#সে_আমার_সর্বনাশ_২
(৩১)
লোকটার এমন অবস্থা দেখে পাখির পরাণে আর পানি রইল না। কুপি হাতে দ্রুত নিচে নেমে এলো সে। দু'হাতে বুকে আগলে নিল নিজের প্রিয় মানুষটাকে। গালে হাত বুলিয়ে কাঁপা কণ্ঠে ডাকল, ”এই যে, শুনছেন? কথা বলুন। কে মেরেছে আপনাকে? কোথায় ছিলেন, বলুন আমায়!”
কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ল পাখি।
লোকটার কোনো চেতনা নেই। নিথরের মতো পড়ে আছে। এত বড় একটা শরীর সে কীভাবে উপরে টেনে তুলবে, ভেবেও কূল-কিনারা পাচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি পানি এনে লোকটার চোখে-মুখে ছিটিয়ে দিল। যদি জ্ঞান ফিরে আসে! কিন্তু কোনো লাভ হলো না। লোকটার চেতনা ফিরল না।
পাখির মাথা তখন আর কাজ করছে না। কী করবে সে? ভালো করে লোকটার আঘাতগুলো পরীক্ষা করল। মাথার পাশে আর কপালে গভীর ক্ষতের চিহ্ন। সেখান থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে। সে ঘর থেকে কয়েক টুকরো কাপড় এনে ক্ষতস্থানে শক্ত করে বেঁধে দিল, যাতে রক্তপাত কিছুটা কমে। এরপর এই মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেই উন্মাদের মতো মানুষ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল সে। কিন্তু চারপাশে কাউকেই পেল না, যাকে বলে নিজের স্বামীকে হাসপাতালে নেওয়ার সাহায্য চাইবে। নিরাশ হয়ে খালি হাতেই ফিরে এলো।
লোকটা তখনও আগের মতোই নিথর হয়ে পড়ে আছে।
পাখি লোকটার মাথাটা টেনে নিজের বুকে তুলে নিল। ওনার সমগ্র মুখ চুমুতে ভরিয়ে দিল। বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে তার। কান্নায় যেন বুক ফেটে যাচ্ছে। নিজের ভাগ্যের ওপর অভিমান করে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
“আল্লাহ, আমার নাওয়াফ ভাইকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ো না গো! সে ছাড়া এই ভুবনে আমার আর কেউ নেই। তাকে ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচব? আমার স্বামীকে বাঁচাও, আল্লাহ। একটু করুণা করো!”
তার সেই আকুল ফরিয়াদ বুঝি কবুল হলো। ঠিক তখনই সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল মোটা-সোটা এক ব্যক্তি। পাখির আর্তনাদ শুনে সে এগিয়ে এলো। কাছে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তার? আর তুমি এভাবে চিৎকার করে কাঁদছ কেন?”
কণ্ঠস্বরটা পাখির পরিচিত মনে হলো। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই চিনতে পারল লোকটাকে। এই সেই ব্যক্তি, যার সঙ্গে জলাভূমির দ্বারে বসে তার একদিন দেখা হয়েছিল।
যদিও লোকটার দৃষ্টি খুব একটা সুবিধার নয়, তবু বিপদের দিনে এতকিছু মনে রাখলে চলে না। এই মুহূর্তে সবার আগে নাওয়াফকে হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। দু'হাতে চোখের পানি মুছে পাখি বলল, “আমার হাসবেন্ডকে কারা যেন মেরে এখানে ফেলে রেখে গেছে। আপনি কি একটু হাসপাতালে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবেন? আমি আপনার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।”
অপরিচিত লোকটা বলল,
“কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আমাকে লজ্জিত করো না। আমি হলাম এই এলাকার মাতব্বর। প্রতিবেশীকে সাহায্য করা এটা আমার কর্তব্য। তুমি দাঁড়াও, আমি গাড়ি নিয়ে আসতেছি।”
লোকটার কথা আর আচরণে ভালোই মনে হলো। তাই পাখি আর আপত্তি করল না। এইদিকে নাওয়াফের অবস্থা ভালো না। লোকটাকে তো হসপিটালে নিতে হবে। ওই লোক এরমধ্যে গাড়ি নিয়ে চলে এলো। পাখিকে বলল, “তুমি আমার সঙ্গে তোমার হাসবেন্ডকে ধরো। একা একা তোলা যাচ্ছে না।”
পাখি মাথা ঝাঁকাল। সে লোকটার সঙ্গে সঙ্গে নাওয়াফকে তুলে গাড়িতে করে হসপিটালে নিয়ে গেল। হসপিটালে নাওয়াফকে ভর্তি করার পর আরেকটি লজ্জার মুখে পড়ল সে। ডাক্তার বলেছে ইমারজেন্সি অপারেশন করতে হবে। মাথার আঘাতটা গভীর। যা এখন অপারেশন না করলে পরবর্তীতে সমস্যা হবে। তাই এখন কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লাগবে। পাখির মাথায় গোটা আকাশটা ভেঙে পড়ল। হাত খালি তার। শৌচনীয় অবস্থা। এই এমন অবস্থাতে টাকা পাবে কই সে? তার পাশে দাঁড়ানো লোকটা বলল, “চিন্তা করো না। টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমি ডাক্তারকে অপারেশন করতে বলে আসছি। তুমি এখানে বসো।”
পাখি অবাক হয়ে শুধাল, “আপনি এত টাকা পাবেন কোথায়? আর অপরিচিত লোককে কেনই দিবেন?”
লোকটা প্রত্যুত্তরে চাপা হাসল। যে হাসিতে লুকিয়ে ছিল অপ্রকাশিত কিছু রহস্য।
“আমার নাম সিরাজ। তুমি আমাকে সিরাজ ভাই বলে ডাকতে পারো। আর একটা কথা মনে রেখো, কেউ কাউকে এমনিতে সাহায্য করে না। কোন কিছুর বিনিময়েই সাহায্য করে। আমারও তেমন কিছু দরকার। যেটা তোমার থেকে চাই। তখন তুমি আমার প্রয়োজন মেটাবে, যেমন আমি এখন তোমারটা মেটাচ্ছি।”
পাখি লোকটার চোখে চোখ রেখে জিগ্যেস করতে পারল না সেই প্রয়োজনটা কি? তবে সে বলল, “আমার সাধ্যের মধ্যে চাইলে অবশ্যই আমি আপনার প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করব।”
“এই কথাটি পরে মনে থাকবে তো তোমার?”
“আমি কাউকে কথা দিলে কথা ফিরিয়ে নেই না।”
“গুড গালর্স। সময় মতো আমার প্রয়োজন মিটিয়ে নিব।” বলেই সিরাজ চলে গেল।
পাখি ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। লোকটা যতক্ষণ তার সামনে ছিল, তার দিকে তাকিয়ে ছিল। যেটা তার ভালো লাগেনি। অস্বস্তি লেগেছে। সে জানে না লোকটা তার কাছে কি চায়? কেনই শুধু শুধু যেচে এসে সাহায্য করছে। যা কিছুই হোক সে তার নাওয়াফ ভাইয়ের জন্য সবকিছু করতে পারবে। পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে গিয়ে লড়াই করতে হলেও করবে। লোকটার সঙ্গে থাকতে থাকতে কখন যে সে লোকটার মায়ায় পড়ে গেছে, ভালোবেসে ফেলেছে, সে নিজেও জানে না। এখনো লোকটার রক্ত তার শরীরে লেগে আছে। সে ফুঁপিয়ে ওঠে।
“আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আসুন নাওয়াফ ভাই। আপনি ছাড়া গোটা পৃথিবী আমার কাছে জেলখানার মতো অন্ধকার মনে হয়। আমি শ্বাস নিতে পারি না।”
“একি তুমি কাঁদছো?”
সিরাজের কণ্ঠ পেয়ে পাখি দ্রুত চোখ দুটো মুছে ফেলল। তবে সে জবাব দিল না। সিরাজ পাখির পাশে বসল।
“স্বামীকে বুঝি অনেক ভালোবাসো?”
পাখি এবার নিজের কান্না আটকে রাখতে পারল না। দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ওঠল। বিড়বিড় করে বললও,
“উঁহু, ওনার তুলনায় কম ভালোবাসি। ওনি আমাকে তার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে।”
“তোমাদের ভালবাসা লাইলি মজলুকেও দেখছি হার মানাবে।”
পাখির মনে হলো লোকটা তাদের ঠাট্টা করছে। সে ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরুলো। জানাল, অপারেশন কমপ্লিট হয়েছে। পেসেন্ট এখন বিপদমুক্ত। আপাদত ঘুমেচ্ছে। সকালের দিকে জ্ঞান ফিরবে। পাখি সৃষ্টিকর্তার কাছে হাজার শুকরিয়া জানাল।
সিরাজ পাখির হাসি খুশি মুখটার দিকে চেয়ে বলল, “তোমার হাসি তো মারাত্মক। তোমার হাসি দেখে নিশ্চয়ই তোমার স্বামী তোমার প্রেমে পড়েছে?”
পাখি খানিকটা অপ্রস্তুত হলো। সে গলা খাকারি দিয়ে বলল, “এটা হসপিটাল। এখানে অযৌক্তিক কথা না বলাই ভালো।”
“দুঃখিত। তোমায় বিব্রত করার জন্য। আপাতত আসছি। সকালে দেখা হবে।”
সিরাজ বেরুতে পাখি স্বস্তি পেল। সে ডাক্তারের থেকে পারমিশন নিয়ে নাওয়াফের কেবিনে ঢুকল। লোকটার মাথায় মোটা একটা ব্যান্ডেজ। ঘুমিয়ে আছে। পাখি একটা ঢুল এনে লোকটার মাথার কাছটাতে বসল। দীর্ঘক্ষণ মুখটার দিকে চেয়ে রইল। কি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে? তার নয়নজোড়া ভিজে ওঠল। তাজাতোজা সুস্থ-সবল পুরুষটিকে হঠাৎ এমন হসপিটালের বেডে শুয়ে থাকতে দেখে পাখির মন কেঁদে ওঠল। সে লোকটার হাতটার ওপর গভীর দুটো চুমু খেয়ে বলল, “আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন প্রিয় পুরুষটি। আপনার পাখি যে আপনি ছাড়া অচল।”
রাত একটার দিকে লোকটা ঘুমের ঘোরে পানি খেতে চেয়েছিল। পাখি পানি খাইয়ে আবার শুয়ে দিয়েছিল। সারারাত নির্ঘুমে এভাবে জেগে লোকটার পাশে বসেছিল সে। খুব ভোরের দিকে ঘুম ভাঙল তার। সেও লোকটার ডাকে। দেখল, চোখ মেলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে লোকটা। পাখি ছলছল নয়নে লোকটার মুখটার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে। লোকটার বুকে মাথা গুঁজে শার্ট খামচে ধরল। নাওয়াফ ওর মাথায় ছোট করে একটা চুমু খায়। ওকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে রেখে বলে, “কাঁদছিল কেন বোকা? আমি ঠিক আছি তো।”
পাখি মুখটা তুলে লোকটাকে চোখ দুটো রাঙিয়ে বলল, “ঠিক আছেন না? তিনটা দিন নিখোঁজ রইলেন। বউ কি করছে, খাচ্ছে না মরছে কোন খোঁজ নিছেন? তিন দিন পর রক্তাক্ত আহত শরীর নিয়ে ফিরলেন। তাও অজ্ঞান হয়ে। আপনার ওই অবস্থা দেখে আমার কি হয়েছিল জানেন? কলিজায় পানি ছিল না। মনে হচ্ছিল শ্বাসটা গলায় এসে আটকে আছে।”
নাওয়াফ ওর মাথাটা আবার বুকে চেপে ধরে বলল, “এখন তো ঠিক আছি বউ। দেখি আর কাঁদে না। সারারাত নিশ্চয়ই জেগে ছিলি? এখন একটু ঘুমা।”
সত্যি সত্যি পাখির ঘুম পাচ্ছিল। তার ভিতরে প্রিয় পুরুষটির বুকটা আরও আদুরে আদুরে লাগছিল। সে সবে চোখ দুটো বন্ধ করতে যাচ্ছিল, তখনই কেবিনের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল সিরাজ। নাওয়াফের ধূর্ত চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে নিবদ্ধ হলো সেদিকে। পাখিও ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু নিল। সিরাজকে দেখে দ্রুত সে নাওয়াফের বুক থেকে উঠতে যাচ্ছিল। নাওয়াফ ওকে উঠতে দিল না। ওর মাথাটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরে সিরাজের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “হু আর ইউ?”
সিরাজ হেসে বলল, “সিরাজ।”
“সে যাই হন, অনুমতি ছাড়া কারোর কেবিনে প্রবেশ করা যায় না। এই ভদ্রতাটুকুও দেখছি জানেন না।”
পাখি নাওয়াফকে ফিসফিস করে বলল, “ওনাকে আমি চিনি। আপনাকে হসপিটাল ভর্তি করতে তিনিই সাহায্য করেছিলেন।”
টাকার কথাটা পাখি আর বলল না। গোপন রাখল। এমনিতে লোকটা একটু আত্মসম্মানওয়ালা। যদি শোনে কারোর থেকে সাহায্য নিয়ে তাকে চিকিৎসা করিয়েছে, তাহলে এখনই হসপিটাল থেকে বেরিয়ে যাবে। তাই সে আর ওসব তুলল না। পাখি আবার বলল, “ছাড়ুন, আমি উঠব। ওই লোকটা কি ভাববে?”
নাওয়াফ তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তবে ওকে ছাড়ল। সিরাজ চেয়ারে বসতে বসতে বলল, “ভুল সময়ে বুঝি এসে পড়েছি?”
নাওয়াফ জবাব দিল না। লোকটাকে তার পছন্দ হচ্ছে না। অসহ্য ঠেকছে। তবে পাখি উত্তর দিল।
“না না ভাইয়া, সমস্যা নেই।”
নাওয়াফকে উদ্দেশ্য করে সিরাজ বলল,
“তো আপনি এখন কেমন আছেন?”
নাওয়াফ গম্ভীর কণ্ঠে জবাবে বলল, “ ভালো।”
“যাক ভালো হলেই ভালো। আপনার স্ত্রী যা কান্না করেছে। এখন তো সুস্থ আছেন।”
নাওয়াফ আর কথা বলল না। সে নিশ্চুপে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। সিরাজ বুঝল নাওয়াফ তার উপস্থিতি পছন্দ করছেন না। সে তাই বলল, “ আচ্ছা আসছি। আপনি রেস্ট করুন।”
পাখি সৌজন্যমূলক হাসল। কিন্তু নাওয়াফ হাসল না। সে উল্টো পাখিকে চোখ রাঙাল।
“ওর থেকে দূরে থাকবি।”
পাখি অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কেন?”
“থাকবি মানে থাকবি। ওকে আমার পছন্দ না। ওর চাহনি আমার ভালো লাগেনি।”
পাখি নীরবে মাথাটা ঝাঁকাল, “ঠিকাছে।”
পাখি চিন্তায় পড়ে গেল নাওয়াফ যদি কখনো জানে ওই লোকটার থেকে টাকা নিয়ে সে তার চিকিৎসা করিয়েছে। বিনিময়ে লোকটাও তার কাছে কিছু চায়। তাহলে সাংঘাতিক কিছু ঘটবে। অতঃপর যা মিটমাট করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। হসপিটালে দুদিন থাকার পর নাওয়াফকে বাড়ি আনা হলো। ডাক্তার দুবেলা কড়া ঘুমের ঔষধ খেতে দিয়েছে। এক সপ্তাহ খেতে হবে। ঘুমে থাকলে মাথায় প্রেশার কম পড়বে, এতে ইনজুরি তাড়াতাড়ি শুকাবে। পাখি রান্না করতে গিয়ে দেখল হাড়ি খালি। চাল নেই। ওইদিকে নাওয়াফ বলেছিল তার ক্ষুধা লেগেছে। এখন চাল পাবে কোথায়? ঘরে পেয়াজ, লবন, মরিচ ছাড়া আর কোন বাজারও নেই যে রান্না করবে। সে একটা কাজ করল। চৌকির নিচে একটা আলু পেল। সেটা সিদ্ধ করে নাওয়াফকে খাইয়ে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দিল। পাতিল ভর্তি পানি চুলায় দিয়ে মিথ্যে বলল, ভাত বসিয়েছে। এরমধ্যে লোকটা ঘুমিয়ে পড়ল। পাখি উদাস ভঙ্গিতে জানলার পাশে বসে রইল। পাতিলের পানি শুকিয়ে গেছে। পেটে খাবার নেই। ক্ষিধের জ্বালায় ছটফট করছে সে। তখন টের পেল ১০ বছরের ছোট একটা বাচ্চা দরজা নক করছে। সে দরজা খুলে দিল।
বাচ্চাটি পাখিকে বলল, “সিরাজ কাকা আপনারে ডাকছে। কি কাজ দিব জানি? আপনে আমার সঙ্গে আসেন।”
পাখি ঘুমন্ত নাওয়াফের পানে এক পলক তাকিয়ে বাচ্চাটির সঙ্গে হাঁটা ধরল। নিজের জন্য না হলেও লোকটার জন্য যাওয়া উচিত। ওখানে যদি গিয়ে কোন রকমের খাবারের যোগাড় হয়, সে অনুরোধ করে নাওয়াফের জন্য কিছু খাবার নিয়ে আনবে ভাবল।
দোতলা একটি ঘর। বেশ পরিপাটি। সে রুমে ঢুকতেই সিরাজ তাকে বসতে বলল। তারপরে বলল, “তোমাকে ডাকতাম না। জরুরি প্রয়োজন ছিল, তাই ডেকেছি। আচ্ছা তুমি কি ৪-৫ জনের রান্না করে দিতে পারবে? বাড়িতে মেহমান এসেছে। কাজের মেয়েটা তিন দিনের জন্য ছুটি নিয়েছে। আমিও রান্না জানি না। যদিও এসব তোমাকে বলতে লজ্জা করছিল। তোমরা হলা ভদ্র ফ্যামিলি। তবুও আর কোন উপায় ছিল না।”
পাখি বিনাবাক্য রাজি হয়ে গেল। তবে সে বলল, “শর্ত আছে একটা। আমাকে দুপুর আর রাতের খাবার দিয়ে দিতে হবে। কারণ আপনার এখানে রান্না করলে আমি বাসায় রান্না করার সময় পাব না।”
“আমি রাজি। তবে তুমি আরেকবার ভেবে বলো। যদিও তোমরা ভদ্র ফ্যামিলির। তোমার স্বামীকে দেখে মনে হয় সে তোমার এই কাজটা পছন্দ করবে না।”
পাখি জানে নাওয়াফ এটা জানলে সত্যিই তাকে কখনো ঘর থেকে বের হতে দিবে না। দরকার পড়লে না খাইয়ে রাখবে। কিন্তু সে নিরুপায়। পেটের ক্ষুধার কাছে সব রাজি।
পাখি বল়ল, “সমস্যা নেই। আমি মেনেজ করে নিব।”
সিরাজ আর আপত্তি করল না। তাকে রান্নাঘরটা দেখিয়ে দিল। পাখি দেখল মোটামুটি সিরাজদের অবস্থা ভালোই। বিরাট বড়ো রান্নাঘর। রান্না করতে কোন অসুবিধা হবে না। রান্না করার ফাঁকে ফাঁকে সিরাজ এসে তাকে এটা ওটা দিয়ে সাহায্য করতে চাইছিল। পাখি রাজি হয়নি। এই বাড়িতে আসার পর পাখি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছে। এখানে কোন মেয়ে মানুষ নেই। সব পুরুষ। তাদের আচরণও অদ্ভুৎ। তাকে প্রথম দেখে এমন অদ্ভুত চোখে তাকিয়েছিল, যেন জীবনে কখনো মেয়ে মানুষ দেখেনি। এ প্রথম দেখেছে। আর সবচেয়ে বড়ো অবাক করার বিষয় ছিল সিরাজের রান্নাঘরে ক্যামেরা লাগানো ছিল। যেটা পাখির কাছে একদমই ভালো লাগেনি। রান্নাশেষে সে দুপুর আর রাতের ভাত নিয়ে সিরাজের কাছে বলতে গেল সে চলে যাচ্ছে। তখন সিরাজ টেলিফোনে কথা বলছিল। পাখিকে দেখে দূর থেকে এক ধ্যানে তাকিয়েছিল। পাখির অস্বস্তি লাগল। সে ‘আসছি’ বলে চলে যাচ্ছিল। ফের আবার পিছু ঘুরে বলল, “আপনার সেই পঞ্চাশ হাজার হিসাবটা বললেন না। কি চাই আপনার?”
ওর কথা শুনে সিরাজ হাসে। হাসতে হাসতে ওর দিকে অদ্ভুৎ চোখে তাকায়। বলে, “সেটা সময় হলে চেয়ে নিব। আপাতত তুমি যাও। তোমার হাসবেন্ড অপেক্ষা করছে।”
লোকটার আচার ভঙ্গিমা পাখির কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছিল। সে দ্রুত ওখান থেকে কেটে পড়ল।
বাড়ি ফিরে পাখি দেখল নাওয়াফ নিচে পড়ে গেছে। মাথা থেকে রক্ত বেরিয়েছে। পাখি দ্রুত লোকটাকে ধরল। ধরে খাটে উঠতে সাহায্য করল। নাওয়াফ নিভু নিভু চোখে জানতে চাইল, “কোথায় গিয়েছিলি? তোকে কত ডাকলাম! এলি না কেন?”
পাখি থতমত খেল। সে এখন কি বলবে? তখন হাতের খাবারের দিকে নজর গেল তার। সে বলল, ”খাবার কিনতে গিয়েছি। ঘরে ভাত নেই। খাবার না কিনলে খাবেন কি?”
“টাকা পেয়েছিস কোথায়?”
“ডাকাতি করেছি। এবার হয়েছে আপনার? বাব্বাহ এত প্রশ্ন করে মানুষ? এখন বসুন। আপনার হাত মুখ মুছে খাবার খাইয়ে দেই।”
নাওয়াফের বিশ্বাস হলো না ওর মুখের কথা। সে পাখিকে টেনে এনে তার পাশে বসাল। ওর থুতনি চেপে ধরে শক্ত অভিব্যক্তিতে বলল, “দারিদ্রতা মানুষের স্বভাব নষ্ট করে, চরিত্র নষ্ট করে। আমি চাই না তুই আমার অবাধ্য হস। কখনো এসব পাপে জড়িয়ে পড়িস। তাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না। আমি সবকিছু সহ্য করতে পারি। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা মোটেও সহ্য করতে পারি না পাখি। কখনো যদি এমন কিছু দেখি না? সবার আগে খুন করব তোকে। সোজা জবাই করব। কথাটা মনে রাখিস। প্রতারক যদি আমার মাও হয়, আমার আদালতে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড।”
লোকটার কথায় পাখির কলিজা পর্যন্ত কেঁপে ওঠল। সে জানে না সামনে কি ঘটবে? যাই ঘটুক, সে কোন অন্যায় করেনি। অতঃপর তার ভয় পাওয়ার কোন কারণও নেই।
#(চলমান~)
#লামইয়া_তাসনিম