#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(১৬)
আজ দুটো দিন হলো পাখি বাড়ি নেই। কোথায় গেছে, কোথায় আছে? সবটা অজানা। এ পর্যন্ত কম খোঁজ লাগানো হয়নি। কিন্তু জানা যায়নি মেয়েটা কোথায় পালিয়ে গিয়ে ওঠেছে? সময় যত গড়াচ্ছে, পরিস্থিতি সবটা যেন হাতের বাহিরে চলে যাচ্ছে। জলজ্যান্ত একজন মানুষ তো আর নিরুদ্দেশ হতে পারে না। নিশ্চয়ই বিয়ের ভয়ে কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে। এইদিকে তাহিরাও ওঁৎ পেতে আছে কবে পাখি বাড়ি ফিরবে? ওর চুল ধরে দুটো আছাড় মারবে সে। মানইজ্জত সব ডুবিয়ে খবিশটা বাড়ি ছেড়েছে।
সময়টা রাত আটটা নাগাদ। কুঠিরের ভেতরে আলো-আঁধারির অন্ধকার। চারপাশে ব্যাঙ আর অজানা প্রাণীর ডাক। কয়েক দল জোনাকি পোকাদের আবার মিটমিট করে সারি বদ্ধভাবে জ্বলতে দেখা গেল। বলতে গেলে মোটামুটি ভালোই বড়ো জঙ্গলটি। সেই জঙ্গলের মধ্যে কাঠের তৈরি একটি ট্রি-হোম মাথা তুলে সজোরে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতরে কয়েক মুঠো আলোক জ্বলতে দেখা গেল। বারান্দায় নীরবে বসা একটা সুবলিষ্ঠ দেহ। হাতের দুআঙুলের ফাঁকে তার জ্বলন্ত সিগারেটটি। সিগারেট পুড়ে পুড়ে নিচে ছাইগুলি ঝরে যাচ্ছে। তাতে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তার বিরস চোখ দুটো আকাশে থাকা ওই চাঁদটার দিকে স্থাপিত। মনের ভিতরে যেন কত শত অজানা অপ্রকটিত ব্যাথা লুকানো। চোখ দুটো নির্ঘুমে জাগ্রত। মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। সেখানে ভিড় করেছে আঁধারের নিকশ ছায়া। হঠাৎ পিছনে কারোর উপস্থিতি পেল। পারফিউম ঘ্রাণে পঞ্চম ইন্দ্রীয় শক্তি আন্দাজ করে নিল কে হতে পারে? সে বলল, “সামনে আয়।”
নিখিল ঠোঁট ছড়িয়ে একটুখানি হাসতে চেষ্টা করল।
“বুঝলি কি করে আমি?”
নাওয়াফ ভারিক্কি কণ্ঠে কথার পরিপ্রেক্ষিতে জবাব দিল,
“অনুমান করলাম।”
নিখিল বেতের সোফায় বসতে বসতে জিগ্যেস করল, “মন খারাপ?”
নাওয়াফ মিছেমিছি হাসতে চেষ্টা করল।
“কেন এমনটা মনে হলো তোর?”
“সত্যিটা ঢাকার চেষ্টা করিস না। সত্যি করে একটা কথা বলবি? তুই কি কেবল ফাহাদের কথা রাখতে দায়িত্ববোধ থেকে পাখিকে বিয়ে করতে চাইছিস, নাকি ওকে ভালোবেসে মন থেকে বিয়ে করতে চাইছিস কোনটা?”
“দুটোই।”
“দুটোই?”
“হ্যাঁ। মৃত বন্ধুকে দেওয়া কথাটা যেমন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনই ওকে নিজের করে পাওয়াটাও আমার গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফাহাদ ওকে নিয়ে কতটা টেনশনে ছিল তা তো তুই জানিসই। পারলে সেদিনই ওর বোনের সঙ্গে আমার বিয়ে করিয়ে দেয়। তখন হয়ত ক্লাস সিক্স সেভেনে পড়ত ও। কতটুকু ছোট ছিল? ফাহাদ বলেছিল বিয়েটা হয়ে যাক। পাখির যখন ১৮ বছর হবে, তখন তুলে নিলেই হবে। আমি রাজি ছিলাম না। ওতটুকু মেয়ে কিভাবে কেমনে বিয়ে করব? বাসর রাতেই তো কেঁদে চোখ ভাসাবে। ফাহাদও ভরসার যোগ্য কাউকে পাচ্ছিলো না। শেষে আমি নিজেই রাজি হলাম। শত হোক সে আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু ছিল। নিজের ভাইয়ের থেকেও বেশি আপন। পাখিকে আমি দেখি ফাহাদের মৃত্যুর দুবছর আগে। তখন ও ক্লাস এইটে পড়ত। প্রথম দেখাতেই ওকে আমার ভালো লাগেনি। হয়ত পিচ্চি বলে। কিন্তু তবুও আমি অপেক্ষায় ছিলাম। ও আরেকটু বড়ো হোক। ভালো ছেলে দেখে ওকে আমি একজনের হাতে তুলে দিব। এটা ছিল আমার নিজের একান্ত সিদ্ধান্ত। কিন্তু কে জানত এই সিদ্ধান্ত একদিন আমার চেইঞ্জ হয়ে যাবে। ২০১৭ সালে মানে ফাহাদের মৃত্যুর পরে ওর সঙ্গে আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়। স্কুল থেকে সবে ফিরেছে। ইউনিফর্ম পরা। চুলগুলি ভীষণ লম্বা ছিল। সেদিন ওর পরীক্ষা ছিল। ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। দু কাঁধে দুটো বেনি ঝুলছিল। লম্বাচূড়াও বেশ ভালো হয়েছে। গায়ের রং আরো উজ্জ্বল হয়েছে। সেই সঙ্গে ওর মুখে এক ধরনের আলাদা একটা স্বচ্ছ মায়া ছিল। আর সবচেয়ে বেশি সুন্দর ছিল ওর চোখ দুটো। কাজলে লেপ্টানো। আগে কখনো ওকে ওমন করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হয়নি। আর দেখা হবে কি করে? ওর জন্মস্থান আর আমার জন্মস্থান ভিন্ন ছিল। সেদিন খুব কাছ থেকে ওকে দেখেছিলাম। ভাইয়ের মৃত দেহ বুকে জড়িয়ে ধরে ও আহাজারি করে খুব কাঁদছিল। ও যখন কেঁদে কেঁদে বলছিল, ‘ভাইয়া তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমি এতিম। আমার মতন মা বাবাহীন এতিমের দায়িত্ব কে নিবে ভাইয়া? আমি যে একেবারে এতিম হয়ে গেলাম।’
জানি না সেদিন ওর ওই কথায় কি ছিল? যা আমার বুকের ভেতরে গভীর করে স্পর্শ করেছে। ওর প্রতি আকর্ষিত হতে বাধ্য করেছে। ওর প্রতি মায়া বাড়িয়েছে। সে মায়া আর কাটাতে পারিনি। সেদিনের সেই কথাগুলি যতবার মনে পড়ত, আমার বুকের ভেতরে তীরের মতন আঘান হেনে খানখান করে দিতো। ইচ্ছে হতো পৃথিবীর সকল সুখ-শান্তি, হাসি, আনন্দ সব ওর পায়ের কাছে এনে ফেলে দেই। জানতাম বয়সের দিক দিয়ে আমাদের মধ্যে একটা ফারাক রয়েছে। তবুও আমি মনটাকে ওর কাছ থেকে বাঁধতে পারলাম না। কেননা ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওর কান্না, ওর হাসি, ওর আনন্দকে ভালোবেসে ফেলেছি। বসিয়েছি ওকে স্ত্রীর স্থানে। রোজ স্বপ্ন বুনতাম ওকে নিয়ে। কত কি করেছি ওর মন পাওয়ার জন্য? ছ্যাচড়ামিও কম করিনি। যেটা আমার বয়সের সঙ্গে একেবারে যায় না। আমি কাউকে বোঝাতে পারি না ওকে কতটা চাই। ওর মায়ায় আমি ভয়ংকরভাবে ফেঁসে গিয়েছি। ভালোবেসে ফেলেছি ওকে। এক সময়ে ছোট বলে যাকে অগ্রাহ্য করলাম। সেই আজ নাকে দড়ি দিয়ে আমাকে ঘুরাচ্ছে। কিচ্ছু করার নেই। ও যত পাগলামি করুক। অভিমান করুক। রাগ করুক। ওকে আমি ভালোবাসবই। বুকে পুষে রাখব। আমি ওকে ছেড়ে দিলে ওকে আগলে রাখবে আর কে আছে বল? ওর না হয় বয়স কম। অবুঝ। কিন্তু আমি তো অবুঝ নই। বুঝদার। একটু অন্যায় যদি করে থাকে। দেই না ক্ষমা করে। তাতে যদি জীবনে একটা পূর্ণতা মিলে।” শেষ করে নাওয়াফ থামল। তার গাল গড়িয়ে এক ফোঁটা জল গড়াল। সে হাসলও একটু। মৃত হাসি।
নিখিল অবাক হয়ে তার সামনে কাঠের মূর্তির মতন বসে থাকা ছেলেটার সুশ্রী মুখপানে চাইল। কত সুন্দর নিখুঁত করে সৃষ্টি! সুবলিষ্ঠ একটা শরীর। যাকে সিক্সপ্যাক বডি বলে। মাথা ভর্তি সিল্কি চুল। যা বাতাসে উড়ছে। মুখের কাঠামোও ভালো। ছাত্রজীবনে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। কত মেয়ের প্রপোজাল পেয়েছে? সে সব তো নিজের চোখেই দেখা। সেই ছেলে কিনা একজন সাধারণ মেয়ের জন্য কষ্ট পাচ্ছে। দোষ তার একটাই। নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা। বদমেজাজি, জেদি, রগচটা ছেলেটাও খুব গভীর করে কাউকে ভালোবাসতে পারে আজ তা স্বচক্ষে সে দেখল। নিশ্চয়ই পাখির ভাগ্য আছে বলতে হবে। কিন্তু বোকটা এমন পাগলামি না করলেও পারতো।
নিখিল লম্বাটে দেহটা থেকে তার দৃষ্টিজোড়া নামিয়ে আনল। মুখ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল সে, “তাহলে আমার ধারণাই সঠিক ছিল। ফাহাদের মৃত্যুর পর পাখির খাওয়া থেকে পড়া, হাত খরচ, বই কেনার যাবতীয় ভরণপোষণের টাকা সব তুই দিতি?”
নাওয়াফ মাথা ঝাঁকাল।
“হ্যাঁ।”
“আমার মনে হয় পাখিকে একবার জানানো উচিত ফাহাদ যে তোর সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক করে গেছে। তাহলে ও রাজি হতে পারে। যেহেতু ফাহাদের কথা ও বেশি মান্য করতো। ফাহাদকে সম্মান করত। প্রচন্ড ভালোওবাসত।”
নাওয়াফ এ বিষয়ে মৌন রইল। নিখিল জবাব না পেয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। আবারও বলল সে, “ যেহেতু পাখি তোকে চাইছে না৷ পছন্দ করছে না। এবার ওর নিজের মতন করে ওকে ছেড়ে দেওয়া উচিত। ও যাকে পছন্দ করে তার সঙ্গে ওর বিয়ে দিয়ে দে। কখনো কখনো ভালবাসার মানুষের সুখের জন্য নিজের সুখ, ত্যাগ, বিসর্জন দিতে হয়। ওকে তুই ভুলে যা নাওয়াফ। ও তোর যোগ্য নয়। নতুবা এতো বোঝানোর পরও ও পালাতে পারতো না। তুই ওর থেকে মর্ডান, শিক্ষিত, ভালো ফ্যামিলির মেয়ে পাবি।”
নাওয়াফ উন্মাদের ন্যায় হাসে। নিখিল হতভম্ব প্রায়। বউ পালানোর শোকে আবার এইটার মাথামোথা গেছে নাকি। নিখিলের ভাবুকের মধ্যে নাওয়াফ হাসতে হাসতে হাতে একটা গিটার তুলে নিল। গিটারের তার নাড়িয়ে একটা গান ধরল সে,
মনে যারে চায়,
তারে কি ভুলিতে পারি?
পরের কথায়ওরে..!
গানটা শেষ করে সে থেমে গেল। মেঘলা আকাশটার দিকে কিছুক্ষণ নির্বিকে চেয়ে থাকল। হঠাৎ শীতল কণ্ঠনালিতে বলে ওঠল, “চাইলেও কি তাকে ভোলা যায়? তুই কারোর প্রেমে না, মায়ায় পড়িস। তখন দেখবি চাইলেও তাকে ছাড়তে পারবি না। মায়া জিনিসটা খুব ভয়ংকর। নইলে দেখ কয়েক বছর আগেও যে মেয়েকে দেখলে ছোট ছোট মনে হতো। হাতে গোণায়ও ধরিনি। কিছু বছরের ব্যবধানে সেই মেয়ের মায়া পড়লাম, প্রেমে পড়লাম। বাসলাম তাকে মারাত্মক রকমের ভালো। আজ সে আমায় হাতের আঙুল দিয়ে ঘুরাচ্ছে, নাচাচ্ছে। আর এটাকে বলে ভাই নারী জাতির ম্যাজিক। ওর সঙ্গে দেখা হলে ওকে বলে দিস, আমায় ভালোবাসতে হবে না। ও যেন আমার মায়ায় পড়ে।”
নিখিল ফোঁস করে শ্বাস ফেলে।
“পাখির খবর পাওয়া গেছে।”
নাওয়াফ হঠাৎ চমকালো। ঠিক বিদ্যুতের ন্যায়। আকাশে চাঁদ পাওয়ার মতন খুশি হলো সে।
“সত্যি! কিন্তু তুই পেলি কি করে?”
“মাত্রই রমিজ দিল। তোর ফোন বন্ধ এজন্য আমায় ফোন করে বলল।”
“ওহ। ফোনে চার্জ ছিল না। এখন বল সর্বনাশিটা আছেটা কই?”
“মাথা ঠান্ডা রাখ। শোন, এখন বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে বাড়ি আন। যা করার বাড়ি এনে করব।”
“নিখিল, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস না।”
“একটু সবুর কর ভাই। তোর বউ লোকে নিয়ে যাচ্ছে না। সে আপাতত ওর চাচাতো এক ফুফুর বাড়ি আছে।”
নাওয়াফ উঠে দাঁড়াল। ভীষণ তাড়া দেখিয়ে অধৈর্য কণ্ঠে বলল, “চল।”
নিখিলের মাথায় হাত।
“সেকি এই রাতে?”
“হ্যাঁ রাতেই৷ আর এক সেকেন্ডও ব্যয় করতে চাচ্ছি না আমি। ইচ্ছে হলে আসতে পারিস। না আসলে থাক। সিগারেট ফুঁক। তোর সামনে সিগারেট আছে। বেশি খাসটা না। দামটা দিয়ে যাস কিন্তু।”
নিখিল পুরা হতভম্ব। এর মতন ছ্যাচড়া সে একটাও দেখেনি। বিয়ের আগেই বউ বউ করে মুখের ফ্যানা তুলে ফেলছে। বিয়ে করলে বুঝি শালা দশদিন পর্যন্ত রুম থেকে বেরই হবে না। সে চিন্তায় আছে ওতটুকু ছোট মেয়ে দিয়ে কেমনে কি করবে?
____
রাত দশটা তখন। পাশের গ্রামে মেলা হচ্ছে। পাখি তার চাচাতো কাজিনদের সঙ্গে বিকালে মেলায় গিয়েছিল। ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হলো। বেশ কিছু জিনিস সে কিনে এনেছে। এসব তার ভীষণ পছন্দের। বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসা একমাত্র নারী বুঝি সে, যে কিনা বিনা টেনশনে ঘুরাঘুরি করছে। বাড়ি ফিরে যাবার কোন টেনশনও নেই তার মধ্যে।
মেলা থেকে বাড়ি ফিরে যখন বসার ঘরে সে প্রবেশ করল। দেখতে পেল সোফায় চেনা মানুষগুলির উপস্থিতি। নিখিল আর স্বাধীন বসে আছে। তার মাথায় যেন ঠাস করে গোটা একটা বজ্রপাত পড়ল। বুকটা অজানা কারণে ভীত সন্ত্রস্তগ্রস্ত হলো। শরীর ঘাম দিচ্ছে। ধরা পড়লে আজ সে শেষ। নিখিল দেখার আগেই সে পিছু হটছিল। একপ্রকার পালিয়ে যাচ্ছিল। তার আগেই শক্ত চওড়া একটা বক্ষের সঙ্গে ধুম করে একটা ধাক্কা খেল। সেই সঙ্গে পরিচিত তীব্র ঝাঁঝাল পারফিউমের ঘ্রাণ এসে নাকে বাড়ি লাগল। কর্ণে ভেসে এলো ঝাঁঝাল কণ্ঠস্বর।
“কোথায় পালাচ্ছিস তুই?”
কথাটি শ্রবণশক্তিতে প্রবেশ করা মাত্রই পাখির বুকে তাৎক্ষণিক একটা অজানা ভয় এসে সজোরে ধাক্কা লাগল। মাথাটা ঝনঝন করে ওঠল। তার নরম ওষ্ঠজোড়া তিরতির করে কাঁপছিল। মনের ভিতরে শুধু একটা কথাই অনবরত বেজে চলছে, তার খবর পেল কি করে এরা? কত সতর্ক হয়ে সে এখানে এসেছে! তার ভাবান্তরের মধ্যে পুরুষালি একটি হাত এসে ওকে স্পর্শ করল। খুব শক্ত করেই। পাখি একটু চমকালো। পিছু ঘুরে দেখল শক্ত একটা গাম্ভীর্য আদল। ফরসা মুখটা আজ কেমন যেন অপরিচিত ঠেকছে। বেশ কঠিন। দু চারটা চড় আজ তার কপালে যে পড়বে, তা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়। পাখিকে টেনে ধারালো চোখের লোকটা তার মুখোমুখি করে বসিয়ে দিল। নিখিল ওরা নড়েচড়ে বসল। তাদের দৃষ্টি আপাতত নাওয়াফ আর পাখির দিকে ঘুরছে। পাখির নরম পা দুটো নাওয়াফের পায়ের মধ্যে নিয়ে সে শক্ত করে কেঁচকি মেরে আটকে দিল। পাখির দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে খেতে ইশারা করে বলল, “পানিটা গিলে নে। এরপরে আর পানি খাওয়ার সুযোগ পাবি না।”
পাখি চোখ তুলে একবার ভীতকরণে লোকটার মুখটা দিকে চাইল। লোকটার চোখের মণিজোড়া আজ বেশ শক্ত। সাদা অংশটুকু লালচে বর্ণ। মুখটা রাগন্বিত দেখা যাচ্ছে। পাখি অল্পস্বল্প একটু পানি খেল। মাথাটা সে নত করে থুতনি নিচু করে রাখল। নাওয়াফ গ্লাসটি টেবিলের ওপর রেখে পাখির থুতনি উঁচু করে জাগাল। পায়ের ওপর পা তুলে তীরের মতন সুচালো পুরুষালি দৃষ্টিজোড়া নাড়িয়ে জিগ্যেস করল, “পালালি কেন?”
পাখির এবার ভয় হলো। ঠোঁটজোড়া ভয়ে পর্যন্ত নড়ল না। এবার সে কি জবাব দিবে? নির্ঘাত আজ সে বদমেজাজি লোকটার হাতে মার খাবে। লোকটার যা রাগ! কণ্ঠও ঝাঁঝাল। পাখি কিছুটা তোতলিয়ে ওঠে।
“আ..আমি আপনাকে বিয়ে করব না।”
নাওয়াফের রাগ গগন ছুঁইল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রাগের বশে ডান হাতটা বাড়িয়ে সে ঠাস করে পাখির ডান গালে একটা সজোরে চড় বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পাখির গালে শক্ত পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গেল। কানে গিয়েও স্পর্শ করল। পাখি ফুঁপিয়ে ওঠে। নাওয়াফ ধমক দিয়ে ওঠে, “ এই চুপ! আর একটা শব্দ মুখ দিয়ে বের হলে তোকে আজ জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলব। গায়ে আগুন ধরিয়ে দিব। যেই আগুন তুই আমার চিত্তে ধরিয়ে দিয়েছিস।”
পাখি ভয়ে চুপসে গেল। লোকটা প্রচন্ড রেগে আছে। বার বার ঘাড় ঘষছে। ফের বলল তিনি, “বিয়ে করবি না বলে পালিয়েছিস?”
পাখি নীরবে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মাথা ঝাঁকাল।
“হ্যাঁ।”
“তাহলে সেদিন রাজি হলি কেন? আমায় স্বপ্ন দেখালি কেন বেইমান?”
পাখি উত্তর দিল না। মাথা নত করে ঠোঁট কামড়ে হাত কচলায়। নাওয়াফের রাগ উঠে গেল। ওর বাম গাল নিয়ে সে আরেকটি চড় বসিয়ে দিল। এবার পাখির ঠোঁট কেটে রক্তের ফিনকি বেরিয়ে এলো। নিখিল বলে ওঠল, “এখন থাম ভাই। হাতটা চালা কম। জানি তোর হাত চলে বেশি। তাই বলে আরেক বাড়িতে বসে মারামারি মানা যায় না। বাসায় গিয়ে ভাই তোরা কামড়াকামড়ি করিস। আপাতত এসব বন্ধ কর। মানুষজন দেখলে কি বলবে?”
নাওয়াফ নিখিলের দিকে রক্তিম চোখে চাইল। নিখিল চুপসে গেল। দুঠোঁটের মাঝে আঙুল চেপে ধরে ঠোঁট উল্টে বলল, “ঠিকাছে ঠিকাছে। তোর বউ তো। মারবি তুই, কাটবি তুই, কামড়াবি তুই, খামচাবি তুই। আবার মলম লাগাবিও তুই। তাতে আমাদের কি? ঠিক কইছি নারে পরাধিন?” বলেই সে স্বাধীনকে ইশারা করল।
স্বাধীন নিখিলকে হালকা করে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “নিখিল ভাই, পরাধীন না। ওটা স্বাধীন হবে।”
“বাল! দুনিয়াতে এত নাম থাকতে তোরা স্বাধীন পরাধীন নাম রাখতে গেলি কেন? যা কইতে গেলেও মুখে বাজে।”
“সে কথা আপনার শশুরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।”
“কথাটা মন্দ বলিসনি ভায়া।”
নাওয়াফ বিরক্ত হলো।
“তোদের কথা বলা শেষ হলে এবার আমি বলি?”
নিখিল ঠোঁট কামড়ে বলল, “হ্যাঁ ভাই বল তুই। শুনি আমরা। তোর কথা শোনার জন্যই আমার এত দূর অবধি এই রাতের বেলা নদী পাড়ি দিয়ে এসেছি।”
নাওয়াফ চোখের ইশারায় নিখিলকে শাসাল।
“বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।”
নিখিল হাসতে হাসতে বলল, “আমি মুখে কস্টিব মারলাম। আর কোন কথাই বলব না।”
নাওয়াফ ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। পুনরায় পাখির দিকে দৃষ্টিজোড়া নামিয়ে আনল। গাল দুটো গাল হয়ে আছে মেয়েটার। পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গেছে। সেদিকে এক নজর তাকিয়ে ফের জিগ্যেস করল সে, “সেদিন তোকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করালাম। তারপরে কি এমন ঘটল, যার জন্য তুই পালাতে বাধ্য হলি। কারণ জানতে চাই আমি পাখি। চুপ করে থাকলে তোর মুখ খোলার ব্যবস্থা আমি করব।”
পাখি নাক টানল। গাল দুটো ব্যথায় টনটন করছে। ঠোঁট কেটে রক্তের ফিনকি বেরিয়ে এসেছে। সে চোখের জল দু হাতের তালুতে মুছে নেয়। বলে, “স্কুল ছুটি শেষে আমার সমবয়সিরা মিলে বলাবলি করছিল, আপনাকে আমি টাকা আর সম্পত্তির লোভে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি। আপনারা এলাকার ভিতরে বেশ প্রভাবশালী। এজন্য লোভে পড়ে আমি রাজি হইছি। তাছাড়া ওরা আরো জগন্য জগন্য কথা বলেছে। যেসব আমার পক্ষে হজম করা কষ্টের ছিল। আপনি অনেক সুদর্শন। আর আমি আনস্মার্ট। তাই আমি চাইনি আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হোক। আমি যেমন সাধারণ, আমার মতন একজন সাধারণ কাউকে আমি বিয়ে করতে চাইছি।”
“কারা বলেছে এসব?”
“ক’জনের নাম বলব আমি? পুরা এলাকা জুড়ে এসব চলছিল।”
“এজন্য পালিয়েছিস?”
পাখি মাথা ঝাঁকাল। নাওয়াফ এবার পাখির দুগালে ঠাস ঠাস করে আরো দুটো চড় বসিয়ে দিল। পাখি অবাক হয়ে এবার নাওয়াফের মুখটার দিকে ছলছল ভেজা নয়নে চেয়ে রইল। বেচারি বুঝল না এবারের চড় খাওয়ার কারণ কি? গাল গড়িয়ে তখনো জল গড়াচ্ছিলো তার। এবার বিনা দোষে চড় খাওয়াটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। নাওয়াফ ভারিক্কি গলায় শুধাল, “এবার চড় দিয়েছি বলে অবাক হচ্ছিস? আসলে তোর এটাই প্রাপ্য ছিল। শালার জীবনে একজন নারীকে ভালোবাসলাম। তাও বালডায় কোন বালও বুঝে না। সারাদিন পালায় আর পালায়। যেন ওকে বিড়ালের মতন মাছ মনে করে গিলে খাব। শোন, এই চড় দুটো তোকে শখ করে মেরেছি। কারণ তুই এরই উপযুক্ত। মানুষ তোকে কথা শুনিয়ে চলে যাবে, আর তুই মুখ বুঝে সহ্য করবি? বিয়ের পরও রোজ এমন চড় থাপ্পড় থেরাপি চলবে। যতদিন না তুই শুধরাবি। প্রতিবাদ করবি। শালি বোঝে না বালডাও। সারাদিন পোলাপানের মতন পালাই পালাই করে।”
পাখি রাগের সঙ্গে চক্ষু রাঙিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করে ওঠল, “আপনি আমাকে শালি বলে গালি দিবেন না।”
“না আপনাকে শালি না, খালাম্মা বলে সসম্মানে মাথায় তুলে নাচা উচিত। কি সুন্দর একটা চমৎকার কাজ করছেন আপনি? আপনি তো নাচতে নাচতে চ্যালচ্যালাইয়া বেহেস্তে চলে যাবেন।”
সিরিয়াস মুহূর্তে নিখিল আর স্বাধীনের গা কাঁপিয়ে হাসি পেল। হাসি কতক্ষণ পেটে চেপে রাখতে না পেরে দুজনেই পুরো রুম কাঁপিয়ে হাহা হিহি হো হো করে হেসে দিল। নাওয়াফ ওদের দিকে তাকাতেই ওদের হাসি বন্ধ হয়ে গেল। দুজনে মুখ চেপে ধরল। কিন্তু এবার পাখির হাসি পেল। মুখ ফসকে সে হেসেও দিল। নাওয়াফ ঠোঁট কামড়ে ভ্রু দুটো নাচিয়ে শুধাল, “তুই হাসছিস কেন?”
সঙ্গে সঙ্গে পাখি মুখটা মলিন করে নিল। বলল, “এমনি।”
“এমনি?”
“হুঁ।”
“পাখি!”
“জি।”
“মানুষের কথা শুনে তুই আমার সঙ্গে বেইমানি করতে পারলি?”
কথাটায় কি ছিল পাখি জানে না। কিন্তু তার চিত্ত জুড়ে হঠাৎ কেমন যেন চিন চিন ব্যথা করে ওঠল। অন্তরের আদালতে কোথায় যেন একটা অপরাধীর ঘণ্টা বেজে চলছে। মন বলছে, ‘ তুই আবারও ভুল করলি পাখি। আবারও ভুল করলি।’
নাওয়াফ পুনরায় বলে, “আমার কথা, আমার সম্মানের কথা একবারও ভাবলি না? তোকে বুকে বড্ড যত্ন করে জায়গা দিয়ে পুষে রেখেছি। সেখানটায় ফুটো করে দিস না রে জান। আমি সব সইতে পারব, কিন্তু তোর শূণ্যতা আমি ভরাট করতে পারব না। সেদিন বিয়ে হলে আজ তুই আমার ঘরের বউ থাকতি।” বলেই সে একটু থামল। বিরতি নিল। একটু পর আবার বলল, “ মানুষের কত রকমের শখ থাকে? আমারও একটা শখ আছে। সেই শখ কি জানিস? তোকে নাওয়াফ তালুকদারের বউ বানাব। হবি আমার বউ? প্রমিজ খুব আদরে রাখব তোকে লক্ষ্মীটি। যতটা আদরে রাখলে তোর চোখ থেকে মাটিতে জল না গড়ায়। প্লিজ রাজি হয়ে যা। তুই না করলে আমি তোকে জোর করব না। হয়ত আমার চেয়ে তুই একজন ভালো মানুষ পাবি। কিন্তু এই নাওয়াফ তালুকদারকে পাবি না পাখি। তার ভালোবাসা পাবি না। আল্লাহর দুনিয়ায় নাওয়াফ তালুকদার এক পিসই রে। তার ফটোকপিও তুই খুঁজে পাবি না। তোকে না পেলে হয়ত একটা অপূর্ণতা, একটা আফসোসবোধের চাওয়া চিরজীবন ধরে আমার থেকে যাবে। সেই চাওয়া আমৃত্যু চাওয়া। আমি আবারও বলছি জোর করব না তোকে। ইচ্ছে হলে রাজি হোস। আর রাজি না হলেও চলবে। তোর কোন পছন্দের মানুষ থাকলে বলে দিস। তার হাতে তোকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তুলে দিব। তবুও এভাবে আমাকে তিলে তিলে শাস্তি দিস না। তোর প্রণয়ের আগুনে আর জ্বলছে পারছি না। নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি। ” কথাগুলি শেষ করে বুক ভাঙা অপ্রকাশিত আর্তনাদ নিয়ে উঠে দাঁড়াল নাওয়াফ। দরজা দিয়ে আড়ালে নিষিদ্ধ অশ্রুগুলি মুছে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
দৃশ্যটি এড়াল না নিখিলের। পাখি এখনো দ্বিধাদ্বন্দের মাঝে ভুগছে। সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। মন একবার বলছে রাজি হয়ে যেতে। আরেকবার ওনার বিরুদ্ধে নালিশ ঠুকছে। যেভাবে কথায় কথায় চড় মারেন তিনি। বিয়ের পর তো তখন চব্বিশ ঘণ্টাই কাছে থাকবে। কোন ভুল হলেই কান ধরিয়ে দিবে। তবে হ্যাঁ ওনার জন্য তার কষ্টও লাগছে। তীব্র অনুশোচনা আর প্রায়শ্চিত্তবোধ হচ্ছে।
তার ভাবনা মাঝে দেখল নিখিল পাখির সামনে গিয়ে বসল। পাখি ছলছল নয়নে নিখিলের দিকে চাইল।
“আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি। কি করব বুঝতে পারছি না। আমার জন্য কে সঠিক তাও অনুভব করতে পারছি না। আমায় একজন বড় ভাই হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবেন নিখিল ভাই?”
“আমি বললে মান্য করবি?”
“নাওয়াফ ভাইকে বিয়ে করতে রাজি হতে বলবেন?”
“হ্যাঁ।”
“ওনায় বিয়ে করলে রোজ আমায় সকাল, বিকাল, দুপুর, সন্ধ্যায় চার বেলাই থাপ্পড়াবে। তখন ভাতের মতন চড় খেতে হবে।”
স্বাধীন বিছানা থেকে নামতে নামতে পাখির কথার জবাব দিল, “গাধি পুরুষ যতই গর্জন তুলুক। দিন শেষে সে তার জীবন সঙ্গিনীর কাছে ভেজা বিড়াল। সামান্য সমুদ্রের ঢেউ দিয়ে দেখ। দূর থেকে সে গর্জন তুলে আসে ঠিকই। কিন্তু তীরে আসলে তার গর্জন আর ঢেউয়ের স্রোতের মাত্রা তখন অনেকটা কমে যায়। পুরুষও ঠিক তেমন। নারীর সান্নিধ্যে এলে তার রাগ, তেজ পানির মতন শীতল আর শান্ত হয়ে আসে। তাছাড়া নাওয়াফ ভাইকে তুই যতটা রাগি আর খারাপ ভাবিস। ওনি আসলে ওমনটা নয়। বিয়ের পরই বুঝতে পারবি। যখন মারের বদলে সকাল, বিকাল, সন্ধ্যা, দুপুর মোট চার বেলা তোকে ঝাপটে ধরে চুমু থেরাপি দিবে।” বলেই স্বাধীন হো হো করে দাঁত কেলিয়ে হেসে দিল।
পাখি স্বাধীনকে কটমট করে চোখ রাঙাল। স্বাধীন হাসতে হাসতে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বলে, “ ওমন করে চোখ রাঙাস তুই কাহাকে, হ্যাঁ? ভুলে যাস না তুই এখনো নাওয়াফ ভাইয়ের ওয়াইফাই হস না। তাই তোকে ভয় পাওয়ার প্রশ্নই আসে না।”
নিখিল বিরক্ত হয়ে স্বাধীনকে ধমকে ওঠল , “ স্বাধীন, তুই চুপ থাক। আর পাখি তুই কি এবার রাজি বল? তোকে কিন্তু জোরজবরদস্তি কিংবা বাধ্যগত করা হচ্ছে না।”
পাখি নীরবে ডান দিকে মাথা কাত করল।
“আপনার ওপর বিশ্বাস রেখেই রাজি হচ্ছি। কিন্তু বিয়ের পর যেন আমার গালটাকে তিনি নিজের সম্পত্তি মনে করে বসেন না। বাব্বাহ, হাতের যা জোর! থাপ্পড়িয়ে থাপ্পড়িয়ে গালটা আমার চ্যাপ্টা বানিয়ে দিল।”
“আবার পালিয়ে আমার নাক কাটবি না তো?”
পাখি হেসে ফেলল। সামান্য লজ্জাও পেল। নীরবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “নাহ!”
স্বাধীন লম্বা আলসেমি দিয়ে বলে, “শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। অবশেষে খবিশটায় রাজি হইছে। মাথা থেকে বদজাত জ্বিনটা নামছে। যাই, আমি গিয়ে নাওয়াফ ভাইকে সুখবরটা দিয়ে আসি। তার সোনা মনা যে বিয়ে করতে রাজি হইছে। বেচারা এমনিতে টেনশনে টেনশনে শুকিয়ে যাচ্ছে। একমাত্র শালা হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব আছে না? গিয়ে বলব, নাওয়াফ ভাই আপনার তোতা পাখি রাজি, ডাকেন এবার আপনি কাজি।”
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম।