#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(২৮)
ভোরের এক টুকরো নরম আলো চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল ওর। পাখিদের মিষ্টি সুর আর মোরগের ডাকে ঘুমানো অসম্ভব হয়ে ওঠেছে প্রায়। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। রাতে যে ঘুম হয়নি। লোকটার হাতের নিচে তার মাথা। তার নরম বুকে মুখটা গুঁজে বাচ্চাদের মতো ঘুমুচ্ছে। কি মিষ্টি মুখ! কি সিগ্ধ! ভোরের প্রথম সূচনায় এই মুখটি দেখাটা তার কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সে এই প্রথম বুঝি লোকটার প্রেমে পড়ল। গতকাল রাতে এক টুকরো যন্ত্রণার কথা ভুলে গিয়ে সে লোকটার প্রতি বিমোহিত হয়ে ওঠল। সে নড়চড়ে ওঠল। ধীরে ধীরে উঠতে চাইল। লোকটা তার নগ্ন কোমরটা চেপে ধরে রাখল। ঘুম ঘুম জড়ানো মায়া মায়া কণ্ঠে অস্পষ্টে বলল, “বিরক্ত করে না লক্ষ্মীটি। একটু ঘুমাই।”
কি আদুরে অনুরোধ! না মেনে থাকা যায়! লোকটার ঘুম ঘুম ভয়েজটা মারাত্মক সুন্দর। নেশা ধরে যায়। সে ফিসফিস করে নরম সুরে বলল, “সকাল হয়ে গেছে। এখন উঠতে হবে। নতুবা মানুষ খারাপ ভাববে।”
লোকটা এবার ফট করে দুচোখ খুলে ফেলল। ওর কোমর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বলল, “কে বলবে খারাপ? তুই কি পরকিয়া করছিস? তুই তোর হাসবেন্ডের সঙ্গে শুয়ে আছিস। সেখানে খারাপ বলার কি আছে?”
“গ্রামের মানুষজন সকাল আটটা পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে বউদের ঘুমানো ভালো চোখে দেখে না।”
“কিন্তু আমি দেখি। যতক্ষণ আমি ঘুমিয়ে থাকব, তুইও আমার সঙ্গে শুয়ে থাকবি। ইভেন ঘুম ভাঙলেও।”
“আর না ঘুমালে?”
“চুল টেনে ধরে শুইয়ে রাখব।”
পাখি হো হো করে হেসে দিল। নাওয়াফ ওর ঠোঁটের ওপর ছোট করে কামড় বসাল।
“বউ আরেকবার?”
পাখি তাড়াতাড়ি লাফিয়ে উঠল।
“নায়াহ...! মরে যাব।”
“বলদ বরের আদরে কেউ মরে না। আয়।” বলেই ওর হাত ধরে টানল।
পাখি চ্যাঁচিয়ে ওঠল, “ছেড়ে দেন নাওয়াফ ভাই। আর পারব না।”
নাওয়াফ এক জটকায় ওকে নিজের বুকের ওপর এনে ফেলল। পাখিকে পাশ ফিরিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে বেডশিট দিয়ে ঢেকে দিয়ে ওর গাল কামড়ে বলল, “ছেড়ে দিব মানে? ছেড়ে দেওয়ার জন্য তোকে বিয়ে করেছি? ধরে রাখব বলেই বিয়ে করেছি। এখন চুপচাপ বরের আদর সোহাগ উপভোগ কর। বেশি কথা বললে মুখে টেপ মারব।”
পাখি চুপ করে রইল। আর কথা বলল না। অতঃপর লোকটার সঙ্গে আরও একবার তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত কাটল।
_____
খুব ভোরের দিকে পাখির নানু এসেছে। বাটি ভর্তি তেলের পিঠা হাতে। খেতে দারুণ সুস্বাদু। নাওয়াফ তখন সবে উঠে কলপাড়ে ঢুকেছে গোসল করবে বলে। পাখি কল চাপিয়ে বালতি ভর্তি পানি রেখে গেছে তার জন্য। তখন জহুরা বেগম গেলেন ওজু করতে। নাওয়াফ উদম শরীরে ব্রাশ করছিল। জহুরা বেগমকে দেখে সালাম দিলো। জহুরা বেগম খুশিতে গদো গদো হয়ে এলো। নাতনি জামাই পেয়েছে একটা মনের মতো। নায়কের চেয়ে কোন অংশে কম না। সে তো যাকে সামনে পায়, তার সামনেই পানের ডালা নিয়ে প্রশংসায় নামে। সে সালামের উত্তর দিয়ে শুধালো, “কেমন আছো নাত জামাই?”
নাওয়াফ ঠোঁট ছড়িয়ে হাসে। দুষ্টুমি করে বলে,
“তোমায় ছাড়া ভালো নেই ডার্লিং।”
“হ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি। সারারাত বউয়ের সঙ্গে ইচিং বিচিং করে এখন আইছো পাম মারতে? জহুরা পামে পটে না।”
“ইচিং বিচিং করছি তুমি বুঝলা কেমনে?”
“পুরা পিঠে কিসের দাগ, হুঁ?”
পিঠের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক তাকিয়ে নাওয়াফ অধর ছড়িয়ে হেসে দেয়।
“বেশি বেশি ভালোবেসেছি তো তোমার নাতনিরে। তার ডোজ সামলাতে না পেরে এসব আকাম করছে খবিশটায়। আজই এরে একটা শিক্ষা দিতে হবে। হাতের নখগুলো সব একটা একটা করে কাটব।”
জহুরা বেগম লজ্জা পেয়ে গেলেন। তার মনে পড়ে গেলো যৌবনের কথা। তিনিও এমন করে তার স্বামীকে খামচাতো। সে আর নতুন করে কিছু বলল না। তবে যাওয়ার পথে একবার বলল, “নখগুলো কেটে দিও। নতুবা প্রতিরাতেই এই আদর তোমাকে সহ্য করতে হবে।”
নাওয়াফ হেসে ফেলে। বুড়ো হলে হবে কি? মনের রং এখনো কমেনি।
-----
মোল্লা বাড়ি থেকে তারা ফিরেছে সপ্তাহ একের হবে। গত তিন দিন আগে তারা বান্দরবন হানিমুন ট্যুরে গিয়েছিল। আজ আবার ফিরে এসেছে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হলো। নাওয়াফের বাইকটা তালুকদার বাড়ির সামনে এসে থামল। আজ বাড়ির গেট হাট করে খোলা। দারোয়ান গেটে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। ওই দৃশ্যটুকু দেখে নাওয়াফের মনে অজানা বিপদের সংকেত দিল। সে দ্রুত পাখিকে নামিয়ে দিয়ে বাইক ফেলে বাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছিল। আজ বাড়ির গার্ডেনে কোন লাইট জ্বালানো হয়নি। সবটা নিস্তব্ধ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাখি জমে আছে। সে এই অন্ধকারের মাঝে ছুটে যাওয়ার সাহস পেল না। দরজার সামনাসামনি আসতেই রক্তের স্রোত দেখল। তার শরীর দরদর করে কাঁপছে। ভেতরে কোন আলো নেই। তার মা-বাবা, দাদা সবাই ঠিকাছে তো? সে ঘরের ভিতরে পা রাখতেই যাচ্ছিল, তখনই মুঠোফোনটি বেজে ওঠল। নিখিল কল করেছে। নাওয়াফ কেটে দিল। কল ধরার মতো পরিস্থিতিতে সে নেই। কিন্তু নিখিলও থামবার নয়। অনবরত কল দিয়েই যাচ্ছে। নাওয়াফ জরুরি মনে করে ধরল। নিখিল ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তীব্র উত্তেজিত গলায় হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “নাওয়াফ কোথায় তুই?”
“কেন?”
“আরে বল না? দরকার আছে।”
“ঘরের বাহিরে।”
নিখিল বিস্ময় হলো।
“ফিরলি কখন?”
“মাত্রই, তুই একটু আসবি? এখানে কিছু ঠিক লাগছে না। ঘরের ভেতর থেকে রক্তের স্রোত বইছে। আমার মনে হয় ভিতরে ভয়ংকর কিছু ঘটেছে। আমি ঢুকতে সাহস পাচ্ছি না। তুই প্লিজ আয়।”
নিখিল জিভ দিয়ে ওষ্ঠজোড়া ভেজাল।
“ভাই একটা কথা বলি, তার আগে বল পাখি কই?”
“গেটের সামনে।”
“সেকি, ওকে ওখানে ফেলে এলি কেন? দ্রুত ওর কাছে যা নাওয়াফ। যা হারানোর হারিয়েছিস। এবার তোরা পালা নাওয়াফ।”
“হারিয়েছি মানে?” বিস্মিত সে।
“ঘরের ভেতরে যারা ছিল, তারা কেউ আর বেঁচে নেই। রমিজ গুরুতর আহত হয়ে হসপিটালে ভর্তি। বাঁচা মরার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তুই পালা নাওয়াফ। এসব এখন ভাববার সময় নয়।”
“আমি কাপুরুষ নই নিখিল। লড়াই করব, তবুও পালাব না।”
“নাওয়াফ এখন রাগ দেখানোর সময় নেই। তোর পুরু ফ্যামিলি ধ্বংস করে দিবে ওরা। অলরেডি দিয়েছোও। বেঁচে আছিস শুধু তুই।”
নাওয়াফ দেখল সে শ্বাস ফেলতে পারছে না। গলাটা কেউ যেন সজোরে চেপে ধরেছে। কিছুদিন আগেও কি সুন্দর মিষ্টি একটি পরিবার ছিল। ইভেন ট্যুরে যাওয়ার আগেও সকলে বেঁচে ছিল। আর আজ নাকি তারা কেউ নেই। বললেই হলো? তার মাথায় দপদপ করে আগুন জ্বলে ওঠল।
“কারা ওরা?”
“আমি জানি না। শুধু রমিজ জানে। ও সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কিচ্ছু জানা যাবে না। তার আগে তোর আর পাখির নিরাপদ একটা আশ্রয় দরকার।”
“আমি ঘরের ভিতরে যেতে চাই নিখিল। শেষ একবার ওনাদের মুখটা দেখতে চাই। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে।” বলতে বলতে নাওয়াফ দুফোঁটা চোখের জল ফেলল।
“তুই সহ্য করতে পারবি না। শোন ওরা আবারও আসছে। মাত্র দশটা গাড়ি ভর্তি একদল গেল। দ্রুত পাখিকে গেটের সামনে থেকে সরা নাওয়াফ। ওরা তোকে ধ্বংস করে দিবে। তোর জন্য নয়, পাখির কথা ভাব। সব হারিয়ে ওকে নিয়ে বাঁচতে পারবি। কিন্তু পাখিও হারিয়ে গেলে তুই কিভাবে বাঁচবি?”
“এর সঙ্গে কারা যুক্ত?”
“বড়ো রাজনৈতিক দলের কোন সদস্য হবে। তোকে কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমি ফোন করব। আপাতত আত্মগোপন কর।”
নাওয়াফ ফোন কাটল। ঘরের ভিতরে বাড়ানো পা দুটি আবার পিছু ঘুরিয়ে নিল। ছলছল নয়নে একবার নিজের মায়ের মুখটা মনে করল। কি সুন্দর মিষ্টি মুখ! মায়েরা বুঝি ওমন মিষ্টি হয়। গাড়ির তীব্র শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এইদিকেই এগিয়ে আসছে। তার স্মরণ হলো পাখি গেটের কাছে। সে দ্রুত ছুটতে লাগল। কোথায় যেন অন্ধকারের মধ্যে ফোনটা পড়ে গেছে। সে সেই দিকে আর গেল না। অন্ধকারে খুঁজবে কই? পাখিকে গিয়ে গেটের সামনে পাওয়া গেল। নাওয়াফ দ্রুত পাখির হাত ধরে টানল। পাখি আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করল, “কোথায় যাচ্ছি আমরা? আপনাকে এমন অগোছালো দেখাচ্ছে কেন?”
নাওয়াফ টের পেল চারপাশ দিয়ে বাইক এইদিকে এগিয়ে আসছে। তাই আর পাখির কথার জবাব দেওয়ার সময় পেল না। সে দ্রুত মোটা গাছটির আড়ালে পাখিকে নিয়ে লুকিয়ে পড়ল। যেহেতু অন্ধকার তাই দেখার কোন অপশন ছিল না। একে একে দশটা বাইক এসে থামল। প্রত্যেকের হাতে বড়ো বড়ো রামদা, চাপাতি, বুলেট ভর্তি রাইফেল। তারা ধা ধা করে বাড়ির ভেতরে ছুটে যাচ্ছে। নাওয়াফ বিড়বিড় করে বলল, “শু*য়ো*রের বাচ্চারা, বউ সাথে দেখে বেঁচে গেলি। নয়তো তোদের জাহান্নাম দেখিয়ে ছাড়তাম।”
ওরা বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই নাওয়াফ পাখিকে নিয়ে বাইকে উঠে গেল। বাইক স্ট্যার্ট দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বাইকের শব্দ পেয়ে লোকগুলো সব বাহিরে ছুটে এলো। একজন চ্যাঁচিয়ে ওঠল, “শালা ফিরেছে খবর পেয়ে মারতে চলে এলাম। আর শালা কিনা বউ নিয়ে ভেগেছে। তোর বউরে পাইলে কসম দশবার আমি রেপ করমু। আর তোরা দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া আমার চেহারা দেখতাছোস কেন? পিছু নে ওদের।”
“জি বস।”
একে একে দশটা বাইক নাওয়াফের পিছু নিল। রাতের নিস্তব্ধতা চিঁড়ে একটার পর একটা ইঞ্জিনের গর্জন কানে এসে বিঁধছে। নাওয়াফ বুঝতে পারছে ওরা শুধু ভয় দেখাতে আসেনি, আজ রক্ত ঝরানোর পরিকল্পনা করেই মাঠে নেমেছে। সে হঠাৎ করেই মেইন রাস্তা ছেড়ে বাইক ঢুকিয়ে দিল সরু, আঁকাবাঁকা এক গলিতে। কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে। কখনো অচেনা চিপাচুপা পথে পেঁচিয়ে যেতে লাগল। পেছনে ধাওয়া করা বাইকগুলোও নেকড়ের মতো লেগে আছে। পরপর গুলির শব্দ কেঁপে উঠছে চারপাশে।
ধুম করে একটা বুলেট এসে পাশের টিনের চালে লেগে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দিল। ভয়ে পাখির বুক কেঁপে উঠল। মনে হলো এই বুঝি হৃদপিণ্ডটা বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। সে আতঙ্কে নাওয়াফের কাঁধ শক্ত করে খামচে ধরল। নাওয়াফ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ভয় পাস না জান। আমি বেঁচে থাকতে তোর গায়ে একটা আঁচড়ও লাগতে দিব না। শুধু আমাকে শক্ত করে ধরে থাক। বাইক থেকে যেন পড়ে না যাস।
কথা শেষ করেই সে বাইকের সর্বশেষ গতি তুলে দিল। হেডলাইটের আলোয় অন্ধকার কেটে সামনে ছুটে যাচ্ছে। রাস্তা কোথায় শেষ, কোথায় শুরু? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। চারপাশে শুধু ঘন জঙ্গল আর নিশুতি রাতের বিভীষিকা।
নাওয়াফ নিজেও জানে না সে কোনদিকে যাচ্ছে।
শুধু একটা জিনিসই তার মাথায় ঘুরছে। যেভাবে হোক পাখিকে বাঁচাতেই হবে। পেছনের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। গুলির আওয়াজও থেমে গেল। তবুও নাওয়াফের সন্দেহ কাটল না। তার চোখে-মুখে সুতীব্র অস্থিরতা, সতর্কতার জমাট। এই নীরবতা স্বাভাবিক না, অস্বাভাবিক কিছুর ইঙ্গিত। হঠাৎই তার মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মতো একটা চিন্তা আঘাত করল। ওরা পিছু নেয়নি তো? ওরা সামনে গিয়ে রাস্তা আটকে অপেক্ষা করছে! বিষয়টা বুঝতে তার দুই মিনিট লেগে গেল। বুঝেই সে মুহূর্তের মধ্যে রাস্তা বদলে ফেলল। আবার শুরু হলো অন্ধকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছোটা। এভাবেই চলতে চলতে রাত প্রায় তিনটে ছুঁয়ে গেল। বাইকের ইঞ্জিন এবার কাঁপতে শুরু করেছে। তেলের শেষ বিন্দুটুকুও ফুরিয়ে আসছে। হঠাৎ করেই ঘড়ঘড় শব্দে বাইকটা থেমে গেল। চারপাশে ধোঁয়াটে অন্ধকার। হেডলাইটের ক্ষীণ আলোয় সামনে দেখা গেল গহীন এক অরণ্য। গাছগুলো এত ঘন যে, সেখানে ঢুকতেও ভয় লাগছে। এক মুহূর্তও দেরি করল না নাওয়াফ। সে পাখির হাত শক্ত করে ধরে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়ল। শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ তুলে ছোট ছোট গাছ পিষে এগিয়ে যাচ্ছে দু’জন। কোথায় যাচ্ছে, সামনে কী আছে? কিছুই জানা নেই।
শুধু ছুটছে। পেছনে মৃত্যুর নিশ্বাস।
কিছুক্ষণ পর একে একে পাঁচটা বাইক এসে থামল সেই নির্জন জায়গাটায়। হেডলাইটের আলো কুয়াশার মতো ধোঁয়ার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। চারপাশে নিস্তব্ধতা।
লোকগুলোর একজন বাইক থেকে নেমে চারপাশ দেখে দাঁত চেপে বলল, “এতটুকু সময়ের মধ্যে কোথায় গেল?”
আরেকজন অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল, “থাকলে এই জঙ্গলের ভেতরেই আছে। চল, খুঁজে বের করি।”
অপরজন তাল মিলিয়ে ভরাট কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ তাই হবে। এতটুকু সময়ের মধ্যে পালাতে তো পারে না।”
তৃতীয়জন বলল, “এত রাতে জঙ্গলে ঢোকা কি ঠিক হবে? কত ভয়ংকর জীবজন্তু আছে! সাপও।”
প্রথমজন বলল, “বস জানলে ভাই তোমারে দিয়া তবলা বাজাবে।”
কেউ আর কিছু বলল না।
সবাই একজোট হয়ে সিদ্ধান্ত নিল যেভাবেই হোক ওদের খুঁজে বের করতেই হবে। মুহূর্তেই একটার পর একটা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বলে উঠল। অন্ধকার জঙ্গলের বুক চিঁড়ে সাদা আলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। গাছের ডাল, শুকনো পাতা আর কুয়াশার ফাঁক গলে আলো এগিয়ে যাচ্ছে শিকারির চোখের মতো। নাওয়াফ দ্রুত পাখিকে নিয়ে একটা ঘন ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। দু’জন এতটাই কাছাকাছি যে একে অপরের হৃৎস্পন্দন পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছে। বাইরে ভারী বুটের শব্দ। লোকগুলো ধীরে ধীরে ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে। নাওয়াফ নিজের শ্বাস আটকে ফেলল।
তারপর হঠাৎ করেই পাখির নাক-মুখ শক্ত করে চেপে ধরল। যেন কোনোভাবেই শ্বাসের শব্দ বাইরে না যায়।
পাখি চমকে উঠল। সে হাত সরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু নাওয়াফের শক্ত মুঠোর সঙ্গে পেরে উঠল না। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতেই তার শরীর ছটফট করতে লাগল। চোখ দুটো আতঙ্কে বড়ো হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর বাতাসের জন্য হাহাকার করছে। অথচ নাওয়াফের সমস্ত মনোযোগ তখন বাইরের লোকগুলোর দিকে। একটু শব্দ হলেই মৃত্যু নিশ্চিত।
লোকগুলো ঝোঁপের একেবারে পাশ দিয়ে চলে গেল। ফ্ল্যাশলাইটের আলো একবার ঝোঁপের গায়ে পড়েই সরে গেল । কয়েক সেকেন্ড, অথচ মনে হচ্ছিল কয়েক যুগ। হঠাৎ করেই পাখির ছটফট থেমে গেল। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলো।
লোকগুলোর শব্দ দূরে মিলিয়ে যেতেই নাওয়াফ দ্রুত হাত সরিয়ে নিল। হাঁপাতে হাঁপাতে পাখির কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে ডাকল, “কলিজা, ঠিক আছিস তুই?”
কোনো সাড়া নেই। নীরব পাখি। জবাবহীন৷ নাওয়াফের বুক ধক করে উঠল। সে আবার ডেকে উঠল, “এই বউ, বউ কথা বলছিস না কেন? ঠিক আছিস?”
তবুও নীরবতা। জবাব নেই, সাড়া নেই। মুহূর্তের মধ্যে নাওয়াফের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। বরফে পরিণত হলো। সে তাড়াতাড়ি পাখির নাকের কাছে হাত নিল। ভয়ানক একটা আশঙ্কা মাথার ভেতর ঝড় তুলেছে। একসঙ্গে এত শক্ত করে নাক-মুখ চেপে ধরার কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটল না তো? কয়েক সেকেন্ড পর খুব ক্ষীণ উষ্ণ নিশ্বাস তার হাতে এসে লাগল। নাওয়াফ গভীর একটা শ্বাস ফেলল। মনে হলো বুকের ওপর চাপা পাহাড়টা সরে গেল।
“আলহামদুলিল্লাহ! বেঁচে আছে।”
এই একটা বাক্যই তাকে স্বস্তি দিল। মুক্ত একটি শ্বাস ফেলার শক্তি দিল।
পাখি শুধু জ্ঞান হারিয়েছে। সে ধীরে ধীরে পাখিকে নিজের বুকের সঙ্গে গভীর করে জড়িয়ে নিল। যেন পুরো পৃথিবীর সব ভয় থেকে আড়াল করে রাখবে তাকে। তারপর কপালে আলতো একটা চুমু খেয়ে কাঁপা গলায় বলল, “ঘুমা জান, আগামীকাল থেকে শুরু হবে আমাদের নতুন করে বেঁচে থাকার এক লড়াই। যে জীবনে সুখ কম থাকবে। বাঁধা আর যন্ত্রণা থাকবে বেশি। তবুও আমি আছি। যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, তোকে কোন কষ্ট, যন্ত্রণা ছুঁতে পারবে না।”
দূরে তখনো রাতের অরণ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। আর সেই গভীর অন্ধকারের ভেতর দুটো ক্লান্ত প্রাণ একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম