফা হেসে ফেলল।
—আপনি না!
আদবি মৃদু হেসে বলল,
—হাসুন। আপনাকে হাসিখুশি দেখলেই ভালো লাগে।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে দুই পরিবারের সবাই মিলে ছবি তুললেন। মাহিরা রাফা ও আদবিকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে বলল,
—এবার আপনাদের দুজনের একটা ছবি চাই!
রাফা একটু লজ্জা পেলেও সবাইকে দেখে মুচকি হাসল। ছবিটি তোলার পর মাহিরা বলল,
—এই ছবিটা আমি নিজের কাছে রাখব।
আদবি বলল,
—আগে ঠিকমতো পড়াশোনা কর, তারপর ছবি রাখিস।
মাহিরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—আপনার কাছে সবকিছুর উত্তর পড়াশোনা!
সবাই হেসে উঠল।
রাতের দিকে অতিথিরা বিদায় নিতে শুরু করলেন। আদবি যাওয়ার আগে রাফাকে বলল,
—আজ একটা কথা বলব?
—বলুন।
—আপনি আজ খুব খুশি ছিলেন। এই হাসিটা যেন সবসময় থাকে।
রাফা মৃদু স্বরে বলল,
—আপনিও সবসময় এমন যত্নশীল থাকবেন।
আদবি বলল,
—চেষ্টা করব। তবে মাঝে মাঝে ভুল হলে মনে করিয়ে দেবেন।
রাফা হেসে বলল,
—মনে করিয়ে দেব।
সেদিন রাতে রাফা ঘরে ফিরে ছবিগুলো দেখতে লাগল। পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে দেখে তার মন ভরে গেল।
ফোনে আদবির মেসেজ এল।
—আজকের দিনটা সুন্দর ছিল।
রাফা উত্তর দিল,
—আমারও খুব ভালো লেগেছে। আল্লাহ যেন আমাদের দুই পরিবারকে সবসময় ভালো রাখেন।
আদবি লিখল,
—আমিন। আর আপনার পড়াশোনার কথা ভুলে যাবেন না।
রাফা হেসে উত্তর দিল,
—আবার পড়াশোনা!
আদবি লিখল,
—এটা কিন্তু আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাফা ফোনটা পাশে রেখে বই খুলল। আনন্দের দিন শেষ হলেও তার দায়িত্ব শেষ হয়নি।
কিন্তু পরদিন সকালে আদবির একটি ফোন রাফাকে নতুন এক সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করাবে। এবার সিদ্ধান্তটি শুধু তাদের দুজনের নয়, দুই পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িয়ে থাকবে।
চলবে...