#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(০৬)
স্কুল থেকে আজ পাখি তাড়াতাড়িই ফিরছিল। সঙ্গে ইচ্ছে ছিল না। ইচ্ছে স্কুলে যাইনি। কোমর ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছিল সে। মুখটা মলিন। হাসি নেই। বরাবরই ওই মুখটিতে হাসির কিরণ লেগেই থাকে। আজ নেই। নাওয়াফ আবার তখন ক্লাবে ছিল। কিছুক্ষণ আগে নির্বাচনের বিষয় নিয়ে কথা শেষ হলো। সামনে নির্বাচন। সেসব বিষয় নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। তখন পাখিকে খোলা দরজা দিয়ে পেট চেপে চেপে হাঁটতে দেখে তার কপালে চিন্তিত বাজ পড়ল। কি হয়েছে মেয়েটার? মস্তিষ্কে জোর খাটিয়ে ভাবতে লাগল৷ বিষয়টি বুঝতে তার দু সেকেন্ড লাগল। হাতে ছিল জলন্ত সিগারেট। যেটা বসে বসে টানছিল। সেটা পায়ের তলে পিষে দিয়ে শাঁ শাঁ করে রাস্তায় নেমে পড়ল। পাখির পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে মৃদু স্বরে বলল, “ক্লাবে আয়।”
পাখি লোকটার কথা শুনল না। কোমর ব্যথায় ধরে যাচ্ছে তার। সর্বাঙ্গ যন্ত্রণায় জ্বলে যাচ্ছে। পেট চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে। বার বার কুঁকড়ে যাচ্ছে৷ তবুও থামছে না। হাঁটতেই থাকে। বাড়ি তো পৌঁছাতে হবে৷ লোকটাও কম না। ওর কথা শোনল না। হাত ধরে টেনে ওকে ক্লাবে নিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিল। পাখি মুখটা নিচু করে নিল। ব্যথার কিঞ্চিৎ ভাব তার মুখজে ফুটে ওঠা। বলল, “নাওয়াফ ভাই, আজকে আমার সঙ্গে কোন ফাজলামো কইরেন না। শরীর ভালো নেই। অস্থির লাগছে।” বলেই সে একটু থামল। কেঁদে দিবে দিবে ভাব।
সুতনু লোকটা ওর কথার উত্তর দেইনি। নীরবে ওর ব্যথাতুর মুখটা দেখল। লাল হয়ে ওঠেছে মুখটা। চোখ দুটো যেন মৃত। নিভু নিভু। লজ্জা আর সংকোচে হয়ত কিছু বলতে পারছে না। সেও অবুঝ নয়। ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ফেলল। ওকে বলল, “এখানে চুপচাপ বোস। আমি আসতেছি।”
কথাগুলি বলেই লোকটা বেরিয়ে গেল। পাখির উদরের নিচাংশে তীব্র ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে। সে টেবিলে মাথায় ঠেকিয়ে কেঁদে দিল। মরণ সমতুল্য যন্ত্রণা হচ্ছে। এ যে অসহনশীল।
কিছুক্ষণের মাথায় লোকটা একটি শপিং ব্যাগ হাতে ফেরত এলো। ওর হাতে প্যাকেটটি এগিয়ে দিল।
“এখানে ন্যাপকিন আর এক সেট কাপড় আছে। ভেতরে আমার বেডরুম। ওখানে গিয়ে চেইঞ্জ করে আয়।”
পাখির লজ্জায় দেওয়ালের সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করল। লোকটা অনুমান করল কি করে তার পিরিয়ড হয়েছে? এক দিকে যেমন লোকটার প্রতি সম্মান বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরেক দিকে রাগ হচ্ছে তাকে লজ্জায় ফেলার জন্য। তার কাপড় ব্লাডে মাখা। এখন উঠলেই তো লোকটা দেখবে।
নাওয়াফ আবারও ওকে তাড়া দিল।
“জলদি ওঠ। চেয়ার নোংরা করিস না। শেষে কিন্তু তোর হাতেই ধোয়াব।”
পাখির বিরক্ত লাগল। ইশ, সে বুঝি ইচ্ছে করে এসে চেয়ারে বসেছে। ডেকে এনে অপমান? তবুও লোকটার উপকার সে ভুলতে পারবে না। এ অবস্থায় রাস্তা দিয়ে গেলে লোকে অবশ্যই তাকে নিয়ে হাসতো। রং তামাসা করত। সেসব অসম্মানজনক অপমানের হাত থেকে লোকটা তাকে বাঁচিয়েছে। এই হিসেবে প্রশংসা করতে সে কৃপণতা করবে না। সে ন্যাপকিন হাতে ভিতরে ঢুকে গেল। ও যেতেই নাওয়াফ মৃদু হাসল। ওর জন্য গরম গরম চা আনতে যাচ্ছিল। তার আগেই অক্ষিকূট জোড়া পড়ল চেয়ারে। কিছু ব্লাডের ছাপ সেখানে রয়ে গেছে। নাওয়াফ ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। সে চেয়ারে পানি ঢেলে দিয়ে চেয়ারটি হাত দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিল। এরপরে আবারও বেরিয়ে পড়ল। পাখি কাপড় পরে বেরিয়ে এল। হাফ সিল্কের এক সেট কামিজ। জামাটা কালো। ওড়না আর সালোয়ার গাঢ় সিঁদুর রঙের। দেখতে বেশ সুন্দর। পাখির পরে আরাম লাগল। সে নিজের ইউনিফর্ম ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে লোকটা আসার আগেই চলে যেতে চাচ্ছিল। তার আগেই লোকটার সঙ্গে দরজার প্রান্তে এসে ধুম করে দেখা হয়ে গেল। অপ্রত্যাশিত ঘটনায় পাখি খানিকটা চমকালো, ভড়কালো। আরেকটু হলে গরম চা পাখির গা নিয়ে পড়ত। নাওয়াফ ওকে ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেল। সিঁদুর রঙের ওড়নাটিতে ঘোমটা দেওয়া পাখির মুখটা দেখে ক্ষণকালের মতন সে বিস্মিত হয়ে রইল। চোখ দুটি লাজ লজ্জা ভুলে গিয়ে কিশোরীর মুখপানে আটকে রইল। সে কল্পনা করছিল ওকে ড্রেসটিতে বেশ ভালোই লাগবে। কিন্তু এতো ভালো লাগবে কল্পনা করতে পারেনি। তার কল্পনার রাস্তাও ছাড়িয়েছে। লোকটাকে নির্লজ্জের মতন নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে পাখির লজ্জা লাগল।
“তুই আমার হার্ট ফুঁটো করে দিয়ে একদিন মেরে ফেলবিরে পাখি। মেরে ফেলবি।” বলেই লোকটা আবারও ওর দিকে গাঢ় চোখে চাইল। এবার বেশ কাছ থেকে। নয়নজোড়া ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।
পাখি লোকটার অপ্রত্যাশিত কথায় যদিও খানিকটা স্তম্ভিত হয়েছিল। পরক্ষণে নিজেটে চট করে সামনে নিল।
সে ফিসফিস করে শুধাল, “ওমন করে কি দেখছেন?”
“ভাবছি তোকে বউ করে ঘরে কবে তোলা যায়? যেভাবে জ্বালাচ্ছিস, কবে জানি হার্ট ফুঁটো হয়ে যায়!”
পাখি ওষ্ঠজোড়া নাড়াল। অতঃপর উল্টালো। বলল,
“আমি আপনার মতন বুড়ো লোককে বিয়ে করব না। লোকে শেষে দুলাভাইয়ের বদলে আপনাকে চাচাজান বলে ডাকবে।”
নাওয়াফ চোখজোড়া রাঙিয়ে বলল,
“এক চড়ে দাঁতের মাড়ির সব দাঁত ফেলে দিব, অসভ্য মহিলা। আসতাগফিরুল্লাহ্ মার্কা কথা বলে সম্পর্কটাই উল্টে দিচ্ছে।
বলেছিলাম তোকে চা খাওয়াব। এখন খাওয়াব না। যা বিদায় হ।”
পাখি একটু নরম মুখে ঠোঁট টিপে হাসল। বলল,
“এনেই যেহেতু ফেলেছেন তাহলে ফেরত দেওয়ার দরকার কি? এত অপচয় করা ভালো নয়। দেন, চা দেন। খেয়েই যাই, কি বলুন?” বলেই পাখি এক প্রকার লোকটার থেকে চা টেনে নিয়ে খেতে লাগল।
নাওয়াফ বিড়বিড় করল, “ছোঁচা বিড়াল।”
পাখি হো হো করে হেসে দিল। নাওয়াফও হাসল। তবে আড়ালে। লোকটা চেয়ার টেনে পায়ের ওপর পা তুলে বসল। গায়ে ধূসর রঙের একটি শার্ট। হাতা গোটানো। সঙ্গে নেবি ব্লু রঙের একটি প্যান্ট। বাম হাতে একটি ঘড়ি আছে। এটা ওনাকে সবসময় পরতে দেখা যাবে। এ বান্দা ঘুমাতে গেলেও ঘড়ি খুলবে না। আপাতত চোখ জোড়া বুজে হাত দুটো মাথার পিছনে নিয়ে চেয়ারে মাথা হেলিয়ে দিল। পা নাড়িয়ে নাড়িয়ে একটি গান ধরল,
আশা ছিল মনে মনে,
প্রেম করিব তোমার সনে..
তোমায় নিয়া ঘর বাঁধিব,
গহিন বালুচরে..!
লোকটার গান শুনে পাখির হাসি হঠাৎ থেমে গেল। সে অর্ধেক খাওয়া চা রেখে কোমর ধরে দাঁড়িয়ে গেল। দাঁত কটমট করে বলল, “তার মানি আপনার সঙ্গে যাতে প্রেম করি, এজন্য ক্লাবে ডেকে এনে চা খাইয়ে ঘুষ দিচ্ছেন! ছিহ নাওয়াফ ভাই, ছি! এমন চরিত্রহীন আপনি, আগে জানা ছিল না। তাহলে আপনার চা খেয়ে পেট খারাপ করতাম না।”
লোকটা চওড়া কাঁধ নাড়িয়ে ওর দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেল। ওর মুখের ওপর স্বল্প ঝুঁকে গিয়ে বলল, “আমি চরিত্রহীন হলে এতো দিনে তোকে দশ বাচ্চার মা বানিয়ে ফেলতাম। সেসব কি করেছি? তাহলে আমি কোন দিক দিয়ে চরিত্রহীন?”
ওনার এহেন কথায় পাখি মুহূর্তের মধ্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। তার নরম দৃষ্টি জোড়া এলোমেলো, অগোছালো। সংকুচিত মনে বিভ্রম হলো। সে ঠোঁট উল্টালো। বলল, “আপনি খুব খারাপ।”
লোকটা নিঃশব্দে হাসে। ওর কর্ণকুহরে ওষ্ঠজোড়া এগিয়ে নিয়ে বলে, “প্রমিজ, তুই বললে আরও আরও খারাপ হয়ে যাবো। ভীষণ ভীষণ। তুই কি করবি?”
পাখি চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তির সঙ্গে কুঁচকে ফেলল।
“এসব নির্লজ্জ কথা শোনানোর জন্যই আমাকে ক্লাবে ডেকে এনেছেন, না? মানুষ ডেকে এখন জড়ো করব?”
“মানুষ এসে যখন জিজ্ঞেস করবে, ও কি করেছে তোমার? তখন কি বলবি? তোর ঠোঁট কামড়ে দিয়েছি, না চুমু খেয়েছি?”
পাখি আর ধৈর্য ধরে শুনতে পারল না। চা’টা খাওয়ার জন্য তার পেট ব্যথা কিছুটা নিরাময় হলো। সে চায়ের কাপ রেখে উঠে যেতে যেতে বলল, “চা খাওয়ানোর জন্য ধন্যবাদ কিপ্টে মানুষ। আসি এখন। আপনার লুচ্চামি কথা শোনার টাইম নেই।”
“কান নিয়ে দুটো দিব।”
পাখি ঘনো ঘনো চোখের পলক ঝাপটিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন, কেন?”
“কথায় কথায় আমায় লুচ্চা বলিস কেন? তোর সাথে কি লুচ্চামি করেছি আমি?”
পাখি ফোঁস করে শ্বাস ফেলল।
“ঠিকাছে সরি, আসি এখন।”
“রাতে তোকে পড়াতে আসব।”
পাখি পিছু ঘুরে ঠোঁট উল্টে জানতে চাইল, “রাতে কেন?”
লোকটা দুলতে দুলতে ওর দিকে হেঁটে এলো। ওর মুখের দিকে কিয়ৎপরিমাণ তাকিয়ে থেকে ফিচেল একটি হাসি দিল।
“প্রেম করব বলে।” বলেই ওর মুখের ওপর ঠাস করে দরজাটি সজোরে আটকে দিল। অপমানে পাখির মুখটা থমথমে হয়ে গেল।
_____
বাড়ির পেছনে নদী। নদীর তীরে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হয়েছে। কাঁচা বালু মাটির উর্বরতায় গাছগুলি দ্রুত বেড়ে ওঠেছে। দূর থেকে দেখতে ভালোই লাগে। ঝিরঝিরে বাতাসে গাছগুলি নড়ছে। বিহঙ্গদের ছোঁয়ায় ওরা যেন আরও কয়েকগুণ চঞ্চল হয়ে ওঠল। মোল্লা বাড়ির পেছনে বিরাট বড়ো নদী। সেখানে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করা একটা শানের ঘাট আছে। লোকেরা দিনের বেলায় সেখানে গোসল করে৷ পাখি সেই শানের সিড়িতে বসে আছে। পা দুটো নদীর স্বচ্ছ জলে ভেজানো। চোখ দুটি জলে চিক চিক করছে। মাও নেই, বাবাও নেই তার। খুব দুক্ষু তার। যখন কারোর বাবা-মাকে দেখে তাদের সন্তানদের আদর করতে। তখন তার শৈশব মনে পড়ে যায়। মায়ের কথা মনে নেই। তবে বাবার কথা মনে আছে। তার মাথা আঁচড়ে দিতো। খাইয়ে দিতো। ঈদ কুরবানি এলে মেহেন্দি, নেলপলিশ, লিপিস্টিক, আর লাল টকটকে কাঁচের চুড়ি এনে দিতো। মুক্তি আপা তাকে সকাল সকাল গোসল করিয়ে নতুন জামা কাপড়ের সঙ্গে সাজিয়ে দিতো।ছোট থেকে তার চুল ছিল বেশ বড়ো, আর ঘনো। সবাই বলে তার চুল তার মায়ের মতন হয়েছে। তার মায়ের চুল বেশ লম্বা ছিল। আগে কোমর সমান চুল ছিল তার। এখন তো হাঁটু ছুঁই ছুঁই এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতি মাসে সে এক মুঠো করে চুল কেটে ফেলে। এতো চুল যত্ন করার সময় কই? সারাদিন দৌড়ের ওপর থাকে। স্কুলে যাও, প্রাইভেটে যাও, ঘুমাতে যাও, খেতে যাও। যাওয়ার ওপরই আছে।
আজ খুব ভোরে তাহিরা তাকে মেরেছে। চুল ধরে টেনেছে। দুগালে দুটো শক্ত করে চড় বসিয়েছে। সে খুব ব্যথা পেয়েছে। তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদেছে। মার খাওয়ার কারণ ছিল, তাকে ভাতের কাছে রেখে তাহিরা পুকুরে গিয়েছিল। সে ভাত রেখে একটু ঘরে গিয়েছিল। তখন দেখে জারিফা কার্টুন দেখে। মটু পাতলু। সে জারিফার পাশে বসে একটু কার্টুন দেখছিল। তার আর মনেই ছিল না ভাতের কথা। তাহিরা যখন পুকুর থেকে রান্নাঘরে গেল। তখন দেখল কুকুরে গরম পাতিলের ভাত ধাক্কা দিয়ে সব ফেলে দিছে। তাহিরার প্রচন্ড রাগ লাগল। এমনিতে সে পাখিকে প্রচন্ড আদর করে। বেশি কাজ করায় না। মাঝে মধ্যে থালাবাসন ধোওয়া, পানি আনা, আর ঘর ঝাড়ু দেওয়া এসব করায়। তাও মেয়েটা ঠিকঠাক করে না। মেজাজ তার এমনিতে খারাপ ছিল। সকাল সকাল মোজাম্মেল মোল্লার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে। তাই মেজাজ খিটমিটে। ঘরে ঢুকে দেখল, পাখি মোবাইল দেখছে। এই তো তার মেজাজ আকাশ ছুঁইল। তখন সে হাত বাড়িয়ে ওর মসৃণ গালে দুটো চড় বসিয়ে দিল। এজন্য অভিমান করে পাখি ঘর থেকে বেরিয়ে নদীর ঘাটে গিয়ে বসল।
নদীতে ঠান্ডা স্রোত বইছে। মৃদ্যু হাওয়া ছিল। অদূরে কোকিল ডাকছে। বসন্তের কোকিল। কতক্ষণ নীরবে বসে বসে সে নিজের ভাগ্যের ওপর দুক্ষু প্রকাশ করে কাঁদল। এরপরে উঠে গেল। মোল্লা বাড়ি ঢুকে তার দুই সেট কাপড়, বইসহ স্কুল ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল। এরপরে তাহিরার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। যাওয়ার আগে অভিমানী গলায় বলে গেল, “আমি ফিরব না। চলে যাচ্ছি। বড়ো হয়ে তুমি যা খাইয়েছো না, সব টাকা চাকরি করে ফেরত দিয়ে যাব।”
ওর অভিমানী কথা শুনে তাহিরা হেসে ফেলল। পাখি সেসব দেখল না। সে হনহনিয়ে হেঁটে চলল। তাহিরা ওকে পিছু থেকে ডাকল, “তা কই যাস?”
“আমার শশুর বাড়ি। শশুর আব্বাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করব, তার বউমাকে কেন অন্যের বাড়ি ফেলে রেখে কথা শোনাচ্ছে? তার ছেলেকে কেন পাঠিয়ে দিচ্ছে না আমাকে নিয়ে যেতে?
তাহিরা ঠোঁট টিপে হাসে।
“তোর শশুরবাড়ি তো পূর্বে না, পশ্চিমে। তাহলে তুই পুবদিকে কোথায় যাচ্ছিস রে?”
“মরতে। আমি মরে যাব। জগতে আমার কেউ নেই।” বলতে বলতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল পাখির ছায়া। সেই সঙ্গে গলার স্বরও হারিয়ে গেল।
তাহিরার মায়া লাগল। বোনের শেষ চিহ্ন ছিল পাখি। পাখিকে জন্ম দিতে গিয়েই ওর মা মারা যায়। মানিক মৃধা আর বিয়ে করেননি। সন্তানকে তিনি নিজেই মানুষ করেছেন। সেও মরল। পাখিও একেবারে এতিম হলো। মেয়েটার আর কেউ রইল না। তার অনুতপ্ত লাগল। এতিম মেয়েটাকে ওমন না মারলেও হতো। তিনি ভাবলেন, দুদিন পর গিয়ে নিয়ে আসবেন। যাবে আর কই? সিকান্দার মির্জার বাড়ি, না হয় নিখিলদের বাড়ি। রাগ কমলে আবার চলে আসবে। এটা তার ভাবনা ছিল।
দুদিন পার হলো পাখির খবর নেই। সে মির্জা বাড়িতে ফোন দিয়েছে। নিখিলদের বাড়িতে ফোন দিয়েছে। কোথাও যাইনি। তাহলে মেয়েটা অভিমান করে গেল কই? পাখির খোঁজ পাওয়া গেল তার পরের দিন। সে তার বড়ো ফুফুর বাড়ি গিয়ে উঠেছে। আর আসবে না বলল। ওখানে থেকেই পড়বে। তাহিরা হতাশ হলো। সামনে মেয়েটার পরীক্ষা। এই বয়সে এই পাগলামি মানায়? সে নাওয়াফকে ফোন করল। নাওয়াফ দুদিন বরিশাল সদরে ছিল। ওখান থেকে আসার পর এই ঘটনা শুনল। সে মোল্লা বাড়ি গিয়ে তাহিরাকে শক্ত গলায় কতগুলি কথা শুনিয়ে এল।
“ওর গায়ে হাত তোলার অধিকার কে দিয়েছে আপনাকে?ওকে পালতে না পারলে আমায় বলে দেন। আমার বউ আমি নিয়ে যাব। নিজ হাতে পেলেপুলে বড়ো করে নিব। তারপরে বিয়ে করব। কিন্তু আপনি ওর গায়ে হাত তুলতে গেলেন কেন? আপনার বাড়ি কাজ করার জন্য ওকে রেখে গেছি? আপনার কাজ আপনি করতেন। না পারলে আমায় বলতেন। দশজন কাজের লোক পাঠিয়ে দিতাম। তবুও ওকে দিয়ে কাজ করাতে গেলেন কেন? ওর ভরণপোষণটা পর্যন্ত আমি দিয়ে দেই। যেন আপনাদের মাথার ওপর চাপ না পড়ে, সেজন্য ওর যাবতীয় ভারও আমি বহন করি। এরপরেও ওরে দিয়ে আপনি কোন আন্দাজে কাজ করান?”
নাওয়াফের কথার পরিপার্শ্বে তাহিরা একটা কথাও বলেনি। ছেলেটা আজ বেশ রেগে আছে। নিখিল নাওয়াফকে তাহিরার সামনে থেকে টেনে সরিয়ে নিয়ে বলল, “ছাড় এখন। পাখিকে তো আনতে হবে। পরীক্ষায় ফেল করলে তখন সবাই বলবে নাওয়াফ তালুকদারের বউ ফেলটুস। কথাটা তখন শুনতে কেমন লাগবে?”
“ভালোই লাগবে। ফেল করলে আমার বউ করবে, পাশ করলেও আমার বউ করবে। সেসব নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু ওর গায়ে কেউ আঁচড় দিলে আমার রক্ত টগবগিয়ে ফুটে ওঠে।”
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম।