#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(৩০)
ভাত তরকারি রান্না মোটামুটি কমপ্লিট হলো। নাওয়াফ গরম গরম ভাত আর ডিম নিয়ে প্লেটে করে বসেছে। সঙ্গে এক টুকরো লেবু আর নাগা মরিচ ছিল। মরিচটা এনেছে পাখির পছন্দের মতো। নাগা মরিচ ওর ভীষণ পছন্দের। সে চৌকির ওপর বসে প্লেট নিয়ে ভাতের সঙ্গে আলু আর ডিম মাখিয়ে পাখির মুখে এক লোকমা তুলে দিল। পাখি বিনাবাক্যে মুখে নিয়ে চিবাতে লাগল। নাওয়াফ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল ওর দিকে, “খেতে কেমন?”
যদিও একটু লবন কম হয়েছিল, তবে খেতে দারুণ। পাখি মুচকি মুচকি হেসে বলল, “দারুণ রেঁধেছেন স্বামীজান। ভীষণ মজা হয়েছে।”
নাওয়াফ লেবুর রস চিপরে ভাতের ওপর দিতে দিতে বলল, “চাপা মারছিস কেন?”
পাখি গাল ভর্তি ভাত নিয়ে অবাক চোখে তাকাল।
“কিসব বলছেন? চাপা মারব কেন?”
নাওয়াফ ললাট কুঁচকে শুধাল,
“সত্যই মজার ছিল?”
পাখি ইতিবাচকে মাথা ঝাঁকাল।
“হ্যাঁ।”
“বহু বছর পর রেঁধেছি বউ। আচ্ছা পুরোটা শেষ কর।”
পাখি মাথা ঝাঁকাল। পাখির খাওয়া শেষ হলে নাওয়াফ নিজে খেল। এরপরে প্লেট ধুয়ে এনে রেখে দিয়ে ওকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। সেই ঘুমে রাত মোটামুটি গভীর হলো। মধ্যরাত্রের দিকে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল তার। সে ঘেমে গেল। ঝটপট পাখির পাশ থেকে উঠে গেল। গিয়ে বারান্দায় শাঁ শাঁ বাতাসের মধ্যে দাঁড়াল। বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। গাছপালাগুলো প্রবল গতিতে বাতাসে দুলছে। কচি কচি ডালগুলো মটমট করে ভেঙে পড়ছে। সেই সঙ্গে ঝড় বইছে তার মনেও। কি নৃশংস বর্বর ছিল সেই দুঃস্বপ্নটা! সে দ্বিতীয়বার মনে করতে চাইছে না। অস্তিরতা একটু কমলে আবার গিয়ে পাখির পাশে শুয়ে পড়ল। পরদিন ভোরের দিকেও বৃষ্টি থামল না। সে অনেকক্ষণ প্রায় অপেক্ষা করল। বৃষ্টি থামলে কাজের উদ্দেশ্যে বের হবে। কিন্তু আল্লাহ দিলে এই বৃষ্টি থামার নয়। সকালে ভাত আর ডাল রান্না করেছে সে। আলু ভর্তা, কাচকলা ভর্তা করে পাখির জন্য রেখে দিয়ে সে বৃষ্টিতে ভিজেই রওয়ানা হলো। ঝড় হোক বৃষ্টি হোক, তাকে তো থেমে থাকলে চলবে না। সংসার চালানোর জন্য অর্থকুড়ি যোগাড় করতে হবে। ভাবল, আজ সন্ধ্যায় বড়ো দেখে একটা মাছ কিনবে। রাতে বেশ মজা করে মশলা বেশি করে দিয়ে রান্না করে সেটাই পাখিকে খেতে দিবে। মেয়েটা আবার ঝাল ঝাল তরকারি খেতে ভীষণ পছন্দ করে। সেসব কল্পনা করতে করতে সে হাঁটা ধরল। গ্যারেজ থেকে অটো নামিয়ে কাপড় চেঞ্জ করে যাত্রীর জন্য সে রাস্তায় অপেক্ষা করতে লাগল। যদিও একটা খেপ পায় সে একটা মাছ কিনে নিবে। ছোট মাছ হলেও চলবে। কিন্তু অনেকক্ষণ বসে থাকার পরও যখন কোন যাত্রী পেল না, চর্তুর দিকে বৃষ্টিতে মুমূর্ষু দশা, তখন তার নিজের মুখটা ঘনো কালো হয়ে এলো। তবে কি আজ সে কোন যাত্রী পাবে না? তার অন্ধকার মুখটা দূর করে দিয়ে সেখানে ভিড় করল আলোর ফোঁটা। কারণ যাত্রী সে পেয়ে গেছে। একজন ভদ্র মহিলা এসেছে। দেখতে বেশ স্মার্ট। ৫০০ টাকা দিয়ে বলল, ‘অমুক জায়গায় যেতে হবে।’
বেশ লম্বা পথ হলেও অগ্রিম টাকা পেয়ে সে রাজি হয়ে গেল। ভদ্রমহিলাকে উঠিয়ে সে নির্দিষ্ট জায়গায় অটো নিয়ে এগিয়ে চলল। মহিলার বাসার সামনে মহিলাটিকে নামিয়ে দিয়ে নাওয়াফ বেরিয়ে যাচ্ছিল। পিছু থেকে মহিলাটি তাকে ডাকল,
“এই যে ভাই শোনেন, আমার এই লাগেজটা কি একটু বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিবেন? আমি টাকা দিব আপনি চাইলে।”
নাওয়াফের একটু বিরক্ত লাগল। মুখে সে কিছু বলল না। মুখটা বিকৃত করে চুপচাপ নীরবে মাথা ঝাঁকাল।
মনে মনে ভাবল, ‘হায়রে নাওয়াফ, কি ছিলি? কি হয়ে গেলি? শেষ পর্যন্ত তোকে আরেকজনের লাগেজ টানতে হচ্ছে? অথচ একটা সময় ছিল, যখন তোর লাগেজই ড্রাইভাররা টানত।’
সে ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে। কঠিন বাস্তবতা শিখে গেছে। সবকিছু থেকে অভিজ্ঞতা নিচ্ছে। আগে যেসব সিনেমায় দেখতো, এখন সেসব বাস্তবে ঘটছে। পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, বাস্তবের গল্পটা থাকে অগোছালো। আর সিনেমারটা গোছালো। সে লাগেজ মাথায় করে নিয়ে ভদ্রমহিলার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিল। ভদ্রমহিলা তাকে বলল, “একটু বসুন। চা খেয়ে যান ভাই।”
নাওয়াফ মুখের ওপর না বলে দিল।
“দুঃখিত। আমায় ক্ষমা করবেন। আমার স্ত্রী আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
ভদ্রমহিলা সামান্য ললাট কুঁচকে ফেলল। বিস্মিত নয়নজোড়া নিয়ে বলল, “আপনি বিবাহিত?”
