### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ৩০
### স্বপ্নের পাশে নতুন ঠিকানা
সকালের আলোয় রাফাদের বাড়িটা আজ অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি সুন্দর লাগছে। বাড়ির প্রতিটি কোণে ব্যস্ততা। তবে আজকের ব্যস্ততা বিয়ের আয়োজন নিয়ে নয়, বরং রাফার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনকে ঘিরে।
রাফার কোর্সের শেষ পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। সে ভালো ফলাফল করেছে। নিজের পরিশ্রমের এমন সুন্দর ফল পেয়ে তার আনন্দ যেন ধরে না।
ফোন হাতে নিয়ে সে প্রথমেই আদবিকে কল করল।
— আসসালামু আলাইকুম।
— ওয়ালাইকুমুস সালাম। কী খবর? আপনার কণ্ঠে এত আনন্দ কেন?
রাফা হেসে বলল,
— আমার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে!
— সত্যি? কেমন হয়েছে?
— আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো হয়েছে।
আদবি আনন্দিত কণ্ঠে বলল,
— মাশাআল্লাহ! আমি জানতাম, আপনি পারবেন।
— আপনার দোয়া আর পরিবারের সহযোগিতা না থাকলে এত সহজ হতো না।
— কৃতিত্বটা আপনার। আপনি পরিশ্রম করেছেন, তাই আজ এই আনন্দের দিন।
রাফা বলল,
— আজ কিন্তু সবাইকে মিষ্টি খাওয়াতে হবে।
— অবশ্যই। আপনার এই আনন্দে মিষ্টি তো খাওয়াতেই হবে।
ফোন রাখার পর রাফা মাকে খবরটা জানাল। শারমিন মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,
— আলহামদুলিল্লাহ! আজ আমার মেয়ের স্বপ্নের একটা ধাপ পূরণ হলো।
সোহাগ সাহেবও মেয়ের ফলাফল শুনে খুব খুশি হলেন।
— মা, মনে রেখো, জীবনে শুধু ভালো ফল করাই শেষ কথা নয়। ভালো মানুষ হওয়াটাও জরুরি।
রাফা বাবার হাত ধরে বলল,
— আমি চেষ্টা করব, বাবা।
সেদিন বিকেলে আদবি, আমিরুল সাহেব ও মাহিরা তাদের বাড়িতে এল। মাহিরা এসেই রাফাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— ভাবি! অভিনন্দন! এবার কিন্তু আপনার কাছ থেকে আমাকে পড়াশোনায় সাহায্য নিতে হবে।
রাফা হেসে বলল,
— অবশ্যই। তবে তোমাকেও মন দিয়ে পড়তে হবে।
— ঠিক আছে, শিক্ষক ভাবি!
সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর দুই পরিবারের বড়রা বসার ঘরে একসঙ্গে বসলেন। আমিরুল সাহেব বললেন,
— আলহামদুলিল্লাহ, রাফার পড়াশোনার একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে। এখন আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আবার আলোচনা করা যায়।
সোহাগ সাহেব সম্মতি জানালেন।
— হ্যাঁ। তবে দুজনের মতামত আর সুবিধার বিষয়টি আগে দেখতে হবে।
আদবি বলল,
— আমার পক্ষ থেকে কোনো তাড়া নেই। রাফা যেন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে, সেটাই চাই।
রাফা আদবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
এরপর সবাই মিলে আলোচনা করলেন। পরিবারের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, দুজনের সম্মতি এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্বের বিষয়গুলো বিবেচনা করে বিয়ের আয়োজনের দিন ঠিক করা হলো। বড়রা নিশ্চিত করলেন, সবকিছু যেন তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য সুন্দর ও স্বস্তিদায়ক হয়।
দিনগুলো দ্রুত কেটে যেতে লাগল।
অবশেষে বিয়ের দিন এসে গেল।
সকালে রাফাদের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা শুরু হলো। শারমিন মেয়েকে সাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে রাখলেন। রাফার পছন্দের নীল-সাদা রঙের পোশাকটি দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
মাহিরা ঘরে ঢুকে বলল,
— ভাবি, আজ আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে!
রাফা লজ্জা পেয়ে বলল,
— তুমি সব সময় এমন কথা বলো কেন?
— কারণ আজ সত্যিই বলছি!
শারমিন মেয়ের পাশে বসে তার হাত ধরে বললেন,
— মা, আজ থেকে তোমার জীবনে নতুন দায়িত্ব আসবে। সব সময় নিজের সম্মান বজায় রাখবে। নিজের স্বপ্নগুলোও আগলে রাখবে।
রাফা মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— আপনার দোয়া সব সময় চাই, মা।
শারমিনের চোখ ভিজে উঠল।
অন্যদিকে আদবির বাড়িতেও আয়োজনের কমতি ছিল না। আমিরুল সাহেব ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন,
— সংসার শুধু আনন্দের নাম নয়, দায়িত্বেরও নাম। একে অপরের মতামতকে সম্মান করবে। রাফার স্বপ্নগুলোকে নিজের স্বপ্নের মতো গুরুত্ব দেবে।
আদবি মাথা নেড়ে বলল,
— আপনার কথা মনে রাখব, বাবা।
অবশেষে দুই পরিবারের উপস্থিতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো। সবাই তাদের নতুন জীবনের জন্য দোয়া করলেন।
রাফা ও আদবি পরিবারের বড়দের কাছ থেকে দোয়া নিল।
সন্ধ্যায় বিদায়ের সময় রাফা মায়ের হাত ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শারমিন বললেন,
— কাঁদবে না মা। নতুন জীবনে ভালো থেকো। নিজের যত্ন নেবে।
রাফা চোখের পানি মুছে বলল,
— আপনাদের খুব মনে পড়বে।
সোহাগ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
— তুমি যেখানে থাকো, আমাদের দোয়া সব সময় তোমার সঙ্গে থাকবে।
আদবি পাশে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে অপেক্ষা করছিল। রাফা যখন সবার কাছ থেকে বিদায় নিল, তখন সে বলল,
— চলুন, সবাই অপেক্ষা করছেন।
রাফা মাথা নেড়ে এগিয়ে গেল।
নতুন বাড়িতে পৌঁছানোর পর আদবির মা তাকে সাদরে গ্রহণ করলেন।
— এসো মা, এই বাড়িটাও তোমার নিজের বাড়ি। কোনো কিছুতে অস্বস্তি হলে আমাদের বলবে।
রাফা বিনয়ের সঙ্গে বলল,
— দোয়া করবেন, যেন সবার সঙ্গে সুন্দরভাবে থাকতে পারি।
মাহিরা কাছে এসে বলল,
— ভাবি, আজ থেকে কিন্তু আমার সঙ্গে গল্প করার দায়িত্বও আপনার!
রাফা হেসে বলল,
— সেই দায়িত্বও পালন করব।
রাতের দিকে সবাই যখন বিশ্রাম নিতে গেল, রাফা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ, নতুন দায়িত্ব—সবকিছু তার কাছে নতুন মনে হচ্ছিল।
আদবি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বলল,
— আজ অনেক ক্লান্ত নিশ্চয়ই?
— একটু। তবে সবাই এত সুন্দরভাবে গ্র্্হণ করেছেন যে ভালো লাগছে।
— সময় নিয়ে সবকিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
রাফা মৃদু হেসে বলল,
— আমাদের দুজনের স্বপ্নগুলো যেন কখনো হারিয়ে না যায়।
আদবি বলল,
— ইনশাআল্লাহ। আমরা একে অপরের পাশে থেকে চেষ্টা করব।
সেদিন রাফা নতুন ঠিকানায় জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করল। তার সঙ্গে রইল বাবা-মায়ের দোয়া,
নিজের স্বপ্ন আর পরিবারের ভালোবাসা।
রাফা মনে মনে দোয়া করল, নতুন জীবনে যেন ভালোবাসা, সম্মান ও বিশ্বাস নিয়ে আদবির পাশে থেকে দুজনের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।
চলবে...