ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

৭ম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

#সে_আমার_সর্বনাশ_২

(০৭)

আইতে দেখি যাইতে দেখি

দেখি সারাক্ষণ..।

তোমায় না দেখিলে ভাল্লাগে না

ও.. ও.. পারাতো বোন..।

“থুক্কু খালাতো বোন হবে। তা যাও কই ময়না পাখি?”

“এ জাউরার পো জাউরা। আর একবার ময়না পাখি বলিস, তোর দাঁত খুলে আমি আতুর দিয়ে ছেছমু। আন্ডারপ্যান্ট খুলে মান্দার গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখমু। শালা, আসতে গান শোনাতে! যা ভাগ।” বলেই ইচ্ছে হাঁটার পা ধরল।

স্বাধীন ইচ্ছের কথাতে কিছু মনে করল না। নারীলোক পটাতে গেলে নাগা মরিচের মতন এরা একটু জ্বলবেই। এ তেমন বড়ো কিছু না। পরবর্তীতে বিয়ের বাতাস গায়ে লাগলে ঠিক হয়ে যাবে। সে ছোট ছোট কদমে ইচ্ছের পিছু পিছু ছুটল।

“ও আমার ময়না পাখি, দাঁড়াও। একটা কথা শুনে যাও।”

ইচ্ছে পায়ের জুতা খুলে হাতে তুলে নিল, “গোলামের পুত, গেলি এখান থেকে। মুখ থেকে যায় নাই এখনো দুধের গন্ধ। সেই ছেমরায় আসে আমারে প্রেম নিবেদন করতে। বাচুট্টার ঘরের বাচুট্টা। ফাউল ছেমরা কোথাকার! এই শোন, তোরে হইতে দেখছি আমি। আর তুই করিস আমারে প্রেম নিবেদন? আমার পিছু পিছু ঘুরিস? মাওগার পো, চাপার দাঁত একটাও থাকবে না কিন্তু। ভালোয় ভালোয় বিদায় হ।” বলেই ইচ্ছে স্বাধীনের দিকে একটি ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারল। স্বাধীন তাড়াতাড়ি দ্রুত সরে গেল। যার কারণে ইটের টুকরোটি তার শরীরের পড়ল না।

ইচ্ছে ক্ষোভিত চোখ দুটো রাঙাল, “আবার পিছু নিলে কিন্তু..!”

পুরোটা আর সম্পূর্ণ করা হলো না। অসমাপ্ত কথার মাঝেই থামতে হলো তাকে। কেননা স্বাধীন তার হাত দুটো ওর ওড়না খুলেই বেঁধে দিল। চিন্তা করছো, কি পরিমাণ বেয়াদব ছেলে! ইচ্ছে কটমট করে তাকায়। স্বাধীন তাতে ভ্রুক্ষেপই করে না। সে একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে থাকে। বলে, “এখন বলো আর কি কি গালি দিবা?”

ইচ্ছের চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। সে হাতের আঙুল নাচাল।

“তুই সিগারেট খাস?”

“না, গাঁজা টানি। কম দামিটা না, বেশি দামিটা। আমি আবার ছোটলোক নই। খাইলে টাকা দিয়ে ভালো জিনিসটাই খাই। কম দামিটা খাই না। পেট খারাপ হয়।”

ইচ্ছের মাথায় হাত। সর্বনাশ! এ ছেরা তো পুরাই পাগল হয়ে গেছে। কি আবোলতাবোল বলতেছে? সে ভ্রুকুটি করে শুধাল, “খালা জানে কিছু?”

“না, সে এখনো কিছু জানে না। তবে তুমি বললে জানবে।

“তুই গাঁজা খাস কেন?”

“কারণ আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম। তোমার কোন সমস্যা আছে?”

“কুত্তা তোর মুখে ঠাডা পড়ুক। এই আমি তোর বড়ো না? আপা বল।

“জামাই বলো। ছেমরা শুনতে কুট্টি কুট্টি লাগে।”

“আইছে, ছেমরার শখ কতো! আমারে ছাড় হারামজাদা। আমার দুই ভাই জানতে পারলে তোরে ভেটকাইয়া শুটকি মতন টিনের চালে রোদে দিবে।”

“দিত না। কারণ তাহাদের দুই ঘরে আমার দুই বোন যাবে। তাহাদের বোনকে যদি আমায় না দেয়, আমিও আমাদের বোনদের তাহাদেরকে দিব না।”

ইচ্ছে বুঝল এই ছেলে সহজে ছাড়ার পাত্র নয়। তাই যা করতে হবে, সুনিপুণ মনযোগে বুদ্ধি খাটিয়ে কৌশলে করতে হবে। এখান থেকে বেরুতে হবে। সে সুমিষ্টি গলায় বলল, “স্বাধীন, দেখ ভাই আমার, ছেড়ে দে না? মানুষ দেখলে কি বলবে?”