“জি।”
“দেখে তো বোঝা যাচ্ছে না।”
নাওয়াফ কথা বাড়াতে চাইল না। সে যাওয়ার জন্য তাড়া দিল।
“আসছি।”
“দাঁড়াও, চা খেয়ে চলে যেও।” বলেই ভদ্রমহিলা নাওয়াফকে আর কথা বলার কোন সুযোগ না দিয়ে বেরিয়ে গেল।
নাওয়াফ রাগে কপাল চেপে ধরল। এ কোথায় এসে ফেঁসে গেল সে। নেহাৎ ভদ্রতার মুখোশ পরে আছে বলে কিছু বলতেও পারছে না। নতুবা চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিতো।
কিছুক্ষণ পর চা হাতে ফেরত এলো মহিলাটি। নাওয়াফের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, “তুমি খাও, আমি আসতেছি।”
এই ফাঁকে নাওয়াফ নাকে মুখে কোন রকম চা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছিল। তার আগেই তার মাথাটা ঘুরে এলো। চোখ দুটোতে ঝাপসা ঝাপসা দেখছে। সে হাঁটতে পারছে না। ঘুরিয়ে পড়ে গেল। হঠাৎ টের পেল পায়েলের ধ্বনি। সে চোখটা পেছনের দিকটাতে ঘোরাল। দেখল, একটি নারী দেহ ধীরে ধীরে তার এদিকে এগিয়ে আসছে। বুকের ওপর কোন কাপড় নেই। সবটা উলঙ্গ, নগ্ন। শরীরের প্রতিটি ভাঁজ প্রকাশিত। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় তড়াক করে তাকে সতর্ক বার্তা দিল, এজন্যই এই মহিলা তাকে এত আদর করে ফ্ল্যাটে ঢুকিয়েছে। চায়ের মধ্যেও এমন কিছু দিয়েছে, যার জন্য তার মাথা ঘুরাচ্ছে। চোখে ক্লিয়ার দেখা যাচ্ছে না। নেশা নেশা লাগছে। ভদ্রমহিলা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে বসল। তার চওড়া বুকটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটটা অশ্লীল ভঙ্গিতে বাঁকাল। নাওয়াফ চোখ দুটো অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে মনে মনে দুটো গালি ছুঁড়ল, “শালি বে*শ্যা।”
মহিলা ওর মুখটার দিকে তাকিয়ে বিকৃত হাসে।
“কি অবস্থা? নিচে পড়ে আছো কেন? উঠো উঠো। নিচে পড়ে থাকলে চলবে? তোমার অনেক কাজ। আজ থেকে তুমি হবে আমার বেড পার্টনার। মজা তুমিও নিবা, আমিও নিব। বিনিময়ে তোমার সংসার চালানোর যাবতীয় খরচ আমি দিব।”
রাগে মাথায় দপদপ করে আগুন জ্বলে ওঠল তার। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো বিকৃত কিছু ভাষা।
“বে*শ্যা, রান দুইটা ধইরা ছিইল্লা ফেলমু তোরে। শা*উ*য়া মাগি, এতোই শরীরে জ্বালা থাকলে পতিতালয়ে যা। সেখানে হাজার পুরুষ আছে তোর শা*উ*য়া*র কু*ড়*কু*ড়া*নি কমানোর জন্য। আমার কাছে এসেছিস কেন? শা*উ*য়া পিটানি খাইতে? শালি ন*টি।”
নাওয়াফের কথা শুনে হাসল মহিলাটি। রাগ করল না। বলল,
“রাগ করো না যুবক। যুবকদের তেজ মুখে মানায় না। বিছানাই তাদের তেজ বাহাদুরিটা সুন্দর।”
মহিলাটির কথার সঙ্গে অঙ্গভঙ্গগুলোও ছিল বিশ্রী। যা দেখে নাওয়াফ আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না। কোন মতো উঠে মহিলাটির গাল বরাবর তার শক্ত পাঁচ আঙুলের চড়টা বসিয়ে দিল। তাতে সে থামেনি। রাগ এতই মাথায় উঠে গেছে যে, মহিলার পেট বরাবর বেশ কয়েকটি লাথি বসিয়ে ছাড়ল। মহিলাটি লাথির আঘাতে মুখ থুপড়ে দপ করে নিচে পড়ল। সেই সঙ্গে চিৎকার করে ওঠল। তাতেও নাওয়াফের রাগ কমেনি। রান্নাঘর থেকে মরিচের কৌটা এনে মহিলাটির পুরো গায়ের ওপর ঠেলে দিল। মরিচের যন্ত্রণা মহিলাটা চিৎকার করে ছটফট করে ওঠল। নাওয়াফ ৫০০ টাকার নোটটি মহিলার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারল।
“তোর মতো একজন বে*শ্যার টাকা হজম করা নাওয়াফ তালুকদারের জন্য পাপ। অর্থের লোভে এ কাজে আসিনি শা*লি। কেবল পরিস্থিতির স্বীকার। এজন্য এসেছি। আর তুই টাকার গরম দেখাস আমারে? মনডায় চায় তোরে টুকরা টুকরা করে কুমির দিয়ে খাওয়াই।”
মহিলাটি বুঝল, এইলোক কোন সাধারণ কেউ নয়। হয়ত ছদ্মবেশে আছে। নতুবা এমন দাপট, ক্ষমতা কোন সাধারণ ড্রইভাররা দেখাতে পারে না। সে ভয় পেয়ে কাতরাতে কাতরাতে হাত জোর করে বলল, “ভাই মাফ করে দেন। আর কোনদিন এমন কাজ করব না।”
“তোর মতো ন*টি*রে মাফ করব কে? শালি তুই আমার সামনে নেক্সট টাইম পড়লে জিন্দা তোর শরীর থেকে চামড়া তুলে নিব।” কথাটা বলেই সে বেরিয়ে গেল। অটো নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ল। মাথাটা এখনো ঝিম ঝিম করছে। দুচোখে তার জলে টলটল করছে। পরিস্থিতির কাছে আজ সে কতটা অসহায়। এতটা অসহায় আগে কখনো হয়ে পড়েনি। আজ আর অটো চালানোর মনযোগ পায়নি। সেই শক্তিও নেই। ফিরে এসেছে। এসে দেখল পাখি মাছ রান্না করছে। নাওয়াফ তো অবাক।
“মাছ পেলি কই?”
পাখি ভেংচি কেটে বলল, “আমি ধরেছি।”
“ধরেছিস?”
“হ্যাঁ।”
“কোথা থেকে?”
“এখানে একটা জলাভূমি আছে। মেঘে যখন ডাকছিল, কৈ মাছগুলো উঠে উঠে লাফাচ্ছিল। আমাকে বিনা পয়সায় তাদের নাচ দেখাচ্ছিল। আমিও তখন সুযোগ বুঝে ওদের ধরে ফেলেছি।”
পাখির কথা শুনে নাওয়াফ হেসে দিল। পাখি তরকারিতে জিরা দিতে মনযোগ দিল। নাওয়াফ ছলছল নয়নে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিল। হালাল জিনিসে বুঝি সৃষ্টিকর্তা এমনই বরকত দেয়। তবে সে উপরে উপরে পাখিকে একটু বকল। বলল, “একা একা জলাভূমিতে যাওয়ার কোন দরকার ছিল? জঙ্গলে কত পিশাচ লোকেরা থাকে! তারা যদি আমার কুমারি বউয়ের দিকে কুনজর দেয়, তখন? এমনিতে দু দুবার পালিয়ে যাওয়া বউ আমার। কত কষ্টে আপসে এনেছি!”
পাখি ঠোঁট চেপে একটু হাসল। সত্যি বলতে এমনই একটা ঘটনা আসার সময়ে তার সঙ্গে ঘটেছে। সে তখন মাছ ঘরে রেখে গোসল করে ফিরে আসছিল, পথে তখন একজন মোটা করে স্বাস্থ্যবান লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। গায়ের রং শ্যামলা। তাকে দেখে বিশ্রী চোখে তাকিয়েছে। তার নাম জিগ্যেস করেছে। সে কোথায় যাকে? তার স্বামীর নাম কি সব? সে কোন রকম জবাব দিয়ে পাশ কাটিয়ে এসেছে। যদিও ব্যাপারটা নাওয়াফ জানে না। জানলে আর তাকে ঘর থেকে বেরও হতে দিবে না। এজন্য ভয়ে সে বললও না। এড়িয়ে গেল। নাওয়াফ ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে শুধাল, “কিরে ভাবছিস কি? মনে হয় আমার কথা শুনে স্ট্যাচু হয়ে গেছিস? সত্যি করে বল তো কাহিনি কি?”
পাখি থতমত খেয়ে বসল। সে তোতলিয়ে ওঠল।
“না না, কি..কিছু না।”
“কিছু তো একটা হয়েছে। নতুবা তুই তোতলাস কেন?”
“বিশ্বাস করুন কিছুই নয়। শুধু আপনার কথা মনে পড়ছিল। এই বৃষ্টির ভেতরে বেরিয়ে গেলেন। পথে কোন বিপদ হলো না তো।”
বলিষ্ঠ লোকটা সুচালো চোখ দুটো নিয়ে কিছুক্ষণ ওর চিন্তিত মুখপানে চেয়ে পরক্ষণে দৃষ্টি নামিয়ে আনল। ওর কোমরটা টেনে তার সুবলিষ্ঠ শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে ধরে বলল, “বাহিরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। এমনও বাদলা দিনে আমি যদি একটু বন্যবিড়াল হই, তুই কি খুব বেশি রাগ করবি বউ?”
পাখি দেখল লোকটার কথায় তার সমগ্র শরীর শিরশির করে কেঁপে ওঠল। লোমগুলো কাঁটা দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে হ্যাঁ না কোন জবাব দিতে পাড়ল না। কেবল মৌন রইল। ওর মৌনতা সম্মতি মেনে নিয়ে নাওয়াফ এগিয়ে যায় ওর শিয়রে। ওর পা দুটো টেনে বুকে টেনে নেয়। সেখানে ছোট ছোট চুমুতে ওর দেহের মধ্যে কম্পন ধরিয়ে দিল। পাখি কেঁপে ওঠল। দুহাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে চোখ দুটো বুজে নিল। অনুভব করতে লাগল প্রিয় পুরুষটির ছোঁয়া। নাওয়াফ ওর বন্ধ চোখ দুটোর পানে চেয়ে মুচকি হাসল। ওর কম্পিত অধর জোড়ার ওপর ছোট্ট করে একটা কামড় বসিয়ে দিল। পাখি আহ্ শব্দ করে ওঠল। নাওয়াফ ওর কোমর চেপে আরও ঘনিষ্ঠ করে নিল।
“বন্যপ্রাণীর বন্য আদরে পোষাবে আপনার? না আবার চিৎকার করে মাথা খাবেন? তাহলে কিন্তু আগে ভাগেই বলে দিচ্ছি মুখে টেপ মারব। মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া আমার পছন্দ নয় লক্ষ্মীটি। আমার স্পর্শগুলো আজ আপনাকে বড্ড পোড়াবে, জ্বালাবে। কিন্তু বাঁধা দেওয়া যাবে না, চলবে না। তাহলে আমার শক্ত হাতের মার আপনার জন্য একেবারে ফ্রি।”
পাখি চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে ফেলল।
“পাষুন্ডে একটা!”
“আমি মোটেও পাষুন্ডে নই বউ। একটু রোমান্টিক বেশি এতটুকুই।” বলেই সে ব্লাউজের হুকে হাত লাগাল। সেখানে উষ্ণ ওষ্ঠজোড়া ছোঁয়াল। পুরুষালি স্পর্শে নারীর কোমল দেহটি ধীরে ধীরে নেতিয়ে যাচ্ছে। পুরোপুরি পুরুষটির আয়ত্তে চলে যাচ্ছে সে। নাওয়াফও থামার নয়। প্রেয়সীকে লেপ্টে দেওয়া প্রতিটি আদরের সঙ্গে সত্যি সে একটু বন্য হচ্ছে। শাড়ির কুচিগুলো ধীরে ধীরে খুলে ফেলল। তার ওষ্ঠজোড়া উষ্ণতা ছড়াচ্ছে উদরের উপরিভাগে। পাখির হাত দুটো আপনাআপনি লোকটার চুলে চলে যায়। সে দুহাতে খামচে ধরে লোকটার চুল। লোকটা হাসে। পাখি লজ্জা পায়। লাজে দুহাতে মুখ ঢাকে। নাওয়াফ ওর মুখ থেকে দুহাত সরিয়ে সেখানে চুম্বন এঁকে দেয়। তার ছোঁয়া আরও গভীর হয়। গভীর করে ছোঁয় ওকে। মিষ্টি মিষ্টি যন্ত্রণার সঙ্গে রাতটা তাদের ভালোই কাটে।
সকালের দিকে পাখি আগে উঠে। গোসল সেরে সে উনুনে ভাত বসায়। তরকারি কাটতে কাটতে নাওয়াফ উঠে গেল। উঠে পাখিকে তরকারি কাটতে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলে সে। পরক্ষণেই হেসে দেয়। হাসতে হাসতে শুধাল, “সকাল সকাল উঠে গিন্নিগিড়ি শুরু হয়ে গেছে?”
পাখি গাল দুটো ফুলিয়ে বলল, “আপনি হাসবেন না। গত রাত্রে কি করেছেন দেখেছেন? বন্যপ্রাণীর মতো গলা থেকে পেট পর্যন্ত দাগ লাগিয়ে দিয়েছেন শরীরে?”
“বাঁধা দিসনি কেন?”
“তখন টের পাইনি।”
“তাহলে এখন আমার কি করা উচিত?”
“আপনার শাস্তি হওয়া উচিত।”
“যেমন?”
“আগামি এক সপ্তাহের মধ্যে আপনি আমার কাছে আসবেন না। আসলে খুন্তি পুড়ে আপনার ঠোঁটে আমি সেঁকা দিয়ে দিব।”
“সব রেখে ঠোঁটের ওপর পড়লি কেন?”
“কারণ ওই দুটোই অবাধ্য বেশি।”
“আমায় আটকে রাখতে পারবি? তারচেয়ে বড়ো কথা আমি ছুঁলে তুই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারবি?”
পাখি চুপ করে রইল। আসলেই লোকটা তাকে স্পর্শ করলে সে দুনিয়ার সবকিছু ভুলে বসে। হারিয়ে যায় কোন এক স্বর্গীয় সুখে। তখন দুনিয়াবি কোন চিন্তা তার মাথায় আসে না। সে কেবল মজে থাকে লোকটার ভালবাসায়। ওর ভাবান্তরের মধ্যে শুনতে পেল লোকটা সকাল সকাল একটা গান ধরেছে,
তুমি ছুঁয়ে দিলে হায়,
আমার কি যে হয়ে যায়?
পাখি গাল ছড়িয়ে হু হা করে হাসতে হাসতে শুয়ে পড়ল। নাওয়াফও হাসে, তবে ওমন হু হা শব্দ করে নয়। ঠোঁট টিপে নিঃশব্দে। বলিষ্ঠ দেহটা নাড়িয়ে হঠাৎ ওর দিকে এগিয়ে গেল। ওকে পাচকোলে তুলে বিছানায় নিয়ে এসে শুয়ে দিল। লোকটা ওর-বুকের ওপর থেকে আঁচল সরিয়ে গলায় নাক ঘষে। পাখি আঁতকে ওঠে।
“কি করছেন নাওয়াফ ভাই?”
“আমার খুব পেয়েছে বউ?”
“কি পেয়েছে?”
“তুই বুঝিস না?”
লোকটার কথাতে পাখি সামান্য কেঁপে ওঠল। লোকটার চোখের চাহনি অন্যরকম। যা তার পরিচিত। সে তবুও না জানার ভান করল। বলল,
“নাহ।”
লোকটা ঠোঁট কামড়ে হাসে। ওর নাকে টোকা বসিয়ে বলে,
“রোমান্স করতে।”
পাখি চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে ফেলল।
“কিহ!”
“জি। সকাল সকাল বরের রোমান্টিক অত্যাচার সহ্য করতে শিখুন বউ। এতে শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।”
পাখি তাৎক্ষণিক চিৎকার করে ওঠল।
“নায়া...হ, ছাইড়া দেন নাওয়াফ ভাই। আমি আর পারমু না। কোমর ব্যথা করছে।”
নাওয়াফ তড়িঘড়ি ওর মুখ চেপে ধরল।
“বেয়াদব, এত জোরে চিৎকার করছিস কেন? মানুষ অন্যকিছু ভাববে।”
“সে ভাবুক। আপনি কাজে যাবেন না? কাজে যান।”
“আপাতত এটাই আমার কাজ। বাঁধা দিলে আমার শক্ত হাতের শক্ত মার খাবি।”
পাখি মুখটা কাঁদোকাঁদো করে নিল। লোকটা নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পাখি আর তাকে বাঁধা দিল না। বাঁধা দিলে লোকটা মানলে তো? বড্ড বেপরোয়া। তাকে আরও একবার লোকটার রোমান্টিক অত্যাচার সহ্য করতে হলো।
দুপুরের পর কাজে বের হয়েছে নাওয়াফ। ওইদিকে বিকেল থেকে আকাশ অন্ধকার। ছোট ছোট মেঘের দলা আকাশে তুলার মতো উড়ছে। কিছুক্ষণ পর শুরু হলো অঝরে বর্ষণ ধারা। পাখির চিন্তা বাড়ল। এই বৃষ্টির মধ্যে লোকটা ফিরবে কীভাবে? যা বৃষ্টি-বাতাস, মানুষ উড়ানোর মতো। সে পথের দিকে কাতর দুটো নয়ন নিয়ে চেয়ে রইল। কখন লোকটা ঘরে ফিরবে? সন্ধ্যায় ঘরে একটি মোম জ্বলছে নিভু নিভু করে। আর কোন মোম নেই। মোমটি নিভে গেলে পুরো ঘর অন্ধাকারে গ্রাস করে নিবে। এশারের ওয়াক্ত শেষ হয়ে রাত এগারোটা বাজতে চলল। নাওয়াফ এলো না। মোমটা ধীরে ধীরে নিভে যেতে লাগল। জানলা দিয়ে বাতাসের ছটার সঙ্গে বৃষ্টির ছিটা এসে পাখিকে ভিজিয়ে দিতে লাগল। পাখির ভীষণ কান্না পেল। সেই সঙ্গে রাগও হচ্ছে। লোকটা এখনো আসছে না কেন? আজ আসুক, সে তিনটা দিন কথা বলবে না। গাল ফুলিয়ে থাকবে। ভাতও খাবে না। এগারোটা ছাড়িয়ে এবার মধ্যরাতে গিয়ে সময় পৌঁছাল। মোমবাতিটা অনেক আগেই নিভে গেছে। পাখি অন্ধকারের মাঝে বসে ভয়ে কাঁপছে। সে অন্ধকারে ভয় পায়। তার ভিতরে বাহিরে প্রচন্ড বৃষ্টি বাতাস হচ্ছে। সাথে আছে বিকট শব্দে হওয়া বজ্রপাত। সে এবার রীতিমতো ভয়ে কান্না করে দিল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, টেরই পাইনি। সেই ঘুম ভাগল ভোর পাঁচটাতে। বৃষ্টি তখনও থামেনি। এ যেন মরণব্যাধি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মানুষ খেকো বৃষ্টি। চিন্তায় অস্থিরতায় পাখির মুখ শুকিয়ে অল্পটুকু হয়ে এসেছে। লোকটাকে কোথাও সে পেল না। তার মানি লোকটা সারারাতেও আসেনি? গেল কোথায়? কোন বিপদ হলো না তো? সেও এখানকার কিছু চেনে না। যাবে কোথায়? খুঁজবে কোথায়? চিন্তা অস্থিরতায় তার মুখে খাবার ওঠে না। চিন্তায় মাথা ধরে যাচ্ছে। পুরো তিনটা দিন এভাবে গেল। না খেয়ে খেয়ে স্বামীর শোকে মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেছে তার। পরদিন মাগরিবের নামাজ পড়ে সবে উঠেছে, তখন বাড়ির আঙিয়ায় ধুম করে বিকট শব্দে কিছু পড়ার শব্দ পেল। সে হাতে কুপি নিয়ে তাড়াতাড়ি জানলার কাছে গেল। জানলা দিয়ে বাহিরে তাকাল সে। দেখল, আলো-আঁধারির মধ্যে লম্বা দেহটি অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। সারা শরীরে মাটি আর রক্তে ভেজা। বৃষ্টির পানিতে রক্তগুলো ধুয়ে যাচ্ছে। কপালের মাঝে একটি কাটা দাগ। ওনার ওমন অবস্থা দেখে তার সমগ্র শরীর দরদর করে কেঁপে ওঠল। বুকটা মুচড়ে ওঠল। কপাল ঘাম দিল। কম্পিত ওষ্ঠজোড়া হতে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে এলো, “নাওয়াফ ভাই!”
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম