### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ২৯
### আনন্দের অশ্রু
সকালের সময়। রাফা নিজের ঘরে বসে পড়াশোনা করছিল। সামনে খোলা বই, পাশে কয়েকটি খাতা। বিয়ের আয়োজন নিয়ে বাড়িতে ব্যস্ততা থাকলেও সে নিজের পড়াশোনার সময় নষ্ট করতে চায় না।
এমন সময় শারমিন ঘরে এসে বললেন,
— মা, একটু নিচে এসো। তোমার বাবা তোমাকে ডাকছেন।
রাফা বই বন্ধ করে বলল,
— কী হয়েছে মা?
— নিচে গেলেই জানতে পারবে।
রাফা নিচে নেমে দেখল, বসার ঘরে তার বাবা সোহাগ সাহেবের সঙ্গে আমিরুল সাহেব বসে আছেন। আদবিও এসেছে। মাহিরা সোফায় বসে হাসাহাসি করছে।
রাফাকে দেখে সোহাগ সাহেব বললেন,
— এসো মা, এখানে বসো।
রাফা বাবার পাশে বসল।
আমিরুল সাহেব হাসিমুখে বললেন,
— তোমার জন্য একটা সুখবর আছে।
রাফা অবাক হয়ে বলল,
— কী সুখবর?
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— আগে বাবা বলুক।
আমিরুল সাহেব বললেন,
— তোমার কোর্সের সময়সূচি এবং দুই পরিবারের সুবিধা বিবেচনা করে আমরা বিয়ের তারিখ চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সবাই মিলে আলোচনা করে একটি দিন ঠিক করেছি।
রাফার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
সোহাগ সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তবে তোমার সম্মতি ছাড়া কিছুই চূড়ান্ত হবে না।
রাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আপনারা যেটা ঠিক মনে করেছেন, আমি তাতে রাজি। শুধু আমার পড়াশোনার বিষয়টা যেন ঠিক থাকে।
আদবি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— সেটা নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমরা আগেও কথা বলেছি, আপনার পড়াশোনা চলবে।
মাহিরা আনন্দে বলে উঠল,
— তাহলে এবার সত্যিই আমার ভাবি আসবে!
সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর দুই পরিবারের বড়রা তারিখ ও আয়োজন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু করলেন। রাফা চুপচাপ বসে সবার কথা শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, এত দিনের অপেক্ষা এবার সত্যিই বাস্তবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
আলোচনা শেষে শারমিন মেয়েকে নিয়ে ঘরে গেলেন।
— কেমন লাগছে মা?
রাফা মায়ের হাত ধরে বলল,
— ভালো লাগছে। কিন্তু একটু ভয়ও হচ্ছে।
— ভয় কেন?
— আপনাদের ছেড়ে নতুন একটা পরিবেশে যেতে হবে। এত দিনের অভ্যাস, এই ঘর, আপনাদের সঙ্গে প্রতিদিন থাকা—সবকিছু মনে পড়বে।
শারমিন মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,
— মা, বিয়ের পরও এই বাড়ি তোমার নিজেরই থাকবে। যখন ইচ্ছা আসবে। আর নতুন পরিবারেও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করবে।
রাফার চোখ ভিজে উঠল।
— আমি আপনাদের কখনো ভুলব না।
— আমরাও তোকে ভুলব না, মা।
দুপুরে মাহিরা রাফার ঘরে এল। হাতে একটি ছোট্ট বাক্স।
— ভাবি, এটা আপনার জন্য।
রাফা বাক্সটি খুলে দেখল, ভেতরে একটি সুন্দর ছোট্ট চুলের ক্লিপ।
— এটা কোথায় পেলে?
— নিজের পছন্দে কিনেছি। বিয়ের দিন আপনাকে এটা পরতে হবে।
রাফা হেসে বলল,
— খুব সুন্দর হয়েছে। ধন্যবাদ।
মাহিরা রাফার পাশে বসে বলল,
— জানেন ভাবি, ভাইয়া বাইরে যতই গম্ভীর থাকুক, আপনার কথা উঠলেই ওর মুখে হাসি চলে আসে।
রাফা লজ্জা পেয়ে বলল,
— তুমি সব সময় তোমার ভাইকে নিয়ে এমন কথা বলো কেন?
— কারণ ভাইয়াকে আমি চিনি!
দুজনেই হেসে উঠল।
বিকেলের দিকে আদবি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। রাফা সেখানে এলে সে বলল,
— আজকের খবর শুনে কেমন লাগল?
— খুব ভালো। তবে একটু চিন্তাও হচ্ছে।
— আবার কী চিন্তা?
— এত আয়োজন, এত মানুষ, এত দায়িত্ব—সবকিছু ঠিকভাবে হবে তো?
আদবি হেসে বলল,
— সবকিছু নিখুঁত না হলেও সমস্যা নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা যেন একে অপরের কথা বুঝতে পারি।
রাফা মাথা নেড়ে বলল,
— আপনি সব সময় এত শান্ত থাকেন কীভাবে?
— সব সময় শান্ত থাকি না। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভেবে কথা বলার চেষ্টা করি।
রাফা মৃদু হেসে বলল,
— তাহলে আমিও চেষ্টা করব।
আদবি বলল,
— আর একটা কথা। বিয়ের দিন আপনি যেন নিজের আনন্দটা উপভোগ করেন। অযথা কোনো কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।
— আপনি থাকবেন তো পাশে?
— পরিবারের সবাই থাকবে। আমিও থাকব, ইনশাআল্লাহ।
সন্ধ্যায় দুই পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খেল। আমিরুল সাহেব ও সোহাগ সাহেব পুরোনো দিনের বন্ধুত্বের গল্প করছিলেন। তাদের কথার মাঝে মাঝে হাসির শব্দ ভেসে আসছিল।
শারমিন বললেন,
— এত দিন পর দুই পরিবার আবার এমনভাবে এক হলো, ভাবতেই ভালো লাগছে।
আদবির মা বললেন,
— আল্লাহর রহমতে সবকিছু সুন্দর হচ্ছে।
রাফা মায়ের পাশে বসে সবার কথা শুনছিল। তার মনে পড়ল, একসময় দুই পরিবারের মধ্যে দূরত্ব ছিল। আজ সেই দূরত্ব পেরিয়ে তারা আবার একসঙ্গে বসেছে।
রাতের দিকে সবাই চলে গেলে রাফা নিজের ঘরে ফিরে এল। টেবিলের ওপর রাখা বই, খাতা, নতুন ব্যাগ আর আদবির দেওয়া ব্রেসলেট—সবকিছুর দিকে তাকাল।
তারপর ফোন হাতে নিয়ে আদবিকে একটি বার্তা পাঠাল—
“আজকের দিনটা আমার অনেক ভালো লেগেছে। আল্লাহ যেন আমাদের সবার মুখে হাসি রাখেন।”
আদবি উত্তর দিল—
“আমিন। আর আপনার স্বপ্নগুলোও যেন পূরণ হয়, সেই দোয়া করি।”
রাফা ফোনটা পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকাল।
আজ তার চোখে আনন্দের পানি ছিল, কিন্তু সেই পানির মধ্যে ছিল না কোনো কষ্টের গল্প। ছিল পরিবারের ভালোবাসা, নতুন জীবনের আশা আর নিজের স্বপ্ন পূরণের প্রতিজ্ঞা।
সে মনে মনে দোয়া করল, সামনে যত দিনই আসুক, যেন সবাইকে নিয়ে সুন্দরভাবে পথ চলতে পারে।
রাফা এরপর নিজের পড়ার টেবিলে ফিরে এল। নতুন খাতাটি খুলে আগামী দিনের পড়াশোনার পরিকল্পনা লিখতে শুরু করল। তার মনে আনন্দের পাশাপাশি নতুন দায়িত্বের কথাও ঘুরছিল। সে জানত, জীবনে ভালোবাসা ও স্বপ্ন—দুটোকেই যত্ন করে আগলে রাখতে হয়। তাই নতুন পথচলায় সে নিজের পরিবার, আদবি এবং স্বপ্নের পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করল।
আমার প্রিয় উপন্যাস ,
চলবে...❤️ 👌