#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(২২)
রাতের অন্তিম প্রহর। শীতল বাতাস আর নিস্তব্ধ আবহাওয়ায় ভূতূরে ভুতূরে একটা পরিবেশ ঠেকছে। ডান দিকে বাগান বিলাশ ফুল গাছটি ডালপালা নিয়ে দুবার নড়েচড়ে ওঠল। কিছু একটা মনে হচ্ছে ওখানে আছে। যে পৈশাচিক ভয় দেখিয়ে আনন্দ নিচ্ছে। অজানা ভয় আর আতঙ্কে পাখি নাওয়াফের হাতটি খামচে ধরল। নাওয়াফের ওইদিকে কোন লক্ষ্য নেই। সে পাখির মুখটার দিকে বিস্মিত নজরে চেয়ে রয়। মেয়েটা যে এত সুন্দর করে সাজানো গোছানো কথা বলতে পারে তার তা একেবারে জানা ছিল না। সারাদিন ফাজলামো আর এ বাড়ি ওবাড়ি ঘোরাঘোরি করতেই দেখেছে। জীবনের প্রতি কোন সিরিয়াস হতে দেখেনি। সে কারণে তার কাছে কথাগুলি বিশেষ করে অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। কিন্তু হ্যাঁ তার নিজের ভালো লাগল। মন ছুঁয়ে গেল। আত্মার টান লাগল। সে ঠোঁট টিপে হেসে ফেলে। পাখিকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ চট করে কোলে তুলে নিল। পাখি একটু চমকাল। চোখ দুটো দুবার ঝাপটালো। পরক্ষণে নিজেকে সংযত করে নিল। তবে কৌতূহল কমল না।
“আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
“রুমে নিচ্ছি।”
“এই না। আমি আপনার আম্মার রুমে যাব।”
“আমার আম্মা তোর কি হয়?”
“শাশুড়ি মা।”
“চড় দিয়ে সব ক’টি দাঁত ফেলে দিব বেয়াদব। আম্মা ডাকবি। কি বলবি?”
পাখি ঠোঁট কামড়ে বলে, “আম্মা।”
“এবার ঠিকাছে।”
বলেই নাওয়াফ ঠোঁট টিপে হেসে দিল। পাখি মুখ বাঁকাল। নাওয়াফ ছোট করে ওর ঠোঁটের ওপর একটা কামড় বসিয়ে দিল। পাখি ‘আহ’ শব্দ করে ওঠল। চক্ষু দুটো পাকিয়ে শুধাল, “কামড় দিলেন কেন?”
“মুখ ভেটকালি কেন?”
“আমার মুখ, আমি যা ইচ্ছে তাই করব।”
“আমার ঠোঁট, আমিও যা ইচ্ছে তাই করব।”
“এটা কিন্তু চিটিং হচ্ছে। আমাকে কপি করছেন।”
“নো চিটিং।”
কথার মাঝে নাওয়াফ পাখিকে এনে খাটের নরম গদির মধ্যে বসিয়ে দিল। পাখি ওপাশ দিয়ে নেমে যাচ্ছিল। নাওয়াফ ওর হাতজোড়া টেনে ধরল।
“এখান থেকে এক পাও নড়বি না। যদি নড়িস? হাত পা বেঁধে সারারাত সুইমিংপুলে চুবিয়ে রাখব।”
পাখি চোখ দুটো রসগোল্লার মতো গোল গোল করে নিল।
“কিহ্!”
“জি।”
পাখি দুহাত এক করে ঠোঁট জোড়া উল্টে বলল,
“আল্লাহ এ কোন আপদের কাছে আমায় এনে ফেললে।”
“ওমন করে স্বামীর নামে সৃষ্টিকর্তার কাছে নালিশ ঠুকে না বউ। গুনাহ হবে তো।”
পাখি ভেংচি কাটে। নাওয়াফ অধর কামড়ে হাসে।
“ওমন করে মুখ ভেটকালে আবার কিন্তু কামড়ে দিব।”
পাখি চুপ হয়ে গেল। নাওয়াফ ওকে বুকে টেনে আনল।
“নে এখান ঘুমা। সকাল হলে আমি ডেকে দিব।”
পাখি আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করল, “আপনি ঘুমাবেন না?”
“না, সকালে একটা কাজে বের হতে হবে। এখন ঘুমালে উঠতে পারব না।”
পাখি আর কিছু বলল না। সে চুপচাপ দুচোখ বন্ধ করে নিল। নাওয়াফ ওর চুলগুলো যত্ন নিয়ে টেনে দিচ্ছিল। যাতে ওর আরাম লাগে। আর চোখে ঘুম নেমে আসে। পাখি আরাম পেয়ে ঘুমিয়েও পড়ল। কিছুক্ষণের মাথায় নাওয়াফের ফোনটি সজোরে বেজে ওঠল। এতো রাতে কল দিল কে ভেবেই তার কপাল কুঁচকে এলো? সে ফোন হাতে নিয়ে দেখল নোভা ফোন করেছে। সে একটু হাসল। রিসিভ করে কানে চাপল।
নোভা মুচকি হেসে শুধাল,
“ডিস্টার্ব করলাম ছোট ভাই? আজ তো আবার আপনার বাসর রাত।”
“তুমি কি এই শেষ রাতে আমাকে খোঁচা দিতে ফোন করেছো?”
“ছিহ, এমন কেন বলছিস? বড়ো বোন হই তোর। খোঁজ খবর নেওয়ার তো একটা ব্যাপার আছে।”
“তাই বলে এই মাঝরাতে?” কথাটা ঠাট্টার স্বরে বলল সে।
“রাতে ঘুমাইনি। প্রচন্ড কাজ। মাথা ব্যথা করছিল। কফি খেতে খেতে ফেসবুকে ঢুকে দেখলাম তুই লাইনে আছিস। তাই নক করলাম।”
“কিছু বলবে?”
“হ্যাঁ বলারই ছিল। পাখি কি করে? তোর সঙ্গে আছে?”
“আম্মির কাছে ছিল। আব্বুকে দিয়ে আম্মুকে পটিয়ে ভাগিয়ে ওকে নিয়ে এসেছি।”
নোভা হাসতে হাসতে বলল, “ট্যালেন্ট আছে ভাই। এতো ট্যালেন্ট রাখিস কই?
“তুমি কিন্তু খোঁচা মারছো?”
“একদমই না।”
“ভবিষ্যৎ প্লান কি?”
“এক কুড়ি পোলাপান পয়দা করব। সব কয়টাকে তোমার কাছে দিয়ে ওর মাকে নিয়ে সোজা মালদ্বীপে লং হানিমুনে যাব।”
“যাতে আরো এক কুড়ি পয়দা করতে পারিস? বেয়াদপ! বোনের সঙ্গে ঠাট্টা করে।”
“আহা! রাগ করছো কেন? তোমার আবুইল্লা কই?”
“দুলাভাই বল।”
“ছোটবেলা থেকে ওরে লেংটা দেখেছি। ও টুনটুনি বের করে বসে থাকত। আর আমি দুষ্টুমি করে টোকা মারতাম। ও গিয়ে তখন ভেটকাইতে ভেটকাইতে আম্মির কাছে বিচার দিতো। আর আম্মি আমার কান টেনে বকত। সেই তাকে কিভাবে দুলাভাই ডাকব?”
নোভা হো হো করে কয়েক দফায় হেসে দিল। হাসতে হাসতে বলল, “ বদজাত তোর কান ধরে যেন এসে টানতে হয় না।”
নাওয়াফ ফোঁস করে বুক চিঁড়ে দুটো শ্বাস ফেলল।
“তোমার সঙ্গে ঝগড়া করার মুড নেই সিস্টার।”
“কি করছিস?”
“বউ ঘুমুচ্ছে। আর আমি বসে বসে পাহারা দিচ্ছি। মশাদের বিনা পয়সায় রক্ত দান করছি। দেখেছো কত মহৎ আমি? এমন একজন মহৎ লোক বাটি চালান দিয়েও পাবে না।”
“না না ব্রাদার, সঠিক বলেছেন আপনি। ভালো সার্ভিস দিচ্ছেন। কিন্তু বউ ঘুমুচ্ছে, আর আমি বসে বসে পাহারা দিচ্ছি ওটা না বলে বলতিস, মুরগি ঘুমুচ্ছে, শেয়াল বসে বসে পাহারা দিচ্ছে। একেবারে তোর সঙ্গে ভালোই মিলতরে নাবু।” বলেই নোভা গা ঝাঁকিয়ে অট্টহাসি দিল।
নাওয়াফ ঠোঁট কামড়ে বলল,
“পচাইয়াও না স্টিস্টার। কিছু লাগলে বলো?”
হাসি বন্ধ করে নোভা সিরিয়াস হয়ে বলল, “কিছু লাগবে না। শোন কিছু বলার ছিল।”
“হুঁ, বলো।”
“ওসব পাখিকে জানিয়েছিলি?”
“কোন সব?”
“জানিস না?”
“না বলিনি, আমার ভয় হয়। যদি ও আমায় ভুল বোঝে?”
“তবুও সত্যিটা জানানো উচিত। এখানে তোর আর পাখির দম্পতি জীবন জড়িয়ে আছে। আমি চাই না সামান্য কোন ভুলে তোদের মধ্যে ভুল বোঝাবোঝি হোক। আর না তোরা আলাদা হোস।”
“এখন জানানো যাবে না আপু। ও আগে আসুক পুরোপুরি ঘরে। এরপরে ধীরে সুস্থে সত্যিটা আমি জানিয়ে দিব।”
“আমার ভয় করছে নাওয়াফ। ও এটা কিভাবে নিবে?”
নাওয়াফ বুক ফুলিয়ে মুখ গোল করে তপ্ত শ্বাসটুকু ফেলল। টেনশন কি তার কোন অংশে কম হচ্ছে? সে চায় না সত্যিটা সামনে আসুক। আর না সে পাখিকে হারাক। তবুও এই ভয়টুকু তাকে পিছু তাড়া করে বেড়ায়। গিলে গিলে প্রতিনিয়ত খায়।
“আমার মনে হয় তোদের আলাদা থাকাই ভালো।”
“কি বলতে চাইছো? এখন বউ ছাড়া আলাদা থাকব?”
নোভার মেজাজটা ক্ষণকালের ভেতরে চটে গেল। সে রাগে কটমট করে বলল, “বউ পাগলা তোরে বউ ছাড়া আলাদা থাকতে বলিনি। তোর বউ নিয়েই তুই দূরে কোথাও গিয়ে থাক। যেখানে ভুল বোঝাবোঝির মতো কিছু ঘটবে না।”
“তুমি চিন্তা করো না। আল্লাহ ভরসা। যেখানে আমি নির্দোষ। সেখানে এতো ভয় কিসের?”
“আচ্ছা রাখছি। ঘুমোব।”
“ওকে..!”
ফোন কেটে নাওয়াফ দুআঙুলে কপাল ঘষতে লাগল। আত্মভিমান মুখটায় গভীর দুঃশ্চিতার প্রলেপ। তার জীবনে ওমন একটা মুহূর্ত না এলেও বুঝি ভাল হতো। সেই দিনটা, সেই রাতটা সে ভুলতে পারছে না। মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে গেঁথে আছে। তার তো কোন দোষ ছিল না। তবুও কেন সে অপরাধীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে? পাখি সত্যিটা জানলে তাকে মেনে নিতে পারবে? নাকি ভুল বুঝে দূরে সরে যাবে? না না সে ওকে দূরে সরে যেতে দিবে না। দরকার পড়লে হাত পা বেঁধে ঘরে বসিয়ে রাখবে। তবুও আলাদা হতে পারবে না। এই মেয়েটাই যে তার একমাত্র বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।
------
কেটে গিয়েছে বেশ কিছুদিন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ। মাসের পর মাস। এই তো পাখির ফাইনাল এক্সাম চলে এসেছে। আগামীকাল তাদের পরীক্ষা। পাখি মোটামুটি ভালই পূর্বপ্রস্তুতি নিয়েছে। নাওয়াফ রাতে রাতে এসে ওকে পড়িয়ে গেছে। পরীক্ষা কেমন কেমন হবে? কিভাবে লিখতে হবে সব বিষয়ে বিস্তারিত বলেছে ওকে। রাতে সব পড়া নিয়ে সে রাত বারোটার দিকে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। যদিও তাহিরা বার বার রাতে তাকে থাকতে বলেছিল। নাওয়াফ থাকেনি।
আজ মাধ্যমিক পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে প্রচন্ড ভিড়। প্রায় ঠেলাঠেলি রকমের অবস্থা। পরীক্ষার্থীদের চেয়ে অভিভাবকদের সংখ্যা বেশি। পাখি আর ইচ্ছে এক সঙ্গে এসেছে। ওদের সিটও পাশাপাশি পড়েছে। পাখিদের সঙ্গে নিখিল আর স্বাধীনও এসেছে। নাওয়াফ এসেছে ঠিকই। ভিতরে ঢোকেনি। এমনিতে সে পরীক্ষার হলে একবার চক্কর মারবে। এজন্য এখন ভিতরে যায়নি। তবে তার হয়ে সকল কাজ নিখিল করে দিচ্ছে। অবশেষে পরীক্ষাটা শুরু হলো। পরীক্ষা দিচ্ছে পাখি। টেনশনে নাওয়াফের মাথা ফেটে যাচ্ছে। ওইদিকে প্রশ্নপত্র বাহিরে ফাঁস হয়ে গেছে। প্রশ্নপত্র বেশ জটিল এসেছে। যা পড়িয়েছে। তার বাহির থেকে বেশি এসেছে। নাওয়াফের মাথা ধরে এলো। ভিতরে বসা বলদটায় কি লিখবে সে তা ভাবছে? ধৈর্য ধরতে না পেরে মিনিট কয়েক পর সে নিজেই খুব স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষার হলে কক্ষ প্রদর্শন করার নামে প্রবেশ করল। তার সঙ্গে দুজন সভাপতি ছিল। যেহেতু মন্ত্রীর নাতি সে। তাই কোন বাঁধাই পায়নি। সব কক্ষ প্রদর্শন করা শেষে সে ৭নং কক্ষের ভেতর থেকে আর বের হয়নি। কক্ষ পরিচালক একজন গিয়েছে ওয়াশরুমে। আরেকজনের সঙ্গে নাওয়াফ কথা বলছিল। কথা বলার ফাঁকে সে একবার চক্কর মারল। পাখির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খুব সাবধানে ওর হাতে নৈব্যতিকের কুয়েশ্চনটি গুঁজে দিল। পাখি আশ্চর্য হলো। সে ভয়ে একবার আশপাশ চাইল। কেউ দেখল না তো? আরেকবার নাওয়াফের দিকে চাইল। নাওয়াফ সবার দিকে তাকিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখছে আর মিটমিট করে হাসছে। বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “লিখো বাচ্চারা, লিখো। আমাকে দেখার সময় পড়েও পাবে। তাই মনযোগ দিয়ে লিখো। আর হবে না কিন্তু নকল।”
তার কথা শুনে ক্লাসসুদ্ধ সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সঙ্গে কক্ষ পরিচালকও হেসে দিল। পাখিও হাসল। লোকটার হাফভাব এমন যেন, সে কিছু জানেই না। ওইদিকে বউয়ের হাতে নকল ঠিকই সবার অগোচরে গুঁজে দিল। পাখি টিচারের দিকে এক পলক তাকিয়ে কুয়েশ্চনটি খুলল। দেখল তার সেটই। ‘খ’ সেট ছিল। সঠিক উত্তরটি হালকা ফোঁটা করে পেন্সিল দিয়ে দাগানো। যাতে বোঝা না যায়। সে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। লোকটা বুঝল কি করে তার কোন কমন পড়েনি? সে তো ভেবেছে আজ ডাব্বাই মারবে। কান্না ছাড়া কোন গতি ছিল না। কি কঠিন এসেছে! তবে হ্যাঁ মানতেই হবে কপাল গুণে একজন বর পেয়েছে। যে বউয়ের কষ্ট কমাতে হাতে নকল ধরিয়ে দিল। বুদ্ধিতে তালগাছ। মাশাআল্লাহ! মাশাআল্লাহ! এমন বর বাংলার ঘরে ঘরে হোক। মনে মনে সে প্রশংসা করে বলল, “থ্যাংকু মাই কলিজার হাসবেন্ড। এমন একটা হাসবেন্ড পাইলে A+ পাওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না।”
পরীক্ষা শেষে নাওয়াফ পাখিকে রাস্তার মধ্যে পথ আটকে ধরল। বাইকে হেলান দিয়ে বুকে আড়াআড়ি বাঁধন বেঁধে ধূর্তমান অক্ষি জোড়া নাড়িয়ে ঠোঁট কামড়ে শুধাল, “এই যে মিস ফেলটুস, সবকিছু ঠিকঠাক দিয়েছেন তো?”
পাখি মুখটা সঙ্গে সঙ্গে কালো করে নিল। ঠোঁট উল্টে বলল, “পরীক্ষা সব দেওয়ার আগেই ফেলটুস বলছেন?”
নাওয়াফ দুই ঠোঁটের মাঝে সিগারেট চেপে লাইটার জ্বালাতে জ্বালাতে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “নকল হাতে গুঁজে না দিলেই ফেসটুস নামটি পূর্ণতা পেতো।”
পাখি মুখ ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে বললো, “আমি মনে হয় নকল আপনার কাছে চাইছি?”
“চাইবি কেন? আমিই পরিস্থিতি খারাপ দেখে দিয়েছি। পরীক্ষায় ডাব্বা মারলে তো সম্মান আমার যেত, তোর না। তখন টিচার হিসেবে আমার ইজ্জত থাকত? সকলে বলতো ওই দেখো ফেলটুস বেডির স্বামী ফেলটুসা যাচ্ছে। ইজ্জত সব যেতো। এত কষ্ট করে নকল টুকে দিলাম। হলে গিয়ে সবার অগোচরে হাতে গুঁজে দিলাম। সেখানে ধন্যবাদ দূরে থাক, একটা চুমুও দিলি না। অন্য কেউ হলে ঝাপটে ধরে দুটো চুমু দিতো। আর ওনি আসছে পায়ে পা তুলে ঝগড়া করতে। রাজাকারের বংশধর কোথাকার! এর জন্য কি এত রিস্ক নিলাম?
“দুঃখিত, দুঃখিত। সম্মানিত ভদ্র মহাদয়া নকল প্রদান করার জন্য আপনাকে হাজার খানা ধনেপাতা দেওয়া হলো।”
“ওইগুলি তোর কাছেই রাখ। তরকারিতে দিয়ে খাস। বাড়ি আসবি কবে?”
পাখির মুখটা হা হয়ে গেল।
“বাড়ি যাব মানে?”
“কথা ছিল পরীক্ষা শেষ হলে আপনি নাওয়াফ তালুকদারের ঘরে হেঁটে হেঁটে চলে আসবেন।”
পাখি মুখ বাঁকাল। ভেংচি কেটে বলল, “আমি যাব না।”
“ঠিকাছে, তুই যেহেতু যাবি না। তাহলে আমিই ঘর জামাই হয়ে চলে আসি।”
“এই না।”
“কি না?”
“আপনার আসার দরকার নাই। আর কয়টা দিন সময় দেন।”
নাওয়াফ বুক ফুলিয়ে ভেতর থেকে কয়েকটা শ্বাস বের করে বলল, “তুই আমারে বুড়ো করে পোলাপানের বাপ বানিয়ে ছাড়বিরে পাখি।”
পাখি মিটমিট করে হাসে। ঠোঁট উল্টে বলল,
“বুড়ো কালে বাবা হতে সমস্যা আছে কোন?”
“আছে না? সন্তান তখন বাবার বয়সে বাবা রেখে চাচাজান ডাকবে। বিষয়টি তখন উল্টে গেল না?”
পাখি হো হো করে হেসে দিল। নাওয়াফ ঠোঁট উল্টালো।
“হাসিস না পাখি, হাসিস না। বউ ছাড়া রাত পার করার কষ্ট তুই মহিলা বুঝবি না।”
“হ সব তো আপনি বোঝেন। আমার বোঝার কিছুর দরকার আছে?”
“বুঝলে আর ঘন ঘন মুততি না।”
“আপনি মনে হয় পাতলা পাতলা মুতেন?
“বাহ! আজকাল ট্রেনের গতিতে তো তোর মুখ চলছে।”
“মুখ থাকলে চলবে না?”
“বাইকে উঠে বস। আজ লং ড্রাইভে যাব। আমারে ধরে বসিস। পড়ে আবার কোমর ভাঙিস না। বাচ্চার মুখ দেখা কিন্তু এখনো বাকি।”
“আমি পড়ব না। দরকার পড়লে আপনাকে ফেলে দিব।”
“তা তো ভালোই পারিস বদমাশ বেডি।” বলেই নাওয়াফ বাইক স্টার্ট দিল।
পাখি পড়তে পড়তে কোন রকম বেঁচেছে। সে নাওয়াফের শার্ট খাঁমচে ধরল। রূহ্টা তার দেহ থেকে এখনই বেরিয়ে যাচ্ছিল। নাওয়াফ বাইক ড্রাইভিং করছে ফুল পাওয়ারে। পাখির কলিজা শুকিয়ে এলো। সে কাতর কণ্ঠে অনুরোধ করে বলল, “নাওয়াফ ভাই, আস্তে চালান। নতুবা প্রাণপাখি বাইকের সঙ্গে ফুড়ুৎ করে উড়াল দিবে।”
“পিছনে মেয়ে মানুষ নিয়ে বাইক আস্তে চালিয়ে মজা নেই জান। যত ভয়, ততই মজা।”
“আমায় নামিয়ে দেন। আমি আপনার সঙ্গে কোথাও যাব না।”
“যাবি না?”
“নাহ।”
”ওকে।”
নাওয়াফ বাইক ঘুরালো। অর্ধেক পথে ওকে নামিয়ে দিয়ে বলল, “এখন বাড়ি যা।”
পাখি অবাক হলো।
“মানে এত রাস্তা আমি হেঁটে যাব?”
“জি, আসি আসসালামু আলাইকুম।”
ওকে ফেলে রেখেই নাওয়াফ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। পাখি হতভম্ব। নাওয়াফের চিহ্ন মিলিয়ে যেতেই পাখির ভয় ভয় লাগল। আশপাশ কেউ নেই। সব শুনশান নীরব রাস্তা। তার ভিতরে মেঘলা আকাশ। এখানে তো কোন ক্রমে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়। সে ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে লাগল। পথে যদি কোন গাড়ি পেয়ে যায়, সে উঠে যাবে। খানিকটা হাঁটার পর পাঁচ থেকে ছ’জন ছেলে পড়ল। যারা জঙ্গলের মধ্যে বসে নেশা করছিল আর কার্ড খেলছিল। সে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেই তাকে দেখে শিস বাজাল। ভয়ে পাখির দেহ বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে দেখল লোকগুলি জঙ্গল থেকে এক এক করে বেরিয়ে আসতেছে। তার পিছু পিছু হাঁটছে। বাজে বাজে ইঙ্গিত করছে। কেউ একজন আবার বলছে, “কই যাও টুনটুনি? একা নাকি? রুম কিন্তু খালি আছে। আমার ছ’জন। তুমি একা। চলো একটা গেম হয়ে যাক।”
ওদের কথা আর কুৎসিত ইঙ্গিতে পাখির গা ঘিনঘিন করে ওঠল। সমগ্র দেহ ঘেমে গেল। ভয়ে চোখ মুখ শুকিয়ে একাকার। দেহে দেহে ছড়িয়ে গেল ভয়ের নিঃশব্দ আন্দোলন। গলাটা মরুভূমির ন্যায় ঠেকল। সে যত দ্রুত হাঁটছে। ওরা ততই তাকে অনুসরণ করছে। সে আর ধৈর্য ধরেনি। দিল দৌড়। ওর পিছু পিছু লোকগুলিও দৌড়াচ্ছে৷ আকাশের অবস্থা ভালো না। মেঘেরা ক্রমে ক্রমে অন্ধকার বানাচ্ছে। সে পিচ ঢালাই রাস্তা ছেড়ে এবার মাটির সরু উঁচু নিচু কাঁচা মাটির রাস্তায় নেমে গেল। এখানে যদি কোন বাড়ি ঘর পায়। কারো কাছে সাহায্য চাইবে। কিন্তু যতই দৌড়াচ্ছে, ততই যেন নির্জন আর ঘনো জঙ্গল চোখে পড়ছে। সেই সঙ্গে তার পা দুটোও থামছে না। সে কোথায় যাচ্ছে তাও জানে না। কেবল জানে তাকে বাঁচতে হবে? এই পথ ছাড়তে হবে।
দশ মিনিট পর নাওয়াফ আবার ফেরত এলো। তার ধারনা সে পাখিকে আগের জায়গায় এসে পাবে। এজন্য ঠিক যেখানে পাখিকে নামিয়ে দিয়েছিল তার একটু আগে সে বাইক থামাল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে না কেন ওকে? ওখানে তো নেই। গেল কই? তার দুঃশ্চিন্তা হলো। এত তাড়াতাড়ি তো কোথাও যাওয়ার কথায় নয়। রাস্তায় কোন অটোও চোখে পড়েনি যে তাতে করে পাখি বাড়ি পৌঁছাবে। সে বাইক রেখে সামনে একটু এগালো। দেখল পাখির হাতে যে ফাইল ছিল। তা নিচে পড়া। একটা জুতাও খুলে পড়া। ওসব দেখে তার বুকটা অজানা ভয়ে মুচড়ে ওঠল। মনটা কু ডাকল। ভয়ে জিভ শুকিয়ে এলো। সে কয়েকবার আশপাশ খুঁজতে খুঁজতে ডাকল ওকে, “পাখি.., পাখিই..! পাখি কই তুই? লুকিয়ে থাকলে সাড়া দে। সরি সোনা। আর এমন করব না। মজা করেছি তো বউ। এবার বেরিয়ে আয়।”
সবকিছু নিস্তব্ধ। কোন সাড়াশব্দ নেই। শুধু মেঘেদের গর্জন আর শিরশিরে হাওয়া ছাড়া রাস্তায় কিছুই নেই। এই নিস্তব্ধতা, হিম শীতলতা নাওয়াফকে আরো দ্বিগুণ ভয় বাড়িয়ে দিল। সে আরেকটু সামনে আগাল। দেখল মাটির একটা রাস্তা গিয়েছে ওইদিকে। সে ওইদিকে মাথা ভর্তি চিন্তা নিয়ে ছুটল। কতখানি পথ হাঁটার পর দেখতে পেল কয়েক টুকরো চুড়ি ভেঙে নিচে টুকরো টুকরো হয়ে পড়া। তার ওপর রক্তের ফোঁটা পড়ে আছে। পাশে সাদা ওড়না আধছেঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। তার আর বুঝতে বাকি রইল না তার পাখির সঙ্গে কি হতে চলছে? সঙ্গে সঙ্গে বুকটা কেঁপে ওঠল। রাগে হাত মুঠিবদ্ধ হয়ে এলো। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো। ওরা কারা? যারা নাওয়াফ তালুকদারের বুকে হাত বসিয়েছে। সিংহের চেয়েও বিষাক্ত হিংস্রতার সঙ্গে সে তাদের খুবলে খুবলে খাবে।
আজ যদি পাখির কিছু হয়ে যায় সে নিজেকে কোনদিনও ক্ষমা করতে পারবে না। এই অনুশোচনা প্রায়শ্চিত্তবোধ কি করে মুছবে?
সে পাখিকে খুঁজতে খুঁজতে নদীরঘাটে পৌঁছে গেল। নদীর জলগুলো লাফাচ্ছে। সামনে আর কোন রাস্তা নেই। যেদিকে তাকায়, নদী আর নদী। পেছনে ঘন জঙ্গল। মাথাটা ফেটে যাচ্ছে তার। চোখ দুটো ভয়ংকর লাল। যেন রাগে চোখ দিয়ে গরম উত্তাপ বেরিয়ে আসতে চাইছে। ওইদিকে আকাশ কাঁপিয়ে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো জমিনে ছড়িয়ে পড়ছে। নাওয়াফ নদীরপাড়ে অসহায়ের মতো বসে পড়ল। বৃষ্টির পানিগুলো তাকে ডিঙিয়ে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই তার। অনুশোচনায় দগ্ধ সে। চুল টেনে নিজেকে নিজে গালাগাল দিল, “এ আমি কি করলাম? কি করলাম আমি? কোথায় এখন পাব তোকে বল?”
হঠাৎ গলা ছেড়ে চিৎকার করে ওঠল সে, “পাখি.., পাখি কই তুই লক্ষ্মীটি? কোথায় খুঁজব আমি তোকে?”
আকাশের দিকে তাকিয়ে ছলছল নয়নে আর্জি করে বসল, “ও সৃষ্টিকর্তা! তুমি আমার বুকে আমার পাখিকে ফিরিয়ে দেও। আমার বুকটা ঠান্ডা করে দেও আল্লাহ। ওকে আমাকে পাইয়ে দেও। আর কিছু চাই না আমার।”
#(চলমান)
#লামইয়া_তাসনিম