#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(২৫, ২৬)
নাওয়াফ যখন নিখিলদের বাড়িতে পৌঁছাল, তখন দেখল পাখি অচেতন হয়ে নিখিলদের দরজার সামনে পড়ে আছে। নিখিলের আম্মা পাখির চোখে-মুখে পানি ছিটাচ্ছে। নাওয়াফকে দেখে তিনি উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বললেন, “এসেছিস বাবা? দেখ তো মেয়েটার কী হলো? হুট করে তোর বাসা থেকে ছুটে এসে চেতনা হারাল। আচ্ছা, তোদের মধ্যে কি কিছু হয়েছে? কোনো ঝুট-ঝামেলা?”
নাওয়াফ বুক চিঁড়ে ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলল।
“ তেমন কিছু না। জানি না কী হয়েছে ওর? বলল বাড়ির জন্য মন কেমন করছে। এরপর বলল ওয়াশরুমে যাবে। ওয়াশরুমের কথা বলে ট্রি-হোম থেকে বেরিয়ে এলো।”
সবগুলো কথাই মিথ্যে ছিল। সত্যটাও বলার মতো ছিল না।
সব কথা শুনে সরল হৃদয়ের মানুষ নিখিলের আম্মা ভয় পেয়ে গেলেন। নতুন বিয়ে হয়েছে। গায়ে কোনো খারাপ বাতাস লাগল নাকি! তিনি দোয়া-দুরুদ পড়ে পাখির গায়ে ফুঁ দিলেন। তারপর নাওয়াফকে নিচু স্বরে বললেন, “ওকে নিয়ে যা নাওয়াফ। কেউ দেখে ফেললে খারাপ কিছু ভাববে। ঘরের কথা যেন বাহিরের কেউ না জানে। তার আগেই তোরা ঘরে ফিরে যা।”
নাওয়াফ আর কিছু না ভেবে পাখিকে কোলে তুলে নিল। যাওয়ার আগে বলল, “আসছি বড়ো আম্মি। তুমি আবার এসব কথা কাউকে বলো কিন্তু।”
“না না, পাগল! ঘরের কথা বাহিরের লোককে বলব কেন? তোরা নিশ্চিন্তে যা।”
“ঠিকাছে।”
ট্রি-হোমে যাওয়ার পর নাওয়াফ সবার আগে পাখিকে বেডে শুয়ে দিল। এরপর একে একে ওর শরীরের কাপড় খুলে কুসুম গরম পানি দিয়ে ওর শরীর মুছে দিল। ওর শরীরে কম্বল টেনে দিয়ে সে বেলকনিতে গিয়ে বসল। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। কিছুক্ষণ পর পর ঠোঁটে ছোঁয়াচ্ছে।
এক এক করে সব হিসেব কষছে সে। দূরে বাদুড় শিমুল গাছের সঙ্গে ঝুলে ঝুলে আছে। গভীর অরন্যের মাঝে শেয়াল-শকুন ডাকাডাকি করছে। তার দুঠোঁটের মাঝে এখনো জ্বলন্ত সিগারেট। ধোঁয়াগুলো আকাশে উঠে যাচ্ছে। ফজরের আজান পড়েছে। ভোর হওয়া পর্যন্ত সে বেলকনিতেই রইল। ভোরের আলো ফুটে সূর্যের তাপ বাড়তেই সে উঠে দাঁড়াল। পাখির এখনো ঘুম ভাঙেনি। সে এসে ওর পাশে একটু বসল। ওর মায়াবী, কোমল, আদুরে মুখটার দিকে কিছুক্ষণ গভীর চোখে তাকিয়ে রইল। আলগোছে ওর চুলগুলো মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দিল।
“তুই চাইলে গত কালকের রাতটা আমাদের জন্য স্মরণীয়, মধুর রাত হয়ে থাকত। কিন্তু তুই চাসনি। প্রথমে আমাকে পাগল করে দিয়ে মাঝ নদীতে ভাসিয়ে দিলি। কিন্তু আমি যে সাঁতার জানি না রে জান। কেমন করে সেখান থেকে সাঁতরে কূলে ফিরব তুই বল। এমন স্বার্থপর কেমনে হলি?”
কথাগুলো বলার সঙ্গে বুক চিঁড়ে তপ্ত দুটো শ্বাস বেরিয়ে এলো তার। ওর কাছ থেকে উঠে গেল। ট্রি-হোম থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের রাস্তা পেরিয়ে মাটির রাস্তায় হাঁটতে বের হলো।
সকাল তখন ন’টা।
পাখির নিদ্রা ভাঙল। হাত-পা নড়াচড়া করে সে পিটপিট করে চাইল। নিজের অবস্থান দেখে নিজেই ভীষণ অবাক হলো। সে এখানে কেন? সে তো নিখিল ভাইদের বাসায় ছিল। এখানে এলো কি করে? সে দ্রুত উঠে বসল। পুরো ঘরটা খালি। তাজা ফুলের ঘ্রাণের সঙ্গে বাতাসে মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসছে। রান্নাঘর থেকে ঢাকঢুক শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। পাখি পা দুটো নরম কার্পেটে রাখল। নিজের গায়ে তাকিয়ে দেখল একটা টিশার্ট আর পেটিকোট পরা। চুলগুলো কাটা দিয়ে আটকানো। সে কাটা খুলে ফেলতেই লম্বা চুলগুলো পুরো পিঠে ঝরঝর করে ছড়িয়ে পড়ল।
“উঠে পড়েছিস?”
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্ন করল নাওয়াফ।
পাখি ঘাড় কাত করে চোখ দুটি পিছু নিল। দেখল তার পিছনে লোকটার অবস্থান। পরনে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট আর টিশার্ট। স্বাস্থ্য ভালো হওয়াতে দেখতে ভীষণ ভালো লাগছে। হাতের বাহুগুলোর রগগুলো মাংসের ওপর স্পষ্ট দাঁড়িয়ে আছে। গা ভেজা ভেজা লাগছে।
“কথা বলছিস না কেন?”
লোকটার ধমকে পাখি চমকে উঠল। গতকালকের পর লোকটা যে তার সঙ্গে এত স্বাভাবিক আচরণ করবে, সে ভাবতেই পারেনি।
“আমি এখানে কী করে এলাম?”
“উড়ে উড়ে এসেছিল।”
“এ্যাহ্?”
“হ্যাঁ।”
“উড়ে উড়ে এসেছি?”
“আমি নিয়ে এসেছি।”
“কেন?”
“কেন আবার কী? বিয়ে করেছি কি বউ পরের বাসায় রাখার জন্য?”কথাটা বলেই সে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
পাখি বিছানার ওপর ধপ করে বসে পড়ল। দাঁত দিয়ে নখ কাটছে সে। এটা তার একটি পুরোনো বদ অভ্যেস। বেশি টেনশন হলে সে দাঁত দিয়ে নখ কাটে। খট করে বাথরুমের দরজা খুলে গেল। সেখান দিয়ে বের হলো বলিষ্ঠ পুরুষটি। কোমরে সাদা একটা টাওয়েল। চুলগুলো গড়িয়ে চওড়া, বলিষ্ঠ বুকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানির ফোঁটা ঝরে পড়ছে। পাখি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এভাবে কেউ ঘরে আসে? সে চোখ দুটো অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। নাওয়াফ ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে শরীরের পানি মুছছিল। ওর দিকে এক পলক তাকাল। চোখ দুটো অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখা। যেন তার দিকে তাকালেও পাপ হবে।
“গোসল করে আয়।”
“গোসল করব কেন?”
“শরীর থেকে বাজে গন্ধ আসে।” বলেই ওর হাত ধরে সোজা বাথরুমে ঢুকিয়ে দিল লোকটা। দরজা বাইরে থেকে আটকে দিল। পাখি হতবাক। এমন জল্লাদের মতো আচরণ কেউ করে? সে ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠল, “আমি ভেতরে কাপড় নেইনি!”
নাওয়াফ জবাব না দিয়ে মিটমিট করে হাসল। কিন্তু কাপড় দিল না। পাখি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কাপড় না পেয়ে সে গোসল করে নিল। পুরো পনেরো মিনিট পর পাখি দরজা ধাক্কাল। নাওয়াফ তখন পুরোপুরি রেডি। কফি কালারের একটা কাতুয়া শার্ট পরনে তার। সঙ্গে ব্ল্যাক প্যান্ট। বাম হাতে দামি ঘড়িটি। এই ঊনত্রিশ বছরের সুদর্শন যুবককে দেখলে যে কেউ চোখ সরাতে পারবে না। এক দেখাতে প্রেমে পড়ে যাবে। অথচ প্রতিনিয়ত নিজের বউয়ের কাছেই তাকে হতাশ হতে হয়।
“দরজা খুলুন। কাপড় দিন আমার।”
নাওয়াফ দরজা খুলে তোয়ালেটা এগিয়ে দিল।
“এটা পরে আয়।”
“এই দেড় ইঞ্চি এটা?”
“হ্যাঁ।”
“না..য়াহ! পরব না আমি।”
“তাহলে যেমন আছিস, তেমনই চলে আয়।”
“না না, পারব না। আপনি তাকাবেন, দেখবেন আমায়।”
“আমার এত ঠেকা পড়েনি তোর দিকে তাকাব।”
পাখি বুঝল, এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সে তোয়ালেটা পরেই রুমের ভেতরে পা রাখল। নাওয়াফ মনে মনে পণ করল, ওর দিকে ভুলক্রমেও তাকাবে না। সে আয়নার দিকে চোখ দুটো নিল। কিন্তু স্বয়ং আয়নাও যেন আজ তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। সে দেখতে পেল
দুটো নগ্ন পা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। বুক থেকে হাঁটু পর্যন্ত তোয়ালে দিয়ে ঢাকা। পাখি টানাটানি করে একবার তোয়ালে উপরে তুলছে, আরেকবার নিচে নামাচ্ছে। নাওয়াফের সামনে মাথা নত করে গিয়ে দাঁড়াল। নাওয়াফের চোখ তখনও আয়নাতে। যেখানে সে সরাসরি পাখিকে দেখতে পাচ্ছে। সে চাইছে দৃষ্টি নামিয়ে নিতে। কিন্তু বেহায়া চোখ দুটো যেন তার সঙ্গে বেইমানি করছে। সে পারছে না দৃষ্টি নিচু করতে।
পাখি মাথা নত অবস্থায় বলল, “এবার আমার কাপড় দিন। শীতে মরছি।” বলেই সে শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে তোয়ালেটা উপরের দিকে টানছিল। বেশি টানতে গিয়ে তোয়ালের গিট আলগা হয়ে নিচে পড়ে গেল। পাখি নিশ্চুপ, সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ। নির্বাক হয়ে রইল। যেন স্ট্যাচু। কোন কাঠের মূর্তি। ঘটনাটি বুঝতে মস্তিষ্ক কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। হুশ আসতেই সে সবার প্রথমে নাওয়াফের দিকে চাইল। দেখল লোকটা তার দিকে নয়, আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে। সে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। যাা লোকটা কিছু দেখেনি। দ্রুত তোয়ালেটা তুলে আবার বেঁধে নিল। ওদিকে আয়নার দিকে স্ট্যাচুর মতো হা করে এখনো তাকিয়ে আছে দীর্ঘ পেশি দেহটা। তার কণ্ঠনালি একবার ঠেলে নিচে নামছে, আরেকবার ওপরে ঠেলে উঠছে। বিছানার চাদর সে শক্ত করে খামচে ধরল। এক পা দিয়ে আরেক পা চেপে ধরল। শরীরের লোমগুলো ততক্ষণে কাঁটা দিয়ে জেগে উঠেছে। সে দ্রুত উঠে বরান্দায় চলে গেল।
পাখি হতবাক। এর আবার কী হলো? সে ঘাড় কাত করে আয়নার দিকে একবার চাইল। সেখানে দেখল তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে সে থ হয়ে গেল। খাইছে সর্বনাশ! তার মানে লোকটা তার সবকিছু দেখে ফেলেছে! ছিহ্, ছিহ্। কি লজ্জা! লজ্জায় আর সে তাকাতে পারছে না। চোখ মিলাতে পারছে না। বিছানার মাঝে দেখল নাওয়াফের একটা শার্ট। সে সেটা পরে নিল। শার্টের সঙ্গে তোয়ালে নিচে পরে বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল। গিয়েই চটপট গলায় ধমকে ওঠল, “আপনি এত নির্লজ্জ কেন, হুঁ?”
নাওয়াফ পকেটে হাত ঢুকানো অবস্থাতে এক পা এক পা করে ওর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ঠোঁট কামড়ে শুধাল, “নির্লজ্জের কী করেছি আমি?”
“সবকিছু দেখে ফেলেছেন?”
“এক জিনিস ক’বার দেখাবি তুই?”
পাখি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“মানে?”
“দেখার জিনিস নতুন করে দেখব কী?”কথাটি বলেই নাওয়াফ বেডরুমে ঢুকে গেল।
পাখি হা হয়ে গেল। মুখে হাত চলে গেল তার। কী বলছে লোকটা? গতকাল ছাড়া আর কবে কী দেখেছে? সে হনহনিয়ে প্রশ্নের উত্তর জানতে রুমে ঢুকে গেল। নাওয়াফের সামনাসামনি গিয়ে নাক উঁচু করে সটান করে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটা এত লম্বা যে, সে লোকটার ঘাড়ের নিচে পড়ে থাকে। তাকে তাকাতে চোখ উপরে উঠাতে হয়। সে চোখ দুটো পাকাল।
“এই যে, আপনি কবে দেখেছেন?”
“কী দেখেছি?”
“জানেন না?”
“ গতকাল রাতে পালালি কেন?”
পাখি দেখল সে খাল খুঁড়তে গিয়ে কুমির বের করে এনেছে। সে এ কথার জবাব এখন কি করে দিবে? তড়িঘড়ি করে কথা ঘুরাতে চাইল।
“আমার কাপড় দিন। পরব।”
“জবাব না পাওয়া পর্যন্ত কাপড় পাবি না। এভাবেই থাকবি।”
পাখি দেখল লোকটা ত্যাড়ামি করছে। জবাব না দিলে সত্যি সত্যিই কাপড় পাবে না। সে তাই মিনমিন করে বলল, “আমার পিরিয়ড ছিল।”
“মিথ্যে কথা।”
“সত্যি।”
“পিরিয়ড হলে আমাকে বললি না কেন?”
“ভয়ে।”
“এটাও মিথ্যে।”
পাখি অপরাধীর ন্যায় মাথা নিচু করে নিল। নাওয়াফ ওর অপরাধী ন্যায় মুখটা এক ঝলক দেখল। ভীষণ মায়া লাগল তার। কেন এত মায়া লাগে এই নারীটির প্রতি সে নিজেও জানে না। যার জন্য এত অন্যায় করার পরেও সে ওকে কটু কথা শোনাতে পারে না। এর প্রতি কঠোর হতে পারে না। সে ওকে কোমল করে বোঝাল, “দেখ পাখি, আমি তোর স্বামী। কোনো জন্তু-জানোয়ার না। আমাকে এত ভয় পাওয়ার কী আছে? এবার সত্যিটা বল। না সত্যিটা জানার আমার অধিকার নেই?”
“না না, আপনার অধিকার আছে। আমি আসলে ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। আমার ক্লাসমেটের বিবাহের ফার্স্ট নাইটের কথা শুনেছিলাম। তার হাসবেন্ড নাকি তাকে জোরপূর্বক রেপ করেছিল। খুব কষ্ট দিয়েছিল। তার সে রাতে প্রচন্ড বি* হয়েছিল। এরপর সে সাতদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল।”
কথাগুলো বলেই পাখি থামল।
নাওয়াফের চোয়াল রাগে শক্ত হয়ে গেল।
“ছিঃ! তোর আমাকে জানোয়ার মনে হয়? রেপিস্ট ভাবিস আমায়?”
“এই না। প্লিজ ভুল বুঝবেন না আমায়।”
“তাহলে পালালি কেন?”
পাখি সঠিক জবাব দাঁড় করাতে পারল না। তাই আদল নত করে নিল। ওর নিশ্চুপতা নাওয়াফকে আরও দ্বিগুণ রাগ বাড়িয়ে দিল। সে আর ওখানে রইল না। বড়ো বড়ো পা ফেলে এক প্রকার রুম থেকে বেরিয়ে গেল। পাখি দপ করে নিচে বসে পড়ল। এটা সে কী করল? নিজের ওপরই এখন রাগ লাগছে। একদিকে ভয়, অন্যদিকে নিজের হাসবেন্ডকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। নাওয়াফের দেখা মিলল দুপুরে। এসে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। তখন পাখি বিছানায় বসে ছিল।
নাওয়াফ কিছুক্ষণ পর বের হলো। হাত-মুখ টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে খুব স্বাভাবিকভাবে জানতে চাইল, “দুপুরে খেয়েছিস?”
পাখি মাথা ঝাঁকাল।
“হ্যাঁ।”
“ঠিকাছে। তাহলে এখন শুয়ে পড়।”
“আপনি?”
নাওয়াফ ওর কথার জবাব না দিয়ে বেরিয়ে গেল। যেন ইচ্ছে করেই ওকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। পাখির খুব কান্না পেল। এমন করছে কেন লোকটা? আগে তো ঠিকই ঘরে থাকত। সে আসার পর যেন ঘরটা অপরিচিত ঠেকছে ওনার কাছে। সারা বিকেলটা তার একা কাটল। নাওয়াফ আর এলো না। রাত আটটার দিকে লোকটার দেখা মিলল। হাতে ভাজাপোড়া কিছু খাবার এনেছে। বাসায় কেউ নেই। সবাই ঘুরতে গিয়েছে। ওকেও সেধেছিল, কিন্তু সে যায়নি। নাওয়াফ ওর হাতে কাগজের ঠোংগা ধরিয়ে দিল। পাখি জানতে চাইল, “কি এটা?”
“চিংড়ি আর রসুনের বড়া।”
“আপনি খাবেন না?”
“না, তুই খা। সামনের ঘরে আছি। প্রয়োজন হলে ডাকিস।”
লোকটা দুহাতে দক্ষতার সঙ্গে ল্যাপটপে টাইপিং করছিল। পাখি পাশে গিয়ে নিঃশব্দে বসল। নাওয়াফ টের পেল। সে কফিতে ছোট্ট করে চুমুক বসিয়ে ফের টাইপিং করতে করতে জানতে চাইল,“কিছু বলবি?”
“আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন না কেন?”
“এই যে বলছি।”
“আগের মতো তো বলছেন না।”
“হাসবেন্ডকে রেপিস্ট ভাবতে পারিস। আর হাসবেন্ড কথা না বললে দোষ?”
“আমার ভুল হয়ে…”
পাখিকে মাঝপথে আটকে দিল নাওয়াফ।
“পিছনের কথা শুনতে চাই না।”
পাখির প্রচন্ড রাগ হলো। সে রেগে উঠে চলে গেল।
রাতে আর নাওয়াফ পাখির কাছে গেল না। খাওয়া-দাওয়া শেষে সে রমিজদের সঙ্গে শুয়ে পড়ল। রমিজের মনে যদিও অসংখ্য প্রশ্ন আসছে, কিন্তু জিজ্ঞেস করার সাহস তার হচ্ছে না। পাখির রুমে ইচ্ছে গিয়ে শুলো। মূলত নাওয়াফই তাকে পাঠিয়েছে। পাখি অবাক হয়ে ইচ্ছেকে দেখে জিগ্যেস করল, “তুই এখানে? ওনি কই?”
“আপনার ওনি সামনের ঘরে রমিজ ভাইদের সঙ্গে ঘুমিয়েছে।”
পাখি আর কিছু বলল না। চুপচাপ শুয়ে পড়ল। তার গাল গড়িয়ে এক ফোঁটা জল গড়াল। সারারাত আর ঘুম হয়নি। নাওয়াফের অবহেলাগুলো তাকে ঘুমাতে দেইনি। ভীষণ পীড়া দিয়েছে। লোকটাকে কেমন পরিবর্তন পরিবর্তন লাগছে! যেন তাকে চেনেই না। আর এসব ভীষণভাবে পোড়াতে লাগল তাকে। এভাবেই তিনটা দিন পার হলো। আজ তারা মোল্লা বাড়িতে গেল। নাওয়াফ বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছিল, কিন্তু ভেতরে ঢোকেনি। কাজ আছে বলে কোনো রকমে বেরিয়ে এলো। রাতে পাখি অপেক্ষা করেছে। লোকটা আসেনি। ফোন করে কাজ আছে বলেছে। আসতে পারবে না। পাখির মন খারাপ হলো। তাহিরা অনেকবার জিগ্যেস করেছিল, নাওয়াফ কখন আসবে? সে জবাবে কিছু বলতে পারেনি। চুপচাপ রুমে গিয়ে বালিশ ভিজিয়ে শুধু কেঁদেছে। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর রাতের দিকে নাওয়াফের পা পড়ল মোল্লা বাড়িতে। প্রথমে সে ভেবেছিল আসবে না। কিন্তু পরক্ষণে ভেবে দেখল এতে পাখি অপমানিত হতে পারে। তাকে প্রশ্নের দরজায় দাঁড় করানো হতে পারে। সেসব ভেবে সে সিদ্ধান্ত নিল এখন যাবে। দরজা খুলে দিয়েছিল তাহিরা।
পাখি তখন গভীর ঘুমে। নাওয়াফ ওর পাশ দিয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সে এমনিতেও পাখি সময় চাইলে দিত। কিন্তু যখন তাকে রেপিস্টের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলো, তখন তার মনটাই ভেঙে গেল। আর এজন্য মেয়েটার ওপর তার এক বুক অভিমান জমা হয়েছে। সে ভেবে নিয়েছে পাখি যখন চাইবে তখনই ওকে ছুঁবে। নিজের যত কষ্টই হোক না কেন, এর আগে ওকে ছুঁবে না।
খুব সকালে উঠেছে পাখি।
ঘুম ভাঙতেই হাতের ডান পাশে সুমিষ্টি মুখটা সবার প্রথমে চোখে পড়ল। কুচকুচে কালো ভ্রু। ধূর্ত দুটো চোখ। চওড়া কপাল। লালচে খয়েরি ঠোঁট। ঝলমলে চুলগুলো কপালের মাঝে এসে লেপ্টে আছে। পাখির একটু ভালো লাগল।
সকাল সকাল লোকটার মুখটা দেখে তার মন নেচে উঠল।
লোকটা না আসলে খালামনির কাছে তাকে কত জবাবদিহি করতে হতো! কিন্তু এলো কখন? সে তো মরার মতো ঘুমিয়েছে। টেরই পাইনি কোন। কতক্ষণ লোকটার মুখটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। কত সুন্দর পুরুষ! আর সে করেছে অবহেলা। থাক বুড়ো বয়সে নাতি-নাতনির কাছে বুক ফুলিয়ে গর্ব করে গল্প করে বলতে পারব যে, ওর দাদাকে নাকে দড়ি দিয়ে আমার পেছনে ঘুরিয়েছি। কথাটি ভেবেই সে ফিক করে হেসে উঠল। গালে হাত দিয়ে গভীর করে দেখল লোকটাকে। কপাল গুণে সুদর্শন একটা পুরুষ জুটেছে কপালে। তবুও ভালো, কালা জামাই কপালে জোটেনি। বাচ্চাগুলানও তাইলে কাইল্লা হইতো। আন্ধার রাইতে বাচ্চা হারাইয়া গেলে খুঁজেও পাওন যেত না। কোনটা জামাই কোন বাচ্চা? এসব ভেবেই আবারও সে ফিক করে হেসে দিল। এবার নাওয়াফের পাশ থেকে উঠে সে হাত-মুখ ধুয়ে তাহিরার সঙ্গে হাতে হাতে কাজ করতে গেল। তাহিরা পরোটা বানাচ্ছিল। পাখি চা বানাচ্ছে।
তাহিরা পাখির পা থেকে মাথা পর্যন্ত সন্দিহান নজরে একবার দেখে শুধাল, “ফরজ গোসল করিসনি?”
পাখি চমকে গেল। সে আসলে অন্য ভাবনায় ব্যস্ত ছিল।
আমতা আমতা করে লজ্জিত মুখে উত্তরে বলল, “না।”
তাহিরা চোখ রাঙাল।
“গোসল না করে চুলার কাছে এলি কেন? যা, গোসল করে আয়।”
পাখি নিচু স্বরে বলল,
“সেরকম আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি মনি।”
“হয়নি?” তাহিরার কণ্ঠে অবিশ্বাস।
“না।”
“কিছু লুকাচ্ছিস আমার থেকে? তোদের মধ্যে সব ঠিকাছে তো? গতকাল দেখলাম নাওয়াফ তোকে দিয়ে গেল। সারাদিনে আর ফোন দিল না। রাত গভীর করেও ফিরল। নতুন জামাই-বউয়ের আচরণ তো এমন না পাখি। নাওয়াফের মুখও শুকনো দেখাল। আগের চেয়ে এ তিন দিনে শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে। বিবাহিত পুরুষদের মুখ অমন অন্ধকার থাকে না। তাদের মুখে সর্বদা হাসি থাকে।”
পাখি চুপ করে রইল। কি জবাব দিবে সে? যেখানে সে নিজেই দোষি।
তাহিরা আবার বলল, “সত্য বলবি। একটাও মিথ্যে বলবি না। নাওয়াফ তোকে ছোঁয়নি?”
“আমিই তাকে ছুঁইতে দেইনি মনি।”
তাহিরার হাত এবার পরোটা বানানোর মধ্যে হুট করে থেমে গেল। গগনচুম্বী আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল সে, “ছুঁতে দিসনি মানে? শারীরিক সম্পর্ক হয়নি তোদের মধ্যে?”
পাখি নিঃশব্দে দুদিকে মাথাটা ঘোরাল।
“নাহ!”
তাহিরার ইচ্ছে করল এই মুহূর্তে পাখির গাল দুটো ঠাস ঠাস করে ফাটিয়ে দিতে। কিন্তু সে বুঝল, রাগারাগি করে কোন লাভ নেই। যা করার বুঝের মাধ্যমে বলতে হবে।
সে ধীরে জানতে চাইল, “ও নিজে থেকে কাছে আসতে চেয়েছিল?”
“হ্যাঁ। আমি নামিয়ে দিয়েছি তাকে।”
“কেন?”
“আমার ভয় হয়।”
“মহৎ বড়ো একটা কাজ করেছেন আপনি। জামাই যখন পরকিয়া করব, তখন বুঝবি। তখন চোখে মরিচ ডলে কাঁনলেও লাভ হইব না।”
পাখির মুখটা নিচু। মনটা ছোট হয়ে গেল তার। সত্যিই কি নাওয়াফ ভাই এমনটা করবে? তার ভবান্তরে মধ্যে আবারও শুনতে পেল তাহিরা বলছে, “ জানিস, সে রাতে তোকে কত ফেরেশতা অভিশাপ দিয়েছে?”
“ফেরেশতা অভিশাপ দেবে কেন?”
“স্বামী স্ত্রীকে কাছে ডাকলে, স্ত্রী যদি রুটিও বানায়। তবুও তাকে স্বামীর ডাকে সাড়া দিতে হবে। না দিলে ফেরেশতারা অভিশাপ দেয় তাকে। তোর চেয়ে পাশের বাড়ির মিতু দুই বছরের ছোট। ওর গত বছর বিয়ে হলো। এবছর বাচ্চাও হলো। আর তুই পড়ে আছিস ভয় নিয়ে? এখনকার যুগেও মানুষ তোর মতো বোকা হয় জানা ছিল না।”