#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(২৩)
নদীর স্রোত ও টেউয়ের মাত্রা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার সঙ্গে বাতাস আর বৃষ্টি পাল্লাক্রমে বইছে। বড়ো গাছের ডালগুলো ঝাপটাচ্ছে। নদীর বড়ো বড়ো ঢেউগুলো এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল তাকে। নিচু তার আত্মাভিমানী বদনটা। মাথার নিউরন পর্যন্ত চিন্তায় ফেটে যাচ্ছে। হাত পা ঝিম ঝিম করছে। দুর্বল দেহটা টেনে সে কাঁদা মাটির রাস্তাটায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। খানিকটা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার পা দুটো ধুম করে থেমে গেল। পঞ্চমইন্দ্রীয় ভয়ের অজানা এক সংকেত দিল। তার চিন্তা ক্রমশ বাড়তে থাকল। কোথা থেকে ‘উম উম’ এক ধরনের ভোঁতা শব্দ আসছে। অনুমান করা যায় শব্দটি জঙ্গলের গভীর থেকে আসতেছে। সরু একটি রাস্তা গিয়েছে জঙ্গলের ভেতরে। সে কিছু একটা মনে করে জঙ্গলের কচি কচি গাছগুলি ডিঙিয়ে ভেতরে যাচ্ছিল। যতটা সামনে অতিক্রম করছিল, ততই তার মনের ভেতরে তীব্র ছটফটানি বাড়ছিল। খানিকটা হাঁটতেই ছোট একটা কুঠির চোখে পড়ল। দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ করা। কে থাকে ওখানে? তার মন বলছে একবার ওখানটাতে যাওয়া উচিত। কিন্তু পা দুটো কঠিন অবাধ্যতা দেখাচ্ছে। নড়ছেই না যেন। সে টেনে নিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল কুঠিরের দিকে। বারান্দা ডিঙিয়ে দরজাটি হালকা করে ধাক্কা দিল। সঙ্গে সঙ্গে দরজাটি খুলে গেল। চোখাচোখি হলো ছয় জোড়া পশুতুল্য দৃষ্টির সঙ্গে। তার অক্ষিতে নামল হিংস্রতা, বর্বরতা। অগ্নি ঝরার দশা। হাতের পাশে ছিল একটা ইটের টুকরো। সেটা ছুঁড়ে মারল সেদিকে। ইটের টুকরোটি গিয়ে পড়ল হ্যাংলা পাতলা শরীরটার ওপর। যে নারী মুখ চেপে ধরে ছিল। নাওয়াফকে দেখে ছেলেগুলি ভয়ে ভাঙা জানলা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। সে পিছু নিল। কাঁচা একটা ডাল নিয়ে পিছনের দুটোর মাথায় আঘাত করল। সঙ্গে সঙ্গে রক্তের ফিনকি বেরিয়ে এলো। আঘাতে হাত থেকে বাঁচতে ওরা নাওয়াফের চোখে কাঁদা মাটি ছুঁড়ে মেরে পালালো। চোখে কাঁদা মাটি ঢুকতেই অন্ধকার ঠেকল সবকিছু। কিছুতেই তাকাতে পারছিল না। কোন মতে উঠে সে গেল কুড়ে ঘরটার কাছাকাছি। টিনের নিচে পুরুষালি বলিষ্ঠ হাত দুটো পেতে সে কোন রকম চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দিল। যদিও চোখ পরিষ্কার হয়েছিল। কিন্তু তবুও চোখ দুটি লাল দেখাল। সে আর ওদের নাগাল পেল না। এজন্য দীর্ঘদেহী শরীরটা নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল, কলাপাতার ওপর নিস্তব্ধ পাথরের মতো শুয়ে আছে একটা নারী দেহ। যার সরল চোখ দুটো নিষ্প্রাণ। জামার হাতাটা ছেঁড়া। পা-জামা হাঁটু পর্যন্ত তোলা। গালে খামচির দাগ। হাতও খামচানো। রক্ত জমাট বেঁধে আছে। ওই দৃশ্য নাওয়াফ দেখল পারল না। তার বুক মুচড়ে ওঠল। চিঁড়ে যাচ্ছিল। ক্ষিপ্ততায় ছটছট করছিল। পশুগুলোর রক্ত দিয়ে গোসল করতে মন চাইছিল। তার ঠোঁট দুটো ফুঁড়ে তাৎক্ষণিক বেরিয়ে এল অশ্লীল বাক্য, “শু*য়া*রে*র বাচ্চারা, তোদের তাজা রক্ত দিয়ে আমি গোসল করব।”
পাখির গাল গড়িয়ে পানি ঝরছিল। নাওয়াফের উপস্থিতিও ওকে নাড়াতে পারল না। সে পুরোপুরি যেন পাথর। নাওয়াফ ওর দিকে এগিয়ে গেল। ওর নিস্তব্ধ বাকরুদ্ধ দেহটা টেনে নিজের বুকে আনল। ওর কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে সেখানে পূর্ণ ঠোঁটে একটা চুমু খেল। চোখ দুটো ছলছল করছিল তার। বুকে হাহাকার, নীরব আর্তচিৎকার জমছিল। এই অবস্থাতে সে তো ওকে কখনো দেখতে চাইনি। তবে এমনটা কেন হলো? তবে কি ভাগ্য আজ তার সঙ্গে বেইমানি করল? সে ওকে শান্ত করতে বলল, “তোর কিছু হয়নি পাখি। কিছুই হয়নি। আমি আছি তো। আমি বেঁচে থাকতে তোর কিছু হবে না। পৃথিবীর সব খারাপ আমাকে ছোঁক, আর সব ভালো তোর হোক।”
পাখির এবার টনক নড়ল। হুশে ফিরল সে। অন্য এক জগতে ছিল যেন। যেখানে বিষাদ আর বিষাদ। সেখানে কেউ সুখী নেই। সে নাওয়াফের শার্ট খামচে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে দিল। নাওয়াফ দেখল ওর কান্নার প্রতিটা শব্দ তাকে ভেঙে দিচ্ছে। বিচলিত আর অস্থির করে তুলছে। সে বসে থাকতে পারছে না। বুকটা পুড়ছে, জ্বলছে। মাথা ঝিম ঝিম করছে। তার ভিতরে সমগ্র দেহ ভেজা। পাখির কান্না ক্রমে ক্রমে বাড়ছেই। নাওয়াফ ধমক মারতে গিয়েও পারল্ না। হঠাৎ পাখি এক কাজ করে। নাওয়াফের হাতে দাঁত বসিয়ে দিল। নাওয়াফ চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। মাটি খামচে ধরল। মেয়েটা এখানো শান্ত হয় না। দাঁত মাংসের ভিতরে ডুবিয়ে দিচ্ছে। এবার ছাড়ল। এখন শুরু হলো নাওয়াফকে এলোপাথাড়ি থাপ্পড়ানো। ক্রন্দরত অবস্থায় লোকটাকে থাপ্পড়াতে থাপ্পড়াতে রাগ ক্ষোভ ঢেলে বলে, “সব আপনার জন্য হয়েছে। আপনি তখন আমাকে ফেলে রেখে না গেলে কিছু হতো না। আপনি আমার সব শেষ করে দিয়েছেন। আপনার জন্য আমার শরীরে নোংরা স্পর্শ পড়েছে।”
নাওয়াফ মাথাটা নত করে নিল। ওর দেওয়া আঘাত সব মুখ বুঝে নীরবে সহ্য করে নিতে লাগল।
“আই এমন সরি কলিজা।”
তাতে পাখি আরো দ্বিগুণ হিংস্র ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সে এবার বাঘিনীর মতো নাওয়াফের বুক ধরে খামচালো। দাঁত দিয়ে বুকের নরম মাংস কামড়ে ধরল। ওর শত আঘাত সব নীরবে সহ্য করে নিতে লাগল সে। এক বিন্দুও আহ্ উহ্ ব্যথাতুর শব্দ মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল না। ওকে বাঁধাও দিল। ওর কষ্টটা যন্ত্রণাটা যেন সে নিজে কিছুটা হলেও অনুভব করতে চায়। এক সময়ে পাখি নিজেই শান্ত হয়ে যায়। সেই সঙ্গে তার চোখের অশ্রুও থেমে পড়ে। শীতল কণ্ঠে নাওয়াফকে বলল সে, “আপনাকে আমার সহ্য হচ্ছে না। ছেড়ে দিন আমাকে। আমি মাটিতে শুব। তবুও আপনার শরীরে আপনার স্পর্শে আমি থাকতে চাই না।”
নাওয়াফ আজ আর বাড়াবাড়ি রকমের কিছু করল না। ওর কথা শুনল। ওকে বসিয়ে দিয়ে তার শার্ট খুলে পাখির বুকের ওপর দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বুকটা একটু দেখল খামচানো আর কামড়ানোর দাগে লালচে হয়ে আছে। জ্বলছে তাতে। এই ব্যথা সে ঠিকই সাড়িয়ে নিবে। কিন্তু ভেতরে যে যন্ত্রণা হচ্ছে তার মলম পাবে কোথায়? বাহিরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। তীব্র বাতাসও সমান তালে। পাখি গুনগুনিয়ে কাঁদছিলো। কাঁদার ফলে ওর দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। নাওয়াফ রোবটের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে তখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিবাহিত করছিল। কখন বৃষ্টি থামবে? অবশেষে সেই মুহূর্ত এলো। বৃষ্টি থামল। অতঃপর নাওয়াফ ঘরের ভিতরে ঢুকল। যেখানে পাখি বসা ছিল সেখানটাতে গেল। সে আলগোছে ওকে কোলে তুলে নিল। পাখি নাওয়াফের স্পর্শে আবারও ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিল। সে এলোপাতাড়ি চড় থাপ্পড় মারতে লাগল তাকে। আর বিলাপ করে বলতে লাগল, “ছাড়েন আমাকে। আমি কোথাও যাব না আপনার সঙ্গে। আমি মরে গেলেই তো আপনার শান্তি। তাহলে বাঁচাতে এলেন কেন?”
নাওয়াফ ওর দুঠোঁটের মধ্যিখানে আঙুল চেপে ধরল, “হিস, কথা বলিস না।”
ওই কথাতে কি ছিল পাখির জানা নেই। সে পুরোপুরি চুপ হয়ে গেল। নতুন করে আর কিছু বলল না। নাওয়াফ ওর শুকনো ঠোঁট দুটোর ওপর ছোট করে একটা চুমু খেল। এরপরে হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে বাইকে উঠে বসল। পাখিকে আজ সামনে বসিয়ে বাইক স্টার্ট করল। সরাসরি মোল্লা বাড়ি ঢুকল না। সোজা নিখিলদের বাড়িতে ঢুকল। পাখিকে কোলে নিয়ে সোজা সামনের ঘরে ঢুকে গেল। মুক্তি নিখিল তখন বাড়িতে ছিল। ইচ্ছে ঘুমুচ্ছে। নিখিলের আম্মা বাড়িতে না। নাওয়াফ পাখিকে শুয়ে দিয়ে মুক্তিকে আদেশ দিল, “ওর কাপড় চেঞ্জ করে ওর শরীর কুসুম গরম পানি দিয়ে মুছিয়ে দিস। আর কাটা স্থানে মলম লাগিয়ে দিস। রাতে আমি আসব। দরজা যেন খোলা থাকে।”
মুক্তির মাথায় কিছুই ঢুকল না। গেল সুস্থ মানুষ। আর ফিরে এলো আহত হয়ে। আসল ঘটনাটি কি?
“ওর কি হয়েছে?” জানতে চাইল নিখিল।
নাওয়াফ ঠোঁটজোড়া জিভের তলে ডুবাল।
“কিছুই হয়নি। বাইক থেকে পড়ে গিয়েছিল। তাই একটু আঘাত পেয়েছে। আমি আসি।”
কথাগুলি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে নাওয়াফ বেরিয়ে গেল। নিখিল অবাক হয়ে নাওয়াফের পথ ত্যাগ করা দেখছিল। নাওয়াফের মুখটাতে স্পষ্ট মিথ্যার ছায়া দেখেছে সে। কিছু একটা লুকাচ্ছে। একসঙ্গে চলে আর এতটুকু বুঝবে না? কি ঘটেছে ওদের সঙ্গে যদিও সে জানে না। জানতেও সে ততোক্ষণ পর্যন্ত পারবে না, যতক্ষণ না নাওয়াফ সেচ্ছায় তাকে জানাবে। মাঝরাতের দিকে পাখির গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। মুক্তি পাশে ছিল। তার মনের ভিতরে অজস্র চিন্তা। এর কারণ সে পাখির কাপড় চেঞ্জ করতে গিয়ে হাতে পায়ে নখের আঁচড় পেয়েছে। যা এক্সিডেন্ট হলে হওয়ার কথা নয়। যদি না কেউ ইচ্ছে করে নখের আঁচড় দেয়। তবে কি নাওয়াফ ভাই জোর করে পাখির সাথে কিছু করতে গিয়েছিল? না না, এটা অসম্ভব। নাওয়াফ ভাই ওরকম লোক নয়। পাখির সাথে জোর খাটানোরও পুরুষ নন। খুবই ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ লোক। ওইদিকে পাখির থেকেও সে তেমন কিছু জানতে পারেনি। মেয়েটা কিছু বলেনি। রাতের শেষের দিকে নিখিলদের সদর দরজাটি খট করে খুলে গেল। সেখান দিয়ে প্রবেশ করল রক্তে ভেজা দুটি পা। হাতে একটি তাজা রক্তে ভেজা রামদা। পাখির রুমের দরজাটি খট করে খুলে গেল। সেখান দিয়ে প্রবেশ করল দীর্ঘদেহী দেহটা। জট মেরে পাখিকে কোলে তুলে নিল। মুক্তি বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কথা বলার শক্তি হারাল। পাখির উষ্ণ শরীরে ঠান্ডা হাতের স্পর্শে সে কুঁকড়ে গেল। পিটপিট করে তাকাতেই মুখের সামনে বীভৎস একটা মুখ ভেসে ওঠল। যা পুরো রক্তে মাখামাখি। তার মুখে হাত চলে এলো। ততক্ষণে সে বাহিরে চলে এসেছে। তাকে দাঁড় করানো হলো কাঠের জলচৌকির ওপর। পাখি বিস্ময়ে ছানাবড়া। কি করছে চাইছে লোকটা? এই মুহূর্তে ওনাকে দেখে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। সমস্ত দেহে রক্তে ভেজা। মুখেও রক্তের ফোঁটা। পাখির সামনে একটা বস্তা খুলল লোকটা। বেরিয়ে এলো বডি ছাড়া এক একটা মাথা। ওসব দেখে পাখির মাথা ঘুরে ওঠল। বমি পেল। সে চৈতন্য হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। নাওয়াফ ওর চোখে জল ছুড়ল।
“পাখি তাকা আমার দিকে। তাকাতে হবে তোকে। দেখতে হবে। হজম করতে হবে। দেখ এরা কারা?”
পাখি চাইল ঠিকই। চোখের সামনে আবারো সেই একই সিন দেখল। সে ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল। নাওয়াফ ওর হাত টেনে ধরল। বস্তা থেকে বের করে আনল আরো তিনটা মাথা। তার দুহাতে তিনটা তিনটা করে মোট ছ’টা মাথা। সব কয়টার চুল ধরে পাখির পায়ের কাছে রাখল। সর্বশেষে বস্তার ভেতর থেকে বের হলো দুলিটারের একটি বোতল। যার ভিতর লাল তরল। পাখি বিস্ময়ের পর বিস্ময় হচ্ছে। তার জবান কাঁপছে। শরীর ঢুলছে। তার সমগ্র দেহ দরদর করে কাঁপছিল। নাওয়াফ বোতলের মুখ খুলে নিল। লাল টকটকে তাজা তরল ঢেলে দিল পাখির পায়ের ওপর। যেন লাল তরল দ্বারা স্নান করাচ্ছিল ওর পা দুটো। কি নির্মম, বীভৎস, নৃশংস দেখতে সে দৃশ্য! শরীরের লোম দাঁড়ানোর মতো। পাখি দেখল সে যে প্রশ্ন করবে তার জন্য শরীরে পর্যাপ্ত শক্তিটুকু পাচ্ছে না। সে সাহস দেখিয়ে এবার জিগ্যেস করেই বসল, “এ..এগুলি কি?”
ওর প্রশ্নে নাওয়াফ ঠোঁট টিপে হাসে। খুব স্বাভাবিকভাবে সরল স্বীকারোক্তিতে উত্তর দেয় সে, “শয়তানগুলোর তাজা রক্ত।”
অতটুকু শুনেই পাখি ঠাস করে মাটিতে পড়ে গেল। পুরোপুরি চৈতন্য হারালো সে। ততক্ষণে নাওয়াফের সমস্ত রক্ত ঢালা শেষ। সে এবার ভালো পানি দিয়ে পাখির পা দুটো ধুয়ে ওকে আবার রুমে রেখে এল। দরজার সামনে দাঁড়ানো অবস্থাতে নীরবে সবটা দেখল মুক্তি। তার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। কী দেখল সে? কি নৃশংস, বর্বর! সে একটা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।
নাওয়াফ পাখিকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকে শুয়ে দিয়ে মুক্তির পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলল, “রুমে যা। পাখি একা শুয়ে আছে।”
মুক্তি ভীতসন্ত্রস্ত মুখটা নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে শুধাল, “আপনি ওই মানুষগুলোকে জবাই করেছেন?”
নাওয়াফ নীরবে চাপা হাসে।
“উঁহু না। মানুষকে কি মানুষ জবাই করে? আমি তো জবাই করেছি পশুদের।”
সরল স্বীকারোক্তি শোনার পর মুক্তির আর সাহস হলো না দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার। সে দ্রুত পা চালিয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন ভোরে নাওয়াফ এসেছিল পাখিকে দেখতে। পাখির আজ পরীক্ষা ছিল না। সে তখন ইচ্ছের বই দিয়ে পড়ছিল। শরীরে জ্বর ছিল। নাওয়াফ ওর সামনে বসা। ওর উচিত কথা বলা। সে তাও বলছে না। এখানে একটু বিরক্ত ঠেকল নাওয়াফের। যদিও পাখির জ্বর মাথায়। তাই কিছু বলছেও না। সে নিজ থেকে এবার থেকে জানতে চাইল, “এখন কেমন লাগছে?”
পাখি জবাব দিল না। নাওয়াফ আবারো বলল, “দেখি জ্বর কমেছে কিনা?” বলেই ওর শরীরে হাত লাগতেই যাচ্ছিল। পাখি দ্রুত দূরে সরে গেল। নাওয়াফ অবাক হয়ে অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি দেখল। সে পাখির এরূপ আচরণে একটু থমকে গিয়েছিল। পরক্ষণে নিজের হাতটি গুটিয়ে নিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখতে চাইল।
“সকালে খেয়েছিস?”
পাখি এবারও জবাব দিল না।
নাওয়াফের এবার রাগ হলো। সে কিছুটা চ্যাঁচিয়ে ওঠল।
“সমস্যা কি পাখি? কথা বলছিস না কেন? রাগ হলেও প্রকাশ কর। তবুও চুপ থাকিস না। মেজাজ গরম হচ্ছে কিন্তু।”
“আপনি আর আমার সামনে আইসেন না নাওয়াফ ভাই। আপনাকে দেখলে আমার নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মে।”
কথাটি কর্ণে প্রবেশ করার মাত্রই তার বুকটাতে ধারালো সুচের মতো কিছু একটা এসে বিঁধল। হৃদয়টা ভেঙে খণ্ডবিখণ্ড হলো। সে বহু কষ্টে মুখ ফুঁড়ে জিগ্যেস করল, “আমি তোর সামনে না এলে তুই খুশি?”
পাখি জবাব দিল না। মুখটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে নিল। ওর নীরবতা, মুখ ঘুরিয়ে নেওয়াটা যেন নাওয়াফকে ভর্ৎসনা করছিল। তাকে অসহায় করে দিচ্ছিল। সে উঠে দাঁড়াল। লম্বাটে লম্বাটে কদম ফেলে দীর্ঘদেহী শরীরটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। পাখির দুচোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু ঝরে।
“সরি প্রণয় পুরুষ, আপনাকে আমি কষ্ট দিতে চাইনি। কিন্তু আপনাকে সহ্যও করতে পারছিলাম না। ওই বিদঘুটে ঘটনাটি আপনার জন্যই তো ঘটেছিল।”
সেবার পাখির জ্বর ভালো হলো। সে সব কয়টি পরীক্ষা দিল। পরীক্ষা এখন শেষও। এই যে সে পরীক্ষা দিল, পরীক্ষা শেষ। এরমধ্যে একবারও লোকটার দেখা পায়নি। গেল কই লোকটা? তাকে ফোনও করেনি। সেদিনের কথায় বুঝি ভীষণ লোকটা কষ্ট পেয়েছিল? ইশ, ওমনটা না বললেও হতো। তার যে হাসবেন্ড হয়। কতকাল আর দূরে থাকবে। সে বিকালের দিকে চুলে দুটো বেনি গেঁথে চুল ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে নিখিলদের বাড়িতে গেল। নিখিল তখন গোসল করছিল। দরজার সামনে পেয়ার গাছ। পাখি বেঠকখানায় উঠে দুটো পেয়ারা পেরে নিল। বৈঠকখানায় পা দুটো ঝুলিয়ে বসল। পা দুটো নাচাতে নাচাতে পেয়ারায় একটা কামড় বসিয়ে দিল। পেয়ারা খেতে খেতে গলা চ্যাঁচিয়ে নিখিলকে বৈঠকখানায় বসে ডাকল, “নিখিল ভাই আর কতক্ষণ লাগবে আপনার?”
নিখিল গায়ে সাবান মাখতে মাখতে কথার পরিপক্ষে বলল, “বউয়ের বইন আমার একমাত্র শালিকা সাহেবা, একটু ধৈর্য ধরুন। করুনা করুন আমার প্রতি। আপনের বইনে তো একটু শরীরডাও ঢইলা দেয় না। শরীরে কতদিনের ময়লা আর্বজনা জইমা আছে জানেন? ওগুলোরে তাড়াইয়া নেই। জ্বর হলে তো আপনার বোন ফিরেও চাইবো না। যেই ঢিলার ঢিলা।”
পাখি বিপরীত পক্ষে ফিক করে একগাল হেসে দিল।
“আমি আপনার ফোন ধরলাম। পাসওয়ার্ড বলেন।”
“তোর বইনের নাম লেখ, কৈতুরি বানু।”
নাম শুনে পাখি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। আরেক গাল হো হো করে হাসলও।
“আপায় শুনলে আপনারে ঘর ছাড়া করবে।”
“হয় আমার ঘরের এখন আমিই ভাড়াটিয়া।”
পাখি ঠোঁট টিপে হাসল ঠিকই, তবে আর নিখিলকে প্রশ্ন করে জ্বালালো না। সে ফোনের লক খুলে নাওয়াফের নাম্বার খুঁজল। কল লিস্টে পেয়েও গেল। গতকাল লোকটার সঙ্গে নিখিল ভাই কথা বলেছে। তাহলে তাকে বলল না কেন? তাকেই কেন বলতে যাবে? এতো ঠেকা পড়েনি কারোর। সে এসব ভাবতে ভাবতে কল দিয়েই বসল। কিছুক্ষণ রিং বাজল। একটু পর রিসিভ হলো। অপর পাশ থেকে বলল, “বল নিখিল।” লোকটা বুঝি ভেবেছে নিখিল ভাই ফোন করেছে।
পাখি দেখল তার দম বন্ধ লাগছে। শ্বাস ফেলছে থেমে থেমে। সে বুক ফুলিয়ে কয়েকটি শ্বাস ফেলে বলল, “ভালো আছেন?”
লোকটার আর সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। শুধু ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে ফোঁস ফোঁস শ্বাস ফেলার শব্দ হলো। তার মানি লোকটা তার কথা শুনেছে। কিন্তু ইচ্ছে করে জবাব দিচ্ছে না। সে কি এতটাই অবহেলার পাত্রি? হুট করে আবার কল কেটে দিল। পাখি পুরা বাকরুদ্ধ। তার কান্না পেল। এ যেন সোজা মুখের ওপর অপমান। লোকটা নিজেকে ভাবে কি বিশতলা বিল্ডিং? আর সে তার পাশে একটা ছনের ঘর? না না, সে আর নত হয়ে ফোন করবে না। ওনার যা খুশি তাই করুক। রাগ করে ক’টা কথা বলেছি এজন্য একমাস পর্যন্ত বউয়ের কোন খোঁজ খবর নিবে না। পাষাণ একটা। তার ভাবুকের ভেতরে হোয়াটসঅ্যাপে কল আসল। ভিডিও কল এসেছে। লোকটাই ভিডিও কল দিয়েছে। পাখি চমকাল। মাত্র না ওনি ফট করে কল কাটল? আবার কল দিলোও। হায়রে পুরুষ জাতি, কত রূপ দেখাইলি। সে মাথায় কাপড় দিয়ে রিসিভ করল। দেখল লোকটা বলিষ্ঠ বুকটা বের করে শুয়ে আছে। ওর মুখটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পাখি মাথা নিচু করে নিল। ফোনের মধ্যে থেকে লোকটা শুধাল, “কেমন আছেন?”
পাখির কান্না পেল। বেয়াদব পুরুষ। এতদিন পর আসছে কেমন আছি খবর নিতে? সে মাথা নিচু করে নিল। এক ফোঁটা জল ফেলল। লোকটা আবার শুধাল, “কাঁদছেন কেন?”
পাখি নাক টেনে উত্তর দিল,
“আগে আপনি ঠিকভাবে কথা বলুন।”
“ঠিকভাবেই তো বলছি।”
“তাইলে আপনি কি?”
নাওয়াফ ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে হেসে দিল।
“তাহলে কি বলব?”
“জানেন না?”
“কেউ যদি জানিয়ে দেয় তাহলে একটু উপকার হয়। ”
পাখি এবার ঝরঝর করে কেঁদে দিল। দুচোখের পানি ছেড়ে দিল। ফোনের ওপর টপটপ করে তার চোখের জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। নাওয়াফ এবার সিরিয়াস হলো। সে গায়ে একটি টিশার্ট পরে উঠে বসল। ওকে একটি ধমক দিয়ে বলল, “এই বউ কাঁদছিস কেন? আহারে কাঁদে না। আমার বুক পুড়ে তো।”
পাখি থামল না। অনবরত তা চলল। এবার নাওয়াফ ওর কান্না থামাতে আহ্লাদি করে বলল, “ কাঁদে না আমার সোনা, আমার পক্ষী, আমার ময়না, টিয়া। মেলা থেকে লজেন্স কিনে দিব। পুতুল এনে দিব। রঙিন শাড়ি এনে দিব। তবুও কাঁদে না আমার পাখিটা।”
পাখি এবার কান্না থামিয়ে হো হো করে কয়েক দফায় হেসে দিল।
“আপনি কোথায়?”
“কেন আপনার লাগবে নাকি আমাকে?”
“সব সময় উল্টা পাল্টা কথা বলেন কেন?”
“বউয়ের সঙ্গেই তো মানুষ উল্টা পাল্টা কথা বলে সোনা।”
“ফাজলামো বন্ধ করুন। বলুন না আপনি কোথায়?”
“বলতেই হবে?”
“হুঁ।” পাখির কণ্ঠে নিপাত জেদ।
“আমার বউয়ের বুকে আমি।”
“ধান্দাবাজ লোক।”
নাওয়াফ পাখির কথা শুনে হো হো করে ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে দিল। পাখিও লোকটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসল। এক সময় হাসি থামিয়ে বলে, “ আপনাকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে সুদর্শন পুরুষ।”
“আর কিছু করে না?”
“কি করবে?”
“রাতে এসে বোঝাব।”
“রাতে আসলে আমি দরজাই খুলব না।”
“আমি সিদ কেটে ঢুকব।”
“চোর কোথাকার!”
“সবচেয়ে বড়ো চোর তো তুই।”
“আমি কি করলাম?”
“আমার মন চুরি করেছিস।”
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম