ফন্ট সাইজ:
থিম:
সে আমার সর্বনাশ-২

২১তম পর্ব

লেখক: লামইয়া তাসনিম

#সে_আমার_সর্বনাশ_২

(২১)

দৌড়াতে দৌড়াতে পাখি নিচে নেমে গেল। সোজা নাওয়াফের রুমে ঢুকে পড়ল। আশপাশ কোথায় লুকাবে সে ভাবতে লাগল। হঠাৎ মনে হলো পর্দার আড়ালে লুকালে তাকে পাওয়া সম্ভব নয়। যেই ভাবা, সেই কাজ। সে দ্রুত পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। নাওয়াফ ধীরে ধীরে তার রুমে প্রবেশ করে। চর্তুর দিকে শিকারীর মতো ধূর্তমান চোখ দুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ওকে খুঁজল। সবকিছু শান্ত। কোথাও নেই ওর অবস্থান। এলোমেলো কিছু চোখেও পড়ছে না। যার ইঙ্গিতে সে খুঁজবে। তবে হ্যাঁ কারোর ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলার শব্দটা শোনা যাচ্ছে। সে মুচকি হাসল। ধীরে ধীরে লম্বাটে শরীরে এগিয়ে চলল। ঠিক জানলার পর্দার সামনে এসে থামল। হুট করে পাখির সামনে থেকে পর্দা সরিয়ে ফেলে। পাখি লজ্জা আর ভয়ে লোকটার চওড়া বুক ধাক্কে পালাতে চাইছিল। কিন্তু ওমন সুবিশাল চওড়া বলিষ্ঠ শরীর তার ধাক্কায় একবিন্দুও নড়ল না। বরং লোকটা তার ওপর ঝুঁকে পড়ে। বলিষ্ঠ হাত দুটো দিয়ে দুদিক থেকে দেওয়ালের হাত ঠেকিয়ে তাকে বন্দী করে নেয়। মধ্যখানে খাঁচায় বন্দী পাখির মতো ছটফট করে সে। ঘন ঘন শ্বাস পড়ে তার। বুকটা লাফাচ্ছে। গলাটা ঘামে চটচটে। নাওয়াফ ওর মুখের দিকে এক নজরে তাকিয়ে থাকে। কিছু যেন একটা নিঃশব্দে খুঁজে যাচ্ছে। হঠাৎ কপালের পাশ থেকে তর্জনী আঙুলটা টেনে টেনে ঠোঁটের ওপর দিয়ে থুতনি থেকে নামিয়ে গলার কাছাকাছি এসে থামাল। পাখির সমগ্র বক্ষ তখনো লোকটা হিমশীতল স্পর্শে কাঁপছিল। তার বক্ষের ভাঁজটি নড়ছিল। সেই সঙ্গে বক্ষের চলাচলও। একবার নিচে নামছে, আরেকবার ওপরে ওঠছে। লোকটা যেন ওকে জ্বালিয়ে বেশ আনন্দ পাচ্ছে। পৈশাচিক আনন্দ। তিনি ঠোঁট দুটো বাঁকায়। থেমে যাওয়া আঙুলটা তুলে বুকের খাঁজের ওপর দিয়ে নেমে আসে আরো নিচে। পাখি লোকটার চলন্ত আঙুল চেপে ধরল। ছটছট করতে করতে সে বলে, “আল্লাহর দোহাই লাগে। ছেড়ে দেন। মরে যাচ্ছি। শ্বাস ফেলতে পারছি না। আপনার স্পর্শে অবাধ্য হচ্ছে মন।”

“কয়টা প্রেম করছিলি যেন?”

পাখি তোতলায়।

“তো..তখন মি..মিথ্যে বলেছি।”

“মিথ্যে বললি কেন?”

“আপনাকে জ্বালাতে।”

“মজা পেয়েছিস?”

পাখির দৃষ্টি নত। নাওয়াফের হাত গিয়ে প্রবেশ করল ওর কামিজ ভেদ করে নরম মসৃণ উদরে। হালকা চাপ দিতেই পাখি কুঁকড়ে ওঠল। কিছুক্ষণের মধ্যে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। গলা দিয়ে চিকন সরু ঘাম ঝরে যাচ্ছে। বক্ষের নরম অংশ দুটোর ওঠা নামা দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে। সেই সঙ্গে তার দেহ জুড়ে দুষ্ট দুষ্ট শিহরণের আনাগোনা।

“লাগছে আমার। ছাড়ুন।”

“জ্বালাবি আমায়? জ্বলবি না তা কি হয়?”

তাৎক্ষণিক পাখি চোখ দুটো খুলে ফেলল। লোকটার ধারালো নয়নজোড়া তার মুখের দিকে তখনো তাক করা। কি কঠিন বাজপাখির মতো দৃষ্টি! ওই চোখে চোখ পড়লেই যেন তার সর্বনাশ নিশ্চিত। পাখি আমতা আমতা করে বলে, “খাব, ক্ষুধা লেগেছে।”

“খাবি?” শুধাল ওনি।

পাখি মাথাটা সজোরে ঝাঁকাল।

“হ্যাঁ।”

নাওয়াফ আমচকা ওর কোমল ওষ্ঠজোড়া নিজের অধরের তলে পিষে নিল। পাখি পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। বাঁধা দেওয়ার শক্তিটুকুও পেল না। মিনিট দুয়েক পর লোকটা ছাড়ল ওকে। পাখি হাঁপাতে লাগল। নাওয়াফ ঠোঁট কামড়ে ওকে শুধাল, “পেট ভরেছে? না আরো লাগবে?”

পাখি মুখটা ভেটকি মাছের মতো করে নিল।

“আমি ভাত খাব বলেছি। আপনার শক্ত ঠোঁটের শক্ত চুমু খাব বলিনি।”

“ওহ! ভাত খাবি?”

পাখি মাথা ঝাঁকাল।

“হ্যাঁ।”

“আমি তো ভাবলাম তোর গলা শুকিয়ে গেছে। তাই তৃষ্ণা মিটাতে গেলাম।”

পাখি ভেংচি কেটে চোখ পাকাল।

“আপনি তো এক আঙুল সব সময় বেশি বোঝেন।”

“থাক খাবার তো খাবারই। সেটা চুমু হোক আর ভাত হোক। ওটা কোন ব্যাপার না। একটা খেলেই হলো।

পাখি পুরো আহাম্মক হয়ে গেল। সে কপাল চাপড়াল।

“ কির ভিতরে কি?”

_____

রাতে সবাই খাবার টেবিলে খেতে বসেছে। পাখি আর নাওয়াফ মুখোমুখি বসা। নিখিল আর মুক্তিও আছে। ইচ্ছেও ছিল। সবাই টুকটাক কথা বলছে। ফাতিহা নুর সবার প্লেটে প্লেটে খাবার দিচ্ছিল। নাওয়াফ খাবার খাচ্ছে আর খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পাখির দিকে চেয়ে চোখ মারছে। দুবার মেজবান তালুকদারের চোখে ধরা পড়েছে। মেজবান তালুকদার চোখ রাঙালো। নাওয়াফ তোয়াক্কা করল না। মেজবান তালুকদার হতাশ হলেন। এ তো তার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে। সে খাওয়ার এক ফাঁকে নাওয়াফকে উদ্দেশ্য করে বলল, “পাখি আজ তোমার আম্মির সঙ্গে ঘুমাবে।”

নাওয়াফ চুপচাপ খেয়ে উঠে গেল। এর বিপক্ষে কোন জবাব দিল না। মেজবান তালুকদার কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। নতুন বউয়ের সামনে এমন অপমান না করলেও পারত। সে এটা মানতে পারছে না।

রাতে মুক্তি, ইচ্ছে আর পাখি ফাতিহা বেগমের রুমে ঘুমিয়েছিল। হঠাৎ মাঝরাতে দরজায় টোকা পড়ল। ফাতিহা নুর তখন জেগেই ছিলেন। তিনি ভাবলেন নাওয়াফ এসেছে। নতুন বউ রেখে আর পরাণ টিকে? সেও এই সুযোগে দুটো ধমক দিবে। কড়া কথা শোনাবে। এসব পরিকল্পনা করে দরজা খোলতে উদ্ধৃত হয়েছিল। কিন্তু তার ধারনা পাল্টে দিল। দরজার সামনে নাওয়াফ নয়; মেজবান তালুকদার দাঁড়িয়ে আছে।

ফাতিহা নুর ঘুমন্ত পাখি আর মুক্তিদের দিকে এক পলক তাকিয়ে ছোট স্বরে মেজবান তালুকদারকে ধমক দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “এখানে এসেছো কেন?”

মেজবান তালুকদার লাজ লজ্জা ভুলে গিয়ে কথার পরিপার্শ্বে বলল, “তোমাকে ছাড়া ঘুম আসছিল না ফাতু।”

মাত্রাতিরিক্ত লজ্জা পেলেন ফাতিহা নুর। গাল দুটো ভারী হয়ে এলো তার। লালিমাও দেখা গেল। সে চোখ দুটি খুব করে পাকাল।

“এই বয়সে এসেও নির্লজ্জতামি ছাড়ছো না?”

“আহা রাগ করছো কেন? বয়স আমার ৪৭-৪৮ হতে পারে। কিন্তু মনের বয়স তো ১৬ ফাতু। আচ্ছা তুমিই বলো, তোমাকে ছাড়া আমি এক রাতও কখনো কোথাও থেকেছি?”

ফাতিহা নুর ভেবে বললেেন, “নাহ।”

“তাহলে সেই তোমাকে ছাড়া আমার নিদ্রা আসে কি করে, হুঁ? এখন গার্ডেনে চলো। গিয়ে দুজনে গল্প করে রাতটা কাটিয়ে দেই। একসাথে ঘুমাতে না পারি, একসাথে রাত তো জাগতে পারি কি বলো ফাতু? দেখেছো আজকের আকাশ? কত সুন্দর জোছনা ওঠেছে! কত বছর হলো তোমায় নিয়ে জোছনা দেখি না!”

“মেয়েরা রুমে আছে। ওদের একা রেখে যাব?”

“তাতে কি হয়েছে? ঘুমাক ওরা। তুমি আসোতো।” বলেই ফাতিহা নুরের হাত টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন মেজবান তালুকদার। মেজবান তালুকদার বেরিয়ে যেতেই নিখিল রুমে ঢুকল। সে এতক্ষণ এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে কাজে লাগল। সে মুক্তিকে গিয়ে আস্তে করে ডাকল, “আমার চড়ুই পাখির ডিম।”

মুক্তি ঘুমের ভেতরে নিখলকে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল। বিড়বিড় করে বললও, “বাস্তবে তো জ্বালাসই। ঘুমের মধ্যে এসেও জ্বালিয়ে মারছে। শালা আবার আমাকে চড়ুই পাখির ডিম ডাকা হচ্ছে? তোর ঘাড় মটকে খাব।”

নিখিল পুরোপুরি আহাম্মক হয়ে গেল। তার মুখটা হয়েছে দেখার মতো। ঠিক পটলের ন্যায়। সে ক্ষণিকের মধ্যে মুখটা কাঁদো কাঁদো করে নিল। সে জীবনে অনেক নারী দেখেছে। কিন্তু কথায় কথায় এমন ঝাঁঝি মারাওয়ালা মেয়ে এই প্রথমবার দেখছে। কথা নয় যেন, এক এক রাশিয়ান এটম বোমা। এমনিতে সারাদিন ঝাঁঝি মারে। এখন আবার ঘুমের ভেতরেও মারছে। ছ্যাহ্, এরে বিয়া করলে তো দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টাই তাকে ঝাঁঝি আর মার খেয়ে মরতে হবে। সে আরেকবার ডাকল ওকে, “আমার কৈতোরি বানু, তুমি ওঠো সোনা। তোমার ঝাঁঝি খাওয়াওয়ালা কালা কোকিল তোমায় ডাকতে এসেছে।”

মুক্তি ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে পিটপিট করে চাইল। আবছা আলোতে নিখিলের মুখের অবয়ব দেখে সে আমচকা ভূত ভূত বলে চেঁচাতে চেয়েছিল। তার আগেই নিখিল দ্রুত ওর মুখ চেপে ধরে বলল, “ হিস, চিৎকার করে না আমার কৈতোরি বানু। আমার পিছু পিছু ছাদে আয়।”

মুক্তি চোখ দুটো সেকেন্ডের মধ্যে বড়ো বড়ো করে ফেলল।

“ছিহ্ এতো রাতে ছাদে ডাকছেন কেন, হ্যাঁ? নিশ্চয়ই আপনার খারাপ কোন উদ্দেশ্য আছে?”

নিখিলের মেজাজ খারাপ হলো। এটা মেয়ে না গোয়েন্দা পুলিশ ভাই। সব সময় এক আঙুল বেশি বোঝে। সে বলল, “আছে তো। তোরে বেঁচে দিয়ে টাকা কামাব। সেই টাকা দিয়ে একটা দোকান দিব।”

মুক্তি বিস্ময়ে আঁতকে ওঠল। তার হাত অটোমেটিক মুখে চলে যায়।

“সর্বনাশ! কি সাংঘাতিক! এখনই আমি খালামণিকে গিয়ে বলছি আপনার উদ্দেশ্যের কথা। ছিহ্, এত কাজ থাকতে শেষ পর্যন্ত নারী পাচারের মতো বেআইনি একটা কাজ করবেন আপনি?”

নিখিল ওর কাছে অনুরোধ করে বলল, “আমার টুনটুনি তোমার চোপা দুইডা আল্লাহর ওয়াস্তে থামাও। আমি তোরে বেচতে নয়; প্রেম করতে ডাকছি। প্রেম বুঝেছিস ছাগল? এখন আয় তো।”

মুক্তি হেসে দিলো। নিখিল হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। মাইয়া পটানোর মতো এত কঠিন কাজ বুঝি দুনিয়াতে দুটোও নেই। এরা মিথ্যে বললে খুশি হয়। সত্য বললে টাকাটাকি লাগায়।

সে মুক্তিকে নিয়ে ছাদে উঠে গেল।

_____

রাত তখন দুটো। বেলকনিতে দাঁড়ানো সে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। নিকোটিনের ধোঁয়াগুলি বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ঝলসানো ঠোঁট দুটিতে সিগারেট চেপে ধরে। ধূসর রঙের মণি দুটো গার্ডেনের দিকে। ঠোঁট ছড়িয়ে এক চিলতি হাসল সে। সিগারেট পায়ের নিচে পিষে রুম থেকে বের হলো। এগিয়ে চলল ফাতিহা বেগমের রুমের দিকে। ভেতরে ঢুকে দেখল পুরো বিছানায় শুধু পাখি একা শোয়া। ড্রিম লাইট জ্বলছে। ওয়াশরুম থেকে পানি পড়ার শব্দ আসতেছে। কেউ হয়ত গিয়েছে। সে ধীরে ধীরে শয়নগৃহের চারপায়ীর ওপর গিয়ে বসল। অগোছালো ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। হাত পা ছড়ানো। সুতি একটা কাপড় পরনে। জামার গলাটা বেশ বড় হওয়ার কারণে বিউটি বোনদের ভাঁজ, নড়াচড়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মুখটা তেলতেলে। মুখের ওপর কয়েকটি চুল এসে নির্লজ্জ ভঙ্গিতে ওড়াওড়ি করছিল। সে হেসে ফেলল। আলগোছে চুলগুলি কানের নিচে গুঁজল। খুব কাছ থেকে মুখটা দেখল। অতঃপর ঝুঁকে পড়ল মুখের ওপর। বক্ষের নরম খাঁজে নরম ঠোঁটটা ছোঁয়াল। ঘুমের ভেতরে পাখি দুবার কেঁপে কেঁপে ওঠল। অজানা শিহরনে বিছানার চাদর খামচে ধরল। তিরতির করে নড়লও ওষ্ঠজোড়া। লোকটা হেসে ফেলল। ঠোঁট দুটো বাঁকাল। ভারিক্কি মুখ জুড়ে চলছে ধূর্তমান কোন চিন্তাধারা। হুট করে ওকে কোলে তুলে নিল। সঙ্গে সঙ্গে পাখির চৈতন্য ফিরে। মৃগ নয়নজোড়া খুলে দেখল অন্ধকারে জ্বলতে থাকা দুজোড়া ধূসর চোখের মণি। ভয়ে আতঙ্কে সে ঘাপড়ে গেল। চিৎকার করতে যাচ্ছিল তার আগেই লোকটা ওর দুই ঠোঁটের মাঝে আঙুল চেপে ধরল।

“হিস, শব্দ করে না লক্ষ্মীটি।”

পাখি দমে গেল। তবে তার শরীর হিম হয়ে আছে। সে ফিসফিস করে বলল, “করছেন কি? আমায় নিচে নামান।”

নাওয়াফ ওর কথা কর্ণে তুলে না। হাঁটতে থাকে। পাখি বুঝে গেল লোকটা তার কথা বুঝবে না। সে বলল, ”আমরা যাচ্ছি কোথায়?”

“আমার রুমে।”

পাখি আঁতকে ওঠল।

“রুমে কেন? আম্মা দেখে ফেললে বকবে।”

“বকবে না।”

“যদি বকে?”

“কারোর সাহস হয়নি যে নাওয়াফ তালুকদারের কলিজাকে বকবে।”

পাখি লোকটার ধূর্তমান সুতনু মুখটার দিকে বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকে। ওর তাকানো দেখে লোকটা হেসে দিল।

“কি দেখছিস ওমন করে?”

“আপনাকে।”

“ভালো লাগে? পছন্দ হয়?”

পাখি লজ্জা পেল। গাল রক্তিম হলো। নাওয়াফ আবারো বলল, “লজ্জা পেলে তোকে এত সুন্দর লাগে কেন?”

“জানি না।”

“কিন্তু আমি জানি। ”

“কি?”

“লজ্জা পেলে তোকে সুন্দর লাগে কেন জানিস? কারণ তুই সুন্দর বলে।”

পাখি মুখ বাঁকাল। ভেংচিও কাটল।

“এসব ফাও কথা। সুন্দর হলে স্কুলে কয়েকশ লাভ লেটার চলে আসত।”

স্বল্পকালীন সময়ের মধ্যে নাওয়াফের ললাট কুঁচকে আসে। ভ্রু দুটো বাঁকাল সে।

“লাভ লেটার আসেনি বলে আফসোস করছিস?”

“আসলে তো আপনাকে হিংসে লাগাতে গর্ব করে বলতে পারতাম। দেখেছেন কত ছেলে আমার জন্য পাগল?”

“একজনকে পাগল বানিয়ে শান্তি হয়নি?”

“কে পাগল হয়েছে?”

“খবিশ মহিলা আমাকে কি তোর চোখে পড়ে না?”

পাখি পা দুটো নাচিয়ে খিলখিল করে হেসে দিল। নাওয়াফও হাসল। তবে স্বল্প। ওর গলার একদম নিচে দুটো কিস করল। পাখি থমকে গেল। কেমন হাঁসফাঁস লাগল তার। বড়ো বড়ো উষ্ণ শ্বাস ফেলছে। নাওয়াফ ঠোঁট কামড়ে ফিচেল হেসে ওকে শুধাল, “ওমন করছিস কেন?”

পাখি অভিযোগ করে লাজে রাঙা গাল দুটো ফুলিয়ে বলল,

“আপনি ওখানে ঠোঁট ছোঁয়ান কেন?”

“আমার ভালো লাগে তাই।”

“আমার দেহে যে উত্তাপ ছড়িয়ে যায়।”

“উত্তাপ ছড়িয়ে যাওয়ার জন্যই তো স্পর্শ করি।”

পাখি চোখ দুটো বন্ধ করে নিল।

“চুপ করুন নির্লজ্জ লোক। আর নিতে পারছি না। লজ্জা লাগছে।”

“এতো লজ্জা?”

“হুঁ।”

“আরেকটু লজ্জা দেই?”

“না কামড়ে দিব কিন্তু।”

“কোথায়?”

“আপনার হাতে।”

“ঠোঁট কি দোষ করল? ওখানে দিতি। মজা পেতাম।”

“আপনি না বেশরম?”

”পুরুষ লোক একটু বেশরম হয়ই বউ। তাদের লজ্জা মেয়েদের তুলনায় কম থাকে।”

কথা বলার মাঝে ওরা রুমে ঢুকে গেল। পাখিকে বেলকনিতে নিয়ে নাওয়াফ বসিয়ে দিল। নাওয়াফ একটু নিচে উঁকি দিল। মেজবান তালুকদার উপরের দিকে তাকালেন। নাওয়াফ মুচকি হাসল। মেজবান তালুকদার ইশারায় বোঝালেন, “চালিয়ে যাও। আমি তোমার মাকে সামলাচ্ছি।”

নাওয়াফ আবারো হাসল। পাখির ললাট কুঁচকে আসে।

“হাসছেন কেন?”

“দেখবি কেন হাসছি?”

“হুঁ।”

“নিচে উঁকি দে।”

পাখি নাওয়াফের কথা মতো নিচে উঁকি দিল। দেখল মেজবান তালুকদার আর ফাতিহা নুর দোলনায় ঝুলছে। ফাতিহা নুরের মাথা মেজবান তালুকদারের কাঁধে। দুজনে কি মিষ্টি গল্পে মজে আছে! ওই দৃশ্য দেখে পাখি না হেসে পারল না।

“এবার বুঝেছি কেন হেসেছেন? আপনার চেয়েও দেখছি আপনার বাবা বেশি রোমান্টিক।”

“ওই দিকে নজর দিস না খবিশ। তোর শশুর হয়।”

“ছিঃ কিসব বলেন? ওনি আমারও বাবা হয়।”

“মজা করেছি তো বউ। বাট আমি আমার আব্বুর চেয়েও বেশি রোমান্টিক হব। প্রতিটা সেকেন্ডে সেকেন্ডে তোকে জ্বালাব। তুই সহ্য করতে পারবি না আমায়?”

“বেশি জ্বালাবেন না। তাহলে আমিও কামড়ে দিতে পারি।”

“আমার কোন আপত্তি নেই। বউকে জ্বালাতে গিয়ে দু চারটা কামড় না খেলে কিসের পুরুষ হলাম? বউ তো বউয়েই, আদর আর মার যাই দেক। সেটাই ভালোবাসা।”

পাখি চুপ হয়ে গেল। নাওয়াফ ওর মাথাটা তার বুকে এনে ঠেকাল। ঝিরেঝিরে বাতাস বইছে। জোছনার আলোয় সবকিছু দেখাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে পাখি শুনতে পেল নাওয়াফ ওকে মোহমায়া কণ্ঠে ডাকছে, “কলিজা!”

পাখি স্তব্ধ হয়ে গেল। তার গায়ে শীতল একটা বাতাস এসে সজোরে যেন ধাক্কা লাগল। এই ডাকটাতে কি আছে সে জানে না? যখনই শোনে তার হৃদয় পুরোপুরি দুর্বল হয়ে যায়। সে স্থির হয়ে যায়। নাওয়াফ আবারো ডাকল, “কলিজা..!”

পাখি এবার সাড়া দিল। প্রত্যুত্তরে বলল, “হুঁ।”

“ভালবাসবি একটু আমায়? তাহলে লাল টুকটুকে একটা শাড়ি কিনে দিব। পায়ের নুপূর এনে দিব। হাতের চুড়ি কিনে দিব। নিজ হাতে পায়ে আলতা পরিয়ে দিব।”

পাখি লোকটার মুখটার দিকে চেয়ে দেখল। সেখানে কত মায়া, সিগ্ধতা, মাদকতা! পাখি মুখটা নিচু করে নিয়ে হাসে।

“মি. নাওয়াফ তালুকদার, আপনি আমাকে লোভ দেখাচ্ছেন? আমি কিন্তু ভীষণ ভীষণ লোভি, হুঁ? তবে হ্যাঁ আপনার বলা ওসবের না। ভালোবাসার। একটু নরম স্পর্শ, একটু আদর, ভালবাসার কাঙাল আমি। এসব পেলে আরো আরো লোভি হব। কারণ অল্পটুকু ভালবাসাতে আমার পেট ভরবে না। দিলে পুরোটা দিতে হবে। আবার বুনো বিড়ালও কিন্তু আমি, হ্যাঁ? খাঁমচে দিতে পারি। সহ্য করার ক্ষমতা আছে কি?”

নাওয়াফ হেসে দিল। ওর হাত দুটো টেনে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এলো। মাথাটা বুকের ভেতরে নিয়ে বলল, “এই যে বুনো বিড়ালটা কতটুকু খামচাবেন আপনি, হুঁ? বেশি দিয়েন না। একটু মায়া দেখিয়েন। আমি না হয় অতটুকু আপনাকে ভালোবাসা দিয়ে পুষিয়ে দিব।”

পাখি বলল, “ এখন রুমে যাই?”

নাওয়াফ বাদ সাড়ল।

“উঁহু না। এখানে ভালো লাগছে। আমার বুকটার সঙ্গে লেপ্টে আছিস শান্তি লাগছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব শান্তি আমার বুকটার মধ্যে এসে লুকিয়েছে। তোর শরীরের গন্ধটা আমার খুব পছন্দের। অতটা পছন্দ আমার বিরিয়ানিও না।”

পাখি চুপচাপ লোকটার বুকের সঙ্গে লেপ্টে রইল। ওনার নিঃশ্বাসের শব্দগুলি উপলব্ধি করতে পারছিল। তার অন্য রকমের একটা ভালো লাগা কাজ করছিল। নাওয়াফ ওকে ডাকল, “আমার আদুরে বউ..!”

পাখি লজ্জায় লাল হয়ে গেল। বিড়াল ছানার মতো ওনার শার্টের বোদাম খুলে শার্টের ভেতরে মুখ গুঁজল। নাওয়াফ হেসে দেয়। ওর মাথার ওপর একটা ছোট করে চুমু খেয়ে ওকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরল।

“ওরে শান্তিরে! এতো শান্তি এতোদিন কই ছিল?”

পাখি ফ্যালফ্যাল করে নাওয়াফের মুখটার দিকে চোখ তুলে চাইল। নাওয়াফ ছোট করে ওর দুই ঠোঁটের মধ্যখানে বিসমিল্লাহ্ বলে চুমু খেল। পাখি অবাক হলো। আগে পরে চুমু খেয়েছে। কিন্তু কখনো বিসমিল্লাহ্ বলতে শোনেনি। সে অবাক হয়ে বলল, “বিসমিল্লাহ্ বললেন কেন?”

নাওয়াফ পাখির নাকের ডগায় টোকা দিয়ে বলল,

“একটা উমরা হজের সওয়াব পেতে।”

“মানে?”

নাওয়াফ ওকে পিছু থেকে কোলের মধ্যে বসিয়ে বলল, “তোকে খুব সহজ করে বোঝাই। কোন বিবাহিত পুরুষ যদি তার স্ত্রীর ঠোঁটে বিসমিল্লাহ্ বলে চুমু খায় তাহলে সে একটা উমরা হজের সওয়াব পায়।”

“আর বিয়ের আগে যা করেছে?”

“আসতাগফিরুল্লাহ। তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছি তো। আর খোঁটা দেয় না বউ।”

পাখি হেসে দিল। নাওয়াফ ওর ঘাড়ে চুমু খেল। পাখি শিউরে ওঠল।

“কি করছেন কি?”

“একটা চুমুই তো খেয়েছি।”

পাখি কিছু বলল না। তবে নাওয়াফ চুপ থাকার নয়। সে আবার বলল, “একটা হিন্দি গান ধরতো।”

পাখি ঠোঁট উল্টে বলল,

“আমি হিন্দি গান পারি না।”

নাওয়াফ ভ্রু দুটো বাঁকাল। অতঃপর নাচালও। ধূর্তমান নয়নজোড়া ওর মুখের দিকে তাক করে শুধাল,

“পারিস না?”

“না। হিন্দি গান আমি উচ্চারন করতে পারি।” বলেই লজ্জায় পাখি মাথাটা নিচু করে নিল। নাওয়াফ হতভম্ব হলো কিছুটা। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিল। সে ওর নিচু মাথাটা তুলে জাগাল।

“তাকা আমার দিকে।”

পাখি চোখ তুলল। লোকটা হাসতে চেষ্টা করল। ওর গালে একটা চুমু এঁকে বলে, “হিন্দি পারিস না তাতে কি হয়েছে? বাংলা তো পারিস। তাতেই চলবে। এখন বাংলাতে শোনা।”

“আজ না, অন্য একদিন। আজ আপনি শোনান।”

“শুনবি?”

“হুঁ।”

“দাঁড়া গিটারটা নিয়ে আসি।”

“আচ্ছা।”

কিছুক্ষণের মাথায় নাওয়াফ গিটার হাতে নিয়ে ফেরত এলো। পাখিকে আবারও কোলে তুলে নিল। ওর কোমল আঙুলগুলি গিটারের তারে রেখে ওর হাত ধরে গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে একটা গান ধরল,

জড়াইয়া মায়ারও ডোরে

বান্দিয়া পিরিতে মোরে

খেলাইয়াও না হৃদয়টারে লইয়া

হাতে ধইরা ছাইড়ো না হাত সামনে আগাইয়া

হাতে ধইরা ছাইড়ো না হাত সামনে আগাইয়া।

ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু মায়া লাগাইয়া।

জীবন খাতায় প্রেম কলঙ্কের দাগ লাগাইয়া

ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু মায়া লাগাইয়া।

নাওয়াফ পুরো গানটা শেষ করল না। মাঝপথে থেমে পড়ল। পাখি গানটা মনযোগ সহকারে শুনল। তার কাছে ভীষণ ভালো লেগেছে। গলাটাও দারুণ ছিল। সে টের পেল লোকটা তাকে বুকের ভেতরে গুঁজে নিয়েছে। শার্টের ভিতরে ওকে ঢুকিয়ে শার্ট দিয়ে ওকে ঢেকে দিয়েছে। বুকের সঙ্গে চেপে ধরল। পাখি আরো টের পেল লোকটার চক্ষু জলে তার কাঁধ ভিজে যাচ্ছে। পাখির বুকটা অজানা কারণে কোন এক পবিত্র মায়ার বন্ধনে ছ্যাৎ করে ওঠল। কাঁদছেন কি ওনি? সে ব্যস্ত ঠোঁটে শুধাল, “কাঁদছেন কেন নাওয়াফ ভাই?”

“কই কাঁদছি না। তবে হ্যাঁ তোকে হারানোর ভয়টা চিত্ত জ্বালিয়ে দিচ্ছে।”

পাখি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝল সত্য স্বীকারোক্তি দিবেন না ওনি। তার কাঁধ এখনো ভেজা। মিথ্যে বলছে ওনি সেটুকু বুঝল। সে আর ঘাটল না। তবে তার মুখে বাক্য নেই। লোকটা এতো ভালোবাসে তাকে? সে কি এতো ভালবাসার যোগ্য।! হয়ত যোগ্য। তাই তো সৃষ্টিকর্তা যোগ্য মানুষটা তার ভাগ্যে জুটিয়ে দিল। সে নাওয়াফের মাথা তুলে দুচোখের জল মুছে দিল। কপালের মাঝে ছোট করে একটা চুমু খেল। বুকের মধ্য থেকে ওড়নাটা সরিয়ে ওনার মাথাটা একবারে বুকের মধ্যখানে গুঁজে নিল। যেখান থেকে চেষ্টা করলেও কেউ ওনাকে কেড়ে নিতে পারবে না। নাওয়াফের ক্ষণিকের জন্য মনে হলো পৃথিবীর সব শান্তি, সুখ যেন আজ তার কাছে এসে ধরা দিয়েছে। তার ভাবনার মধ্যে শুনতে পেল পাখি বলছে, “যে পুরুষ তার প্রিয় নারীটিকে হারারোর ভয়ে কাঁদে। তার ভালবাসা উপেক্ষা, অবহেলা করার মতো শক্তি আমার পাখির নেই। আজ থেকে আমাদের দুজনের দেহ, মন আলাদা নয়। দুটো দেহের, দুটো হৃদয়ের একটি ফুল আমরা।”

#(চলমান।)

#লামইয়া_তাসনিম

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন