#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(২৯)
লম্বা লম্বা গাছগুলোর ফাঁক গলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে কয়েক মুঠো সোনালি রোদ এসে পড়ল পাখির মুখে। নরম আলোটা চোখে লাগতেই সে অস্বস্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। ললাটে ভাঁজ ফেলে ধীরে ধীরে চোখ দুটো মেলে তাকাতেই টের পেল সে নাওয়াফের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে ছিল। সে সামান্য নড়েচড়ে উঠতেই নাওয়াফও ঘুমের গভীরতা ভেঙে তৎক্ষণাৎ চোখ দুটো খুলে ফেলল। ঘুম জড়ানো সতর্ক দৃষ্টিতে এক পলক পাখির মুখের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে শুধাল, “উঠেছিস?”
মাথাটা নিঃশব্দে ঝাঁকাল সে।
“হ্যাঁ, আমরা এখন কোথায় আছি?”
নাওয়াফ আগে ধীরে ধীরে গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল। রাতভর একইভাবে বসে থাকার কারণে কাঁধটায় অসহ্য রকমের ব্যথা জমে আছে। নাড়ানো যাচ্ছে না। তার ওপর পাখি পুরো রাতটা যে তার কাঁধে মাথা রেখে শিশুদের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল। অথচ সেই ব্যথার মাঝেও নাওয়াফের মনে অদ্ভুত এক তৃপ্তি ছিল। ভালোলাগা ছিল, ভালোবাসা ছিল। এটাই কম কিসে? সে দু’হাত উপরে তুলে লম্বা একটা আলস্যভরা টান দিল। সকালের নরম বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল তার ক্লান্তি মুখটা। চারপাশে অচেনা নির্জনতা। কোথায় আছে? কোন পথে এসেছে? কিছুই মনে নেই। সেসব চিন্তা আপাতত বাদ দিয়ে নাওয়াফ মৃদু হেসে পাখির কথার জবাব দিল। নিচু স্বরে বলল, “কোথায় আছি সেটাই তো জানি না? ফোনটাও নেই সঙ্গে। ওয়ালেটটাও মনে হয় কোথাও পড়ে গেছে।”
শেষ কথাটা বলেই থেমে গেল সে। চোখের ভেতর হালকা অন্যমনস্কতা ভেসে উঠল তার। যেন জীবনে প্রথমবার সবকিছু হারিয়ে ফেলার অনুভূতি তাকে ছুঁয়ে গেল। হারিয়েছে তো নিজের পরিবারকে। সে নিঃশব্দে পাখির কাছে এগিয়ে এলো। দু’হাত তুলে আলতো করে ওর দু’গাল ছুঁল। স্পর্শটা খুব কোমল। আদুরে স্পর্শ। গভীর চোখে তাকিয়ে খুব আস্তে শুধাল ওকে, “দারিদ্র্য সহ্য করতে পারবি, পাখি?”
কথাটা শুনে সকালের বাতাসটাও যেন হঠাৎ থমকে গেল। তার কণ্ঠে কোনো অহংকার নেই। নেই অভিমানও। শুধু ছিল এক অদ্ভুত ভয়। আপনজন হারানোর ভয়। সব হারিয়ে ফেললেও মানুষটা কি তবুও তার হাত ধরে থাকবে?
পাখির চোখের দিকে তাকিয়েই সে আবার ম্লান হেসে বলল, “পকেটে মাত্র এক হাজার টাকা আছে। বাকিটা সব ওয়ালেটে ছিল। কার্ডগুলোও। আমি তো কখনো বেশি টাকা সঙ্গে রাখি না। সবসময় কার্ডই ব্যবহার করি। তাই এখন সত্যি বলতে আমার কাছে আর কিছুই নেই।”
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে তার ঠোঁটের কোণে হাসি থাকলেও চোখের গভীরে চাপা অনিশ্চয়তা ছিল। জীবনে প্রথমবার হয়তো নাওয়াফ বুঝল, টাকা, ক্ষমতা, পরিচয় সব হারিয়ে গেলে মানুষ আসলে কতটা অসহায় হয়ে পড়ে। আর সেই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল দারিদ্র্য নিয়ে নয়, তার ভয় ছিল এই অভাবের অন্ধকারে পাখিও যদি একদিন তার হাত ছেড়ে দেয়? তাকে ভুলে যায়?
পাখি লোকটার দুহাত তার হাতের তালুতে আনল। এরপরে দুহাতের তালুতে গভীর করে চুমু খেয়ে মিষ্টি করে হাসল সে।
“দুদিন না খেয়ে থাকতে হবে তো?”
“উঁহু, দরকার পড়লে রক্ত বিক্রি করে তোকে খাওয়াব। তবুও অনাহারে রাখব না। তুই শুধু আমাকে ছেড়ে যাস না বউ। তুই ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই।”
পাখি হঠাৎ থমকে গেল। ‘কেউ নেই!’ কথাটি দ্বারা লোকটা তার ভেতরে চাপা দেওয়া নীরব আর্তনাদের কথা বুঝিয়ে দিচ্ছে যেন। সে স্বাভাবিক করল নিজেকে। দুষ্টুমি করে বলল, “রক্ত বিক্রি করার দরকার নেই। রক্ত আমায় দিয়েন। আমি খাব।”
“পিশাচ কোথাকার!”
পাখি খিলখিল করে হাসতে লাগল। নাওয়াফ ওর হাত ধরে হাঁটতে লাগল। জঙ্গলের রাস্তা খুঁজছে সে। পেয়ে গেলে কোন মতো সড়কে উঠে একটা হোটেল খুঁজে সকালের নাস্তাটা সেড়ে নিবে। এরপরে একটা বাসা দেখবে। বাসাটা পেলেই সে একটা চাকরি খুঁজে নিবে। ছোটখাট যে কোন ধরণের কাজ। শুধু পেট আর বাসা ভাড়াটা চললেই হলো। যতদূর হাঁটছে, শুধু ঘন জঙ্গলই। কোন রাস্তা নেই। হাঁটতে হাঁটতে পাখির পা ব্যথা হয়ে এলো। সে দপ করে নিচে বসে পড়ল। নাওয়াফের হাত টেনে বলল, “শুনছেন আর হাঁটতে পারব না। পা ব্যথা করছে।”
“আমার পিঠে ওঠ।”
“কিহ!”
“জি।”
“আমায় নিয়ে আপনি হাঁটতে পারবেন?”
“কেন তুই কি ময়দার বস্তার চেয়েও ওজন বেশি?”
পাখির খানিকটা লজ্জা লাগল। সে আর কথা বাড়াল না। লোকটার পিঠে উঠে বসল। তারা হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের ভিতরে ছোট একটা কুঁড়ে ঘরের সামনে এসে থামল। বাঁশ দিয়ে উঁচু করে ঘরটি তোলা। পাশেই আরেকটি ঘর। তবে পুরনো না। নতুনই। নাওয়াফ পাখিকে পাশে নামিয়ে দিল। যদিও তার ভীষণ আত্মসম্মানে লাগছিল কারও কাছে সাহায্য চাইতে। তবুও এছাড়া আর বিকল্প কোন রাস্তা নেই। সে দরজার কড়া নাড়ল। দরজা খুলে দিল একজন বৃদ্ধা এসে। বয়সের ভারে শরীর অনেকটা নুয়ে এসেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে। গুঁজো দিয়ে হাঁটে। তাকে দেখে জিগ্যেস করল, “তুমি ক্যাডা? কারে চাও?”
নাওয়াফ নিজের আসল পরিচয় গোপন করে বলল, “আমি নাকিব। এখানে কি একটু পানি পাওয়া যাবে? আমার স্ত্রীর বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে।”
বৃদ্ধা বুড়ি গলা উঁচু করে এক পলক পাখিকে দেখল। এরপরে বলল, “দাঁড়াও, আনতেছি।”
পাখি নাওয়াফের পাশে গিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়াল। ফিসফিস করে সে নাওয়াফের কানে কানে বলল, “আপনি ওনাকে মিথ্যে বললেন কেন?”
“শোন, পাখি পরিস্থিতি যা, সে হিসেবে পরিচয় গোপনই রাখতে হবে বুঝেছিস? নতুবা ধরা পড়ার চান্স আছে।”
পাখি আর কোন শব্দ উচ্চারন করল না। ওইদিকে বুড়িও পানি নিয়ে এলো। স্টিলের একটি গ্লাসে করে পানি এগিয়ে দিল । পাখি তৃপ্তি নিয়ে পান করল। নাওয়াফ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলল, “ধন্যবাদ আপনাকে দাদু। এখন আসি।”
পেছন থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল বৃদ্ধা।
“তোমরা যাইবা কই?”
পিছু ঘুরে নাওয়াফ উত্তর দিল,
“যাওয়ার কোন রাস্তা নেই। আপাতত জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরছি।”
“পোশাক আশাক দেখে তো ভালো বংশেরই মনে হয়। বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছো?”
পাখি না বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই নাওয়াফ ফট করে বলে ফেলল, “হ্যাঁ, বাবা মা মেনে নিচ্ছে না। এইদিকে আমরা দুজন দুজনকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। লুকিয়েও থাকতে পারছি না। ধরার জন্য লোক পাঠিয়েছে। তাই রাতের আঁধারে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ি। এখন একটা আশ্রয়ের জন্য ঘর খুঁজছি। চাকরিও একটা যোগাড় করতে হবে।”
“ঘর খুঁজছ? থাকবে ঘরে?”
“হ্যাঁ, আপনার জানা শোনা কোন ঘর আছে, যা ভাড়া দেওয়া হয়?”
“আছে তো। আমার নিজেরই ঘর। ও-ই যে তোমাগো সামনে। বেশি না, ১২০০ টাকা দিলেই হবে।”
“এইটা বেশি হয়ে গেল না? এখানে তো আরও কম ভাড়া হওয়ার কথা।”
“ভাই এই দামে বাসা পাইছো এইটাই বেশি।”
“আপনিও তো এই জঙ্গলের মধ্যে ভাড়াটিয়া পেয়েছেন এটাও কম কিসে?”
বৃদ্ধা এবার দাঁত ছাড়া মুখটাতে কুট কুট করে হেসে দিল।
“বেশ চতুর তুমি। আচ্ছা যাও হাজার টাকা দিলেই হবে।”
নাওয়াফ শেষমেশ রাজি হলো। বৃদ্ধা তাদের ছোট্ট ঘরটা দেখিয়ে দিল। বাঁশ আর টিনে তৈরি উঁচু করে তোলা ঘর। একদম পাহাড়িদের বাড়ির মতো। ওপরে উঠতে ছোট্ট একটা সিঁড়ি। ঘরের ভেতর তেমন কিছু নেই। শুধু একটা টেবিল, ছোট্ট চৌকি, দুটো মোড়া আর আধভাঙা একটা ভাতের আলমারি। পাশে ছোট্ট বারান্দা। তবে ঘরটায় অদ্ভুত এক শান্তি আছে। চারপাশের অতিরিক্ত জানলাগুলো দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে পুরো ঘরটাকে শীতল করে রেখেছে।
নাওয়াফ চারপাশে তাকিয়ে মৃদু নিঃশ্বাস ফেলল। হাজার টাকায় এর চেয়ে ভালো থাকার জায়গা হয়তো সত্যিই পাওয়া সম্ভব নয়। ঘর দেখিয়ে বৃদ্ধা এক প্লেট খৈ আর মিঠাই দিয়ে গেল তাদের। পাখি হাত-মুখ ধুতে চলে গেল। আর নাওয়াফ নিঃশব্দে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। দূরের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর চাপা অস্থিরতা জমতে লাগল।
ওয়ালেটটা সঙ্গে থাকলে হয়তো এক বছরও কোনো চিন্তা করতে হতো না। কিন্তু এখন? বাসা মিলেছে ঠিকই, কিন্তু সংসার চলবে কী দিয়ে? নাওয়াফ ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। সে মনে মনে নিজেকেই শক্ত করল। না, এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। তাকে কাজ খুঁজতেই হবে। ছোট হোক, তবুও একটা চাকরি। কারণ সে কোনোভাবেই চায় না পাখি অভাবের কষ্টটা টের পাক। দারিদ্র্যতা বুঝুক। পৃথিবীর সবটুকু সুখ দিয়ে সে পাখিকে সুখী রাখতে চায়।
“আপনি এখানে কি করছেন?”
রিনরিনে নারী কণ্ঠে সে পিছু ঘুরল। পাখিকে দেখে ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে শুধাল, “এখানে থাকতে তোর কোন অসুবিধা আছে?”
পাখি দুদিকে নিঃশব্দে মাথাটা ঘোরাল।
“উঁহু না, আমার তো বেশ ভালোই লাগছে। কিন্তু একটা কথা বলুন তো, আমরা হঠাৎ পালিয়ে জঙ্গলে এলাম কেন? আপনাকেই লোকগুলো তাড়া করল কেন? কারা ওরা?
“তারা হবে হয়ত আমার কোন গোপন শত্রু অথবা দাদার কোন পুরনো শত্রু। রাজনীতির খেলা বুঝবিনারে বউ। প্রয়োজনে এরা নিজের বউ বাচ্চাদের খুন করে নাটকও সাজাতে পারে।”
পাখি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটা কিছু একটা এড়িয়ে গেল।
পরদিন খুব ভোরেই নাওয়াফ বেরিয়ে পড়ল কাজের খোঁজে। বৃদ্ধা যে সরু পথটা দেখিয়ে দিয়েছিল, সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে একটা ছোট বাজারে এসে পৌঁছাল। জায়গাটা ভীষণ ব্যস্ত। নারী-পুরুষ সবাই জীবিকার তাগিদে ছুটে চলেছে। নাওয়াফ নিঃশব্দে মুখটা রুমাল দিয়ে ঢেকে নিল। যাতে কেউ চিনতে না পারে। তারপর একটা অটোর গ্যারেজে ঢুকে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলল অটো ভাড়ার বিষয়ে।
প্রথমে লোকটা একটু অবাক হলেও শেষমেশ রাজি হয়ে গেল। নাওয়াফ সেদিনই অটো নিয়ে রাস্তায় নামল। নতুন চালক দেখে শুরুতে কেউ উঠতে চাইছিল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ধীরে ধীরে দু-একজন যাত্রী মিলল।
অন্যদিকে পাখি সারাদিন না খেয়ে ঘরে বসে রইল। বৃদ্ধা গিয়েছে তার মেয়ে বাড়ি। যাওয়ার আগে বলেছিল, মেয়ের বাড়ি যাচ্ছে৷ ফিরতে মাস তিনেক লাগবে। তারও একা ভাল লাগছিল না। ছোট্ট ঘরটায় একা বসে থাকতে থাকতে ক্ষুধায় তার পেট জ্বলে উঠছিল। দুর্বল শরীরটা আর নড়তেও চাইছিল না।
সন্ধ্যার একটু আগে নাওয়াফ ফিরল। বাইরে তখন টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। দু’হাত ভর্তি বাজার তার। চাল, ডাল, তেল, মরিচ, হলুদ, আলু, ডিম। সংসার চালাতে যা লাগে, সবই এনেছে। সারাদিন অটো চালিয়ে যা পেয়েছে, অর্ধেক গ্যারেজের ম্যানেজারকে দিতে হয়েছে। বাকি টাকায় এগুলো কিনেছে। ফেরার পথে পাখির জন্য দুটো ডাবও এনেছে। প্রথমে ফুচকা নিতে চেয়েছিল, ভেবেছিল মেয়েটা খুশি হবে। পরে মনে হলো, সারাদিন না খেয়ে থাকা মানুষটাকে আগে পেট ভরে কিছু খাওয়ানো দরকার। ফুসকা খেলে আবার গ্যাস্টিক হবে। তাই আনেনি। ঘরে ঢুকতেই সে দেখল পাখি ঘুমিয়ে আছে। গাল দুটো ভেজা। মুহূর্তেই নাওয়াফের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠল। কেঁদেছে কি মেয়েটা? তার ভীষণ মায়া লাগল। নিশ্চয়ই খুব ক্ষুধা পেয়েছিল। ইশ, কাজের ফাঁকে যদি সে কিছু একটা ওকে দিয়ে যেতে পারত! সে তাড়াতাড়ি চাল-ডাল ধুয়ে চুলায় বসাল। তারপর ধীরে ধীরে পাখির পাশে এসে বসল। আলতো করে মাথায় হাত রেখে খুব নরম স্বরে ডাকল ওকে, “পাখি, এই পাখি।”
পাখি পিটপিট করে চাইল। নাওয়াফ সামান্য হাসতে চেষ্টা করল।
“খাবি না? ওঠ।”
পাখি উঠতে যাচ্ছিল, শরীরে শক্তি না থাকায় ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল। নাওয়াফ ওকে দ্রুত ধরে ফেলল। ওকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে ধরে কানে ছোট করে একটা চুমু খেল।
“সরি বউ।”
পাখি দুর্বল শরীরে জানতে চাইল,
“সরি কেন?”
নাওয়াফ আগে ওর পেছনে একটি বালিশ দিয়ে বালিশের সঙ্গে ওকে হেলিয়ে দিল। তৎপর বলল, “এই যে সারাদিন তোকে কিছুই খাওয়াতে পারলাম না।”
“কে বলেছে আমি কিছু খাইনি? খেয়েছি তো।”
নাওয়াফ অবাক হয়ে জিগ্যেস করল,
“কি খেয়েছিস?”
“গতকালের খৈ আর মিঠাই।”
“তাতে কি পেট ভরে?”
“উঁহু মন ভরে।”
“মিথ্যে বলছিস কেন? মুখটা শুকনো দেখাচ্ছে তোর।”
“আপনারও তো।”
কথা সত্য। সারাদিনে পানি ছাড়া তার পেটেও কিছু পড়েনি। সে কথা পাল্টাতে চাইল।
“তোর জন্য ডাব এনেছি। চল ডাব খাবি। তাহলে দেখবি শরীরের অর্ধেক দুর্বলতা কেটে গেছে।”
“আপনি খাবেন না?”
“আমার চেয়ে তোর প্রয়োজন বেশি।”
“উঁহু না, আপনার প্রয়োজন বেশি। কারণ সারাদিন আপনি অনেক পরিশ্রম করেন।”
“আচ্ছা দুজনেরই।”
পাখি হেসে দিল।
“ঠিকাছে।”
দুজনে ভাগাভাগি করে ডাব খেল। নাওয়াফ ওকে খাটের ওপর বসিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে চুপচাপ বসে থাকবি। আমি রান্না করছি। ভাত হলে খাইয়ে দিব।”
পাখি পা দুটো নাচিয়ে বিরোধিতা করে বলল, “না, আমি রান্না করব।”
নাওয়াফ ধমক দিয়ে ওঠল ওকে।
“বলেছি না আমি করব?”
পাখি ওই ধমকে দমল না। উল্টো ভেংচি কেটে বলল, “না আমি।”
নাওয়াফ এবার নরম করে বোঝায় ওকে।
“আহা পাগলামি করে না বউ। রান্না করতে গেলে তোর কচি কচি আঙুলগুলো পুড়ে যাবে।”
“কচি শরীরে লাল করে লাভ বাইট দিতে পারেন, আর পুড়ে যাওয়াটাকে ভয় পাচ্ছেন?”
ওর কথা শুনে নাওয়াফ ঠোঁট টিপে হাসল।
“সেটা তো ভালোবেসে দেই। এখন বস। বেশি পাকনামি করবি না। চড় দিয়ে তাহলে সব কয়টা দাঁত ফেলে দিব। আমি আলু কাটব। তুই বসে থাকবি। আলু দিয়ে ডিম রান্না করা শেষ হলে ভাত খাস।”
পাখি আর কিছু বলল না। সেধে সেধে মার খায় কে?
নাওয়াফ বসল আলু কাটতে। পাখি চুপচাপ বসে বসে আলু কাটা দেখতে লাগল। হঠাৎ নাওয়াফ অন্যমনষ্ক হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল তার বাবা-মায়ের রক্তাক্ত দেহগুলোর কথা। শেষ দেখাটাও একবার হলো না। সে বুঝি একমাত্র দুর্ভাগা সন্তান, যার কপালে বাবা মায়ের কবরে এক মুঠো মাটি দেওয়ার ভাগ্যটুকু পর্যন্ত হল না। হাতে মোবাইলও নেই। কারো নাম্বার মুখস্থও নেই যে, সে ফোন করে খোঁজ খবর জানবে। হঠাৎ ক্যাচ করে তার বুড়ো আঙুলটা বটিতে কেটে গেল। সেখান দিয়ে বেরিয়ে এলো রক্তের ফিনকি। হাত গড়িয়ে রক্ত পড়ছে। লোকটা রোবটের মতো রক্তের দিকে তাকিয়ে আছে। ব্যথায় একটু আহ্ উহ্ শব্দ করেও ওঠল না। পাখি দ্রুত ছুটে গেল। লোকটার বুড়ো আঙুলটা সে তার নিজের মুখে ভরে নিল। নাওয়াফ স্তব্ধ হয়ে গেল।
“আরে করছিস কি? রক্ত মাখা হাত মুখে ভরেছিস কেন? ময়লা আছে তো হাতে।”
“থাকুক। মেয়েদের কাজ পারবে না, তবুও মাতব্বরি করে গেছে কাজ করতে। এখন চুপ থাকুন। নতুবা মেরে নাক ফাটিয়ে দিবে।”
“তুই আমার সঙ্গে পারবি?”
“যখন পারব, তখন মারব।”
“ভাগ্য করে একটা বউ পেয়েছি? যে মেরে নাক ফাটাতে চাইছে।”
“আপনার মন থাকে কই?”
“বউয়ের কাছে।”
“বউ থাকে কই?”
“আমার বুকে।”
“ফাজলামো বন্ধু করুন। একটু সতর্ক হয়ে চলবেন না?”
“আরে বউ আমার কিছু হয়নি।”
পাখি চোখ দুটো রাঙিয়ে ধমকে ওঠল, “চুপ থাকতে বলেছি না? বলেছি বার বার আমি আলু কাটি। না ওনি মহান সাজতে গিয়ে হাত কেটে বসে আছে।”
নাওয়াফ চুপচাপ ওর শাসন করা, ধমক দেওয়াগুলো উপভোগ করতে লাগল। মানুষ ঠিকই বলে বাবা-মায়ের পরে যদি কেউ ভালোবেসে থাকে সে হলো একমাত্র ঘরের স্ত্রী। সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে সে একজন ভাগ্যবান। এমন একজন স্ত্রী পেয়েছে, যে স্বামীর আঘাতে নিজে কষ্ট পায়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তো এমনই হওয়া উচিত। নাওয়াফকে নিজের দিকে ওমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে পাখি নাওয়াফের আঙুল বেঁধে দিতে দিতে শুধাল, “ওমন করে তাকিয়ে দেখছেন কি? ধমক দিয়েছি বলে রাগ দেখাচ্ছেন?”
“উহুঁ, বউয়ের আদুরে ধমকে আমি রাগ করি না। আমি আমার বউয়ের ভালোবাসা দেখছি। একটু আঘাতে সে আমার জন্য কতটা উত্তেজিত হয়ে পড়ল তাই দেখছি। এভাবে তুই সারাজীবন আমার আঘাতের মলম হয়ে থাকিস। আমাকে একটু ভালোবাসিস। আমার আর কিছু চাই না। বাসবি তো ভালো আমায় বউ?”
পাখি চুপ করে রইল। নাওয়াফও অপেক্ষায় রইল ওর অস্বীকারোক্তি শোনার। অবশেষে পাখি জবান খুলে বলল, “বাসব।”
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম