ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

১৮তম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

#সে_আমার_সর্বনাশ_২

(১৮)

সকালের দিকে পুরা এলাকায় ছেঁপে গেল গতকাল রাতে নাওয়াফ পাখির কাবিন হয়েছে। আর এই খবর সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বেশ খাটুনি করেছে নিখিল আর স্বাধীন। বিনা পয়সায় সেই সকাল থেকে সামনে যাকে পেয়েছে, তাকেই ধরে ধরে এসব গুণাগান শুনিয়েছে তারা। তাদের মনে একটাই দুক্ষু। বিয়ের মতন এমন একটা পবিত্র কাজ হওয়ার পরও তাদের ভাগ্যে এক টুকরো মিষ্টিও কেন জুটল না? এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে তারা। না না এটা মানা যায় না। এটা বিরাট বড়ো অন্যায় হয়ে গেছে। এই পর্যন্ত স্বাধীন আর নিখিল বসে বসে দশ কাপ চা-এর মতো শেষ করেছে। এখন বসে বসে পা নাচাচ্ছে আর টিভি দেখছে। অপেক্ষা করছে নাওয়াফের ঘুম ভাঙার। সেই সকালের দিকে ক্লাবে ফিরেছে। ক্লাবের ভিতরে ছোট একটা রুম আছে। যেখানে ঘুমানো যায়। সেখানে ঘুমুচ্ছে। বেলা গড়িয়েছে। অথচ তার ঘুম ভাঙেনি। নিখিল হাত ঘড়িটা এক ঝলক দেখে ললাট কুঁচকে নিল। শেষের চাটুকু গিলে রমিজকে তাড়া দিয়ে বলল, “তোর বসকে ওঠা। বেলা বারোটা বাজতে চলল। আর কতক্ষণ বসে বসে বাসি মুখে চা ঢালব? একটু মিষ্টিও খাওয়া? তোর বস তো শালা কিপ্টুস একটা! তুই তো মিষ্টি খাওয়াতে পারিস।”

“আমার কাছে টাকা নেই নিখিল ভাই।”

“বাল কাটার ব্লেড আছে ভাই?”

নিখিলের মশকরা করা দেখে রমিজ হো হো করে হেসে দিল। নিখিল মুখ কোঁচকালো।

“দাঁত বোঝা। যা তোর বসের গায়ে গিয়ে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ে আয়। রাগ দেখালে বলবি, নিখিল ভাই ঢালতে বলছে।”

রমিজ চেয়ার টেনে নিখিলের পাশাপাশি বসতে বসতে বলল, “আপনি কি সকাল সকাল আমার গাল দুটোকে চ্যাপ্টা বানাতে চান? এমনিতে বিয়ে করিনি আমি। গাল চাপা। মেয়ে মানুষ চাপা গাল দেখে প্রেম করতে চায় না। ওনার হাতের চড় খেয়ে আরো গাল দুটো চেপে গেছে। এখন আবার চড় খেয়ে বাকিটুকু চাপাতে চাচ্ছি না। ভাইয়ের ঘুম ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত তিনি উঠবেও না। ভীষণ মেজাজওয়ালা লোক।”

“আরে উঠবে উঠবে। তুই যা তো। শুধু আমি যা বলব, তাই করবি।”

রমিজ চোখ দুটি বড়ো বড়ো করে ফেলল।

“হ্যাঁ উঠবে? কিন্তু কি করে?”

“গিয়ে কানের কাছে বলবি শুধু তোদের ভাবিজান এসেছে। বাকিটা আর বলতে হবে না।”

রমিজ খুশি হলো। সে খুশি মনে রুমে গিয়ে নাওয়াফের কানের কাছে চেঁচিয়ে ডাকল, “ভাই, ও ভাই ওঠেন। ভাবিজান আইছে। তিনি বসে আছেন।”

রমিজের কথায় কাজ হলো। সত্যি সত্যি লোকটা ঘুমের মধ্য থেকে একপ্রকার লাফিয়ে উঠে বসল।

“কই কই ও?”

রমিজ কান চুলকে মুখটা অপরাধীর মতো করে বলল, “মিথ্যে বলেছি ভাই। ভাবি আসেনি। নিখিল ভাই ডাকতে বলেছে।”

“এইদিকে আয়।”

“না যামু না। আপনে মারবেন।”

“না মারব না। এইদিকে আয়।”

রমিজ ভয়ে ভয়ে গেল। নাওয়াফ রমিজের চুলের মধ্যে হাত চালিয়ে দিল। শক্ত করে ধরে টানলও। রমিজ ভয়ে শেষ। খাইছেরে আজ তার চুল শেষ। খাটের ড্রয়ার খুলে নাওয়াফ কেঁচিটা হাতে তুলে নিল। সামনের থেকে এক মুঠো চুল ধরে কেটে রমিজের হাতে ধরিয়ে দিল। রমিজ হতবাক।

“চুল কেটে দিলেন?”

“হ্যাঁ দিলাম। এটা মিথ্যা বলার শাস্তি। আমার বউ আমার ইমোশনাল। সেই ইমোশনাল নিয়া তোরা মজা করবি, আর শাস্তি পাবি না? তা তো হবে না।”

রমিজ মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল। মুখটা তার কাঁদো কাঁদো। নিখিল রমিজের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হলো প্রায়।

“একি তোর সামনের চুল গেল কোথায়?”

রমিজ মুখটা কাঁদো কাঁদো করে নিল।

“আপনাদের তালে পড়ে গেছে। এখন নেড়ো হতে হবে।”

“নিশ্চয়ই এটা নাওয়াফ ভাইয়ের কাজ?” কথাটা স্বাধীন বলল।

রমিজ মাথা ঝাঁকাল, “হুঁ।”

ওদের কথার মাঝে নাওয়াফ হাত মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো।

“কি খবর? সকাল সকাল এখানে কি করছিস তোরা? পুরা এলাকায় কূটনামি করে তার ভাড়া নিতে এসেছিস নাকি?”

“তুই জানলি কি করে আমরা কূটনামি করেছি?”

“এলাকায় একটা কাক ঢুকলেও সেই খবর আমার কানে আসে। আর এসব জানব না?

“হয়ে গেল ষোলকলা পূর্ণ। ভাই এবার মিষ্টিমুষ্টি কিছু খাওয়া। বিয়ে বিয়ে ফিল পাচ্ছি না।”

“মুতি না পানির ডরে ও আসছে মিষ্টি খাইতে। ধুর হ শালা।”

নিখিল ঠোঁট ছড়িয়ে হো হো করে হেসে দিল।

“শালা কিপ্টা কোথাকার!”

____

গতকাল মুসকানকে ছেলে পক্ষ দেখতে এসেছে। মেয়ে তাদের পছন্দ হয়েছে। বিয়ে ঠিক করা। শুক্রবার গায়ে হলুদ। শনিবার বিয়ে। আজ হলো বুধবার। আর একদিন বাকি। ইদানীং কিছু সমস্যার কারণে নির্বাচন পিছিয়ে নেওয়া হয়েছে। আপাতত নির্বাচনের ঝামেলা নেই। নাওয়াফ এসেছিল হিসাব নিকাশ করতে। বিয়েতে কেমন খরচ হবে না হবে সেসব নিয়ে। ইচ্ছে আবার আজ স্কুলে যায়নি। সামনে বোনের বিয়ে। ঘর গোছানোর একটা ব্যাপার স্যাপার আছে না? নাওয়াফ, রমিজ, নিখিল, স্বাধীন, আবুল সবাই মিলে লেখালেখির হিসেবে বসেছে। কি কি বিয়ের বাজার করতে হবে? কে কোন দায়িত্বে থাকবে? নাওয়াফ ইচ্ছের একটা খাতা টান দিতে গেল। হিসেব টুকবে এজন্য। খাতার ওপর ছিল একটা বই। বইটা নিচে পড়ে গেল। নাওয়াফ ওঠাতে গিয়ে দেখল, বইয়ের মধ্যে একটা কাগজ ভাঁজ করা। সে রেখেই দিচ্ছিল হঠাৎ নজরে পড়ল বইটা ইচ্ছের না। কারণ বইয়ের উপরে অনন্যা রহমান পাখি লেখা ছিল। এবার কাগজটির প্রতি তার সন্দেহ জাগল। কি লেখা আছে ওতে? সে বইটা হাতাতে লাগল।

নিখিল বিরক্তসূচকে বলল, “আরে ছাড় তো। মাইয়্যা মানুষ আজাইরা জিনিস কাগজে লিখে বইয়ে রাখে।”

নিখিল যেমন গা ভাসিয়ে দিল বিষয়টি। নাওয়াফ তেমন দিতে পারল না। সে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে কাগজটি পেয়ে গেল। কাগজটি খুলতেই তার কপালের নীলচে রগগুলি ফুলে ওঠল। মাথায় দপদপ করে আগুন জ্বলছে। চোখের মণি দুটো শক্ত দেখা গেল। পাখিকে সামনে পেলে সোজা চিবিয়ে খেতো। কাগজটি ছিল একটি প্রেমপত্র। আশিক নামের এক ছেলে পাঠিয়েছে। সেখানে লেখা ছিল,

আমার প্রিয়তমা। আমার ভালোবাসার রানী। আমার বুলবুলি। তোমায় ভীষণ ভীষণ আমার ভালো লাগে। তুমি আমার দিকে যখন তাকাও আমার হৃদপিণ্ড থমকে যায়। আমার বুক ধুকপুক করে ওঠে। ওগো প্রিয়তমা, আমার জান আমি তোমায় ভালবাসি। মুখে বলতে পারছি না। কারণ লজ্জা লাগছে। তাই চিঠিতে লিখে জানালাম। আমি তোমার জন্য স্কুলের পিছনে আগামীকাল অপেক্ষা করব। তুমি এসো। আমার মনে জায়গা দিব তোমায়।”

ইতি তোমার প্রেমিক পুরুষ,

আশিক।

চিঠিটা পড়ার পর নাওয়াফের হাতের আঙুলগুলি মটমট করে মুঠিবদ্ধ হয়ে এলো। এই চিঠিটা নিশ্চয়ই পাখি পড়েছে। অথচ খবিশটা তাকে একবারও জানাল না। ইচ্ছে করল শয়তানিটাকে সামনে এনে ঠাস ঠাস করে গাল ফাটিয়ে দিতে। কত্ত বড়ো সাহস তার থেকে এই বিষয়টি লুকিয়েছে? দেখা কি ছেলেটার সঙ্গে করেছে? মাথা তার গরম হয়ে ওঠল। সে ইচ্ছেকে ডাকল, “ইচ্ছে, এই ইচ্ছে এখানে আয় তো।”

ইচ্ছে তখন ভেতরের রুম গোছাচ্ছিল। নাওয়াফের চেঁচামেচির শব্দ পেয়ে সে দ্রুত কাজ ফেলে রেখে বসার ঘরে ছুটে এলো। এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জিগ্যেস করল, “ডাকছেন নাওয়াফ ভাই?”

চিঠিটা ইচ্ছের মুখে সামনে ধরে নাওয়াফ জানতে চাইল।

“এটা কি?”

ইচ্ছে অবাক হলো।

“কি এটা?”

“জানিস না?”

“না তো।”

“তোর বান্ধবীর লাভ লেটার।”

“কার পাখির?”

“জি, ও কি ওই ছেলেটার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল?”

ইচ্ছে আকাশ থেকে পড়ল।

“কোন ছেলের সঙ্গে?”

“বেয়াদব কান নিয়ে দিব একটা চড়। তোর বান্ধবীকে যে আশিক নামের ছেলেটি লাভ লেটার দিয়েছিল তার কথা বলছি। তুই কিছু জানিস না?”

“আমি সত্যি বলছি আমি কিছু জানি না। এমনিতে আশিকের ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতাম কুত্তাটা পাখিরে পছন্দ করে। কিন্তু লাভ লেটার দিব জানতাম না।”

“ওর বই তোর কাছে এলো কি করে?”

“পড়তে এনেছিলাম।”

“পড়েছিস?”

“না, ধরার সময় পাইনি।”

“পাখি কি এই চিঠির সমন্ধে জানে কিছু?”

“আমি জানি না।”

“ও কি আশিকের সঙ্গে দেখা করেছিল?”

“তাও জানি না।”

নাওয়াফ টেবিলে একটা ঘুষি মেরে চোখ দুটো রক্তিম করে চেঁচিয়ে ওঠল, “তাহলে জানিস কি আমার বাল?”

ইচ্ছে ধমক খেয়ে লাফিয়ে ওঠল। কেঁদেও দিল। জড়োসড়ো হলো সে। নাওয়াফ একটু কোমল হলো। মাথা ঠান্ডা রাখল সে। বেজায়গায় রাগা ঠিক না।

“ও না তোর বান্ধবী হয়? তোর কাছে কিছু বলেনি?”

ইচ্ছে চোখ মুছল। ভয়ে রীতিমতো চোখে জল এসে পড়েছে তার। মাথাটা নিচু করে নিয়ে মুখে বলল, “ও আমার থেকে কিছু লুকায় না। এটা যেহেতু বলেনি। নিশ্চয়ই ও নিজেও জানে না। জানলে বলতো।”

“যদি ইচ্ছে করেই না বলে থাকে?”

ইচ্ছে নিশ্চুপ রইল। জবাবহীন।

নাওয়াফ চিঠিটা হাতে তুলে নিয়ে নিল। ভাঁজ করে পকেটে ভরে রমিজকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আমার সঙ্গে আয়।”

নিখিলদের উদ্দেশ্যে বলল, “তোরা লিস্ট কর। এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসছি।”

নিখিল নাওয়াফকে শান্ত হতে বলল, “দেখ ভাই রাগিস না। পাখি মনে হয় সত্যিই এটা জানে না।”

“তুই নিজের ঘর সামলা। আমাকে জ্ঞান দেওয়া বন্ধ কর। আমি তোর থেকে কম বুঝি না।”

নিখিল হতাশ হলো।

নাওয়াফ বেরিয়ে গেল। তার পিছু পিছু রমিজও। সে বাইক স্টার্ট দিল। রমিজ পিছু থেকে জড়তা নিয়ে প্রশ্ন করল, “আমরা যাচ্ছি কোথায় ভাই?”

নাওয়াফ জবাব দিল না। তার মাথায় গগনচুম্বী রাগ উঠে আছে। সে চায় না ভুল মানুষটির প্রতি তা প্রয়োগ হোক। তার বাইকটি উদয়পুর স্কুলের বারান্দার পাশে এসে থামল। নাওয়াফ আজ পারমিশন ছাড়াই টেনের ক্লাসে ঢুকে পড়ল। তখন নোভা ম্যাডাম ক্লাস নিচ্ছিলেন।

নাওয়াফ ভিতরে ঢুকে বলল, “ক্ষমা চাচ্ছি ম্যাডাম অনুমতি ছাড়া ভিতরে প্রবেশ করার জন্য। বাট ইমারজেন্সি ছিল।” বলেই সে মাঝের সাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। নোভার অবাক লাগলো। এর আবার হলো কি? কোন নতুন করে ঝামেলা পাকালো নাকি?

এইদিকে ক্লাসের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে লোকটাকে প্রবেশ করতে দেখে পাখির বুকে যেন পানি শুকিয়ে এলো। বক্ষ মাঝটা মুচড়ে ধক করেও ওঠল। লোকটাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? নিশ্চয়ই কোন গন্ডগোল পাকিয়ে এসেছে তার ঘাড়ে চাপাতে। সে জবুথবু দিয়ে রইল। তোর ভাবনার ভিতরে নাওয়াফ ওকে আদেশ দিল, “বেরিয়ে আয়।”

পাখি আমতা আমতা করে জিগ্যেস করল, “আমি?”

“আমি তোর সঙ্গে বেয়াই বেইন খেলতে আসিনি। তোকে বেরিয়ে আসতে বলেছি। দাঁড়া তোর আসতে হবে না। আমিই বের করছি।” বলেই বলিষ্ঠ হাতটা বাড়িয়ে ওর হাত ধরে টেনে বের করল ওকে। পাখি বেঞ্চে বেঝে পড়তেই যাচ্ছিল। কোন মতো বেঁচেছে। ক্লাসের সমগ্র স্টুডেন্ট ওদের দিকে অদ্ভুৎ দৃষ্টিকোণে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দেখছে। পাখি বুঝতে পারছে না লোকটা হঠাৎ এমন বদমাশগিড়ি কেন করছে? উশৃঙ্খল কেন হচ্ছে? পাখির হাত ধরে নোভা ম্যাডামের সামনে গিয়ে নাওয়াফ দাঁড়িয়ে আবারো বলল, “ক্ষমা চাচ্ছি ম্যাডাম, আপনার সামনে বসে আপনার স্টুডেন্টের হাত ধরে টেনে নেওয়ার জন্য। বাট সেই অধিকার আমার আছে। আধ ঘণ্টা সময় দিন আমায়। আপনার স্টুডেন্ট আবার আপনার কাছে ফেরত দিয়ে যাব।”

নোভা নির্বিক প্রায়। এটার মাথায় আবার কোন কেড়া ঢুকছে? সে চুপচাপ কেবল দেখল। কোন জবাব দিতে গিয়েও পারল না। নাওয়াফ ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বলল। যতটুকু প্রশ্ন করার ইচ্ছে জেগেছিল। ততটুকুও নাওয়াফের ইশারায় দমে এলো। নাওয়াফ পাখির হাত ধরে কয়েক মিনিটের মধ্যে সোজা মসজিদে ঢুকে গেল। রমিজকে আদেশ দিল, “যা মসজিদের ইমামকে ডেকে নিয়ে আয়।”

রমিজ মুখ বাড়িয়ে প্রশ্ন করল, “কেন ভাই?”

“হাঙ্গা করমু তাই, বুঝেছিস? এখন যা।”

রমিজ ধমক খেয়ে চুপসে গেল। নাওয়াফ পাখির মাথায় ওড়না টেনে দিয়ে বলল, “চুপচাপ থাকবি। যা বলব তাই শুধু শুনবি। বাড়তি কথা বললেই চড় খাবি। আমার মাথা হট আছে। খুনও করে ফেলতে পারি। তাই যতটা পারিস, মুখ বন্ধ রাখ।”

পাখি দেখল লোকটার চোখ দুটো ভয়ংকরভাবে আজ লাল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। নীলচে রগগুলি কেমন দাঁড়ানো! হঠাৎ এত রাগল কেন? পাখি ভাবল সে কিছু জিজ্ঞেস করবে। তার আগেই ইমাম চলে এলো। নাওয়াফ সালাম দিল।

“আসসালামু আলাইকুম হুজুর, আপনাকে একটা এখন বিয়ে পড়াতে হবে।”

পাখি অবিশ্বাস্য নয়নে লোকটার মুখটার দিকে চাইল। নাওয়াফ পাখির মনের অবস্থা বুঝতে পারছে হয়ত। তবে ওর দিকে তাকাল না। পাখি নাওয়াফের কাছ থেকে হাত ছাড়াতে চাইল। পারল না। বেশ পোক্ত করেই হাত ধরেছে। চোখ গরম করে ওর দিকে তাকাতেই পাখি চুপসে গেল। মুখ নিচু করে নিল।

হুজুর সালাম নিয়ে বলল, “পাত্রির সম্মতি আছে?”

পাখি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বলতে যাচ্ছিল। নাওয়াফ রক্তাক্ত চোখ দুটো নিয়ে ওর দিকে এমন করে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে পাখি দৃষ্টি নত করে নিল।

নাওয়াফ মৃদ্যু হাসির ঝলক দিয়ে বলল, “পাত্রির সম্মতি আছে। আমাদের আগে থেকেই কাবিন হয়ে আছে। আপনি শুধু বিয়ে পড়াবেন, তাহলেই হলো।”

হুজুর ‘ঠিকাছে’ বলে মাথা ঝাঁকাল। অবশেষে তিন কবুল বলে বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ে পড়ানো শেষে হুজুর নাওয়াফ আর পাখির মাথায় হাত রেখে দোয়া পড়ে বলল, “আজ থেকে তোমরা ইসলামিক নিয়ম অনুযায়ী স্বামী স্ত্রী। এখন থেকে তোমরা একসাথে থাকতে পারো।”

হুজুরকে কিছু হাদিয়া দিয়ে নাওয়াফ মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেল। মসজিদের বাহিরে গিয়ে দাঁড়াল। পাখির মাথা থেকে কাপড় নামিয়ে ওর দুগালে আচমকা ঠাস ঠাস করে দুটো চড় বসিয়ে দিল। রমিজ পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠাস ঠাস শব্দ পেয়ে বুঝল তাল পড়তেছে। বাংলা সিনেমা শুরু হয়ে গেছে। সামনে আর না এগানোই ভালো। সে বুঝি এই প্রথম পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য জনক বিষয় দেখল। বিয়ের পর নতুন জামাই নতুন বউকে বিয়ের গিফটের বদলে ঠাস ঠাস করে চড় দিচ্ছে। এটাও একটা ইউনিক বিষয়। বাট মন্দ নয়। ইতিহাস রচনা করার মতো। আপাতত তার পালানো উচিত। ওই দিকের ঝড় কখন তার ওপর দিয়ে যায় বলা মুশকিল।

পাখি গালে হাত দিয়ে রইল৷ ছল ছল নয়নে নাওয়াফের দিকে মুখ তুলে চাইল। তার নীরব চোখ দুটো যেন জানতে চাইছে তার অপরাধটা কি? প্রথমে ভরা ক্লাস থেকে ধরে এনে মসজিদে নিয়ে হুজুর দিয়ে বিয়ে পড়িয়ে এসে এখন চড় মারা হচ্ছে? এর মানে কি? কি অন্যায় তার? কি দোষ করেছে? নাওয়াফ চোখ দুটো পাকিয়ে বলল, “কি কারণে মারলাম তোকে জানতে চাইছিস? দাঁড়া ওয়েট। ”

সে পকেট হাতিয়ে চিঠিটা বের করে পাখির মুখের সামনে ধরল।

“স্কুলে আইসা প্রেম মারাও। একদম কলিজা ছিঁড়ে ফেলব তোর পাখি। হাড্ডি ইট দিয়ে ভাঙব। আগামীকাল থেকে স্কুলে বোরকা পরে আসবি। চোখ ছাড়া তোর কিছুই যেন দেখা যায় না।”

পাখি নীরবে মাথা ঝাঁকাল।

“ঠিকাছে।”

তার চোখ দুটো দিয়ে দুই ফোঁটা জল গড়াল। নাওয়াফের মায়া লাগল। ইশ! একটু বেশি হয়ে গেল বুঝি? সে একটু কোমল হলো।

“কি খাবি বল?”

“কিছু না।”

নাওয়াফ ওর কথা শুনল না। আইসক্রিম কিনে এনে ওর হাতে ধরিয়ে দিল। সঙ্গে দুটো বরফ এনেছে। গাল দুটো চড়ের কারণে ফুলে গেছে৷ সেখানে সে বসে বসে কতক্ষণ বরফ ঘষতে ঘষতে পাখিকে উপদেশ দিল।

“আজ থেকে আপনি নাওয়াফ তালুকদারের ইসলামিক আইন অনুযায়ী বৈধ স্ত্রী। আমি চাই না আমার স্ত্রীকে বাহিরের পুরুষ দেখুক। আর লাভ লেটার দেক। তাকে দেখার অধিকার একমাত্র আমার। তাই আপনি নিয়মিত বোরকা পরবেন। কোন ছেলে যদি লাভ লেটার দিতে আসে আমার নাম বলবেন। বলবেন কি?”

“আমি নাওয়াফ তালুকদারের স্ত্রী।”

“গুড। এই তো আমার লক্ষ্মী বউ। আমার সব কথা শুনবেন। মাথায় তুলে রাখব। ঘাওড়ামি করবেন তো। সকাল বিকাল ঠাস ঠাস করে গালে পড়বে। ঘাওড়ামি করা আমার একেবারে পছন্দ নয়।”

পাখির থেকে চোখ সরিয়ে নাওয়াফ রমিজকে ফোন করে বলল, “দশ মিনিটের মধ্যে বাজার থেকে বোরকাসহ হিজাব, ক্যাপ কিনে ক্লাবে নিয়ে আসবি। আমি ক্লাবে যাচ্ছি।”

রমিজ বলল, “ঠিকাছে।”

দশ মিনিটও লাগেনি। সাত মিনিটের মাথায় রমিজ লং ঘের ওয়ালা কালো বোরকা আর কালো হিজাবসহ ক্যাপ নিয়ে এলো। নাওয়াফ নিজ হাতে পাখিকে সাজাল। প্রথমে বোরকা তারপরে মাথায় ক্যাপ পরিয়ে তার ওপর হিজাব সুন্দর করে পরিয়ে দিল। ওর কপালের মাঝে উষ্ণ ঠোঁটজোড়া ছুঁয়ে দিয়ে বলল, “ সুবহানআল্লাহ আসমানের চাঁদ যেন আজ জমিনে নেমে এসেছে। কি সুন্দর লাগছে আপনাকে! পুরাই মারাত্মক! এখন থেকে এভাবে প্রতিদিন স্কুলে বোরকা হিজাব পরে যাবেন। চাইলে হিজাবের সঙ্গে মুখে মাক্সও পরতে পারেন।

কোন বাঁধা নেই৷ আপনার সুবিধা অনুযায়ি। কিন্তু কোন ছেলের সঙ্গে কথা বলা তো দূরে থাক। তার দিকে তাকালেও আপনার চোখে আমি গজালি ভরে দিব। এখন চলুন।”

পাখি নৈঃশব্দ্যে মাথা ঝাঁকাল।

“আচ্ছা।”

নাওয়াফের ভালো লাগল। যাক বউটার গায়ে তাহলে ভদ্রতার বাতাস লেগেছে। আজ সব কথা অক্ষরে অক্ষরে মানছে, শুনছে। সে ওকে নিয়েই আবার ক্লাসে ঢুকল। অনেকে পাখিকে চিনতে পারল না বোরকা পরা দেখে। নাওয়াফ ভেতরে ঢুকতে অনুমতি চাইল, “আসতে পারি ম্যাডাম?”

নোভা মুচকি হাসল। দুষ্টুমি করে বলল, “আসুন স্যার। আমার ছাত্রীকে যে নিয়ে গেলেন, আর দিয়ে গেলেন না।”

নাওয়াফ একটু মুচকি হাসল।

“এই তো নিয়ে এলাম।”

পাখির হাত ধরে সে সমগ্র স্টুডেন্টকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এভরিবডি সাইলেন্ট প্লিজ। একটা গুড নিউস শুনেন। আজ থেকে আপনাদের সহপাঠী অনন্যা রহমান পাখি সনাম ধন্য নাওয়াফ তালুকদারের স্ত্রী। মাত্র আমাদের ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী বিবাহ সম্পূর্ণ হয়েছে। এই আনন্দের খবরটি আপনাদের সঙ্গে ভাগাভগি করতে এলাম। আশা করি সবার ভালো লাগবে।”

কথাটা শোনা মাত্র সবার ভিতরে চাপা উত্তেজনার সঙ্গে তীব্র ফিসফিসানি বাড়ল। নোভা বিস্মিত। ফাজিলটায় তাহলে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে এই আকাম করেছে। বাড়ি আসুক আজ। ওর খবর আছে।

নাওয়াফ সকল স্টুডেন্টের উদ্দেশ্যে আবার বলল, “বর্তমানে সে আমার স্ত্রী। তাই তার দিকে আপনাদের মধ্য থেকে কোন ছেলে যদি খারাপ দৃষ্টিতে তাকায় বা লাভ লেটার দেয়। তার কবর খোঁড়ার দায়িত্বটা আমি নিজে কাঁধে নিব। কথা ক্লিয়ার? আর হ্যাঁ এখন বিয়েটা সাদামাটাভাবে হয়েছে। যখন আনুষ্ঠানিকভাবে হবে সবাই ইনশাআল্লাহ দাওয়াত পাবেন। আপাতত আপনাদের সবার জন্য আমার পক্ষ থেকে সামান্য মিষ্টিমুখ করাতে চাইছি। রমিজ মিষ্টি নিয়ে আয়।”

রমিজের পিছু পিছু সাফিন, অয়নও দুহাত ভর্তি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে এলো।

নাওয়াফ মিষ্টির প্যাকেট খুলে প্রথম মিষ্টিটাই পাখির মুখে ভরে দিল।

“বিয়ের প্রথম মিষ্টি আপনাকে দিয়েই শুরু করলাম বিবি সাহেবা।” শেষ করেই রমিজের উদ্দেশ্য বলল, “এবার ওদের সবাইকে মিষ্টি দে রমিজ। একজনেও যেন বাকি না থাকে। সঙ্গে ক্লাসে উপস্থিত থাকা ম্যাডামকে দুটো বেশি করে দিস।”

পাখির দিকে তাকিয়ে নাওয়াফ উপদেশ দিল, “আপনি এখন যান। গিয়ে বেঞ্চে বসুন। ক্লাস করুন। ছুটির সময় আমি এসে নিয়ে যাব। পাকনামি করে আবার একা যাওয়ার চেষ্টা করবেন না। আমার হাতের মার কিন্তু খুব শক্ত।”

(চলমান~)

#লামইয়া_তাসনিম।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন