### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ২৫
### নতুন সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে রাফার ঘরে এসে পড়েছে। ঘুম থেকে উঠে সে বিছানা গুছিয়ে পড়ার টেবিলে বসেছিল। সামনে কয়েকটি বই খোলা, পাশে তার কোর্সের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। গত কয়েক দিন ধরে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের নানা আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও আজ সে ঠিক করেছে, অনেকটা সময় পড়াশোনার পেছনে দেবে।
ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে আদবির নাম দেখে রাফার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
— আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুমুস সালাম। কী করছেন?
— পড়তে বসেছি। আপনি?
— আপনার সঙ্গে কথা বলার অপেক্ষায় ছিলাম।
রাফা মুচকি হেসে বলল,
— এত সকালে আমার সঙ্গে কথা বলার কী দরকার পড়ল?
আদবি একটু হেসে বলল,
— একটা কথা ছিল। তবে ফোনে বলার চেয়ে সামনাসামনি বললে ভালো হতো।
— কী কথা?
— দুই পরিবার মিলে আমাদের বিয়ের সময় নিয়ে আলোচনা করতে চাচ্ছে।
কথাটা শুনে রাফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার মনে আনন্দের পাশাপাশি একটু চিন্তাও এসে ভিড় করল।
আদবি আবার বলল,
— রাফা, আপনি চুপ করে আছেন কেন?
— আসলে হঠাৎ শুনে একটু অবাক হয়েছি।
— অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, আপনার মতামত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত হবে না।
রাফা ধীরে বলল,
— আমার কোর্সটা তো এখনো শুরু হয়নি। আমি পড়াশোনাটা ঠিকভাবে এগিয়ে নিতে চাই।
— আমি জানি। আর আপনার এই স্বপ্নকে আমি কখনো ছোট করে দেখব না। বিয়ের পরিকল্পনা এমনভাবেই হবে, যাতে আপনার পড়াশোনায় কোনো বাধা না আসে।
রাফার চোখেমুখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
— আপনি সত্যিই আমার পড়াশোনাকে এতটা গুরুত্ব দেন?
— অবশ্যই। আপনার স্বপ্নগুলোও তো আপনার পরিচয়ের অংশ। শুধু সম্পর্কের কারণে আপনি নিজের স্বপ্ন থেকে দূরে সরে যাবেন, সেটা আমি চাই না।
কথাগুলো শুনে রাফার মনটা ভালো হয়ে গেল।
— ধন্যবাদ।
— ধন্যবাদ দিতে হবে না। শুধু একটা কথা বলবেন, কোনো বিষয়ে মন খারাপ হলে আমাকে জানাবেন। চুপ করে থাকবেন না।
— আচ্ছা, বলব।
— তাহলে বিকেলে দেখা হবে?
— কোথায়?
— আমাদের বাসায়। দুই পরিবারের সবাই বসে কথা বলবেন। আপনিও থাকবেন। আপনার মতামতটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
— ঠিক আছে।
ফোন রাখার পর রাফা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল, জীবনের একটা নতুন অধ্যায় ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছে। আনন্দ হচ্ছে, আবার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা ভয়ও কাজ করছে।
সে বই বন্ধ করে মায়ের ঘরের দিকে গেল।
শারমিন তখন রান্নাঘরের কাজ দেখছিলেন।
— মা, একটা কথা বলব?
— বলো মা।
— আদবি ফোন করেছিল। আজ নাকি দুই পরিবার মিলে বিয়ের সময় নিয়ে কথা বলবে।
শারমিন মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— হ্যাঁ, তোমার বাবা গতকাল রাতেই বলছিলেন। তবে তোমার পড়াশোনার বিষয়টা আগে ঠিক করতে হবে।
রাফা মায়ের পাশে বসে বলল,
— মা, আমি চাই সবকিছু সুন্দরভাবে হোক। কিন্তু পড়াশোনাটা যেন বন্ধ না হয়ে যায়।
শারমিন মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— তোমার পড়াশোনা বন্ধ করার কথা কেউ ভাবছে না। সংসার জীবনে যাওয়ার আগে নিজের স্বপ্ন পূরণ করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। তোমার বাবা-মা হিসেবে আমরা চাই তুমি নিজের পায়ে দাঁড়াও।
রাফা মাকে জড়িয়ে ধরল।
— আপনারা পাশে থাকলে আমার আর ভয় কীসের?
শারমিন মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বললেন,
— সব সময় পাশে থাকব, মা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই দুই পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসার ঘরে জড়ো হলো। আমিরুল সাহেব, সোহাগ সাহেব, শারমিন এবং আদবির মা—সবাই উপস্থিত। মাহিরাও আজ বেশ আনন্দিত।
আদবি ঘরে ঢুকে প্রথমেই রাফার দিকে তাকাল। রাফা চোখ তুলে তাকাতেই সে মৃদু হাসল।
সবাই বসার পর আমিরুল সাহেব কথা শুরু করলেন।
— আমরা চাই, এবার বিয়ের একটা সময় ঠিক করা হোক। তবে ছেলে-মেয়ে দুজনের মতামত আগে শুনতে চাই।
সোহাগ সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
— ঠিক বলেছেন। আমাদের মেয়ের পড়াশোনা আছে। তার সুবিধার বিষয়টা আগে দেখতে হবে।
আদবির মা বললেন,
— রাফা আমাদের পরিবারের মেয়ে হয়ে আসবে। তার স্বপ্ন আর পড়াশোনার দায়িত্বও আমাদের সবার।
কথাগুলো শুনে রাফার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় অনেকটা কমে গেল।
আমিরুল সাহেব এবার আদবির দিকে তাকালেন।
— বাবা, তোমার কী মত?
আদবি শান্তভাবে বলল,
— আমি চাই, রাফার কোর্সের সময়সূচি দেখে তারপর তারিখ ঠিক করা হোক। ওর পড়াশোনায় যেন কোনো সমস্যা না হয়।
এরপর সবাই রাফার দিকে তাকাল।
রাফা একটু ইতস্তত করে বলল,
— আমি চাই, বিয়ের আয়োজনের আগে আমার কোর্সটা শুরু হোক। আমি পড়াশোনাটা কিছুটা গুছিয়ে নিতে চাই। তবে পরিবারের সবাই যেভাবে ভালো মনে করবেন, আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
সোহাগ সাহেব মেয়ের কথা শুনে খুশি হলেন।
— এটাই তো আমরা চাই। নিজের মনের কথা স্পষ্ট করে বলবে। জীবনের সিদ্ধান্তে তোমার মতামত অবশ্যই থাকবে।
মাহিরা হঠাৎ বলে উঠল,
— তাহলে ভাবি, আপনার কোর্স শেষ হলে কিন্তু আমাকে পড়াশোনায় সাহায্য করতে হবে!
সবাই হেসে উঠল।
রাফা লজ্জা পেয়ে বলল,
— আগে ভাবি হওয়ার সুযোগ তো দিন!
মাহিরা হাসতে হাসতে বলল,
— সেই সুযোগ তো আর বেশি দূরে নেই!
আদবি পাশ থেকে মৃদু হেসে বলল,
— মাহিরা, সবাইকে একটু শান্তিতে কথা বলতে দাও।
— ভাইয়া, আমি তো শুধু আনন্দ করছি!
ঘরের পরিবেশ হাসিতে ভরে উঠল।
কিছুক্ষণ আলোচনার পর দুই পরিবার সিদ্ধান্ত নিল, রাফার কোর্সের সময়সূচি হাতে পাওয়ার পর বিয়ের সম্ভাব্য তারিখ ঠিক করা হবে। কোনো তাড়াহুড়ো করা হবে না। দুজনের সম্মতি এবং সুবিধাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
আলোচনা শেষ হলে সবাই যখন অন্য কাজে ব্যস্ত, তখন রাফা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। সন্ধ্যার আকাশে হালকা বাতাস বইছে।
কিছুক্ষণ পর আদবি এসে তার পাশে দাঁড়াল।
— কী ভাবছেন?
— ভাবছি, সময় কত দ্রুত চলে যায়। কিছুদিন আগেও সবকিছু কত অচেনা ছিল।
— এখনো কি অচেনা মনে হয়?
রাফা মৃদু হেসে বলল,
— কিছুটা। তবে আগের মতো ভয় লাগে না।
আদবি বলল,
— ভয় লাগলে আমাকে বলবেন। সবকিছু একদিনে বুঝে ফেলতে হবে না। আমরা ধীরে ধীরে এগোব।
রাফা তার হাতের ব্রেসলেটটার দিকে তাকাল। আদবির দেওয়া সেই উপহারটি এখনো তার হাতে রয়েছে।
— আপনার দেওয়া ব্রেসলেটটা আমি এখনো খুলিনি।
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— জানি। দেখলেই মনে হয়, আমার দেওয়া ছোট্ট উপহারটা আপনার কাছে বিশেষ হয়ে আছে।
— কিছু উপহার দামের জন্য বিশেষ হয় না। কিছু উপহারের সঙ্গে সুন্দর স্মৃতি জড়িয়ে থাকে।
আদবি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আমাদের সামনের দিনগুলোও যেন এমন সুন্দর স্মৃতিতে ভরে ওঠে।
রাফা আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— আমিন।
সেদিন সন্ধ্যায় দুই পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খেল। হাসি, গল্প আর ভবিষ্যতের ছোট ছোট পরিকল্পনায় সময় কেটে গেল।
কিন্তু রাফার মনে তখন একটি নতুন অপেক্ষা—কোর্সের সময়সূচি হাতে পাওয়ার পর তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনটির তারিখও হয়তো ঠিক হয়ে যাবে।
আর আদবি মনে মনে ঠিক করল, রাফার মুখের হাসিটা যেন কোনো দিন তার নিজের স্বপ্ন হারানোর কারণ না হয়।
চলবে...