“আমি ছাড়া মানুষ কই? তাছাড়া ভাই বলো কারে? আমি তো তোমার বর হব। বর বলো। শুনতে ভালো লাগবে।”

“লুচ্চা শালা, হাতটা শুধু একটু খুলে দে। তোর গাল দুটোকে আমি একটু তবলা বাজিয়ে আসি।”

“ঠিকাছে মানবা না যেহেতু, তাইলে থাকো এমন।” বলেই

স্বাধীন ইচ্ছেকে ওমন অবস্থাতেই বেঁধে রেখে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছিল। ইচ্ছে পিছু থেকে বেশ কয়েকবার স্বাধীনকে ডাকল, “এ স্বাধীন, ভাইয়ু ভালো, বাঁধনটা খুলে দে না?”

“জামাই বললে ছেড়ে দিব।”

“তোর অন্ডকোষে ঠাডা পড়ুক।”

_____

সবে রেইনট্রি গাছের মাথায় মৃদু রোদের চিলিকের দেখা মিলল। বাড়ির উঠোনে বড়ো মোরগটা গলা চিঁড়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। যেন সেই এই বাড়ির একমাত্র কর্তা। নিখিলের আম্মা তহমিনা বেগম গিয়েছে তালুকদার বাড়ি। ফাতিহা বেগম তাকে যেতে বলেছে। ইচ্ছে ঘুমুচ্ছে। মরা ঘুম। সে ঘুমুলে চারপাশে খেয়াল থাকে না। যাকে বলে গভীর ঘুম। মুসকান ঢাকা। ভোর ভোর আবার মুক্তি রান্না করতে বসেছে। নিখিল তখন বাড়িই ছিল। সে গিয়ে মুক্তির পাশে মোড়া পেতে বসল। একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে আশপাশ সতর্ক চোখে এক চিলিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “রাতে আমার রুমে আসিস। কথা আছে।”

মুক্তি উনুনে বৈশ্বানর দিতে দিতে বলল, “আমি পারব না। রুমে নিয়া আপনি কি করবেন তা জানা আছে? এখন আমার চুমাচুমির বয়স না। চুমাচুমি করার ইচ্ছে থাকলে এখান থেকে ভাগেন। খালাকে একদম আপনার সব লুচ্চামির কথা বলে দিব। খালি চিপাচিপি খুঁজে। পোলা জাতটাই খারাপ।”

“এমন করে বলে না সোনা। আমি তো তোরই বর হবো। একটা দুইটা চুমু খেলে কিছু হয় না।”

“আপনি তো খুব খারাপ। এক নাম্বার লুচ্চা। ছিঃ! ছিঃ! এমন একটা লুচ্চার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে? অসম্ভব। আমি আজই খালাকে বলে দিব, রুমে ডেকে আপনি আমাকে চুমা খেতে চান।”

নিখিলের মাথায় হাত। বলে কি?

“ধুর বোকা! এসব কথা কেউ হবু শাশুড়িকে বলে?”

“আমি বলি। কারণ আপনার আম্মা আমার শাশুড়ি না, খালাজান হয় বুঝেছেন? এখন এখান দেখে যান। নতুবা খালাকে ডেকে বলব, বিয়ের আগে আপনি আমাকে ইভটিজিং করতে শুরু করে দিয়েছেন। জানেন ইভটিজারদের শাস্তি কি?”

“ছিহ, এমন কথা বলতে পারলি? ইভটিজিং তোকে আমি করি? আল্লাহ তোর মতন পাষুন্ডের মনে রহমত বর্ষণ করুক, করুক, করুক।” বলতে বলতে নিখিল চলে যাচ্ছিল।

মুক্তি মিটমিট করে মুখ চেপে হাসে। সে পিছু থেকে ডাকে, “নিখিল ভাই?”

নিখিল হাত বাড়িয়ে দুটো বরই ছিড়ে হাতে নিয়ে চিবাতে চিবাতে শুধাল, “কিছু বলবি?”

“রাতে আসব।”

কথাটা মাথায় ঢুকতে নিখিলের চার সেকেন্ড লাগল। বিস্ময়ে বিমুঢ় সে। তার মুখ থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে আসে, “সত্যি!”

মুক্তি হাসতে হাসতে নিখিলের কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। হঠাৎ সে নিখিলের নাকের ডগায় ছোট একটি টান মেরে ঘরের ভিতরে সে চঞ্চল পায়ে ছুটে গেল। নিখিল পুরাই আহাম্মক হয়ে গেল। সৎবিৎশক্তি ফিরতেই সে এক গাল হেসে দিল।

_____

আজ বুধবার। আকাশের অবস্থা ভালো না। রোদ ওঠেনি। নভেঃর মনঃক্ষুণ্ন। সেই মেঘলা দিনে নদীর বাঁক চিঁড়ে নাওয়াফ আর নিখিলকে দেখা গেল খেয়া পেরিয়ে জয়নগর যেতে। জয়নগর পাখির বড়ো ফুফু সাইমার বাড়ি। বাড়ির নাম খন্দকার বাড়ি। দুপাশে ফসলি জমি। মাঝখানে মাটির সরু দুর্বাঘাসে ভর্তি রাস্তাটি। এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে বেশ দূর পর্যন্ত। সেই রাস্তা পেরিয়ে তারা খন্দাকার বাড়ি গিয়ে ওঠল। সেখানে গিয়ে দেখল পাখির বড়ো ফুফু সাইমা খানম মাটির চুলায় খোলা পিঠা ভাঁজছেন। নিখিল আর নাওয়াফকে দেখে প্রচন্ড খুশি হলেন।

“আরে দুই জামাই দেখি আমার এক সঙ্গে! এসো বাবাজিরা, বসো বসো। কত দিন পর এলা! নিখিল তো মাঝে মাঝে আসে। কিন্তু নাওয়াফ তুমি তো আসো না। সামনে নির্বাচন করছো শুনছি। সেসব নিয়ে ব্যস্ত বুঝি? ব্যস্ত যাইহোক, শাশুড়িদের ভুলে থাকলে চলবে?”

নাওয়াফ মৃদ্যু হেসে বাঁশের চালন থেকে একটা খোলা পিঠা হাতে তুলে নিল। এক টুকরো ছিড়ে মুখে নিয়ে চিপাতে চিপাতে জবাব দিল, “সব কথা পরে বলব। আগে আমার কলিজার টুকুরোটাকে ডেকে পাঠান। বলেন তার বর এসেছে তাকে নিতে। দুদিন পর্যন্ত দেখি না মুখটা। কলিজা শুকিয়ে মরছি।”

সাইমা খানম দুষ্টুমি করে নাওয়াফের কান ধরে টানল।

“মাইয়্যা তো মাশাআল্লাহ ভালোই বড়ো হয়েছে। নিয়ে যাও না কেন এখনো, হুঁ? তোমার বউকে কি আমরা ধরে রেখেছি? তাহলে তো আর কলিজা শুকিয়ে মরতে হয় না।”

“মেয়ে তো রাজি না।”

“বাচ্চা মানুষ। দুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। এই দেখো, আমার বিয়ে হয়েছে কিন্তু দশ বছর বয়সে। বিয়ে করব না বলে কত বাবার পা ধরে কাঁদলাম! জামাই এক দরজা দিয়ে ঢুকল। আরেক দরজা খুলে আমি পালিয়েছি। বাবা ধরে এনে তবুও বিয়ে দিল। প্রথম প্রথম জামাইকে দেখে গালাগাল করতাম। খামচাতাম, ঘুষি মারতাম। ব্যাটায় অনেক ভালো ছিল। তবুও কিছু বলতো না। আমায় ধমক দিত না। গায়ে হাত তুলতো না। ধীরে ধীরে এক সময়ে তারে ভালোবেসে ফেললাম। এটাই তো স্বামী স্ত্রীর মোহাব্বত। তুমিও এখন পাখিকে বিয়ে করে ফেলো। ও তো ওতোও ছোট না। মেট্রিক দিব। সামনে কলেজে ওঠবে। কলেজ লাইফ তো ভালো না। ছেলে মেয়েদের চোখ নষ্ট হয়ে যায়। বলা কওয়া তো যায় না, কলেজে ওঠলে অন্য পোলারে যদি ভালো লেগে বসে, তখন?”

“তখন ওর চোখ দুটো খুলে রেখে দিব।” কথাটি কংক্রিটের ন্যায় শক্ত শোনাল।

নিখিল চা খাচ্ছিল। সাইমা খানম ওকে চা দিয়েছিল। নাওয়াফের কথা শুনে নিখিল বিষম খেল। তার মাথায় চা উঠে গেল। সে মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, “তুই পারবি ভাই, পারবি। বাপরে কি ভয়ংকর কথা?”

“এটা বলার জন্য তোর মাথায় চা ওঠল?”

“না, তোর কথা শুনে।”

সাইমা বেগম নিখিলের মাথায় বাতাস করতে করতে বলে, “আস্তে খাও বাবা, তোমার চা কেউ কেড়ে নিচ্ছে না।”

নিখিল খানিকটা লজ্জা পেল। নাওয়াফ আলসেমি দিতে দিতে উঠে দাঁড়াল। সাইমা খানমকে বলল, “কই ওইটা?”

“বিলে গেছে শাড়ি চুড়ি পরে? সরিষা ক্ষেতে নাকি তেনারা ছবি তুলবে। সঙ্গে ফাইমা ছিল।”

“নিখিল তুই থাক। আমি বিলে যাচ্ছি।”

“যা যা, অন্যডালে তোর পাখি বসার আগে শিকল দিয়ে ঝাপটে ধর।”

“তোরে যেন আন্ডারপ্যান্টের তলায় পিটাতে না হয়। তার আগেই ভালো হ।”

নিখিল ঠোঁট টিপে হেসে দেয়। হাসে সাইমা খানমও।

নাওয়াফ বিলে গিয়ে দেখল এরা টিকটক করছে। পাখির গায়ে মেরুন রঙের একটা শাড়ি। চুলগুলি খোলা। বেশ লম্বা আর ঘনো ঝলমলে দেখতে। বাতাসের তালে তালে দুলছে। ওর ব্যাকপিঠ দেখা যাচ্ছে। ফাইমা ভিডিও করছে। নাওয়াফ চুপচাপ পাখির পিছনে গিয়ে বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে দাঁড়াল। ফাইমার হাত সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলের স্ক্রিনে থেমে গেল। সে কিছুটা ভীত হলো। পাখি বিরক্ত হলো।

“কি হলো? ভিডিও কর।”

ফাইমা আকার ইঙ্গিতে বোঝাল, “তোর পিছনে কে?”

পাখি জানতে চাইল, “কে?”

“নাওয়াফ ভাই।”

“মানে?” বলেই বিস্ফোরিত নয়নে পিছু ঘুরল সে। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দুটো চক্ষুচড়ক। সে পিছু ঘুরতেই দৃষ্টিতে পড়ল লোকটার সুতনু ভারিক্কি মুখটা। লোকটা গা ঝেড়ে দৃষ্টিজোড়া অন্যত্রে নাচাতে নাচাতে বলল, “পড়ালেখা রেখে তোরা টিকটক করিস?”

হঠাৎ পাখি এক কাণ্ড করে বসল। সে দিল দৌড়। ওর অপ্রত্যাশিত আচরণে নাওয়াফ পুরাই বাকরুদ্ধ। সে পাখির পিছু নিল। পিছু থেকে চেঁচিয়ে যাচ্ছে, “ওই পাখি, দাঁড়া। তোরে কি পাগলা কুত্তা ধাওয়া করছে? দৌড়াস কেন?”

“আপনি কুকুরের চেয়েও ভয়ংকর।”

“মার খেয়েছিস, বেদ্দব মহিলা? দাঁড়া বলছি।”

“হয় আপনার হাতে শক্ত মার খেতে?”

“আরে পাগল মারব না তোকে।”

“আমি জানি হাতের কাছে পেলে আপনি আমাকে পিটাবেন।”

“তুই না থামলে এবার সত্যি সত্যি পিটাব।”

পাখি তবুও থামল না। সে শাড়ির কুচি ধরে দৌড়াতে থাকে। ফাইমা এদের ছোটাছুটি দেখে অবাক হয়। সে তাড়াতাড়ি এখান থেকে ভাগল।

নাওয়াফের দৌড়ের সঙ্গে পাখি পারল না। লোকটা ছো মেরে পেছন থেকে ওর হাত ধরে ফেলল। পাখি ধাক্কা দিয়ে পালাতে যাচ্ছিল। তার আগেই পাখির লম্বা শাড়ির আঁচলটি লোকটা পা দিয়ে চেপে ধরল। যার কারণে পাখি মুখ থুপড়ে মাটিতে পড়ল। লোকটাও ওর পাশাপাশি বসে পড়ল। পাখির ভয় হলো। লোকটা কি ওকে মারবে? সে সংকুচিত মনে কিছুটা গুটিয়ে গেল। ওর ভীতকর মুখজটা দেখে নাওয়াফ ঠোঁট টিপে হাসে। ওকে ইশারা করে কাছে ডাকে, “এই দিকে আয়।”

“হ, সেধে সেধে আপনার কাছে আমি মার খেতে যাই।”

“মারব না তোকে।”

“তাহলে ডাকছেন কি করতে?”

“কানে কানে বলব, আয় শোন।”

পাখি লোকটাকে বিশ্বাস করে লোকটার কাছাকাছি গেল। সুবলিষ্ঠ লোকটি ওর কাজল কালো আঁখি দুটোর দিকে গভীর চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। চমৎকার দেখাচ্ছে চোখ দুটো। ভীষণ মায়াবি । তার বেশি পছন্দ এই দুটিই। লোকটা ওর ললাটের মাঝে উড়ে আসা কিছু চুলের অংশ কানের নিচে গুঁজতে গুঁজতে বলে, “তুই এতো দৌড়াদৌড়ি দুষ্টুমি করিস কেন পাখি? বড়ো হয়েছিস না? এখন থেকে কম কম দুষ্টুমি করবি।”

লোকটার কথাগুলি আজ কোমল আর আদুরে আদুরে শোনাল। পাখি নির্বিক হয়ে শোনে। লোকটাকে এমন আদুরে গলায় কখনো কথা বলতে শোনেনি সে। আজই প্রথম। ক্ষণকাল লোকটার চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। কিসের যেন একটা নেশা ওই চোখে। সে তাকিয়ে থাকলে একটা ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যায়। যার কারণে সে বেশিক্ষণ ওখানে তাকিয়ে থাকতে চায় না। দৃষ্টিজোড়া নামিয়ে আনে। লোকটা আবার বলে, “বাড়ি চল।”

পাখি অমত করে, “আমি যাব না।”

“মার খেয়েছিস?”

“না, খাব। তবুও যাব না।”

“কেন যাবি না?” বলেই ভ্রু দুটো খিঁচে নিল সে।

“খালা মারে। সারাদিন কাজ করায়।”

“আর করাবে না।”

পাখি বাচ্চাদের মতন ঠোঁট উল্টে জিজ্ঞেস করল, “যদি করায়?”

“সোজা আমার কাছে চলে আসবি। আমার বাড়ি চিনোস না?”

“চিনি, কিন্তু আপনার কাছে যাব কেন? আপনি আমার কি হন?”

লোকটার ভ্রুকুটি হয়ে আসে । সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“আমি তোর ভাতার হই। এবার বুঝেছিস?

“না বুঝিনি। ভাতার হিসেবে আপনাকে আমি মানি না।”

“মানবি না কেন? আমি কি দেখতে অসুন্দর?”

“তা নয়। কিন্তু আপনাকে দেখলে মনের মধ্যে বর বর ফিলিংস আসে না।”

“কি আসে তাইলে ?”

“চাচাজান, চাচাজান।” বলেই পাখি জোতা হাতে নিয়ে দিল দৌড়। তারে আর পায় কে? মৌচাকে খোঁচা বসিয়েছে সে।

নাওয়াফ পুরাই হতবাক। এমন নির্বোধও হয়! সে ওর পিছু পিছু বাঁশের চিকন টুনি হাতে ছুটল। ছুটতে ছুটতে ধরে ফেলল ওকে। পাখি ঠোঁট কামড়ে দাঁড়াল। নাওয়াফ ওর সামনে বাঁশের টুনি হাতে দাঁড়িয়ে শাসনের স্বরে বলল, “কানে ধর।”

“ধরতেই হবে?”

“জে, আপনার মাফ নেই চাচাজানের বউ চাচি আম্মা।”

“একটু মাফ করেন না?”

“যা মানবতার খাতিরে মাফ করাই যায়। দ্বিতীয়বার তোর মুখে চাচাজান শুনলে তোর জিভ আমি কেটে দিব। আর একটা শর্ত আছে।”

“কি শর্ত?”

“আগে কানে ধর।”

“কেন, কেন? কানে ধরব কেন?”

নাওয়াফ এবার বেশ সিরিয়াস হয়ে দাঁড়াল।

“আহা! এত প্রশ্ন করে না ময়না। কারণ আছে, তাই ধরবি।”

পাখি আর দ্বিতীয়বার কিছু জিজ্ঞেস করল না।

লোকটার জিভটা শুকনো শুকনো ঠেকল। সে শুকনো ঠোঁটজোড়া জিভের তলে পিষিয়ে নিয়ে খানিকটা ভিজিয়ে বলল, “তিনবার উঠবি আর বসবি। আর বলবি, আই লাভ ইউ। আমি আপনাকে ভালোবাসি, নাওয়াফ ভাই।”

পাখির চোখ দুটো তাৎক্ষণিক রসগোল্লার মতন বড়ো বড়ো হয়ে গেল।

“কীহ!”

“জি। যা বলেছি, বলেছিই। দ্বিতীয়বার আর বলতে পারব না। বললে বল, না বললে নাই। আমার এত শোনার শখ নেই।”

পাখি দ্বিমত জানিয়ে বলে, “এ সমস্ত লজ্জাজনক কথা আমি আপনার মতন দামড়া এক ছেলেকে বলতে পারব না।”

“তোকে বলতেই হবে। নতুবা বাঁশের টুনির মার একটাও নিচে পড়বে না। বল বল।”

পাখি কেঁদে দিল।

“আমি পারব না।”

নাওয়াফ ওর পায়ে ছোট করে একটা বাড়ি বসাল ব্যথা যেন না পায় ওমন। তবুও পাখি চিৎকার করে ওঠল, “বলছি বলছি। আর মাইরেন না।”

নাওয়াফ ওর উজবুক মুখটা দেখে নীরবে হাসে। পাখি

কানে হাত দেওয়া অবস্থাতে কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, “আই লাভ ইউ। আমি আপনাকে ভালোবাসি না নাওয়াফ ভাই।” বলেই পাখি কান থেকে হাত সরিয়ে দিলো ভৌঁদৌড়। তারে আর পায় কে? অনেক কষ্টে বাঘের খাঁচা থেকে পালিয়ে ফিরেছে। সে তো এই বুদ্ধিটাই এতক্ষণ ধরে এঁটেছে। অবশেষে সফল হলো।

নাওয়াফ আর ওর পিছু নিল না। সে ওর পাগলাটে কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে ফসলি জমির আইলের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল। তার পাগলামিটা। যাক তবুও আই লাভ ইউ তো বলেছে। এটাই তার জন্য অনেক শান্তি। সে চেঁচিয়ে পাখিকে পিছু থেকে বলে ওঠল, ” আই লাভ ইউ টু নাওয়াফ তালুকদারের কলিজা। অনেক অনেক ভালবাসি তোকে।”

তার উচ্চশব্দে বলা প্রতিটি কথা যেন বারবার বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছিল। সেই সঙ্গে তার মুখের কোণে ফুটে ওঠল এক টুকরো রৌদ্র ছটার ন্যায় ঝলমলে হাসি।

পাখি দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ গতিপথে ধপ করে থেমে পড়ে। অদ্ভুত এক দৈবশক্তি তাকে থামিয়ে দিল। লোকটার মুখে ভালবাসি কথাটা শোনার পর থেকে তার শরীরে বিদ্যুতের মতন এক ঝলক বহে গেল। শিরশিরে বাতাস তার সর্বাঙ্গ জুড়ে বইছে। সে পিছু ঘুরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি পাগল?”

লোকটা উচ্চশব্দে হেসে ওঠে। কিন্তু ওর কথার জবাব দিল না। বরঞ্চ সে ফসলি জমির ওপর বলিষ্ঠ দেহটা ছড়িয়ে দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। ওর দিকে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে খালি গলায় একটি গান ধরল।

আমার বাহির যদি পাগল হইতো

দেখতা আমার পাগলামি।

ওরে তোমার লাগি ভিতর পাগল

কেমনে বোঝাই আমি..

#(চলমান~)

#লামইয়া_তাসনিম।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন