#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(১৯)
বৈশাখের আজ পহেলা দিন। সকাল থেকে মেঘেদের গর্জন শোনা যাচ্ছে। ভোর থেকে আকাশ গুমট গুমট। ঠান্ডা বাতাসে শরীরের লোম পর্যন্ত শিহরন জাগায়।
তাহিরা বেশ ভোরেই উঠেছে। নামাজ পড়ে নাস্তা বানাতে বসল। তখন ঘরের ভেতর থেকে মুঠো ফোনটি বেজে ওঠল। তার হাতে আটা ছিল। সে হাতটা ধুয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে চেপে ধরল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে সালাম দিয়ে শুধাল ফাতিহা নুর।
“কেমন আছো তাহিরা?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আপা। আপনি কেমন আছেন?”
“ভালোই আছি বইন। ছেলেটা যা কান্ড করছে না? বিয়েটা যেহেতু করবিই, আমাদের জানিয়ে করলে কি হতো? কাবিন করছে নদীর ওপার গিয়া। বিয়া করছে মাইয়্যা স্কুল থেকে তুইলা নিয়া। এরে নিয়া আমি যামু কই ক বইন? মাথাটা পুরা পাগল করে দিছে। এদের বাপ ছেলের জ্বালায় দেখছি ঘর ছাড়তে হইবে।”
তাহিরা আর ফাতিহা নুর আগে থেকে পূর্বপরিচিত। তাছাড়া ফাতিহা নুর তাহিরাকে তুই বলেই আগে পরে ডাকত। তাহিরা মুচকি হেসে শুধাল, “পোলার বাপে আবার কি করল?”
“পোলার বাপের ইচ্ছে হইছে পুত্রবধুর মুখখানা দেখব। ওইদিকে তিন দিন যাবৎ বউয়ের মুখ দেখতে না পেয়ে পোলার আইছে জ্বর। এসব কথা মানুষরে বলা যায়? মানুষ ছিহ ছিহ করব। আমি গেছি মাথায় জলপট্টি দিতে। গিয়ে শুনি ও কি বলে জানিস?”
“কি বলে আপা?"
“বউ, একটা চুমা দে। তোর চুমুর ডোজে সব জ্বর ভালো হয়ে যাবে। সাধে কি আর ওটাকে পাগল বলি? দেখিস তাহিরা পাখি এ বাড়িতে আসলে ও ঘরকুনো হবে। ঘর থেকে বেরই হবে না। সারাক্ষণ বউয়ের আঁচল ধরে বসে থাকবে।”
ফাতিহা নুরের কথা শুনে তাহিরা হো হো করে কয়েক দফায় হেসে দিল।
“তুই হাসছিস? আর এদের বাপ ছেলের লীলা দেখতে দেখতে আমি এখন ক্লান্ত। আর নিতে পারছি না। গা জ্বলে। বাপে এক ধাপ জ্বালিয়েছে। ছেলে আরেক ধাপ জ্বালাচ্ছে। এখন থাক এসব বিষয়। পাখিকে আজ স্কুলে পাঠাস না। নাওয়াফের ভীষণ জ্বর। উঠতে পারছে না বিছানা থেকে। ওর কলিজার ডুগডুগিরে পাঠিয়ে দিস। নতুবা পাগলটা জ্বর নিয়ে গিয়ে তোর বাড়িতে উপস্থিত হবে। তখন তোর ঝামেলা আরো বাড়বে। আমি রমিজকে পাঠিয়ে দিচ্ছি পাখিকে দিয়ে দিস। শশুড় বাড়ি ঘুরে যাক, আর তার স্বামীকে একবার দেখে যাক। এসে দেখুক তাকে দেখতে না পেয়ে তাহার স্বামীজান কীভাবে জ্বর বাঁধিয়েছে শরীরে?”
“তা না হয় পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু আপনি তো একবার আসতে পারেন আপা। দুটো দিন ঘুরে যান।”
“না না হাতে সময় নেই। ছেলে বউয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছে। সেঁকরা ডেকে গহনা বানাতে দিতে হবে। বউয়ের জন্য বিখ্যাত তাঁতি দিয়ে শাড়ি বানাতে হবে। অনেক কাজ বাকি। রাখছি এখন, হ্যাঁ? ওকে পাঠিয়ে দিস।”
“আচ্ছা আপা।”
তাহিরা ফোন রেখে পাখিকে ডাকতে গেল। মেয়েটা গভীর ঘুমে ঘুমুচ্ছে। তাহিরা আজ খুব কাছ থেকে পাখিকে লক্ষ্য করল। কত ছোট ছিল মেয়েটা! আজ কত বড়ো হলো! যে বিয়ে করবে না বলে লাফাচ্ছিলো, আজ সেই মেয়েটারও বিয়েটা হয়ে গেল। এখন স্বামীর বাড়ি গিয়ে মন দিয়ে সংসার করতে পারলেই হলো। মুখটা আগের চেয়ে একটু উজ্জ্বল হয়েছে। হাত পায়ের আঙুলগুলি চিকন আর লম্বা লম্বা। সে ওকে আলতো করে ডাকল, “পাখি।”
পাখি নড়েচড়ে আবার ঘুমিয়ে গেল। তাহিরা আবার ডাকল, “পাখি, এই পাখি। ওঠ না। তোকে এক জায়গায় যেতে হবে।”
পাখি ঘুম ঘুম চোখে বিরক্তি নিয়ে বলল, “আমি তোমার সবজি খেতে যেতে পারব না। ওখানে অনেক জোঁক।”
তাহিরা হেসে দিল।
“তোকে সবজি ক্ষেতে যেতে হবে না গাধা। এক জায়গায় বেড়াতে পাঠাব।”
বেড়ানোর কথা শুনে পাখি ঝটপট উঠে বসল। অগোছালো এলোমেলো চুল তার। বেশ বড়ো হয়েছে। হাঁটু ছুইছুই হচ্ছে। এমন চুল ছিল পাখির আম্মার। মেয়েটা বুঝি মায়ের মতো হয়েছে কিছুটা। পাখি বেড়াতে বেশ পছন্দ করে। সে ঘুম জড়ানো ফোলা ফোলা মুখটা নিয়ে জিগ্যেস করল, “কোথায় বেড়াতে যাব?”
“তোর শশুর বাড়ি।”
পাখি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসল।
”শশুর বাড়ি? বেড়ানোর আর কোন জায়গা পেলে না?”
“এত কথা জানি না৷ আপনাকে যেতে হবে। আপনার স্বামী নাওয়াফ তালুকদার আপনাকে তিন পর্যন্ত দেখতে না পেয়ে জ্বরে ভুগছে। তাকে একটু দেখা দিয়ে সুস্থ করে আসুন। আপনার শাশুড়ি আম্মা আর তার সেবা করতে পারছে না। ভীষণ জ্বালাচ্ছে তাকে। সারাক্ষণ বউ বউ বলে সে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলছে। তাই আপনার শাশুড়ি আম্মা সকাল সকাল ফোন করে আপনাকে তালুকদার বাড়িতে যেতে বলেছে। সে রমিজকে পাঠিয়ে দিবে। রমিজ কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। আপনি গোসল করে রেডি হন। মাথায় একটু ভালো করে শ্যাম্পু দিয়েন।”
পাখি বিরক্ত হলো। চোখ মুখ কুঁচকে বলল,
“এটা কেমন কথা মণি? এভাবে কেউ শশুর বাড়ি যায়? পরে তো তারা তুলে আর নিবে না। সব টাকা বাঁচানোর ধান্দা। কিপ্টা ফ্যামিলি কোথাকার!”
“এগুলি গিয়ে তোর বরকে বলিস। আমায় না।”
পাখি ভেংচি কেটে বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, “ও মণি না গেলে হয় না?”
”হয় তো। এখন তুই যাবি না। পরে তোর বর এসে এ বাড়িতে দুতিন থাকবে। তখন বাড়ি বসে তার সেবা যত্ন করিস।”
পাখির মাথায় হাত।
“ সর্বনাশ! তিনি দুতিন থাকবে কেন?”
“কারণ সে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না।”
“কেন তার ডায়রিয়া হয়েছে?” বলেই পাখি দাঁত বের করে হাসতে লাগল।
তাহিরা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। পাখি ঝটপট মুখ বুঝালো।
“বিয়ে হয়েছে এখন একটু পরিবর্তন হইস। অন্যসব মেয়েদের দেখে একটু শিখ। জামাই ছাড়া তারা একটু মুততেও যায় না।”
“মুততে যেতে কি জামাইরে লাগে?”
“আহা ওটা কথার কথা। এখন যা তো রেডি হ।”
____
তাহিরার রুটি বানানো শেষ প্রায় তখন দেখল রমিজ এসেছে। দুহাতে ফল আর মিষ্টির প্যাকেট৷ তাহিরাকে দেখে কপাল মাঝে লম্বা সালাম ঠুকল। তাহিরা রমিজকে ডয়িং রুমে বসতে বলল। রমিজ তাড়া দিয়ে বলল, “না না, বসার সময় নেই খালাম্মা। এখনই আবার বের হতে হবে। ভাবিজানরে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে একটু মুলাদি যাব। ভাই যেতে বলেছে।”
“তাই বলে বসবে না? বসো তো তুমি। আমি দেখে আসি পাখির হলো কিনা।”
তাহিরা রমিজকে নাস্তা পানি দিয়ে পাখিকে ডাকতে ডাকতে রুমে ঢুকল।
“পাখি তোর হলো? রমিজ কিন্তু এসে গেছে।”
পাখি চুল আঁচড়ে চোখে কাজল দিতে দিতে বলল, “মণি আর একটু। এখন একটা কথা রাখবে? ইচ্ছেকে বলো না গো সঙ্গে যেতে। প্লিজ প্লিজ। এই প্রথম ওই বাড়িতে যাচ্ছি। আমার লজ্জা করছে। সঙ্গে ভীষণ ভয়ও লাগছে।”
তাহিরা পাখির দিকে কতক্ষণ নীরবে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল। মেরুন রঙের পাকিস্তানি একটা থ্রিপিস পরনে ওর। লম্বা চুল থেকে শ্যাম্পুর কড়া ঘ্রাণ বের হচ্ছে। ড্রেসটা উজ্জ্বল শরীরে বেশ মানিয়ছে। তাহিরা বলল, “সব ঠিকাছে। ঠোঁটে শুধু একটু গাঢ় করে লিপস্টিক দে। দেখতে ভালো লাগবে।”
পাখি তাহিরার কথা শুনল না। তাহিরা পাখির হাত টেনে ধরল।
“বিয়ের পর এই প্রথম শশুর বাড়ি যাচ্ছিস। একটু সেজেগুজে না গেলে ভালো লাগে দেখতে?”
“লিপস্টিক দিলে নুড কালার দেও। গাঢ় কালার দেখতে ভালো লাগে না।”
তাহিরা ফোঁস করে শ্বাস ফেলল।
“ঠিকাছে দে। আমি বের হলাম। তুই বের হ দ্রুত।”
“ইচ্ছেকে আসতে বলবে না?”
“ওর যাওয়ার সময় কই? সামনে ওর বোনের বিয়ে।”
পাখি মুখটা গোল করে শ্বাস ফেলল।
“সবাই স্বার্থপর।”
“দুনিয়ায় তুই একমাত্র ভালো মানুষ।”
“কথাটা সঠিক বলেছো।”
তাহিরা হতাশ হলো। নীরবে শ্বাস টানল। সে বেরিয়ে যাচ্ছিল। পাখি ঠোঁটে লিপিস্টিক লাগিয়ে তাহিরার পিছু পিছু বের হলো। তাহিরা অনেক কিছু বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে রমিজের সঙ্গে পাঠাল।
তালুকদার বাড়ির সীমান্তে এসে তার বুকটা ধুকপুক করতে শুরু করে দিল। এতদিন এই বাড়ির সামনে দিয়ে কত গিয়েছে, এসেছে? কিন্তু কখনো ভিতরে ঢোকা হয়নি। কোন ফিলিংসও জাগেনি। আজ কেন জানি অচেনা ভয়, বুক ধুকপুকানি হামাগুড়ি দিয়ে এসে তাকে আষ্টেপৃষ্টে ধরছে। কড়া পাহারা আর পিলারের কারণে বাড়ির ভিতরের অংশ দেখা অসম্ভব ছিল। সেই বাড়িতে আজ বউ হিসেবে প্রথম প্রবেশ করতে যাচ্ছে সে। এটাকে বলে ভাগ্য। দারোয়ান পাখিকে দেখে সালাম ঠুকল, “সালাম ভাবিজান।”
পাখি দারোয়ানকে চিনে। আগে কত যেত? তখন ভালো করে তাকাতোও না। এখন কত সম্মান দেখাচ্ছে! ভক্তি দেখাচ্ছে। সবই এই যে তালুকদার ট্যাগ শরীরে লেখে গিয়েছে না? তার জন্য। সে সালামের উত্তর দিল। তারা ভিতরে ঢুকল। বাড়িটাতে আভিজাত্যের ভালোই ছোঁয়া আছে। মোটামুটি বড়োই। ডুপ্লেক্স বাড়ি। তারা কিছুটা পথ হাঁটার পর ভিতরে ঢুকল। ভিতরে গুছানো, পরিপাটি। মন্ত্রী পরিবার বলে কথা। পাখি যেতেই ফাতিহা নুর এগিয়ে এলেন। পাখি মুচকি হেসে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”
ফাতিহা নুর চোখ পাকান।
“আমার ছেলেটারে তাবিজ করে বিয়ে করে এখন আন্টি ডাকা হচ্ছে? দিব এক চড়। যান উপরে গিয়ে আপনার স্বামীর চোখ জুড়ান। বুক শান্ত করেন। মন ভরান।”
পাখি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসল। পরক্ষণে লজ্জা পেল। সব লোকটার জন্য হচ্ছে। আচ্ছা করে সে কয়েকটা বকা শুনাবে।
ফাতিহা নুরের কথায় রমিজ ফিক করে ঠোঁট টিপে হেসে দিল। ফাতিহা নুর রমিজের দিকে সন্দিহান নজরে তাকালেন।
“তুই হাসছিস কেন?”
“এমনি।”
“এমনি না? দিব এক চড়। তোর বসের সঙ্গে থাকতে থাকতে লাফাঙ্গা, বদমাশ হয়েছিস।”
পাখির মাথায় ঘোমটা দেওয়া। সে ভয়ে আছে। কখন আবার তাকে এক ধমক দিয়ে বসে। যে কড়া মহিলা? আপাতত মাথাটা নিচু তার। মেজবান তালুকদার উপর থেকে নিচে নামতে নামতে শুধালেন, “সকাল সকাল কাকে ধরে গোয়েন্দাগিড়ি করতে শুরু করে দিয়েছো ফাতু।”
ফাতিহা নুর কটমট করে সিড়ির দিকে তাকান। স্বামীকে দুটো কড়া কথা শুনাতে তিনি এগিয়ে যান।
“তোমাকে না কতদিন বলেছি আমাকে ফাতু বলে ডাকবে না। হয় ফাতিহা নয় নুর বলে ডাকো।”
“আহা রাগ করছো কেন? ফাতু তো তোমাকে ভালবেসে ডাকি।”
“রাখো তোমার ভালবাসা। তোমার আর তোমার ছেলের ভালোবাসা দেখতে দেখতে এইদিকে আমি শহিদ হয়ে যাচ্ছি।”
“ছেলে আবার নতুন করে কি করেছে?”
“কি করেনি সেটা বলো? সে যা করে সব সঠিক। বাকি সব ভুল।”
“তা তো ঠিক। দেখতে হবে না তার পয়দাদাতা কে?”
“মশকড়া বন্ধ করো। এখানে নতুন একজন মানুষ আছে। দেখে শুনে কথা বলো।”
“নতুন মানুষ? কে সে?”
“তোমার ছেলের কলিজার ডুগডুগি।”
“কে পাখি?”
“চোখ দুটো খুলে সামনে নেও।” বলেই ফাতিহা নুর মেজবান তালুকদারের মাথাটা পাখির দিকে ঘুরিয়ে দিল। মেজবান তালুকদারের চোখ পাখির দিকে পড়তেই পাখি হাসতে চেষ্টা করল। সালামও দিল। মেজবান তালুকদার আশ্চর্য হলেন।
“ওমা! আমার ছেলের এই দামি ডায়মন্ড এখানে এলো কি করে?”
“আসল না, আমি এনেছি। এখন যাও ছেলেকে ডেকে নিয়ে আসো তার ডায়মন্ড দেখতে।”
“ডাকার কি আছে? পাখিকে উপরে নিয়ে যাও। কথা বলুক ওরা।”
“তুলে আনার আগে এক রুমে থাকতে দেওয়া উচিত?”
“ওই নিয়ম আমি মানলেও তোমার বেপরোয়া ছেলে মানবে তো? দেখো আবার তুলে আনার আগে তোমাকে দাদি বানিয়ে বসে থাকে না যেন। ওর ভিতরে এমনিতে ধৈর্য সহ্য কম। দেখলে না মেয়েটাকে স্কুল থেকে ধরে নিয়ে কেমন বিয়ে করে নিল।”
এদের কথা শুনে পাখির লজ্জায় কান পর্যন্ত গরম হয়ে এলো। কিসব বলছে তারা? সে উপরে তাকাতে পারছে না।
রমিজ মেজবান তালুকদারের কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলে, “আপনার সঙ্গে আমি একমত খালু। ভাইরে সব বিষয়ে বিশ্বাস করলেও আমি এই বিষয়ে এক পাসেন্টও বিশ্বাস করি না।”
ফাতিহা নুর বললেন, “হলে হলাম দাদি। তাতে সমস্যা কি? তাই বলে ছেলের হক মারব? বউ এনে লুকিয়ে রাখব? না না এটা অন্যায় হয়ে যাচ্ছে। ছেলের সঙ্গে এই অনিয়মটা আমি কিছুতেই করতে পারব না। দাদি একদিন না একদিন হবোই। সেটা দুদিন আগে হলেই কি? এখন যার বউ, বাপু তার কাছে দিয়ে আসো।”
পাখি এদের দুপক্ষের কথার মাঝে আটকে রইল। সে আসলে কি করবে বুঝতে পারছে না। কিছু বললে আবার না ভুল ধরে বসে। ফাতিহা নুর মেজবান তালুকদারকে দেখিয়ে পাখিকে বলল, “এ হলো তোমার অকর্মা শশুড়। যার কাজ দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টাই ঘরে বসে থাকা। কি করছি না করছি তার ভুল ধরা। তার ভিতরে দিনের চব্বিশ ঘণ্টার বাইশ ঘণ্টাই তার সঙ্গে আমার ঝগড়া লেগে থাকবেই।”
মেজবান তালুকদার ফোঁড়ন কেটে বলে ওঠলেন,
“হ্যাঁ, নতুন বউকে এনে শশুড়ের নামে বদনাম রটাচ্ছো। বাইশ ঘণ্টার ঝগড়াটাই তুমি দেখলা। বাকি দু ঘণ্টার প্রেমটা আর দেখলা না। আজকাল ভালবাসার কোন দামই নেই। মূল্যই নেই। না না এই বাড়িতে আর থাকা যাবে না। যেখানে ভালবাসা নেই, সেখানে সম্মানও নেই। চল রমিজ বনবাসে চলে যাই। গিয়া হারপিক খাই।”
মেজবান তালুকদারের কথাতে ফাতিহা নুর লজ্জায় লাল হয়ে ওঠলেন। সে পাখিকে তাড়া দিয়ে বলল, “চলো তোমাকে নাবুর কাছে দিয়ে আসি।”
লোকটার কাছে যাওয়ার কথা শুনে পাখির বুকটা ধুকপুক করে ওঠল। হাত পা শিরশির করছে। বুকের ভেতরে যেন হাতুরি পেটাচ্ছে।
ফাহিতা নুর হাঁটতে হাঁটতে পাখিকে নাওয়াফের রুমে নিয়ে গেল। নাওয়াফ তখন সাইয়্যারা মুভি দেখছিল। ফাতিহা নুর খোলা দরজা দিয়ে পাখিকে ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজায় হালকা টোকা দিয়ে বলল, “আব্বাজান, আপনার কলিজার ডুগডুগি এসে গেছে। এবার জ্বরটা দ্রুত ভালো করুন হ্যাঁ? আমি চললাম৷ আপনাদের জন্য নাস্তা পানির ব্যবস্থা করি।” বলেই সে দরজা বাহির থেকে আটকে দিল। দরজা আটকানোর শব্দে পাখি মৃদু চমকাল।
নাওয়াফ টিভি বন্ধ করে পাখির দিকে চাইল। পাখিকে দেখে সে প্রচন্ড চমকাল। সকাল সকাল সে ভুল দেখতে না তো। মেয়েটার শরীরে গাঢ় মেরুন রঙের জর্জেট থ্রিপিসটা। উজ্জ্বল শরীরে দারুণ মানিয়েছে। খোলা চুল। তার ওপর মাথায় কাপড় দেওয়া। চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা করে লিপস্টিক দেওয়া। ঘোমটা দেওয়ার কারণে মুখটা বউ বউ একটা ফিলিং লাগছে। সে উঠে গেল। জ্বরে পোড়া শরীরটা নিয়ে পাখির দিকে ধীরে ধীরে আফিসের মতো এগিয়ে গেল। পাখির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর মুখটা নিচু। কাঁপছিল একটু। চোখে মুখে গভীর জড়তা। সে ঘোমটা দেওয়া মুখটা দুহাতের তালুতে তুলে নিল।
“মাশাআল্লাহ! এ তো আসমানের পরি। তোকে দেখে চোখ ফেরাতে পারছি না পাখি। এমনিতে জ্বরে মরছি। তার ওপর তুই আর আমাকে নতুন করে মারিস না। সত্যি বলছি মরে যাব।”
পাখি দ্বিগুণ লজ্জা পেল। গাল দুটো ভারী ভারী দেখাল তার। নাওয়াফ মৃদ্যু হাসল। ওর গালের সাথে নিজের গাল দুটো ঘষা দিল। খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে পাখির সমগ্র শরীরে শিরশির নামক শিহরণ বয়ে গেল। সেই সঙ্গে লোকটার গা থেকে ঝাঁঝাল পারফিউমের ঘ্রাণে ওর কেমন নেশা নেশা লাগল। নাওয়াফ পাখির ওড়না মাথা থেকে ফেলে দিল। ওড়নাটি বুকে আড়াআড়ি করে দিয়ে পাখির পিছু গিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়াল। ওর লতানো কোমড়টা দুহাতে টেনে নিজের চওড়া বলিষ্ঠ শরীরটার সঙ্গে মিশিয়ে ধরল। লম্বা ঝলমলে চুলগুলো থেকে মিষ্টি ঘ্রাণে তার মাথা ধরে যাচ্ছিল। কি মিষ্টি সুভাস! সারাক্ষণ ওই চুলে তার মুখ গুঁজে থাকতে ইচ্ছে করল। কতক্ষণ ঘ্রাণটুকু নাক ভরে শুষে নিল। এরপরে চুলগুলি দুহাতে সরিয়ে দিয়ে হাতের বাম পাশে এনে ডান কাঁধে সে থুতনিটা রাখল। ওর উন্মুক্ত ঘাড়ে পুরুষালি নাকটা ঘষতে ঘষতে শুধাল, “এই যে আম্মুর একমাত্র ছেলের কলিজার ডুগডুগি, সকাল সকাল আপনি কেন এসেছেন, হুঁ? আমার চরিত্র নষ্ট করতে? আমায় গোসল করাতে? উদ্দেশ্য যদি এটা হয়ে থাকে, তবে আমি রাজি। এই জ্বরের শরীরে আপনার সঙ্গে গোসল একবার নয়, দশবার করতে হলেও আমার কোন আপত্তি নেই।”
পাখি দুহাতে ওড়না খামচে ধরল। ছিঃ! লোকটা এসব কি বলছে? ওই দিকে লোকার উত্তাপে তার শরীর পুড়ছে। উষ্ণ হয়ে উঠছে। লোকটার কথাগুলি তাকে বহুগুণ লজ্জা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কথা বলতে গিয়েও দুঠোঁটের মাঝে আটকে পড়ল। সে জবাব দিতে পারল না। ওর থেকে কোন জবাব না পেয়ে লোকটা ওর কানের লতিতে আলতো করে কামড় বসিয়ে দিল। পাখির সমগ্র শরীরে কেমন বিজলির ন্যায় ঝলক বয়ে গেল। শরীরের লোমগুলিও কাঁটা দিল। অতঃপর একে একে সব দাঁড়িয়ে গেল। নাওয়াফ ফিসফিস করে পাখির কানে কানে আবারো বলল, “আপনার আগমনে জ্বর ভালো হয়ে গেছে লক্ষ্মীটি । এই দেখেন, শরীরে কোন জ্বর নেই। এখন আমার শরীরে নতুন করে একটা অসুখ বেঁধেছে। সেই অসুখের নাম হলো দুষ্ট প্রেমের মিষ্টি অসুখ। এই অসুখ কেবল আপনার ছোঁয়াই সাড়বে। এই অসুখের মেডিসিন একমাত্র আপনার কাছেই আছে।”
পাখি আমতা আমতা করে জড়তা নিয়ে বলল, “কি সব বলছেন নাওয়াফ ভাই? কিসের মেডিসিন আমার কাছে থাকবে?”
“জানিস না?”
“না।”
“চোখ দুটো বন্ধ কর। আমি দেখাচ্ছি।
“কেন?”
“আহা এতো প্রশ্ন করে না আমার কলিজাটা।”
লোকটার নির্লজ্জতম কথাবার্তায় পাখির বুকটা টিপটিপ করে কাঁপছিল। ধুকপুকও করছে। কি করতে চাইছে লোকটা সে বুঝতে পারছে না। ওইদিকে লোকটার স্পর্শে পুরো শরীরে আগুন ধরে গেছে। সে ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। নাওয়াফ দুহাতে পাখির কোমর খামচে ধরল। ওকে তার দিকে ফিরিয়ে নিল। পাখি চোখ দুটো খিঁচে নিল। নাওয়াফ ওর ওষ্ঠ দুটোর দিকে নীরবে কতক্ষণ তাকিয়ে রইল। তিরতির করে কাঁপছিল, নড়ছিল মেয়েলি ওষ্ঠজোড়া। সে ঠোঁটজোড়া বাঁকিয়ে হাসে। নিকোটিনে ঝলসে যাওয়া ঠোঁট দুটো এগিয়ে নিল সেদিকে। একটা সময়ে দুই জোড়া ঠোঁট এক সন্ধিতে আবদ্ধ করে নিলো। পাখির দেহের ওপর দিয়ে রীতিমতো আবারও ঝলক বয়ে গেল। চোখ দুটো খুলে ফেলল সে। ঠেলে বাঁধা দিতে চাইল। নাওয়াফ ওর ঠোঁট দুটো আঁকরে ধরা অবস্থাতে ওর হাত দুটো পিছনে কোমরের সঙ্গে চেপে ধরল। পাখি দেখল তার দম বন্ধ লাগছে। শ্বাস ফেলতে পারছে না। তবুও লোকটার উন্মদনা কমছে না। তাকে ছেড়ে ছেড়ে অঘটন ঘটাচ্ছে তিনি৷ লোকটা একটু ছাড়তেই পাখি শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, “মরে যাচ্ছি। এবার ছাড়ুন নাওয়াফ ভাই। সইতে পারছি না। নতুবা সত্যি সত্যি মরেই যাব।”
নাওয়াফ ওর দুই ঠোঁটের মাঝে ছোট করে একটা কামড় বসিয়ে বলল, "উঁহু না, তুই মরবি না। তোকে তো মারব আমি নিজে। আমার উষ্ণ আদরে। দুই ঠোঁটের আগুনে ঝলসে দিব তোর দেহের প্রতি কোনা থেকে কোনা। তুই রেডি থাকিস, এরচেয়েও ভয়াবহ উত্তাপ তোর দেহে ছড়িয়ে দিয়ে তোকে আমি উষ্ণ আলিঙ্গনে মারব লক্ষ্মীটি।"
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম।