#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(১৫)
আজ পাখির বিয়ে। সকাল থেকে ধুমধামে মোল্লা বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় আয়োজন চলছে। নানান রকম রান্নায় পুরো বাড়ি ম-ম সুভাস ছড়াচ্ছে। বাড়িতে ইতিমধ্যে মেহমানে ভরে এসেছে। বিয়েটা মূলত হবে মসজিদে বসে। খেঁজুর ছিটিয়ে। পুরোপুরি ইসলামিক নিয়মে। সকাল থেকে নাওয়াফ পুরা এক্সাইটেড। জীবনের নতুন এক অধ্যায় পা দিতে শুরু করেছে। যে জীবনে প্রবেশ করবে এক নারী। তার পুরো ঘরে ছড়িয়ে দিবে জান্নাতি সুভাস। তার হৃদয় করবে দখল। যার ভাল থাকা, ভাল লাগা, যাবতীয় দায়িত্ব সে কাঁধে তুলে নিবে। ভাগাভাগি করে নিবে দুজন দুজনের সুখ দুঃখের ভালোবাসার কথা। গতকাল সারারাত সে ঘুমায়নি। একে তো কাজের ব্যস্ততা। তার ভিতরে নিজের প্রিয় নারীকে নিজস্ব করে পাওয়ার আনন্দে দুচোখে ঘুম নামেনি। তার ভিতরে অজানা অপার্থিব কিছু দুঃশ্চিন্তা এসে মস্তিষ্কে হানা দিয়েছিল। দুপুরের দিকে সকল রকম প্রস্তুতি নিয়ে তারা মসজিদে বিবাহের যাত্রা শুরু করল।
তখন জুম্মার নামাজের পর মুহূর্ত। সকলে মসজিদে উপস্থিত । পাখির জন্য বিয়ের সাজের লাগেজ পাঠানো হয়েছে। বিয়ের পর বরসহ বরের আত্মীয় স্বজনরা পাখিকে দেখতে আসবে। নাওয়াফ তো আবার আজ রাতে থাকবে এখানে। এজন্য বাসর ঘরও সাজানো হচ্ছে। দুপুর দুটোর দিকে বরের পিতাসহ দুজন লোক এলো। রেজিস্ট্রার পেপারে তো সাইন করতে হবে। তাহিরা পাখিকে ডাকতে রুমে এলো। রুমে গিয়ে দেখল পাখি রুমে নেই। সমগ্র রুম ফাঁকা। অজানা ভয় আতঙ্কে তাহিরার বুকটা হঠাৎ ছ্যাৎ করে ওঠল। গেল কোথায় মেয়েটা? বাথরুমে গেল না তো? সে বিছানায় বসে কতক্ষণ অপেক্ষা করল। প্রায় দশ পনের মিনিট বসে রইল। তবুও ওর দেখা নাই। এবার তার অন্তরালের চিন্তা বাড়ল। মেয়েটার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে দিচ্ছিল। এজন্য পালালো না তো আবার? ওইদিকে বসার ঘর থেকে ডাক আসতেছে বার বার।
“কনেকে ডাকুন। আমরা তার স্বাক্ষর নিয়েই চলে যাব।”
তাহিরার মাথা কাজ করছে না। সে নিখিলের আম্মার কাছে বিষয়টি জানাল। নিখিলের আম্মার চোখে মুখে গাঢ় অন্ধকারের ছায়া নেমে এলো। সে নিজে গেল এবার চেক দিতে। খাটের নিচ, ওয়ারড্রবের আশপাশ সব জায়গায় খুঁজল। টয়লেটও বাদ দিল না। তবুও পাখিকে পাওয়া গেল না। ঘটনাটি এখন কিভাবে জানাবে সে বুঝতে পারছে না? বসার ঘরে নাওয়াফের পিতাসহ চাচা বসে আছে। সঙ্গে উকিল। এখন যদি এই বিয়ে ভেঙে যায়; তাহলে কে করবে পরবর্তীতে এই মেয়েকে বিয়ে? সকলে তো বলবে মেয়ে ভেগে গিয়েছে। তার মাথা কাজ করা পুরোপুরি বন্ধ করে দিল। তাছাড়া এ বিয়ে না হলে ফাতিহা নুরের সঙ্গে তার লম্বা একটা দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। সেই দূরত্ব হতে পারে পারিবারিক বিচ্ছেদও। কথা শোনাতেও পিছ পা হবে না। খবরটি সরাসরি ওনাদের দেওয়াও যাবে না। নিখিলকে জানাতে হবে। না না, এ ক্ষেত্রে নাওয়াফকে জানানোই ভাল। ছেলেটা বুঝদার। পরিস্থিতি সামলে ফেলতে পারবে। যদিও মনে কষ্ট পাবে। তবুও জানাতে হবে। পাখিও না। মেয়েটা কেন পালালো? অন্য কারোর সঙ্গে সম্পর্ক আছে নাকি? এবার তার দ্বিগুণ টেনশন হচ্ছে। যদিও এমন মেয়ে পাখি না। যতটুকু চিনেছে, বেশ সরল। তবুও আজকালের ছেলে মেয়েদের বিশ্বাস নেই। সে নাওয়াফকে কল লাগালো। নাওয়াফ কল কেটে ব্যাক করল। নিখিলের আম্মা রাহি বলল, “বাবা, পাখিকে তো কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না? মেয়েটা গেল কোথায় তাও জানি না। সকালেও দেখে ছিলাম। দুপুরের পর কাজের জন্য আর খেয়াল হয়নি।”
কথাটা শোনা মাত্র নাওয়াফের মাথায় যেন বজ্রপাত পড়ল। মসজিদের ভিতরে তখন তাকে ঘিরে সকল বন্ধুরা বসা। সবার সামনে সে কিছু বলতেও পারছে না। ঘামছে সে। মুখটা শুকনো দেখাল। সে ‘আসছি’ বলে ওদের সাইড কাটিয়ে একটু বাহিরে বের হলো। মাথার টুপি হাতে নিয়ে জিগ্যেস করল, “কিসব বলছো বড়ো মামুনি, মাথা ঠিকাছে তোমার?”
“তুই তাহিরার সঙ্গে কথা বল নাবু। আমার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। আমি হচ্ছি প্রেশারের রোগি। এত টেনশন নিতে পারি না।”
তাহিরা ফোন হাতে নিয়ে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিল। চক্ষু লজ্জা আর মানসম্মান হারানোর ভয়ে তার চোখ দুটো আজ ভীষণ কাঁদছে। অসহায় ঠেকছে নিজেদের। সে কান্না থামিয়ে চক্ষু লজ্জা সব ঝেড়ে বলল, “নাবু সব দোষ আমার। মেয়েটার কোন দোষ নেই। ও এ বিয়েটা করতে রাজি ছিল না। বার বার বিয়েটা ভাঙতে বলেছিল। আমি ওর কোন কথা শুনিনি। জোর করেছি। ভেবেছি বিয়ের পর তোর কাছে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই আমি ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে এই বিয়েটা দিচ্ছিলাম। তারই প্রতিশোধ নিল সর্বনাশি আজ। তুই একটু আয় বাড়িতে। আমার ভীষণ ভয় করছে। তোর বাবাকে কি জবাব দিব? ওনারা যে এখনো বসার ঘরে কনের অপেক্ষায় বসে আছে।”
পুরো ঘটনাটি বিস্তারিতসহ তাহিরার মুখ থেকে নাওয়াফ মনযোগ দিয়ে শুনল। সেই গতকাল রাত থেকে তার মনের অভ্যন্তরে একটা খুতখুতানি ভাব ছিল। অচিরে কিছু যেন একটা দুর্ঘটনা ঘটতে চলেছে মন তা আগে থেকেই আগাম বার্তা দিয়েছিল। তাই তো সারা রাত ধরে অক্ষিজোড়ায় এক ফোঁটাও নিদ্রা নামেনি। তার বুকটা বড্ড ভারী ভারী মনে হলো। চিন চিন করে জ্বলছেও। এত ভালোবাসার পরেও মেয়েটা তার সঙ্গে বেইমানি করল! ছলনার আশ্রয় নিল! অথচ সেদিন কি সুন্দর নাটকটাই না করল? বলল, বিয়েতে সে রাজি। আর কোন আপত্তি নেই। অভিনয়ে নারী সেরা রে, সেরা।
নাওয়াফ নিখিলকে ফোন করল। নিখিল তখন মসজিদের মধ্যেই ছিল। নাওয়াফের ফোন পেয়ে নিখিল আশ পাশ এক পলক চোখজোড়া বুলিয়ে নিল। নাওয়াফকে দেখতে পেল না। মনে মনে বিড় বিড় করল সে, “গেল কই ওইটায়?”
নাওয়াফকে দেখতে না পেয়ে দৃষ্টিজোড়া ফোনের স্ক্রিনে পুনরায় ফেরত এনে নিখিল ফোন রিসিভ করে কানে চাপল।
শুনতে পেল নাওয়াফ তাকে সতর্ক গলায় বলছে, “শোন, এখন যা যা বলব, সব শুনবি। বারতি একটা কথাও বলবি না।”
কেন জানি নিখিলের অজানা কারণে সন্দেহ হতে লাগলো। সেই সঙ্গে টেনশন আর ভয় একসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এতটুকু সময়ের মধ্যে কি এমন ঘটল? মাত্রই তো নাওয়াফ বেরিয়ে গেল। সে শোনার জন্য পূর্বপুস্তুতি নিল। নাওয়াফের পুরুষালি ঠোঁট দুটো শুকনো ঠেকল। গলাটা তৃষ্ণায় মরিয়া হয়ে ওঠছে। সে জিভের তলে নিকোটিনে পোড়া ঠোঁট দুটি কিঞ্চিৎকর ডুবিয়ে নিল। তৎপর ঠোঁট নেড়ে বলল, “পাখি পালিয়েছে।”
নিখিলের চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার যোগাড়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সে। বিস্ময়ে মুখ হতে আপনাআপনি বেরিয়ে এলো, “কীহ!”
শব্দটি বুঝি একটু বেশি সাউন্ড হয়ে গেল। আশপাশে থাকা লোকজন নিখিলকে উদ্ভব চোখে দেখতে লাগল। যা তার নিকট খানিকটা লজ্জা আর বিভ্রান্ত লাগল। সে সরি বলে জানলার পাশটাতে গেল। আবারও শুনল নাওয়াফ বলছে, “ মসজিদে যারা আছে তুই তাদের নিয়ে মসজিদ থেকে এখন বেরিয়ে যা। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি পাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আপাতত বিয়ে দুটো দিন পর হবে। তাদের খাবার খাইয়ে বিদায় কর।”
নিখিল আশপাশ সতর্ক চোখে এক পলক তাকিয়ে বলল, “সে না হয় মেনেজ করে নিলাম। কিন্তু চাচ্চু আর মেজ মাকে কি বুঝ দিবি?”
“চিন্তা করিস না। এক ব্যবস্থা হবেই। একটু তাড়াতাড়ি আয় ভাই। আমি মসজিদের পিছনে আছি। হাত পা কাঁপছে আমার। হাঁটার শক্তি পাচ্ছি না। বুকটাতে আগুন ধরিয়ে দিল আমার। কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। কাকে বলব আমি এই মনের কষ্টের কথা? ও কেন এমনটা করল ভাই? আমার কেমন জানি লাগছে নিখিল? শরীর ঘাম দিচ্ছে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। জিভটা জলশূণ্যতায় ভুগছে। আমি মনে হয় পড়ে যাব।”
নিখিলের বুকটা হঠাৎ ছ্যাৎ করে ওঠল। পাখিকে নাওয়াফ কতটা ভালোবাসে সেটা তো নিজ চোখে দেখাই। তবুও পাজিটা কেন এই আকামটা করেছে কে জানে। সামনে থাকলে গাল ফাটিয়ে একটা চড় বসিয়ে দিতো। সে নাওয়াফকে শান্ত করতে বলল, “এ ভাই তুই ঠিক আছিস? দেখ কিছু হয়নি। শয়তানি পালিয়ে যাবে কই? দরকার পড়লে আকাশ পাতাল এক করে খুঁজে এনে তোর সঙ্গে বিয়ে দিব। পাখি শুধু নাওয়াফের। প্রতিটা এলাকায় মাইকেন করে এ বার্তা ছড়িয়ে দিব। ব্যানার পোস্টার লাগিয়ে ছাপিয়ে রাস্তায় রাস্তায় টানিয়ে দিব। তবুও তুই শান্ত হ ভাই। কিছু হয়নি। আমরা আছি তো। আমরা থাকতে তোর এতো টেনশন কিসের?”
নিখিলের কথা নাওয়াফের কানে কি ঢুকল?
সে ‘রাখছি’ বলে কল কেটে দিল। কণ্ঠটি ভাঙা ভঙা আর ক্রন্দনরত শোনাল। নিখিল দেখল তার কষ্ট লাগছে। কেননা নাওয়াফের শেষ অক্ষর কথাটি ছিল ভাঙা হৃদয়ের।
কিছুক্ষণ আগে বিয়ের আনন্দে যেই বাড়িটি রবদব সাজে সজ্জিত ছিল। সেখানে এখন ভিড় করেছে একরাশ দুঃশ্চিন্তা। বেনামি বেদনার দিনের সুর। নাওয়াফ মোল্লা বাড়ি পৌঁছাল। বাড়ির মেইন ফটকে ঢুকে দেখল তার বাবা আর উকিলসহ দুজন লোক বসা। তার চাচ্চু বোধহয় চলে গেছে। ওনাদের সামনে নাস্তার প্লেট। তারা লেখালেখির কিছু কাজ করছে। নাওয়াফ গিয়ে তার বাবা মেজবান তালুকদারের পাশে নৈঃশব্দ্যে বসল। তার বাবাকে বলল, “আব্বু আমি কিছু কথা বলতে চাই।”
মেজবান তালুকদার মুখে এক কোয়া কমলা নিয়ে চিবাতে চিবাতে প্রত্যুত্তরে বললেন, “বলো, আমি শুনছি।”
“আমি এই বিয়ে করব না আব্বু।”
মেজবান তালুকদারের মাথায় যেন বসা অবস্থাতে বিনা ঝড়ে বজ্রপাত পড়ল। সে মাত্রাতিরিক্ত অবাক হলো।
“বিয়ে করবে না মানে? বিয়ে করবে বলে কত লাফালাফি করলে? কতজনের ঘুম হারাম করলে? আর এখন বলছো বিয়ে করবে না? এসব কি নাওয়াফ? বিয়েটা তোমার কাছে ছেলেখেলা মনে হচ্ছে? যখন ইচ্ছে হবে খেলবে, যখন ইচ্ছে হবে খেলবে না?”
“আহা! তুমি ভুল বুঝছো আব্বু। বিয়ে করব না মানে এই নয় যে আমি আর কখনো বিয়ে করব না। বিয়ে আমি করব। কিন্তু সময় চাই। পাখি এখনো বিয়ের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। আর এই যে উকিল সাহেব, লেখালেখি ছেড়ে বকশিস নিয়ে ভাগেন। আপাতত বিয়ে হচ্ছে না।”
বিয়ে হবে না শুনে উকিলের চোখ কপালে ওঠল।
“বিয়ে হবে না? কিন্তু কেন?”
“কারণ মেয়ের বিয়ের বয়স হয়নি। এখনো সে বিয়ের উপযুক্ত নয়। এত ছোট মেয়ে বিয়ে করে শেষে বাল্যবিবাহের মামলা খাব নাকি?”
“তাহলে এখন আমি কি করব?”
“পশ্চিমের রাস্তা মাপুন।”
মুখটা কালো করে উকিল চলে যাচ্ছিল। নাওয়াফ পিছু থেকে ডেকে বলল, “চিন্তা করবেন না উকিল সাহেব। আমার বিয়ের উকিল আপনিই হবেন।”
ওইটুকু শুনে উকিলের মনটা একটু ভালো হলো। কিন্তু মেজবান তালুকদারের মাথা ঘুরছে। তার টেনশনে প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। ছেলেটা পেয়েছে কি? সব বিষয় নিয়ে ফাজলামি। বিয়ে করবে না আগে বলত। বিয়ের আয়োজন করে কাজি ডেকে এনে উকিল ডেকে এনে এখন বলছে সে বিয়ে করবে না। তার তো পিঠের ওসব এই বয়সে দুটো দিতে মন চাইছে। নাওয়াফ মেজবান তালুকদারকে ইশারায় জিগ্যেস করল, “তুমি বসে আছো কেন? মিষ্টি খেয়ে যাবে? অর্ডার দিয়ে আনিয়ে নিব মিষ্টি?”
“ফাজলামো করা বন্ধ করো। এই বয়সে এসব কমনসেন্স নিয়ে আসো ইয়ার্কি করতে। লোকজনের সামনে নাক কাটলে আমার। আসো আজ বাসায়। যাচ্ছি এখন।” বলেই মেজবান তালুকদার রেগে উঠে বেরিয়ে গেলেন।
পর্দার আড়ালে থাকা পাখির বড় খালা আর তাহিরা একটু স্বস্তি পেল। খুব ঠান্ডা মাথায় ছেলেটা ব্যাপারটা মেনেজ করে নিয়েছে। বুঝতেই দেইনি কাউকে পাখিকে যে বাড়ি থেকে পালিয়েছে। সে উঠে গিয়ে পাখির রুমে ঢুকল। গিয়ে দেখল খাটের ওপর তার দেওয়া লাগেজটা পড়ে আছে। বিছানার ওপর ভারী দামি জামদানি শাড়িটা। জানলা সব বন্ধ। সে চুপ করে খাটটার একটা পাশে গিয়ে বসল। জামদানি শাড়িটা টেনে হাতে নিল। এক ধ্যানে শাড়িটার দিকে কতক্ষণ নির্বিকারে চেয়ে রইল। কত স্বপ্ন ছিল! কত আশা! এই শাড়িতে বউ রূপে দেখবে তার নিজস্ব নারীটিকে। আজকে রাতেই মন ভরে তার ওকে দেখার কথা ছিল। কাছে টানার কথা ছিল। ওর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিটা পশমের গোড়ায় গোড়ায় তার বিচরণ করার কথা ছিল। নরম আদরে আর ভালোবাসার প্রতিটা শিহরনে ওকে কম্পন জাগানোর কথা ছিল। সবকিছু পায়ে ঠেলে পালাল সে। ধোঁকা দিল তাকে। যদি ধোঁকাই দিবে তাহলে সেদিন ওমন আশা দেখাল কেন? মন থেকে কিছু তিক্ত কথা বেরিয়ে এলো, “ তুই নিষ্ঠুররে পাখি। বড্ড পাষাণ। এতো পাষাণ তো হওয়ার কথা ছিল না। তাহলে কেন হলি? আমার ভালোবাসা পায়ে ঠেলতে তোর বুকটা একটুও কাঁপল না?”
তাহিরা দরজা ঠেলে রুমে ঢুকল। নাওয়াফের চোখ জোড়া একটু জ্বললো। তাহিরা আসার আগেই সে ভেজা চোখ দুটো আড়াল করে নিল। কঠোর গলায় জিগ্যেস করল, “ওর সঙ্গে তখন এই রুমে কে ছিল?”
নাওয়াফের অন্ধকারে থাকা মুখটা এক ঝলক দেখে তাহিরা জবাব দিল, “ইচ্ছে। ”
“ওকে ডাকুন।” শান্ত আর ভেজা শোনাল তার গলা।
“ডাকতে হবে না। ও আমার পেছনেই আছে।”
“ইচ্ছে এখানে আয়। হ্যাঁ দরজাটা আটকে আসিস।” কথাটা নাওয়াফ বলল।
ওমন জলদ গম্ভীর গলা শুনে ভয়ে রীতিমতো ইচ্ছের বুকসহ দ্রিম দ্রিম করে কাঁপতে লাগল। পাখি পালিয়েছে। তার দোষে শাস্তি সে পাবে না তো! কিন্তু সে তো সম্পূর্ণ নির্দোষ। এই বিষয়ে তার জানা নেই কিছু।
“কি হলো কথা কানে যাচ্ছে না তোর?”
ঝংকারের মতন বাক্যগুলি শুনে ইচ্ছে একটু হকচকাল। সে বলল, “জি আসছি।” বলেই সে ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিল।
“এখানে এসে বস।”
ইচ্ছে নাওয়াফের পাশে গিয়ে বসল। নাওয়াফ ধারালো চোখ দুটো এবার উপরে তুলল। লালচে হয়ে আছে সাদা অংশটুকু। মণি জোড়া শক্ত আর স্থির। রেগে আছে না কাঁদছে বোঝার মতন অবকাশ নেই। তীরের মতন সুচাল চোখ দুটি ইচ্ছের ওপর স্থাপিত করে ভরাট গলায় শুধাল, “পাখি কোথায়?”
ইচ্ছের এবার ভয়ে রীতিমতো হাত পা কাঁপছে। সে নাওয়াফের দুপা চেপে ধরে নিচু হয়ে বসে ঝরঝর করে দুচোখের পানি ছেড়ে দিয়ে কেঁদে দিল।
“বিশ্বাস করুন নাওয়াফ ভাই, আমি এসব কিছু জানি না। ও কোথায় গেছে তাও জানি না?”
লোকটা ভ্রু দুটো কুঁচকে ফেলল।
“জানিস না? কিন্তু ওর সঙ্গে তো তুই একই রুমে ছিলি।”
ইচ্ছে নাক টেনে বলল, “হ্যাঁ, এক সঙ্গেই ছিলাম। কিন্তু উকিল আসার আগে ওর শাড়ি পরার কথা ছিল। ও ব্লাউজ পরবে বলে আমাকে বাহিরে পাঠিয়ে দিল। আমার আবার নিজের ড্রেস আনার কথা মনে ছিল না। তখন আমি খালামনিকে বলে ড্রেস আনতে বাড়ি গিয়েছিলাম। এসে শুনি ও পালিয়েছে।”
“ওর কি কারোর সঙ্গে রিলেশন ছিল? কাউকে পছন্দ করতো? যার জন্য সে পালিয়েছে।”
“না, এমন কিছু না।”
“তোর অজানাও তো থাকতে পারে। তোকে শেয়ার করতেও না পারে।”
“না না ভাইয়া। ওর কারোর সঙ্গে রিলেশন নেই। থাকলে আমায় বলতো। ওর পেটে সহজে কথা পচে না।”
“তাহলে বেয়াদবটা পালালো কেন?”
“সেটা তো আমিও বুঝতে পারছি না।”
“ওর আর কোন বান্ধবী আছে?”
“হ্যাঁ, আমাদের সঙ্গে আরও তিনজন আছে।”
“ওদের ফোন নাম্বার জানা আছে?”
“আছে।”
নাওয়াফ ওর দামি আইফোনটি ইচ্ছের হাতে ধরিয়ে দিল। “নে কল কর ওদের। পাসওয়ার্ড মাই কলিজা দেওয়া। জিগ্যেস করবি পাখির কথা। পালিয়েছে তা বলবি না। বলবি বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে গেছে।”
ইচ্ছে ‘আচ্ছা’ বলে মাথা ঝাঁকাল।
পাসওয়ার্ড খুলতেই ইচ্ছের চোখে সর্ব প্রথম পড়ল পাখির কাজল দেওয়া মায়াবি একটা মুখ। কত যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে মোবাইলের স্ক্রিনে ছবিটা! এতো ভালোবাসা পাওয়ার পরেও পালানোর কি দরকার ছিল? কোন অসুবিধা থাকলে নাওয়াফ ভাইয়ের সঙ্গে মিলে মিশে কথা বলে সমাধান করে নিতি। তাই বলে পালাবি তুই শয়তানি, কুত্তি, ডাইনি? তাও আমাকে ফাঁসিয়ে পালিয়েছে। আমি অভিশাপ দিলাম তোরে। তোর কপালে যেন নাওয়াফ ভাই জোটে। দুই কুড়ি সন্তান হয় তোর।
ইচ্ছে এক পলক আড় চোখে তার পাশে নিঃশব্দে বসে থাকা পুরুষটির দিকে চাইল। খুবই শান্ত ভঙ্গিতে বসা সে। দু আগুলের ভাঁজে জ্বলন্ত সিগারেট। অন্ধকারের মাঝে সিগারেটের মাথাটি জ্বলজ্বল করছিল। তিনি নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছেন? আর পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। এতো এতো ভালবাসল। আর দিন শেষে তাকে দুহাত ভর্তি দুঃখ পেতে হলো। জনম ভরেই এইগুলা। কেউ ভালোবাসা পাওয়ার জন্য হাহাকার করে। কেউ ভালোবাসা পেয়েও পায়ে ঠেলে। সে তার বান্ধবীদের একে একে সবাইকে কল করল। কারোর বাসাই পাখি যায়নি। নাওয়াফ সবটা পাশে বসে শান্ত ভাবে দেখল। ইচ্ছের এবার ভয় করছে। নাওয়াফের শান্ত থাকাটা তার ভয়ের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে ফোন নাওয়াফের দিকে এগিয়ে দিল। নাওয়াফ ফোনটা নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে নিল। সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটুকু পায়ের নিচে পিষে মুখ দিয়ে নিকোটিনের ধোঁয়া বের করতে করতে ভারিক্কি কণ্ঠে বলল, “৭২ ঘণ্টার ভিতরে ওকে আমি খুঁজে বের করব। আর না পারলে ওর সামনে কোনদিন এই মুখ নিয়ে দাঁড়াব না। এলাকায় আর কোনদিন মুখ দেখাব না। আমি নাওয়াফ তালুকদার যা বলি তাই করি। আমার জবান এক। সেই জবানের কথা কোন নড়চড় হবে না।”
(চলমান)
#লামইয়া_তাসনিম।