ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

১৪তম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

#সে_আমার_সর্বনাশ_২

(১৪)

উষ্ণ নোনা জলে গাল দুটো লেপ্টানো তার। ভেজাও। থুতনি গড়িয়ে নোনতা পানিগুলি ঝরছিল। বুকটা বড্ড জ্বলছিল। অসহায়ত্ববোধের যাতনা সর্বদিক দিয়ে যেন তাকে দেওয়ালের মতন চেপে ধরেছে। মানুষ খোঁটা দেয়। তাই বলে এভাবে? সে হাতের তালুতে চোখের পানিটুকু সযত্নে মুছে নিল। চোখ দুটো ভীষণ লাল। নাক টানল পর পর। কোন রকম কথা বলল না। কাকে বলবে? কে বুঝবে তার বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা কষ্টগুলি? যারা বুঝত, তারা নেই। অচিন দেশের পথ ধরে সেথায় হারিয়ে গেছে। সোজা চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল সে। বাড়ির পেছনে নদীরঘাট। সেখানে গিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বসল। জায়গাটি তার ভীষণ পছন্দের। ঝিরিঝিরি হাওয়া নদীর বাঁক জুড়ে। তার মন খারাপ হলে সে এখানে এসে নীরবে বসে। ভীষণ বাতাস এখানে। চুলগুলি উড়ছিল। সে মুখটা হাঁটুর মধ্যে গুঁজে নিল। তৎপর হাউমাউ করে কেঁদে দিল। জীবনে এই প্রথম মা না থাকার কষ্ট অনুভব করল সে। তার নিজের মা বেঁচে থাকলে আজ এমন করতে পারতো? পারতো না। বাবাটাও অকালে চলে গেল। সঙ্গে বড়ো ভাইটাও। সে এখন পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে আছে। পরের খোটা শুনছে। যে যেভাবে পারছে, তাকে চালাচ্ছে। জোর করছে। জুলুম করছে। সে তো চাইনি ওনার খরচে বাঁচতে। তাহলে কেন তাকে ওনারটা বহন করতে হচ্ছে? ওনার কোন কিছুই তার চাই না। চাই না মানে, চাই না। তার বুকটা ফাটছে। মানুষ কেন এমন মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধ জোর করে। যাকে মনে টানে না। তাকে শরীরে টানবে কি করে?

পরদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তার মনটা বেশ ভার ছিল। চোখগুলি লাল আর ফোলা ফোলা দেখাচ্ছিল। পুরো মুখটা মেঘে ঢাকা। নাওয়াফ তখন ক্লাবের সামনে চেয়ার নিয়ে বসেছে। হাতে নাস্তার প্লেট। সকালের নাস্তা করছিল। রমিজ চেয়ার মুছছে। মিনি বক্সে লো ভলিউমে গান বাজছে। লোকটা পা নাচানোর সঙ্গে সঙ্গে মুখে পরোটা ভরছিল। তখন তার ধূসর মণি দুটোর নজর পড়ল মেইন রোডের দিকে। বিরস মুখে হেঁটে যাচ্ছে তার মনোহরণী। মুখটা মলিন। ফোলা ফোলাও। বাম পাশের গালটা কিঞ্চিৎকর লাল। চোখ দুটোও ফোলা দেখাচ্ছে। হাতে মোটা দুটো বালা। আঙুলে একটা আংটিও আছে। গলায় মোটা চেইনসহ রকেট। জুয়েলারিগুলো দেখে চিনতে অসুবিধা হলো না তার। এসব ইউএস থেকে আনা জুয়েলারি। কিন্তু ওসব ওর হাতে গেলো কেন? আর ওর মুখটা ওমন হাসিহীন মলিন কেন? গাল চোখ লাল কেন? কি হয়েছে? কে মেরেছে ওকে? মারার কথা মনে উঠতেই তার বক্ষ মাঝটা চিনচিন করে ওঠল। মুখে আর দ্বিতীয়বার খাবার ওঠল না। বিদঘুটে ঠেকল তা। খাবারের প্লেট রেখে এক গ্লাস পানি নিয়ে গলাটা গড়গড় করে কুলি করে পরিষ্কার করে সামান্য পানি খেল। পানি খাওয়া হয়ে গেলে সে মোবাইল হাতে নিয়ে বসল। অর্ধ খাওয়া প্লেটটি দেখে রমিজ নাওয়াফকে শুধাল, “একি ভাই, আপনি খাবার খাবেন না?”

নাওয়াফ ভারিক্কি গলায় জবাব দিল, “নাহ, সকাল সকাল তোর ভাবির মলিন মুখ দেখে খাবার খাওয়ার মন উঠে গেছে।”

“ভাবির মুখ মলিন ছিল? মনে হয় বিয়ের কথা শোনার পর। গতকালই তো আপনার আম্মা আমাগো খালাম্মা মোল্লা বাড়ি গিয়েছিল। আপনার ফুফুকে সঙ্গে করে। বিয়ে পাকাপাকি করে এলো। ভাবিকে গহনা পরিয়ে এসেছে।”

নাওয়াফ ঈষৎ চমকাল। ললাটে তার দুটো ভাঁজ পড়ল। নিকোটিনে পোড়া অধর দুটো খুলে তাৎক্ষণিক বেরিয়ে এলো,

“মানে? আমার বিয়ে পাকাপাকি হচ্ছে, অথচ আমি জানি না?”

রমিজ ঠোঁট টিপে স্বল্প হাসে। বলে সে,

“খালাম্মা মনে হয় আপনারে সারপ্রাইজ দিতে চাইছিল। তাই জানায় নাই। আপনার তো আবার ভাবিরে দেখলে হুশ থাকে না।”

“হাতটা ভীষণ নিশপিশ করছেরে রমিজ। দুটো চড় খাবি?”

রমিজ থতমত খেয়ে বসল। কিঞ্চিৎ ভয়ও পেল। লোকটার হাতের মার যা শক্ত। গালে পড়লে দাঁত ভেঙে পড়বে। ভাগ্যক্রমে দুএকবার খাওয়ার মতন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সে দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে চাইল। তার আগেই লোকটার ভারিক্কি গলা শোনা গেল।

“নিখিল আর আপুকে ক্লাবে আসতে বল।”

“কেন ভাই, এখুনি বিয়ে করবেন নাকি? ভাবিকে ডেকে দিব?”

“তোর জিভ কাটব আগে, না চোখ তুলব আগে বলতো?”

রমিজের মুখটা ক্ষণিকের মধ্যে চুপসে গেল। বউয়ের কথা শুনতে ভালোই লাগে। আর সে কথা বললে ধমক মারে। আহা! কি কষ্ট করে এমন একজন বস ছুটেছে কপালে।

নাওয়াফ ক্লাব থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। রমিজ পিছু থেকে চেঁচিয়ে ডাকল, “ভাই কই যাচ্ছেন?”

লোকটা যেতে যেতে উত্তর দিল, “বউ আনতে।”

____

ক্লাস ভর্তি স্টুডেন্ট। স্টুডেন্ট পড়াচ্ছিলের নাম করা গণিত টিচার আবুল স্যার। হেড স্যার হওয়া সত্বেও তিনি গণিত ক্লাসটা নেন। নাওয়াফ ক্লাসের বাহিরে দাঁড়িয়ে ভিতরে ঢুকতে অনুমতি চাইল, “আসতে পারি স্যার?”

আবুল স্যার তখন বোর্ডে অঙ্ক করাচ্ছিল। নাওয়াফের কণ্ঠ শুনে ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল। বোর্ডে চক থামিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “আরে নাওয়াফ ভাই যে, আসুন আসুন। ভিতরে এসে বসুন। তা কি ব্যাপার হবু এমপি সাহেব, হুঁ? এমনিতে তো আপনার দেখা মিলে না। আজ হঠাৎ এখানে? দিনের বেলায় চাঁদ খুঁজতে এসেছেন বুঝি?”

নাওয়াফ আবুল স্যারের রশিকতাপূর্ণ কথা কানে ঢোকাল না। ওটা হলো নিখিলের চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে। কথা বলার সময় ডানে বামে তাকায় না। প্রচন্ড বাঁচাল। নাওয়াফ ক্লাসে ঢুকে লম্বাটে লম্বাটে পা ফেলে সরাসরি পাখিকে খুঁজতে লাগল। মাঝ সারিতে মাথা নিচু করে বসে আছে মেয়েটা। মুখটা অন্ধকার। নাওয়াফ গিয়ে পাখির হাত ধরে বসল। হাত ধরে টেনে সবার সামনে দিয়ে নিতে লাগল। ইতিমধ্যে ক্লাসে থাকা সকল স্টুডেন্ট কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছে। নাওয়াফ অবশ্য ওসব কানাঘুষা কানে তুলল না। সে ওকে হাত ধরে নিয়ে আবুল স্যারের সামনে সটান করে দাঁড়িয়ে গেল। বলল, “স্যার আপনার স্টুডেন্টকে মাত্র ১৫ মিনিটের জন্য নিচ্ছি। ১৫ মিনিট পর ফেরত দিয়ে যাব। আশা করি আপনার থেকে কোন বাঁধা পাব না।”

আবুল স্যারের থেকে পাল্টা জবাবের আশায় সে রইল না। পাখির হাত ধরে টেনে ক্লাবের দিকে নিতে লাগল। আবুল স্যার হতভম্ব। কি বলবে বুঝে ওঠতে পারছে না? তার কি বাঁধা দেওয়া উচিত ছিল? তার বাঁধা কি মানতো? বদজাতটা যেই হারে ঘাড়ত্যাড়া। তাতে মানত না। সে যে টিচার ওটাও গোনায় ধরতো না।

পাখি পুরোদমে আশ্চর্য হয়ে গেল। ভরা ক্লাসে বসে একজন স্টুডেন্টের হাত ধরে টানা কতটা যুক্তিযুক্তিক সে জানে না। সবাই দেখছে। নিশ্চয়ই বিষয়টি ভালো চোখে দেখছে না। তাছাড়া স্যার কেন কিছু বলছে না? বলবে বা কি? নিজের আপন বন্ধু যে। ক্লাসে বসা প্রতিটা স্টুডেন্ট কানাঘুষা ইতিমধ্যে চর্চা করতে শুরু করে দিল। পাখির গাঢ় অস্বস্তি হচ্ছিলো। লোকটা কেন বুঝে না? এটা ক্লাস, স্কুল। তার ক্লাব না। সকলে কুৎসিত দৃষ্টিতে ঘটনাটি দেখছে। যা পাখির নিকট বিরাট বড়ো অস্বস্তি হয়ে ঠেকছে। সে লোকটার হাতের বাঁধন ঢিলা করতে চাইল। কিন্তু পারল না। লোকটা ওর হাত দ্বিগুণ শক্ত করে ধরে রেখেছে। কে কি বলল, কানাঘুষা করল তাতে লোকটার যায় আসে না কিছু।

রমিজ তখন টেবিল মুছছিল। নাওয়াফের সঙ্গে পাখিকে দেখে সে কিছুটা চমকালো। সত্যি সত্যি কি তাদের ভাই ভাবিকে ধরে এনে বিয়ে করে নিবে? নাওয়াফ পাখিকে চেয়ার টেনে দিয়ে বলল, “বোস।”

পাখি অস্বস্তি আর অস্থিরতা নিয়ে আমতা আমতা করে বসল। লোকটাও চেয়ার টেনে ওর মুখোমুখি হয়ে বসল। ওর নিচু বদনটা ধরে উঁচু করে নিল। পুরুষালি কুচকুচে ভ্রু দুটো নাচিয়ে জানতে চাইল, “গতকাল কি কি ঘটেছিল? সবটা এখন আমায় বলবি। সময় মাত্র ফাইভ মিনিটস। একটাও যেন চিপায় চুপায় আটকে না থাকে।”

পাখি নীরব রয়। সে উত্তর দেয় না। চোখের জল গাল গড়িয়ে নিচে পড়ছিল। তার আগেই নাওয়াফ হাত পাতল। নোনাজলগুলি গড়িয়ে গিয়ে পুরুষালি হাত স্পর্শ করল। জলটুকু নিজের মাথায় সযত্নে সুতনু পুরুষটি মুছে নিল। ওর ওপর গভীর দৃষ্টি ফেলে নাওয়াফ আবারও বলল, “চোখের জল বিসর্জন দেওয়ার জন্য তোকে ডেকে আনিনি। দেখ তুই যদি না বলিস তাতে সমস্যা নেই? আমি কোন না, কোন ভাবে জেনে যাব। বাট সেটা তোর জন্য ভালো হবে না। আমি সরাসরি তোর মুখ থেকে শুনতে চাইছি।”

পাখি এবার মুখ খুলতে যাচ্ছিল। নাক টানল সে। নাওয়াফ ফোঁস করে তপ্ত শ্বাসটুকু ফেলে ওর দিকে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিল। পাখি হাত বাড়িয়ে নিল। নাক মুছল সে। তারপরে ছোট স্বরে বলতে শুরু করল, “আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখি আপনার আম্মা আর ফুফু বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছে। তারা আগামী শুক্রবার বিয়ে ঠিক করেছে। হাতে বালা, আংটি আর চেইন পরিয়ে গেছে। এই দেখুন এসব সবই আপনার পরিবারের। আমি বিয়েতে সম্মতি দেইনি বলে খালামনি পিটিয়েছে। চুল ধরে টেনেছে। গালে চড় দিয়েছে। খাবারের খোটা দিয়েছে।” অভিযোগগুলি ভাঙা ভাঙা গলায় করেই পাখি ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিল।

নাওয়াফ আরেকটু ওর কাছাকাছি ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। পাখির মাথাটা টেনে তার বুকের মাঝটাতে রাখল। ওর কপালে চুমু খেলো। পাখি লোকটার হৃদপিণ্ডের গতিবেগ অনুভব করতে পারছিল। কেমন দ্রিম দ্রিম আওয়াজ। সে দ্রুত সরে যেতে চাইছিল। পারল না। লোকটা কড়া হুশারি দিল, “উঁহু নড়বি না। একটুখানিও যদি নড়িস না? ওনারা যেটা পরে করবে ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা আমি এক্ষুনি করে দেখাব। সোজা কাজি এনে বিয়ে, হাত ধরে তোকে আমার ঘরে নিয়ে যাব। সেসব না চাইলে যেভাবে আছিস, চুপচাপ ওভাবে থাক।”

পাখি লোকটার শাসানোতে প্রচন্ড ভয় পেল। লোকটা যা রাগি! ওমনটা করতেও সময় নিবে না। সে নড়ল না। নাওয়াফ শীতল গলায় ওকে বলল, “মানুষ ওমন করে কার কাছে অভিযোগ করে জানিস বোকাটা?”

পাখি দুদিকে মাথাটা ডানে-বামে ঘুরালো। না সে জানে না। নাওয়াফ ওর অবুঝ মুখটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে এক টুকরো সোনালি রৌদ্রের ন্যায় ঝলমল করে হাসল। এই প্রথম পাখির মনে হলো লোকটার হাসি আসলেই সুন্দর। উঁহু সে একটু ভুল বলল। শুধু সুন্দর নয়; মারাত্মক সুন্দর।

নাওয়াফ জানত জবাব পাবে না। তবুও সে আবার বলে, “যাকে মানুষ বেশি আপন ভাবে, কাছের ভাবে এবং ভালোবাসে, নিরাপদ মনে করে। তার কাছেই নির্দ্বিধায় এসব অভিযোগের ডালা নিয়ে বসে। এর দ্বারা কি বোঝায়, হুঁ?”

পাখি পুরুষালি চওড়া সুঠাম বক্ষ থেকে মাথাটা উঁচু করে লোকটার মুখটার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে বলে, “ কিন্তু আমি তো আপনাকে ভালবাসি না।”

নাওয়াফ নীরবে মুচকি হাসল।

“আমি তো বলিনি তুই আমাকে ভালোবাসিস। তাহলে ওই কথা তুলনি কেন? এখন তো আমার মনে মনে বিশ্বাস হচ্ছে তুইও আমাকে পছন্দ করিস। আর উপরে উপরে ভাব মারাও না?”

পাখি নাওয়াফের বুক থেকে সরে যেতে যেতে বলল, “বিশ্বাস করুন আমি ওমন নই।”

লোকটা ভ্রু দুটো কুঁচকে ঠোঁট কামড়ে জানতে চাইল,

“কেমন?”

“আপনাকে ভালবাসি না।”

“তাহলে এতক্ষণ আমার বুকের সঙ্গে লেপ্টে রইলি কেন?”

“আপনিই তো জোর করলেন।”

“আর তুই রাজি হয়ে গেলি?”

“তা না হলে তো আবার মারতেন।”

“উঁহু মারতাম না। আমি পরীক্ষা করে দেখছিলাম তুই আসলে কতটা আমার বাধ্যগত। পরীক্ষা পাশ করেছিস। মার্ক সব দিব বিয়ের পর। এক সঙ্গে এক হালি আন্ডাবাচ্চার মা করে।”

“আমি আপনার আন্ডাবাচ্চার মা হব না।”

“তোকে আমার আন্ডাবাচ্চার মা হতে হবে না। ওদের জনক জননী হলেই চলবে।”

পাখির মুখটা কাঁদোকাঁদো হয়ে এলো। কাকে কি বোঝায় সে? সে উঠে চলে যাচ্ছিল। নাওয়াফ খপ করে ওর হাত ধরে ওকে বসাল। চোখ দুটো রাঙিয়ে ধমকে বলল, “আমার কথা শেষ হওয়ার আগে এক পা উঠালেও তোর ঠ্যাং কেটে ঘরে বসিয়ে রাখব।”

পাখি নিচু বদনে মিনমিনে বলে,

“আপনি কথায় কথায় এতো ধমক দেন কেন?”

“তুই আমার কথা শুনলে তো ধমক দিতে হয় না। এবার বল আমাকে বিয়ে করতে তোর এত আপত্তি কিসের? মিথ্যে বললে কিন্তু চড় খাবি।”

“অতিরিক্ত শাসন আমার পছন্দ নয়। যেটা আপনি করেন।”

“শুধু এতটুকুই?”

“উঁহু, আপনার আর আমার বয়সের পার্থক্য অনেক। বিয়ের ক্ষেত্রে এতটা গ্যাপ নেওয়া উচিত না। শেষে আপনার মতামতের সঙ্গে আমার মতামত মিলবে না। আমার যা ভালো লাগবে, আপনার তা লাগবে না। অতএব বিয়ের ক্ষেত্রে এসবের মূল্যায়ন করা জরুরি।”

“আর কিছু?”

“না।”

“এবার আমি বলি। শোন, অতিরিক্ত শাসন সেই করে পাখি, যে তোকে ভালোবাসে। তোকে শাসনও করবে সে, যে তোর ভালো চায়। কিন্তু কখনো আমি তোর স্বাধীনতা হস্তক্ষেপ করব না। দ্বিতীয় কথাটি হলো বয়সের ভেদাভেদ। শোন পাখি বয়স কোন ফ্যাক্ট না। তোর আগে আমার জন্ম হয়েছে এটা পাপ না। কিন্তু তোকে না পাওয়াটা আমার কাছে এক যুগ সমান পরিমাণ কষ্ট হয়ে রবে। আমি তোকে যে কোন মূল্যে পেতে চাই পাখি। তোর মতামতের গুরুত্ব অবশ্যই আমি দিব। তোর যা ভাল লাগবে, তাতে কখনো হস্তক্ষেপ করব না। তবুও তুই বিয়েতে রাজি হয়ে যা লক্ষ্মীটি। দেখ বিয়ে হয়ে যাওয়া মানে এই নয় যে, তোর স্বাধীনতা কেড়ে নিব। তোর ভাললাগাকে আমি ত্যাগ করতে বলব। আমার কাছ থেকে তুই সব রকমের ফ্রিডম পাবি। তুই শুধু একবার বল রাজি। বাকিটা আমি বুঝে নিব।”

“ওটা হয় না নাওয়াফ ভাই। পরে আপনি আফসোস করবেন।”

“কেন করব?” জানতে চাইল নাওয়াফ।

“বাবা-মাহীন এতিম মেয়েকে বিয়ে করার কারণে।”

“চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিব বেয়াদপ মহিলা।”

পাখি হাসল।

“হাসছিস যে?”

“এমনি।”

“শোন, এখন বিয়ে হওয়া মানে এই নয় যে, বিয়ের পরপরই তোকে আমি তুলে আনব। বিয়েটা শুধু এখন হয়ে থাকবে। যেহেতু মুরব্বি দুজন লোক কথা দিয়ে এসেছে। তাদের কথা তো অস্বীকার করা যাবে না। তো তোর যখন ইন্টার শেষ হবে। তখন তুলে আনব। আপাতত বিয়েটা হবে। তোর পড়ালেখায়, চলাফেরায় কোন সমস্যা হবে না। এবার বল রাজি? এখন রাজি না হলে তোর মাথায় আস্ত একটা ইট ফাটাব আমি।”

পাখি হকচকিয়ে ওঠল। কি সাংঘাতিক কথা! রাজি না হলে সোজা মাথায় ইট ফাটাবে! সে তড়িৎ বলল, “না না, ইট ফাটিয়েন না। আমি রাজি। আপনাকেও কথা রাখতে হবে। ইন্টারের আগে তুলে নিতে পারবেন না কিন্তু।”

নাওয়াফ ভীষণ খুশি হলো। বুকের ভেতর থেকে যেন একটা ভারী শক্ত পাথর নেমে গেল। খুশিতে তার মুখটা ঝলমল করছে। সে বলল, ”শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। তুই রাজি হয়েছিস তাতেই আমি খুশি। আর কি চাই আমার? আমি আমার কথা রাখব। কিন্তু তোকেও কথা দিতে হবে, কোন জায়গায় গলা টানা টোনা দিতে পারবি না। টাংকি মারতে পারবি না। আমি ছাড়া কোন পুরুষের দিকে তাকালে, সোজা গজাল পুড়ে তোর চোখ দুটো তুলে ফেলব। দরকার পড়লে কানা বউয়ের সঙ্গে সংসার করব।”

“নিখিল ভাইয়ের দিকে তাকালেও?”

“একবার তাকাবি ওর দিকে। তিনবারের বেশি তাকাতে পারবি না।”

“ঠিকাছে।”

“এখন বল কি খাবি?”

“কিছু না। আগে ক্লাসে দিয়ে আসেন। ক্লাসে এতোক্ষণে চর্চা কয়েক দফায় আপনাকে আমাকে নিয়ে করা শেষ।”

নাওয়াফ চাপা হাসল।

“চল।” বলেই পাখির হাত ধরে আবারও স্কুলের দিকে ফেরত গেলো। পাখিকে ক্লাসে দিয়ে আবার ক্লাবে ফেরত এলো। ফোন ঘেটে কল বসাল চিরপরিচিত একটা নম্বরে। ফোনের ওপর পাশ থেকে রিসিভ হতেই ভারিক্কি গলায় শক্ত কয়েকখান সে কথা শোনাল। সে বলল, “আপনার কোন হাত কাটলে বেশি সুবিধা হবে বলেন তো? ডান হাত, না বাম হাত?”

ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিটি বুঝি তার থেকে এ রকম কিছু আশা করেনি। সে কিছুটা চমকপ্রদ হলো। খানিকটা ভড়কালোও। নাওয়াফ পুনরায় বলল, “দ্বিতীয়বার ওর গায়ে শুধু হাত তুইলেন। আমি নাওয়াফ তালুকদার আপনার হাত দুটো সযত্নে কেটে নিব।”

#(চলমান~)

#লামইয়া_তাসনিম।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন