### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ২৮
### ভালোবাসার নতুন আয়োজন
সকাল থেকেই রাফাদের বাড়িতে বেশ ব্যস্ততা। বিয়ের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে দুই পরিবারের আলোচনা শেষ হওয়ার পর এবার শুরু হয়েছে কেনাকাটার প্রস্তুতি। শারমিন মেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা তৈরি করছেন। আর রাফা নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি মাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে রাফা মাকে বলল,
— মা, এত কিছু একসঙ্গে কেনার দরকার আছে?
শারমিন হেসে বললেন,
— বিয়ের আয়োজন বলে কথা! কিছু জিনিস তো লাগবেই।
— কিন্তু আমার তো বেশি কিছু প্রয়োজন নেই।
— সেটা আমি জানি। তবুও মেয়ের বিয়েতে মায়ের একটু আয়োজন করতে ইচ্ছা করে।
রাফা মায়ের হাত ধরে বলল,
— আপনি শুধু আমার পাশে থাকবেন। তাহলেই হবে।
শারমিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
এদিকে আদবির বাড়িতেও চলছে প্রস্তুতি। মাহিরা সকাল থেকেই ভাইকে বিরক্ত করছে।
— ভাইয়া, ভাবির জন্য কী কিনবেন?
আদবি নিজের কাজ থেকে চোখ না তুলে বলল,
— এখনো ঠিক করিনি।
— আপনি কিছুই ঠিক করেননি! এভাবে বিয়ে হবে কী করে?
আদবি হেসে বলল,
— তোমার এত চিন্তা করতে হবে না। বড়রা সব দেখছেন।
মাহিরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— আমি কিন্তু ভাবির পক্ষের মানুষ। আমার অনুমতি ছাড়া কিছু হবে না!
আদবি হেসে মাথা নাড়ল।
দুপুরের দিকে আদবি রাফাকে ফোন করল।
— আজ বিকেলে একটু সময় হবে?
— কেন?
— আপনার সঙ্গে কিছু কেনাকাটা করতে চাই।
— কী কিনবেন?
— সেটা আপনি সঙ্গে গেলেই জানতে পারবেন।
রাফা একটু হেসে বলল,
— ঠিক আছে। তবে বেশি কিছু কিনবেন না।
— সেটা পরে দেখা যাবে।
বিকেলে পরিবারের অনুমতি নিয়ে রাফা, আদবি ও মাহিরা কেনাকাটা করতে গেল। প্রথমে তারা পোশাকের দোকানে প্রবেশ করল।
মাহিরা নীল রঙের একটি পোশাক দেখিয়ে বলল,
— ভাবি, এটা কেমন?
রাফা পোশাকটি হাতে নিয়ে দেখল। নীল রঙের ওপর সাদা কাজ করা। তার বেশ পছন্দ হলো।
— সুন্দর তো!
আদবি পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
— আপনার পছন্দ হয়েছে?
— হ্যাঁ।
— তাহলে এটিই নেওয়া যাক।
রাফা বলল,
— আগে দামটা দেখুন।
মাহিরা হেসে উঠল।
— ভাবি, আপনি শুধু দাম নিয়ে চিন্তা করেন!
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— নিজের পছন্দের জিনিস নিতে দ্বিধা করবেন না। তবে অপ্রয়োজনীয় খরচও করব না।
এরপর তারা প্রয়োজনীয় আরও কিছু জিনিস কিনল। আদবি রাফার জন্য একটি সুন্দর বইও কিনে দিল।
রাফা বইটি হাতে নিয়ে অবাক হলো।
— বিয়ের কেনাকাটার মধ্যে বই কেন?
— কারণ আপনার জীবনে পড়াশোনার জায়গাটা যেন সবসময় থাকে।
রাফা বইটির মলাটের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— এই উপহারটা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।
মাহিরা পাশ থেকে বলল,
— ভাইয়া, ভাবির জন্য এত কিছু কিনছেন, আমার জন্য কিছু নেই?
আদবি বলল,
— তোমার জন্যও আছে। তবে আগে বাসায় চলো।
মাহিরা খুশি হয়ে গেল।
কেনাকাটা শেষে তারা বাসায় ফিরে এল। সন্ধ্যায় রাফা নিজের ঘরে বসে বইটি পড়ছিল। হঠাৎ আদবির ফোন এল।
— বইটা পড়া শুরু করেছেন?
— এখনো না। তবে আজ রাতেই পড়ব।
— ভালো। আর আজ আপনাকে বেশ আনন্দিত লাগছিল।
রাফা একটু হেসে বলল,
— অনেক দিন পর এভাবে কেনাকাটা করতে গেলাম। ভালো লেগেছে।
— সামনে আরও অনেক সুন্দর সময় আসবে, ইনশাআল্লাহ।
— একটা কথা বলব?
— বলুন।
— বিয়ের পর সবকিছু বদলে গেলেও আমি চাই, আমাদের মধ্যে এমন সহজ কথাগুলো যেন হারিয়ে না যায়।
আদবি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— হারাবে না। কোনো বিষয়ে মন খারাপ হলে বলবেন, আনন্দ হলে সেটাও ভাগ করে নেবেন। আমি চাই আমাদের সম্পর্কটা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক।
রাফা মৃদু স্বরে বলল,
— আমিও চাই।
পরদিন সকালে রাফার কোর্সের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র গুছাতে হলো। শারমিন তাকে সাহায্য করলেন। সোহাগ সাহেব মেয়ের পড়াশোনার খোঁজ নিয়ে বললেন,
— বিয়ের প্রস্তুতির পাশাপাশি পড়াশোনার দিকেও মন দেবে। কোনো কিছু যেন বাদ না পড়ে।
রাফা মাথা নেড়ে বলল,
— জি বাবা। আমি চেষ্টা করব।
সোহাগ সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তুমি আমাদের কাছে সবসময় ছোটই থাকবে। নতুন পরিবারে গেলেও নিজের মনের কথা বলতে কখনো ভয় পাবে না।
রাফার চোখে পানি চিকচিক করে উঠল।
— বাবা, আপনাদের ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে।
সোহাগ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— দূরে গেলেও তুমি আমাদের মেয়ে হয়েই থাকবে। তোমার জন্য এই বাড়ির দরজা সবসময় খোলা।
রাফা বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
সেদিন বিকেলে আদবি আবার ফোন করল। সে জানাল, দুই পরিবার বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত করার আগে আরেকবার একসঙ্গে বসবে। রাফা সম্মতি জানাল।
ফোন রাখার আগে আদবি বলল,
— রাফা, সামনে যত আয়োজনই থাকুক, নিজের যত্ন নেবেন।
— আপনিও।
— আর পড়াশোনার সময় ঠিকমতো পড়বেন।
— আপনি কি আমার শিক্ষক হয়ে গেলেন?
আদবি হেসে বলল,
— প্রয়োজন হলে সেটাও হতে পারি।
রাফা হেসে বলল,
— তাহলে আগে নিজের পড়াশোনা ঠিক রাখুন!
দুজনের হাসির মধ্যে কথোপকথন শেষ হলো।
রাতে রাফা নতুন কেনা বইটি খুলে প্রথম কয়েকটি পাতা পড়ল। তারপর বইটি যত্ন করে টেবিলে রেখে দিল। তার মনে হচ্ছিল, জীবনে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের স্বপ্নগুলোও জায়গা পাচ্ছে।
অন্যদিকে আদবি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। সামনে বিয়ে, নতুন দায়িত্ব, নতুন পরিবার—সবকিছু নিয়ে তার মনেও নানা ভাবনা।
তবুও তার বিশ্বাস, দুজনের মধ্যে সম্মান, ধৈর্য আর বিশ্বাস থাকলে পথটা সুন্দর হবে।
কিন্তু বিয়ের আয়োজনের ব্যস্ততার মধ্যেই পরদিন দুই পরিবারের জন্য অপেক্ষা করছিল একটি আনন্দের খবর। যে খবর শুনে রাফার চোখে আনন্দের পানি চলে আসবে।
চলবে...
❤️