ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

১৩তম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

#সে_আমার_সর্বনাশ_২

(১৩)

পশ্চিমের জানলাটি হাট করে খোলা। সেখান দিয়ে কয়েক মুঠো মরুৎ এসে শাঁ শাঁ করে খোলা জানলা দিয়ে গৃহে প্রবেশ করল। বাড়ির সামনে আবার একটা আমড়া গাছ রয়েছে। ঝিরেঝিরে হাওয়ায় গাছের পাতাগুলি একটু নড়েচড়ে ওঠল। আমড়া গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় দেখতে বেশ রসালো রসালো আমড়া ধরেছে। দেখলেই জিবে জল নেমে আসে। সেই ডালে বসে ঝিমুচ্ছিলো রাতের বিহঙ্গেরা। হঠাৎ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের ন্যায় কুৎসিত ঘটনাটি ঘটল। এ আর গ্রামঞ্চলে নতুন কি? রোজই ঘটছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে পুরো ঘরটা তলিয়ে গেল। সেই অন্ধকারের মাঝে মিটমিট করে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে নৃতের ন্যায় এঁকেবেঁকে জ্বলছিল ল্যামের স্বল্প আলোকটুকু। তেল ফুরাবার পথে।

তখন সুবলিষ্ঠ পুরুষটির হাত ল্যাম থেকে সরে এলো। পকেট হাতিয়ে সে ফোন বের করে লম্বাটে লম্বাটে আঙুলগুলি নাচিয়ে কিছু একটা টাইপিং করল। এরপরে ফোনের টর্চ অন করে ফোনটা টেবিলে রেখে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে স্বাধীন এলো ঘরে। ছেলেটা এসে হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে আবার নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। পাখি কেবল নীরবে চেয়ে দেখছে। সে বলবে কি? বলার আছেটাই কি? আদৌ মানবে তার কথা?

লোকটা সুনিপুণ মনযোগে চামচে পড়া ল্যামের কালিগুলো চা চামচের সাহায্যে টেনে টেনে এক জায়গায় জমা করল। তার মধ্যে পাউডার, কয়েক ফোঁটা নারিকেল তেল দিয়ে তর্জনী আঙুলের মাথা দিয়ে নাড়তে লাগল। পাখি নীরব দর্শক হয়ে এসব দেখছে। টেবিলে ভেসলিনের একটা কৌটা ছিল। কৌটা থেকে ভেসলিন ফেলে দিয়ে তাতে লোকটা কাজল ভরে দিল। পাখি চিৎকার করে ওঠল, “আহ, আমার ভেসলিন। ”

লোকটা ওর ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে ধরে থামাল।

“হিস, শব্দ করিস না। এখন এইদিকে আয়।”

পাখির দুচোখ গোল গোল বড়ো বড়ো হয়ে এল।

“কেন?”

“তোকে ঝাপটে ধরে দুটো চুমু খাব তো তাই। খবিশ মহিলা ডাকছি, আয়।”

পাখি নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল। বেদ্দপ ব্যাটা। কথায় কথায় খবিশ বলে। সে খবিশের করছেটা কি? ওনার ঘাড় ধরে কি টেনেছে, না চুল ধরে? সে একদম তীরের মতন হয়ে বসল। আমতা আমতা করে লোকটার নিকটে যাচ্ছিল। হঠাৎ বলিষ্ঠ হাত দুটো তার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাতটা খপ করে ধরে টান দিল। যার ফলে অসতর্কভাবে পাখি পড়ে যাচ্ছিল। লোকটার দুই উরুর ওপর দুহাত ভর দিয়ে নিজের ভারসাম্য কোন রকম সামলানো। আড়চোখে একবার লোকটার মুখটার দিকে চাইল। লোকটা বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে ভ্রু কুঞ্চিত করে ওর মুখটার দিকে নির্বিকে তাকিয়ে আছে। পাখি বুঝল না এভাবে তাকানোর আছেটা কি? সে কি ওখানে ইচ্ছে করে ধরেছে? কেবল দুর্ঘটনায় থেকে বাঁচতে স্পর্শ করেছে। তাতে ওমন করে তাকানোর কি আছে? লোকটা বিড় বিড় করে নিচু স্বরে মুখে উচ্চারণ করল, “অটিস্টিক একটা।”

পাখি শুনল তা। কত্ত বড়ো বেয়াদব! তার হাত ধরে টেনে তাকে প্রতিবন্ধী উপাধি দিচ্ছে৷ খবিশ লোক কোথাকার। তোর ওপর পৃথিবীর বৃহৎতম ঠাডা পড়ুক হারামজাদা। তার সুগভীর ভাবান্তরের মধ্যে খেয়াল হলো লোকটা ধূসর রঙের গাঢ় দৃষ্টিজোড়া তার মুখের ওপর এখনো তাক করা। আশ্চর্য ওমন করে দেখছে কি লোকটা? এমন তো না তাকে মুগ্ধ নয়নে দেখছে। লোকটার ভেতরকার মনোভাব বোঝা দুঃসাধ্য। তার হঠাৎ মনে হলো তার হাত দুটো এখনো লোকটার দুই উরুর মাঝখানে। সে দ্রুত হাত দুটো গুটিয়ে নিল। কোলের ওপর নিঃশব্দে নিয়ে রাখল। মুখটা মলিন। থুতনির সঙ্গে একেবারে লাগানো। নাওয়াফ ওর থুতনি ধরে উঁচু করল। ওর কোলের ওপর থেকে হাতটা ধরে টেনে তার মুখোমুখি করে নিল। পাখি আশ্চর্য হয়। কথায় কথায় লোকটা তাকে ছোঁয়ার এতো সাহস পায় কোথা থেকে? আস্ত বদমাশ একটা!

“আমাকে গালি পরে দিস। আগে চুপচাপ বোস।”

পাখি হকচকিয়ে ওঠল। সব শুনল কি করে? সে সামান্য নড়লও। লোকটা বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে ওর চোখের নিচের নরম চামড়াটি টেনে ধরে তর্জনী আঙুলের মাথায় কাজল লাগিয়ে ওর চোখে দিতে দিতে বলল, “উঁহু নড়ে না। স্থির থাক৷ নতুবা লেপ্টে যাবে।”

পাখি কি করবে বুঝতে পারছে না। তবে সে নড়ল না। শান্ত হয়ে দেখতে চায় লোকটা আর কি কি করে?

নাওয়াফ মোটা করে লেপ্টে ওর চোখে কাজল দিয়ে দিল। নিজের পকেট হাতিয়ে টিস্যু বের করে চোখের নিচে লেপ্টানো কাজলটুকু মুছে নিল। কতক্ষণ ওর মুখটার দিকে স্থির হয়ে নির্বিঘ্নে চেয়ে রইল। ওমন করে গভীর মনে কি দেখছে কে জানে? পাখির অস্বস্তি লজ্জা এক সঙ্গে হচ্ছিল। কোন পুরুষ লোক যদি একজন নারীর দিকে সেকেন্ডের পর সেকেন্ড এক নজরে এমন কাছ থেকে মুখের ওপর তাকিয়ে থাকে, সেখানে লজ্জা অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক। তার ভাবুকের মধ্যে লোকটা বলে ওঠল, “পারফেক্ট। চমৎকার মানিয়েছে। শোন, আজকের পর থেকে তোর চোখ থেকে যেন কোনদিন কাজল ফুরায় না। এই কৌটার মধ্যে কাজল রাখা আছে। শেষ হয়ে গেলে আমায় বলবি। আমি এসে আবার বানিয়ে দিয়ে যাব। কিন্তু রোজ দুবেলা করে হলেও অন্তত আমার জন্য তোকে চোখে কাজল পরতে হবে। তোর মায়াবি আঁখি জোড়া কাজল ছাড়া বড্ড বেমানান রে পাখি। তোর চোখ দুটোকে আমায় দুটো দিনের জন্য ধার দিবি? কথা দিচ্ছি আবার ফেরত দিয়ে দিব। ওদের আমি খুব কাছ থেকে মনের তৃপ্তি নিয়ে একটু দেখতে চাই। আমি জানতে চাই কি এমন আছে ওর ভিতরে, যা আমাকে চুম্বকের মতন বরাবর টানে। আমায় দুর্বল করে দেয়।” কথাগুলি বলে নাওয়াফ একটু থামল।

পাখির দুচোখ নিচের দিকে স্থাপিত। সে তাকায় না লোকটার মুখটার দিকে। তার মুখে জড়তা, আড়ষ্টতা।

নাওয়াফ পকেটে হাত দিল। ছোট একটা কাগজের প্যাকেট থেকে এক মুঠো কাঁচের লাল চুড়ি বের করে ওর বইয়ের উপরে রাখল।

“পরিস। তোর জন্য শখ করে কিনেছি। শখের জিনিস শখের নারী না পরলে বড্ড বেমানান লাগে। আর হ্যাঁ আগামীকাল থেকে প্রাইভেটে চলে আসিস। আমি আর তোকে বিয়ের আগে চুমু খাব না। এবার পাক্কা প্রমিজ।” বলেই লোকটা চলে যাচ্ছিল।

পাখি পিছু থেকে গলা উঁচিয়ে বলল, “আমি যাব না।”

লোকটার চলন্ত পা দুটো তৎক্ষণাৎ থেমে গেল। সে পিছু ঘুরে পা চালিয়ে আবার ওর দিকে ফিরে এলো। চেয়ার টেনে আবারো ওর মুখোমুখি হয়ে বসল।

“কি বলেছিস তখন? আবার বলতো, একটু শুনি।”

লোকটার ধমকে পাখি একটু ভয় পেল। সে গলার আওয়াজ কিছুটা কমিয়ে মিন মিন করে বলল, “বলেছি পড়তে যাব না।”

“আর একবার এ কথাটা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করিস তো। সোজা তোর ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরব। খবিশ মহিলা পড়তে আসবে না? পরীক্ষায় গোল্লা পেলে গাছের সঙ্গে দুরাত বেঁধে রাখব।”

পাখি পাল্টা জবাব দিল না। মৌন রইল সে। উত্তর দেওয়ার চেয়ে নীরবতাকে যেন সে বেছে নিয়েছে।

লোকটা ওর মলিন মুখটার দিকে সুগভীর চাহনি ফেলে। কাজল দেওয়ার কারণে চোখ দুটো বড়ো বড়ো আর মারাত্মক সুন্দর দেখাচ্ছিল। বার বার অন্য মনষ্ক হয়ে যাচ্ছিল সে। নিজেকে সংযত করে নরম কণ্ঠে বলে সে, “তুই এতো অবুঝ কেন পাখি? তোকে বুঝবে হবে। তুই নাওয়াফ তালুকদারের হবু বউ। তাকে সামলাতে হবে। তার মনের কথা শুনবে হবে। পারবি না? পারতে হবে তোকে লক্ষ্মীটি। এখন আসি।” বলেই ওর দুগাল টেনে দিল। এক গালে ঝড়ের গতিতে একটা চুমু বসিয়ে দিয়ে তৎপর আবার হাঁটা ধরল। যেন কিছুই হয়নি। খুব স্বাভাবিক। হাঁটতে হাঁটতে পিছু থেকে বলল, “আমার শাশুড়ি আম্মাকে বলে দিস, তার একমাত্র জামাই সাহেব রাতে খেতে আসবে। ডালটা যেন ভালো রাঁধে। আমার আবার ডাল ভীষণ প্রিয়। ঠিক তোর মতন। আর তুই রেডি থাকিস। রাতে তোর সঙ্গে কথা আছে চড়ুই আমার।”

হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে কথাগুলির গতি ধীরে ধীরে কমে এলো। একটা সময়ে লোকটার গলার আওয়াজ মিলিয়ে গেল।

পাখি এখনো পুরা স্তম্ভিত। সে বার বার নিজের গালটা ওড়না দিয়ে মুছে যাচ্ছে। কি ছোঁচার ছোঁচা। বলল আর চুমু খাবে না। তবুও তার গালে চুমু খেয়েছে। যেন সরকারি গাল পেয়ে বসেছে। যখন ইচ্ছে চুমু খেয়ে যাবে। র্নিলজ্জ লোক কোথাকার! নিজের কেনা সম্পত্তি মনে করেছে তাকে। আস্ত একটা খবিশ!

_____

দিনটি ছিল রোববার। আজ পাখির স্কুল দুটোর দিকে ছুটি হয়েছে। সে বাড়ি ফিরে এসে দেখল নাওয়াফের আম্মা তাদের ঘরের সোফায় বসে আছে। ওনার সঙ্গে একজন মধ্য বয়সি মহিলা বসা। গায়ের রং উজ্জ্বল ফরসা। দেখতে ভীষণ স্মার্ট, আধুনিক। শহুরে শহুরে মনে হয়। তাহিরা তাদের মেহমানদারি করছে। পাখিকে দেখে ইশারায় ওনাদের সালাম দিতে বলল। পাখি বুঝল না। তাহিরা পাখিকে চোখ পাকাল। পাখির পাশ দিয়ে যেতে যেতে কানে কানে বলল, “ওনাদের সালাম দে। ওনারা তোর গুরুজন।”

পাখির মেজাজ এমনিতে খুব খারাপ। ক্রুদ্ধ। স্কুলের একটা মেয়ের সঙ্গে তার কয়েক দফায় ঝগড়া হয়েছে। সেখানে ইচ্ছেও ছিল। ইচ্ছে তার সাপোর্ট করেনি। এজন্য তার সারা রাস্তায় মন খারাপ হয়েছিল। ইচ্ছের সঙ্গে কোন কথা বলেনি। মলিন মুখ করে রেখেছিল। এখানে এসে তার বাকিটুকু মেজাজ খারাপ লাগল। তবুও সে ভদ্রতা বজায় রাখল। এদের মধ্যে একজনকে সে চিনে। ওনি ফাতিহা নুর। নাওয়াফ ভাইয়ের আম্মা। পাশের জন মহিলা ওনার খালা অথবা ফুফু হতে পারে। সে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”

ফাতিহা নুরের পাশে বসে থাকা মধ্য বয়সি মহিলা উচ্চশব্দে সালামের জবাব দিলেন।

“ওয়াআলাইকুমুস সালাম আম্মাজান। আসুন এখানে বসুন।”

পাখি আমতা আমতা করে মহিলার পাশে গিয়ে জড়তা নিয়ে বসল। তাহিরা এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। খাতির যত্নে সে কোন কিছুর কমতি রাখেনি। এতো বড়ো ঘরের মানুষ। খাতির যত্ন না করলে চলে? ফাতিহা নুর ইশারায় তার পাশে বসা ননদ জাইমাকে বোঝালেন মেয়ে এটাই। জাইমা মুচকি হেসে পাখিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। দেখে বলল, “গায়ের রং একটু চাপা হলেও মেয়ে দেখতে খারাপ না। কিছু কিছু মেয়েরা আছে না? এরা সুন্দরী না হলেও সুন্দরীদের মাথা খায়। তোমার নাবুর বউ তেমন গো ভাবি। যৌবনে পড়লে এ মেয়ের গায়ের রং উজ্জ্বলে ফিরবে। তবে ভয়ংকর রকমের সুন্দর হবে। বয়স তো কম। দেখতেও পাতলা গড়নের। নাওয়াফের সঙ্গে মানাবেও ভালো। এখন নাওয়াফকে মানিয়ে চলতে পারলেই হলো। নাবুর রাগ তো আবার নাকের ডগায়। চব্বিশ ঘণ্টা রাগের ওপরেই থাকে। তার ভিতরে নাবুর তুলনায় মেয়ে বেশ ছোট পড়ে গেছে। বয়স কম।”

ফাতিহা নুর হাসতে হাসতে বলেন, “ছোট হলে হবে কি? ছেলের মন তো মজে আছে এতে। কি করব? দুনিয়ার কোন নারী তার পছন্দ হয় না। তার মন পড়ে থাকে মোল্লা বাড়ির দরজায়। এজন্য আমাকেও তার পছন্দকে মূল্যায়ন করতে হবে। সংসার করবে সে। আমি তো না। তার পছন্দের একটা দরকার আছে।”

“হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছো। তোমার ছেলে যা একবার মুখ দিয়ে বের করবে। ওটা না করা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। বড্ড জেদি। এখন বিয়ের ব্যাপারটা পাকা করো। দেশে থাকতেই বিয়েটা খেয়ে যাই।”

পাখি আশ্চর্য হয়ে এদের কথা গিলছিল। তার মনে হলো তাকে শো-পিসের মতন এখানে সাজিয়ে কথা শোনানো হচ্ছে। সে রেগে তাহিরার মুখের দিকে চাইল। তাহিরা বুঝল পাখি এখানে থাকতে চাইছে না। তাহিরা ইশারায় ওকে চোখ রাঙানো। ওখান থেকে উঠতে নিষেধ করল। পাখির বিরক্ত লাগছিল। ফাতিহা নুর পাখির হাত ধরে টেনে তার পাশাপাশি নিয়ে বসাল। নিজের ব্যাগ থেকে একটা জুয়েলারির ব্যাগ বের করল। ব্যাগ থেকে গোল্ডের জুয়েলারি বের করে এক এক করে ওকে পরাতে লাগল। প্রথমে পাখির দুহাতে দুটো মোটা বালা পরিয়ে দিল। তারপরে অনামিকা আঙুলে একটি আংটি পরিয়ে দিল। সর্বশেষে গলায় চেইন পরিয়ে দিতে দিতে বলল, “শোন মেয়ে, নাবু আমার একমাত্র ছেলে। সেই ছেলে যদি আসমানের চাঁদও চাইতো। সম্ভব হলে আমি সেটাও এনে দিতাম। খুব আদরের সে। তালুকদার বাড়ির সকলের চোখের মণি সে। সকলে তাকে ভালোবাসে। বাড়িতে গেলে নিজের চোখেই এগুলা দেখতে পাবে। সেই ছেলে হাজার হাজার নারীর ছবি রেখে তোমাকে সিলেক্ট করেছে। কেন জানো? কারণ তোমাকে তার ভীষণ ভীষণ পছন্দ। ভালো লাগে। ভালোবাসে সে তোমাকে। আমার নিজের হাত ধরে তোমাকে সে আমার কাছে চেয়েছে। এখন বুঝো কতটুকু সে তোমায় চায়? সেই তাকে কখনো কষ্ট দিলে আমি ফাতিহা নুর সহ্য করব না। তোমার প্রতি তখন নিষ্ঠুর হব। ছেলের সকল আবদার রেখেছি। মা হিসেবে ছেলের পছন্দ আর ভালোবাসাটাকে তো অস্বীকার করতে পারি না। এতো বছর পর ছেলে আমার বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। এতেই আমি খুশি। আমার বাড়িতে কোন কাজ নেই। সব কাজ কাজের লোকেরা করে। তোমার কাজ হলো শুধু আমার ছেলেকে একটু ভালো রাখা। তাকে ভালোবাসা। আর তার অবাধ্য কখনো হইও না। সে নিজের অবাধ্য হলে নিজের বাপকেও ক্ষমা করে না। যাই হোক অনেক কিছু বলে ফেলেছি। তুমি ছোট মানুষ। আস্তে আস্তে সব বুঝে যাবে। আপাতত বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নেও। দুটো দিন পরেই তো পুরোপুরি তালুকদার বাড়িতে চলে আসবে।”

কথার মাঝে চেইন পরানো শেষ। বেশ বড়ো চেইন। দুটো পেঁচ দিয়ে পরানো হয়েছে। চেইনের মাথায় চতুর্ভুজের মতন দেখতে একটা রকেটও আছে। রকেটের ভেতরে N অক্ষর লেখা। মানে এটা লোকটার চেইন! পাখি অবাক হয়। বিয়ে মানে? সে তাহিরার মুখটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তাহিরা বুঝল এখন এটাকে রুমে না পাঠালে অঘটন একটা ঘটিয়ে ফেলবে। সে বলল, “পাখি এখন রুমে যাক বেয়াইন সাহেবা। বাকি কথা আমরা মুরব্বিরা পাকাপাকি করি। ওর এখানে থাকার প্রয়োজন নেই।”

ফাতিহা নুর উত্তরে বলেন, “ হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি এখন গিয়ে বিশ্রাম নেও। রাতে নাবু আসবে। ওকে পাঠিয়ে দিব। পেডিকোট আর ব্লাউজের মাপ নিতে।”

পাখি কোন কথা বলতে পারল না। তার দুচোখ জলে চিক চিক করছিল। তার অনুমতি ছাড়া তার খালা এতো দূর অবধি পৌঁছে গেল। সে হনহনিয়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজায় ঠাস করে খিল লাগাল। শব্দটি তাহিরার কান পর্যন্ত এলো। ফাতিহা নুরেরা কথায় ব্যস্ত থাকায় খেয়াল করেনি। ওনাদের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, আগামী শুক্রবার পাখির সঙ্গে নাওয়াফের সরা কাবিন হয়ে থাকবে। মসজিদে বসে বিয়ে হবে। ছেলে দুটো দিন এখানে থাকবে। পরে পাখির পরীক্ষা শেষ হলে একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হবে।

ফাতিহা নুরদের দুপুরের খাবার খাইয়ে তাহিরা বিদায় করে পাখির রুমের দিকে গেল। মেয়েটা দরজায় খিল লাগিয়েছে। সে দরজা নক করল।

“পাখি দরজা খোল।”

পাখি দরজা খুলল না। তার মনের আকাশে অমানিশার মেঘ জমেছে। প্রিয় মানুষদের প্রতি অভিমান জমেছে। ভেতর থেকে কান্নার ফুঁপানো ফুঁপানো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। তাহিরা আবার বেশ কয়েকবার দরজা ধাক্কাল। এবার ধমকের সুরে বলল, “পাখি, দরজা খুলতে বলেছি কিন্তু! রুমে ঢুকলে তোর চুল টেনে ছিড়ব। দরজাটি খোল।”

পাখি তাহিরার কথা কানে ঢুকাল না। তাহিরার মাত্রাতিরিক্ত এবার বিরক্ত লাগল। সে পিছনের দরজা দিয়ে পাখির রুমে ঢুকল। রুমে গিয়ে দেখল স্কুলের ড্রেসটা পর্যন্ত মেয়েটা খুলেনি। সেই অবস্থাতেই বালিশে মুখ গুঁজে অনবরত কাঁদছে। তাহিরার ওকে ডাকল, “এই পাখি, ওঠ। ওঠ বলছি। আমার দিকে তাকা। কেন কাঁদছিস বল আমায়?”

পাখি নাক টানতে টানতে লাল চোখ দুটো নিয়ে ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি বিয়ে করব না মনি। ওনাদের না বলে দেও।”

“কেন করবি না সেটা অন্তত বল? কারণ দেখা।”

“আমি এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাই না। আমি আরো পড়তে চাই।”

“আর?”

“ওনাকে আমার পছন্দ নয়।”

“কাকে?”

“নাওয়াফ ভাইকে।”

“পছন্দ নয় বলে বিয়ে করবি না? তোর খালুকেও তো আমার পছন্দ ছিল না। তাকে বিয়ে করিনি? সংসার করছি না? সেখানে তোর আপত্তি কিসের?”

“কার সঙ্গে কার তুলনা দেও তুমি? খালু মাটির মানুষ।”

“আর নাওয়াফ?”

“ওনার চরিত্রের দোষ আছে।”

তাহিরা সঙ্গে সঙ্গে পাখিকে একটা ধমক দিয়ে ওঠল।

“চড় খেয়েছিস? একটা লোককে তোর পছন্দ না হতেই পারে। তাই বলে তার নামে বদনাম রটাবি? তোর সাত পুরুষের ভাগ্য ভালো নাওয়াফের মতন একজন ছেলে তোকে বিয়ে করতে চাইছে। কোন যৌতুক ছাড়াই। আজকাল দিনের ছেলেদের ডিমান্ড দেখেছিস? আবার যদি শোনে মেয়ে এতিম, তাহলে তো হলোই। এরা ভুলেও সমন্ধ আগায় না। সেখানে নাওয়াফ তোকে নিজে পছন্দ করে ঘরে তুলতে চাইছে। আর তুই তাকে পায়ে ঠেলছিস?”

“এতো কথা জানি না, ওনাকে আমি বিয়ে করতে পারব না। জোর করলে আমি গলায় ফাঁস দিব। আর নয়ত বিষ খাব।”

তাহিরা রাগে আক্রোশে পাখির চুল টেনে ধরল। গালে ঠাস করে একটা চড়ও বসিয়ে দিল। ওর চুলের গোছাটা টেনে শক্ত হাতে ওর দু চাপা চেপে ধরে দুচোখ পাকিয়ে রগচটা গলায় বলল, “মরবি না? মরার শখ জেগেছে? তাহলে মরার আগে ওর টাকা শোধ করে দিয়ে যাস। তুই যে কাপড় শরীরে পরে আছিস না? ওটা নাওয়াফের টাকায় কেনা। রোজ যে টাকা আমার কাছ থেকে স্কুলে যাওয়ার সময় নিয়ে মুখ নাড়িয়ে নাড়িয়ে ঝালমুড়ি খাস, চটপটি খাস, ফুসকা খাস। ওই টাকাও নাওয়াফের দেওয়া। যেই বই দিয়ে পড়ছিস না, ওটাও ওর টাকায় কেনা। শুধু এ নয়। তোর ইনার থেকে পেন্টি সব টাকা নাওয়াফ বহন করে। আর তুই ওকে বিয়ে করবি না? একদম খুন করে ফেলব পাখি তোকে। বিয়ে তোর নাওয়াফকেই করতে হবে। এতে তুই মরিস আর বাঁচিস। এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত। মানতে না পারলে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।”

(চলমান ~)

#লামইয়া_তাসনিম

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন