### নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা ৩৩
### স্বপ্নপূরণের আনন্দ
সকালের আলো জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে এসে পড়েছে। রাফা পড়ার টেবিলে বসে নিজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল। আজ তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। অনেক দিনের পরিশ্রমের পর সে একটি নতুন কাজের সুযোগ পেয়েছে। নিজের যোগ্যতা দিয়ে কিছু করার স্বপ্নটা এবার সত্যি হতে চলেছে।
আদবি ঘরে ঢুকে দেখল, রাফা বেশ মনোযোগ দিয়ে কাগজপত্র দেখছে।
— এত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছেন?
রাফা মুখ তুলে হাসল।
— আজ আমার সাক্ষাৎকারের ফলাফল জানাবে।
— ওহ! তাহলে তো আজ গুরুত্বপূর্ণ দিন।
— হ্যাঁ। একটু ভয়ও লাগছে।
আদবি পাশে বসে বলল,
— ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি নিজের যোগ্যতা দিয়ে চেষ্টা করেছেন। ফলাফল যা-ই হোক, আপনার চেষ্টা কখনো বৃথা যাবে না।
রাফা মৃদু হেসে বলল,
— আপনি সব সময় আমাকে সাহস দেন।
— কারণ আমি জানি, আপনি পারবেন।
কিছুক্ষণ পর রাফার ফোনে একটি বার্তা এল। সে দ্রুত ফোন হাতে নিয়ে বার্তাটি খুলল। খবরটি পড়ে তার চোখ আনন্দে বড় হয়ে গেল।
— আদবি!
— কী হয়েছে?
— আমি সুযোগটা পেয়েছি! আমাকে নির্বাচিত করেছে!
আদবি আনন্দিত হয়ে বলল,
— আলহামদুলিল্লাহ! মাশাআল্লাহ! অভিনন্দন!
রাফার চোখে আনন্দের পানি চলে এল।
— আমি সত্যিই পেরেছি!
— অবশ্যই পেরেছেন। এবার নিজের স্বপ্নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যান।
রাফা হাসতে হাসতে বলল,
— এই খবরটা সবার আগে মাকে জানাতে হবে।
সে সঙ্গে সঙ্গে শারমিনকে ফোন করল। খবর শুনে শারমিন আনন্দে কেঁদে ফেললেন।
— আলহামদুলিল্লাহ মা! আল্লাহ তোমার পরিশ্রমের ফল দিয়েছেন।
সোহাগ সাহেবও মেয়ের খবর শুনে খুব খুশি হলেন।
— আমি জানতাম, আমার মেয়ে একদিন নিজের যোগ্যতায় এগিয়ে যাবে।
রাফা বলল,
— বাবা, আপনাদের দোয়া ছাড়া কিছুই সম্ভব হতো না।
সেদিন বিকেলে আদবির বাড়িতে ছোট্ট আয়োজন করা হলো। রাফার আনন্দ ভাগ করে নিতে দুই পরিবারের সদস্যদেরও ডাকা হয়েছিল।
মাহিরা এসে রাফাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— ভাবি, এবার কিন্তু আমাকে মিষ্টি খাওয়াতেই হবে!
রাফা হেসে বলল,
— শুধু তোমাকে কেন, সবাইকে খাওয়াব।
আদবি পাশ থেকে বলল,
— তাহলে আজকের মিষ্টির দায়িত্ব আমার।
মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— ভাইয়া, শুধু মিষ্টি আনলে হবে না। আরও কিছু লাগবে!
আদবি হেসে বলল,
— তোমার চাহিদা তো দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে!
সবাই হেসে উঠল।
খাওয়াদাওয়ার পর দুই পরিবারের বড়রা একসঙ্গে বসে গল্প করছিলেন। সোহাগ সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মা, নিজের কাজের পাশাপাশি পরিবারের প্রতিও যত্নশীল থাকবে। তবে নিজের স্বপ্নকে কখনো অবহেলা করবে না।
রাফা বলল,
— বাবা, আমি চেষ্টা করব সবকিছু সুন্দরভাবে সামলাতে।
আদবির মা বললেন,
— আমরা সবাই তোমার পাশে আছি। কোনো সমস্যা হলে আমাদের জানাবে।
রাফা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলল,
— আপনারা আমাকে এতটা আপন করে নিয়েছেন, এজন্য আমি সত্যিই ভাগ্যবান।
সন্ধ্যার পর সবাই যখন গল্পে ব্যস্ত, রাফা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। একটু পর আদবি সেখানে এল।
— কী ভাবছেন?
— ভাবছি, কত কিছু বদলে গেছে। আগে শুধু স্বপ্ন দেখতাম, এখন ধীরে ধীরে সেগুলো পূরণ হচ্ছে।
— আপনার আরও অনেক স্বপ্ন পূরণ হবে, ইনশাআল্লাহ।
রাফা বলল,
— একটা কথা জানেন? আমি চাই একদিন নিজের উপার্জনে বাবা-মায়ের জন্য কিছু করতে।
আদবি মৃদু হেসে বলল,
— নিশ্চয়ই করবেন। আপনার এই ইচ্ছাটা খুব সুন্দর।
— আর আপনার স্বপ্ন কী?
আদবি একটু ভেবে বলল,
— আমি চাই আমাদের পরিবারে সবাই সুস্থ ও ভালো থাকুক। আমাদের মধ্যে যেন সব সময় সম্মান আর বিশ্বাস থাকে। আর আমরা দুজন যেন একে অপরের স্বপ্ন পূরণে সহযোগিতা করতে পারি।
রাফা বলল,
— তাহলে আমাদের স্বপ্ন তো অনেকটা একই রকম।
— হ্যাঁ। তাই তো একসঙ্গে পথ চলাটা সুন্দর হবে।
এরপর কয়েক দিন কেটে গেল। রাফা নতুন কাজের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। আদবি নিজের কাজের পাশাপাশি তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিত। দুজনের ব্যস্ততা বাড়লেও তারা প্রতিদিন কিছুটা সময় একে অপরের জন্য রাখার চেষ্টা করত।
একদিন রাফা আদবির মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে কাজ করছিল। হঠাৎ আদবির মা বললেন,
— মা, তোমাদের সংসারটা এখন বেশ গুছিয়ে উঠেছে। আল্লাহ যেন সব সময় এমন শান্তি রাখেন।
রাফা মৃদু হেসে বলল,
— আমিন। আপনারা সবাই পাশে থাকলে সবকিছু সহজ মনে হয়।
আদবির মা স্নেহভরে বললেন,
— শুধু একটা কথা মনে রাখবে, জীবনে কখনো মন খারাপ হলে একা একা কষ্ট পাবে না। পরিবারের সঙ্গে কথা বলবে।
রাফা মাথা নেড়ে বলল,
— জি, আম্মু।
রাতে আদবি বাড়ি ফিরে দেখল, রাফা নতুন কাজের জন্য কিছু প্রস্তুতি নিচ্ছে।
— আবার পড়াশোনা?
— না, আগামীকাল থেকে নতুন কাজ শুরু। তাই কিছু বিষয় দেখে নিচ্ছি।
আদবি বলল,
— তাহলে আজ তাড়াতাড়ি বিশ্রাম নিন। কাল আপনার জীবনের নতুন একটি দিন।
রাফা হেসে বলল,
— আপনি কিন্তু কাল আমার জন্য দোয়া করবেন।
— প্রতিদিনই করি।
রাফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— আদবি, আমাদের জীবনটা এভাবেই সুন্দর থাকুক। ছোট ছোট আনন্দ, কিছু অভিমান, অনেক ভালোবাসা আর একে অপরের প্রতি সম্মান নিয়ে।
আদবি উত্তর দিল,
— ইনশাআল্লাহ। আমরা দুজন মিলে চেষ্টা করব।
সেদিন রাতে রাফা ঘুমানোর আগে নিজের বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করল। তারপর নতুন দিনের কথা ভেবে মনে মনে আনন্দ পেল।
সে জানত না, সামনে তাদের পরিবারে আরও একটি আনন্দের খবর অপেক্ষা করছে। এমন এক খবর, যা দুই পরিবারের হাসি আরও বাড়িয়ে দেবে।
নতুন দিনের অপেক্ষায় রাফা চোখ বন্ধ করল। তার মনে ছিল পরিবারের দোয়া, আদবির ভালোবাসা এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের অদম্য ইচ্ছা। সে জানত, সামনে আরও সুন্দর সময় অপেক্ষা করছে।
চলবে...