### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ৩২
### ছোট্ট অভিমান, গভীর ভালোবাসা
সকালের মিষ্টি রোদ জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে। রাফা ঘুম থেকে উঠে নিজের কাজগুলো গুছিয়ে নিল। তারপর পড়ার টেবিলে বসে বই খুলল। নতুন সংসারের ব্যস্ততার মাঝেও সে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে আদবি সকালে নাশতা করে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
রাফা ঘর থেকে বের হয়ে বলল,
— আপনি কি আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবেন?
আদবি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
— আজ অফিসে একটু বেশি কাজ আছে। চেষ্টা করব তাড়াতাড়ি ফিরতে।
— আচ্ছা। আজ আপনার সঙ্গে একটা বিষয়ে কথা ছিল।
— কী বিষয়ে?
— সেটা আপনি বাসায় ফিরলে বলব।
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— ঠিক আছে। তাহলে ফিরে আপনার কথা শুনব।
এই বলে সে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
সারাদিন রাফা নিজের পড়াশোনা আর ঘরের ছোটখাটো কাজে ব্যস্ত থাকল। দুপুরে মাহিরা এসে তার পাশে বসে গল্প শুরু করল।
— ভাবি, আজ ভাইয়া কখন ফিরবে?
রাফা বলল,
— জানি না। অফিসে কাজ আছে বলেছে।
— ভাইয়া কিন্তু কাজের মধ্যে থাকলে সময়ের কথা ভুলে যায়।
রাফা হেসে বলল,
— কাজ তো করতেই হবে। তবে আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরলে ভালো লাগত।
মাহিরা মজা করে বলল,
— বুঝেছি! ভাবি ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন!
রাফা লজ্জা পেয়ে বলল,
— তুমি যাও তো, নিজের পড়াশোনা করো।
মাহিরা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। রাফা কয়েকবার ঘড়ির দিকে তাকাল। আদবি এখনো ফিরেনি। সে ভাবল, হয়তো কাজ বেশি। তাই আর ফোন করল না।
রাত আটটার দিকে আদবি ফোন করল।
— রাফা, আমি আজ একটু দেরি করব। একটা জরুরি কাজ এসে গেছে।
রাফা শান্ত গলায় বলল,
— আচ্ছা। আপনি কাজ শেষ করে আসুন।
— আপনার কি কোনো প্রয়োজন ছিল?
— না, তেমন কিছু না।
— ঠিক আছে। ফিরে কথা বলব।
ফোন রেখে রাফা কিছুটা মন খারাপ করল। আজ সে আদবির সঙ্গে বসে নিজের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু আবারও সময় পাওয়া গেল না।
রাতে আদবি বাড়ি ফিরল বেশ দেরিতে। রাফা তখন নিজের বই গুছিয়ে রাখছিল।
আদবি ঘরে এসে বলল,
— আজ অনেক দেরি হয়ে গেল। আপনি খেয়েছেন?
— জি, খেয়েছি।
— আপনি কি আমার ওপর রাগ করেছেন?
রাফা বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— না।
আদবি বুঝতে পারল, তার কথার মধ্যে অভিমান লুকিয়ে আছে।
সে শান্তভাবে বলল,
— আজ আপনার সঙ্গে কথা বলার কথা ছিল। আমি সেটা রাখতে পারিনি। দুঃখিত।
রাফা এবার তার দিকে তাকাল।
— আপনি সব সময় কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আমি বুঝি। কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার কথাগুলো বলার সময়ই পাওয়া যায় না।
আদবি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— আপনার এমন মনে হওয়াটা আমি বুঝতে পারছি। আমার উচিত ছিল আপনাকে আগে থেকেই সময়ের ব্যাপারে জানানো।
রাফা মৃদু স্বরে বলল,
— আমি চাই না আপনি কাজ ছেড়ে শুধু আমার সঙ্গে সময় কাটান। শুধু চাই, ব্যস্ত থাকলেও একটু সময় নিয়ে আমার খোঁজ নেবেন।
আদবি বলল,
— আপনি ঠিক বলেছেন। আমিও চাই না আমাদের মধ্যে এমন অভিমান জমে থাকুক, যেটা কথা বললেই মিটে যেতে পারে।
রাফার মুখে একটু হাসি ফুটল।
— তাহলে কাল কিছুটা সময় রাখবেন?
— অবশ্যই। কাল বিকেলে আপনার জন্য সময় থাকবে।
পরদিন বিকেলে আদবি সত্যিই নিজের কাজ গুছিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল। হাতে ছিল কয়েকটি বই এবং রাফার পছন্দের কিছু খাবার।
রাফা দরজার কাছে এসে বলল,
— আজ তো দেখছি কথা রেখেছেন!
আদবি হেসে বলল,
— চেষ্টা করছি। এবার বলুন, গতকাল যে বিষয় নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন, সেটা কী?
রাফা তাকে পড়ার টেবিলের পাশে নিয়ে গেল। সেখানে কয়েকটি বই ও খাতা সাজানো ছিল।
— আমি আরও একটি কোর্স করার কথা ভাবছি। এতে আমার ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।
আদবি মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনল।
— খুব ভালো পরিকল্পনা। কোর্সটির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন?
— কিছুটা করেছি। তবে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলাম।
— তাহলে আমরা একসঙ্গে সব তথ্য দেখে নিতে পারি। সময়, খরচ আর পড়াশোনার সুবিধা—সবকিছু বুঝে সিদ্ধান্ত নেব।
রাফা খুশি হয়ে বলল,
— আপনি আমার পরিকল্পনাকে এত গুরুত্ব দেন বলে আমার সাহস বাড়ে।
আদবি বলল,
— আপনার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা আপনার নিজের। আমি শুধু পাশে থাকতে চাই।
এরপর দুজন মিলে কোর্সের তথ্য দেখল। রাফা তার পরিকল্পনা বুঝিয়ে বলল, আর আদবি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করল।
কিছুক্ষণ পর মাহিরা ঘরে ঢুকে বলল,
— আপনারা আবার পড়াশোনা নিয়ে বসেছেন? আমার জন্যও একটু সময় রাখবেন!
রাফা হেসে বলল,
— তোমার জন্যও সময় আছে। আগে বলো, আজ পড়া শেষ করেছ?
মাহিরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— ভাবি, আপনি সব সময় পড়ার কথা বলেন কেন?
আদবি হেসে বলল,
— কারণ তোমার ভাবি চান তুমি ভালো করো।
তিনজনের হাসিতে ঘরটা আনন্দে ভরে উঠল।
রাতে খাবারের টেবিলে আদবির মা বললেন,
— আজ তোমাদের দুজনকে বেশ হাসিখুশি লাগছে।
রাফা মৃদু হেসে বলল,
— আজ আমাদের একটা ছোট্ট পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আদবির মা বললেন,
— খুব ভালো। সংসারে একে অপরের কথা শোনা আর বোঝার চেষ্টা করাটাই সবচেয়ে জরুরি।
রাফা সম্মতি জানাল।
রাতে ঘুমানোর আগে আদবি বলল,
— আজকের মতো অভিমান জমিয়ে রাখবেন না কিন্তু।
রাফা হেসে বলল,
— আপনিও ব্যস্ততার কথা আগে জানাবেন।
— কথা দিলাম।
রাফা জানালার পাশে রাখা বইগুলো গুছিয়ে বলল,
— জানেন, একটা বিষয় বুঝেছি।
— কী?
— ভালোবাসা মানে শুধু সুন্দর কথা নয়। একজনের কথা অন্যজন মন দিয়ে শোনাও ভালোবাসার অংশ।
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— কথাটা একদম ঠিক বলেছেন।
সেদিনের ছোট্ট অভিমান তাদের দুজনকে আরও একটি বিষয় শিখিয়ে দিল—সম্পর্ক সুন্দর রাখতে শুধু ভালোবাসা থাকলেই হয় না, প্রয়োজন হয় সময়, সম্মান আর খোলামেলা কথোপকথনের।
আর রাফা মনে মনে দোয়া করল, তাদের সংসারে যেন কখনো এমন কোনো অভিমান না আসে, যা ভালোবাসার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়।
চলবে...